বিবলিওম্যানিয়া বিবলিওফেলিয়া: গ্রন্থোন্মাদ ও গ্রন্থপ্রেমী

 ড. মোহাম্মদ আমীন

ইংরেজিতে বিবলিওম্যানিয়া (Bibliomania) অর্থ— গ্রন্থের প্রতি অত্যধিক আসক্তি, গ্রন্থন্মোদনা। যারা গ্রন্থোন্মাদ, পুস্তকোন্মাদ, গ্রন্থে অত্যধিক আসক্ত গ্রন্থবাইগ্রস্ত তাদের গ্রন্থম্যানিয়া বা বিবলিওম্যানিয়ায় আক্রান্ত বলা যায়।

উন্মাদের মতো গ্রন্থ সংগ্রহ, গ্রন্থ সংগ্রহের জন্য উন্মত্তের মতো আচরণ, নির্দিষ্ট পুস্তককে তৃষ্ণার্ত মাতালের মতো নিজের সংগ্রহে নিয়ে আসার জন্য বোধহীন আচরণ, নৃশংস হয়ে যাওয়া, সংগৃহীত পুস্তক গোপনে জমিয়ে রাখা, অন্যদের সংগৃহীত গ্রন্থ থেকে দূরে রাখা প্রভৃতি আচরণ মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে চলে গেলে তাদের জন্য বিবলিওম্যানিয়া শব্দটি প্রয়োগ করা হয়।

এমন আচরণকারীদের সংগৃহীত বই তাদের বা অন্য কারও কাজে লাগে না। তারা কেবল বই সংগ্রহ করে। পুস্তুকরাজির ক্ষুদ্রাংশও পঠিত হয় না। সংগৃহীত বইয়ের স্তূপে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এক একা বিশাল বইয়ের ভান্ডারে কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় বইয়ের নিচে চাপা পড়ে মারা যায়। এরূপ অনেক ঘটনা আছে।

ব্যক্তিবিশেষের বই সংগ্রহের এমন উন্মত্ততাকে The American Psychiatric Association (APA)- ম্যানিয়া বা রোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে (দেখতে পারেন DSM-IV)। যারা এমন আচরণ করে তাদের বলা যায়— গ্রন্থোন্মাদ, পুস্তকোন্মাদ, গ্রন্থধর্ষী, গ্রন্থধর্ষক, গ্রন্থাসক্ত প্রভৃতি।

পাণ্ডুলিপি, একাধিক সংস্করণ, দামি, পুরাতন, দুর্লভ, আকর্ষণীয় চিত্রসম্বলিত, মিহিপাতায় রচিত, ইতিহাস, ব্ল্যাকলেটার, সচিত্র প্রতিলিপি-সহ যে-কোনো তথ্যবহুল বইয়ের প্রতি তাদের তীব্র লোভ এবং তা সংগ্রহের জন্য প্রচণ্ড উন্মদনা লক্ষ করা যায়। এরা বই দেখলে মাতাল ধর্ষকের মতো হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এবং ওই বইকে যে-কোনো প্রকারে নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। এজন্য চুরি, ডাকাতি এমনকি খুনের মতো অপরাধ ঘটাতেও কুণ্ঠিত হয় না।

বিবলিওফিলিয়া ও বিবলিওম্যানিয়া

তবে Bibliophilia-এর সঙ্গে Bibliomania-কে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। Bibliophilia or bibliophilism হচ্ছে বইয়ের প্রতি ভালোবাসা, বইপোকা; যারা বইকে ভালোবাসে এবং প্রচুর বই পড়ে তাদের জন্য Bibliophilia শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এরা বইকে ভালোবাসে, সতর্কতার সঙ্গে বই বাছাই করে, যত্ন নেয়, অধ্যয়ন করে। অন্যকে দেখতে দেয়; পড়তে দেয়, ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকলে ধারও দেয়। বিবলিওফিলিয়াকে বলা যায় গ্রন্থপ্রেম, কিন্তু বিবলিওম্যানিয়াদের কাজ গ্রন্থকে ধর্ষণ কর। উভয়ের পার্থক্য যথাক্রমে প্রেমিক আর ধর্ষকের মতো।

ম্যানচেস্টার রয়্যাল ইনফার্মারির চিকিৎসক জন ফেরিয়ার [John Ferriar (১৭৬১-১৮১৫)] ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর পুস্তকপ্রেমী বন্ধু রিচার্ড হেবারকে [Richard Heber (১৭৭৩-১৮৩৩)] উৎসর্গীকৃত একটি কবিতায় প্রথম বিবলিওম্যানিয়া শব্দটি ব্যবহার করেন। রেভারেন্ড টমাস ফ্রোগনাল দিব্বিন (Reverend Thomas Frognall Dibdin) ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে বিবলিওম্যানিয়া বা বুক ম্যাডনেস প্রকাশ করেন। যেখানে সাহিত্য সামলোচক (Philip Connell) ফিলিপ কনেলের উদ্ভট সংলাপগুলো ছিল। এখানে বিবলিওম্যানিয়ার অনেকগুলো লক্ষণ উল্লেখ করা হয়েছে।

বিখ্যাত/ কুখ্যাত কয়েকজন গ্রন্থোন্মাদ

স্টিফেন ব্লামবার্গ (Stephen Blumberg) একজন খ্যাত-কুখ্যাত গ্রন্থধর্ষী। ৫.৩ মিলিয়ন ডলারের পুস্তক চুবি করার জন্য তাঁকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। প্রথম ব্যারন স্যার থমাস ফিলিপস [Sir Thomas Phillipps (1792–1872)] আর একজন গ্রন্থধর্ষী। তার সংগ্রহে ছিল ১ লাখ ৬০ হাজারের অধিক বই ও পাণ্ডুলিপি। তার মৃত্যুর পর বইগুলোর খবর পাওয়া যায়। বইগুলো সংগ্রহের জন্য তিনি অনেক মানুষকে কষ্ট দিয়েছেন, খুনও নাকি করেছেন। গত একশ বছর যাবত তার বইয়ের নিলাম হয়ে আসছে। এখনও শেষ হয়নি।

রেভ ডব্লিউ এফ উইচার (Rev. W.F. Whitcher) আর এক পরিচিত গ্রন্থোন্মাদ বা গ্রন্থধর্ষী। তার অভ্যাস ছিল দুর্লভ বই চুরি করা। বই দেখলে তা পাওয়ার জন্য উন্মাদ হয়ে যেতেন। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি বই চুরি করে ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগে দুর্লভ গ্রন্থের বিশাল এক ভান্ডার গড়ে তুলেছিলেন। ডন ভিনসেন্ট ( Don Vincente) নামের এক স্প্যানিশ সন্ন্যাসী মঠ থেকে বই চুরি করে বিশাল একটি সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছিলেন। বই চুরি করার জন্য তিনি নয় জন লোককে হত্যা করেন। রিড অর ডাই (Read or Die)-এর নায়ক Yomiko Readman ছিলেন অতিমাত্রার অন্তর্মুখী একজন বিবলওম্যানিয়া ব্যক্তি। তিনি মানুষের চেয়ে পুস্তককে অধিক গুরুত্ব দিতেন। একটি বইয়ের জন্য তিনি একশ মানুষকে অবহেলা করতেও কুণ্ঠিত হতেন না।

বিবলিওম্যানিয়া ও বিবলিওফ্যালিয়া: গ্রন্থোন্মাদ ও গ্রন্থপ্রেমী

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com

All Link : শুবাচে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ লেখা

All Link

All Links/1

All Links/2

শুবাচির প্রশ্ন থেকে উত্তরAll Links/3

 

 
 
error: Content is protected !!