বিবিধ ব্যাকরণ প্রত্যয় প্রকৃতি, সন্ধি, শানচ, শব্দ ইন প্রত্যয়ান্ত, ইন ভাগান্ত, একাকী কিন্ত একাকিত্ব, মন্ত্রী কিন্তু মন্ত্রীগণ

 
ড. মোহাম্মদ আমীন

একবচনে ঈ-কার বহুবচনে ই-কার

সংস্কৃত ইন প্রত্যয়ান্ত শব্দের বহুবচনে ঈ-কার এর পরিবর্তে ই-কার হবে। যেমন হস্তিযূথ, করিযূথ, মন্ত্রিবর্গ, প্রাণিকুল, কর্মিবৃন্দ, গুণিগণ, প্রার্থিগণ, শিক্ষার্থিবৃন্দ প্রভৃতি।

ই-কার ও ঈ-কার-বিধি/২

৫. পূজা-অর্চনা বা উপাসনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেবী, দেবীর নামে রাখা প্রাকৃতিক জলাশয়, স্থান কিংবা দেবীর নামের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত শব্দের শেষে ঈ-কার হবে। যেমন: দেবী, শ্রীদেবী, লক্ষ্মী, কালী, চণ্ডী, সরস্বতী, ভাগীরথী।
৬. চন্দ্রবিন্দু থাকলে ওই শব্দে একদম ঈ-কার দেবেন না। কারণ চন্দ্রবিন্দু-যুক্ত সব শব্দই অতৎসম। যেমন: চিচিংফাঁক, ঘেঁষাঘেষি, ঝুঁকি, ফাঁকিবাজি, ফাঁসি।
দাদি বলে রাঁধি, চন্দ্রবিন্দুয় ই-কার বসায় গাধি।
৭. শেষে ঈ-কার আছে এমন কোনো তৎসম শব্দকে ঈ-প্রত্যয় (-নী, -ণী ) যুক্ত করে স্ত্রীবাচক করতে গেলে ঈ-প্রত্যয় (-ণী/-নী) যেখানে বসবে তার আগের ঈ-কার, ই-কার করে দেবেন। যেমন: অধিকারী> অধিকারিণী, অধিবাসী> অধিবাসিনী, অধিরোহী> অধিরোহিণী, প্রতিযোগী> প্রতিযোগিনী, অনুরাগী> অনুরাগিনী, অনুসারী> অনুসারিণী, দুঃখী> দুঃখিনী, পালনকারী>পালনকারিণী।
ণ কেন? র থাকায় কয়েকটি শব্দের ন, ণত্ববিধিমতে, ণ হয়ে গেছে। এ নিয়ে ভাববেন না, র-এর পর ণ বসিয়ে দেবেন।
৮। কোনো শব্দের শেষে ঈ-কার থাকলে (সংস্কৃত ইন-প্রত্যয়ান্ত শব্দ) এবং এর শেষে -ত, -তা, -ত্ব, প্রত্যয় যুক্ত করলে প্রত্যয়ের আগের ঈ-কার, ই-কার করে দেবেন। যেমন: গন্ত্রী>গন্ত্রিত্ব, গন্ত্রিতা, গন্ত্রিত; যন্ত্রী>যন্ত্রিত, যন্ত্রিত্ব; স্থায়ী>স্থায়িত্ব, দায়ী>দায়িত্ব, মন্ত্রী>মন্ত্রিত্ব, চমৎকারী>চমৎকারিত্ব; কৃতী> কৃতিত্ব, নীতি>নেতৃত্ব, প্রার্থী>প্রার্থিতা, উপকারী>উপকারিতা, সহযোগী>সহযোগিতা, পরাধীন>পরাধিনতা, আত্মীয়>আত্মিয়তা।
সতীর সতিত্ব আর কৃতীর কৃতিত্ব ই-কার নিয়ে চলন্ত।
৯। কোনো বিশেষ্য বা বিশেষণের শেষে ঈ-কার থাকলে (সংস্কৃত ইন-প্রত্যয়ান্ত শব্দের ঈ-কারান্ত রূপ) এবং ওই শব্দটি সমাসবদ্ধ হলে ঈ-কার, ই-কার বানিয়ে দেবেন। যেমন: প্রাণী> প্রাণিতত্ত্ব, প্রাণিবিদ্যা, প্রাণিবিজ্ঞান; মন্ত্রী> মন্ত্রিপরিষদ, মন্ত্রিসভা, যন্ত্রী> যন্ত্রিবিদ্যা, যন্ত্রিশালা/যন্ত্রিশাল, গন্ত্রী>গন্ত্রিপরিষদ।
১০. ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ব্যতিরেকে -কৃত, -ভবন, -ভূত ও -করণ প্রভৃতি যুক্ত হলে বিশেষ্যের শেষের অ/আ/ই/ঈ-কার, ঈ-কার করে দেবেন। যেমন: সরল থেকে সরলীকরণ, ভস্ম থেকে ভস্মীকরণ, বক্র থেকে বক্রীকরণ, ব্যক্ত থেকে ব্যক্তীকরণ, বাজি থেকে বাজীকরণ এবং ঘন থেকে ঘনীকরণ, ঘনীকৃত, ঘনীভবন ও ঘনীভূত।
 
ইন ভাগান্ত শব্দ
ইন প্রত্যয়ান্ত মানে (প্রত্যয়+অন্ত = প্রত্যয়ান্ত), অন্তে ইন প্রত্যয় আছে। সংস্কৃত একবচনে গুণী হয়। ‘গুণ’ নাম-প্রকৃতির সঙ্গে ইন প্রত্যয় যোগ হলে গুণ+ইন = গুণিন্ হবে। একে ইন ভাগান্ত শব্দও বলা যায়।
ভাগান্ত = ভাগ+অন্ত।
অর্থাৎ অন্তে বা শেষে ‘ইন’ ভাগ বা অংশ আছে।
সমস্ত প্রত্যয় সম্ভবত নির্দিষ্ট আছে। মনে করি, প্রত্যয় ছাড়াও অন্য ভাগান্ত শব্দ হতে পারে।
যেমন, অন ভাগান্ত শব্দ ‘রাজন’। এটিও মানে — ‘রাজন’ ‘অন’ প্রত্যয়ান্ত শব্দ।
‘খেচর’ কে কি ‘চর’ ভাগান্ত শব্দ বলতে পারি? আরও উদাহরণ –
খেচর, সহচর, জলচর, ভূচর, গুপ্তচর, বনচর, অনুচর।
কোথায় ই-কার আর কোথায় ঈ-কার হবে
 
কোথায় ই-কার আর কোথায় ঈ-কার হবে
১। তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, মিশ্র অর্থাৎ সকল অ-তৎসম শব্দে ই-কার হবে।
যেমন : খুশি, চাকরি, জানুয়ারি, দিঘি, পাখি, বাড়ি, মাসি ইত্যাদি।
২। ভাষা ও জাতিতে ই-কার হবে।
যেমন : ইংরেজি, জাপানি, জার্মানি, ফারসি, বাঙালি ইত্যাদি।
৩। সংস্কৃত ইন-প্রত্যয়ান্ত শব্দের সঙ্গে -ত্ব, -তা, -নী প্রত্যয় বা -ণী যুক্ত হলে ই-কার হবে।
যেমন :
অনুসারী > অনুসারিণী,
দায়ী > দায়িত্ব,
দুঃখী > দুঃখিনী,
প্রার্থী > প্রার্থিতা ইত্যাদি।
৪। সংস্কৃত ইন-প্রত্যয়ান্ত শব্দের ঈ-কারান্ত রূপ সমাসবদ্ধ হলে ই-কার হবে।
যেমন :
গুণী > গুণিজন;
প্রাণী > প্রাণিতত্ত্ব, প্রাণিবিদ্যা;
মন্ত্রী > মন্ত্রিপরিষদ, মন্ত্রিসভা ইত্যাদি।
৫। প্রমিত বানানে শব্দের শেষে ঈ-কার থাকলে -গণ যোগে ই-কার হবে।
যেমন :
কর্মচারী > কর্মচারিগণ,
কর্মী > কর্মিগণ,
প্রার্থী > প্রার্থিগণ,
সহকারী > সহকারিগণ ইত্যাদি।
৬। ব্যক্তির -কারী, -চারী বা -আরী নয়, এমন শব্দে ই-কার হবে।
যেমন : তরকারি, দরকারি, পাইকারি, পায়চারি, সরকারি ইত্যাদি।
৭। পদের শেষে -অলি প্রত্যয় বা অঞ্জলি শব্দ যুক্ত হলে ই-কার হবে।
যেমন : অঞ্জলি, গীতাঞ্জলি, জলাঞ্জলি, পুষ্পাঞ্জলি, শ্রদ্ধাঞ্জলি ইত্যাদি।
৮। পদের শেষে -আলি প্রত্যয় যুক্ত হলে ই-কার হবে।
যেমন : খেয়ালি, চৈতালি, পুবালি, মিতালি, রুপালি, স্বর্ণালি ইত্যাদি।
৯। পদের শেষে সমষ্টিবাচক -আবলি যুক্ত হলে ই-কার হবে।
যেমন : কার্যাবলি, গ্রন্থাবলি, তথ্যাবলি, নিয়মাবলি, পত্রাবলি ইত্যাদি।
১০। ব্যক্তির -কারী, -চারী বা -আরী-তে ঈ-কার হবে।
যেমন : অধিকারী, উপকারী, কর্মচারী, নভোচারী, সহকারী ইত্যাদি।
১১। ঈ, ঈয়, অনীয় প্রত্যয় যোগ হলে ঈ-কার হবে।
যেমন :
চণ্ড > চণ্ডী,
জাতি > জাতীয়,
দেশি > দেশীয়,
মান > মাননীয় ইত্যাদি।
১২। জীব অর্থে সব বানানে ঈ-কার হবে।
যেমন : জীব, জীবন্ত, জীবিকা, জীবিত, সজীব ইত্যাদি।
১৩। পদের শেষে -জীবী ঈ-কার হবে।
যেমন : আইনজীবী, কৃষিজীবী, চাকরিজীবী, পেশাজীবী, মৎস্যজীবী ইত্যাদি।
১৪। নীল অর্থে সব বানানে ঈ-কার হবে।
যেমন : নীল, নীলগিরি, নীলাচল, নীলিমা ইত্যাদি।
 
প্রাণী কিন্তু প্রাণিসম্পদ
 
‘প্রাণী’ শব্দটি যখন সমাসবদ্ধ হবে যেমন — প্রাণিসম্পদ, প্রাণিবিদ্যা, তখন সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী ইন্‌-প্রত্যায়ন্ত শব্দের দীর্ঘ ঈ-কারান্ত রূপ পরিবর্তিত হয়ে হ্রস্ব ই-কার হবে।
প্রাণী, মন্ত্রী ইন্‌ প্রত্যায়ান্ত শব্দ; কিন্তু ‘কৃতী’ কী করে ইন্‌-প্রত্যায়ন্ত শব্দ? এই শব্দ তিনটির ব্যুৎপত্তি হচ্ছে যথাক্রমে প্রাণী ( স. প্রাণ + ইন্‌ ), মন্ত্রী ( স. √মন্ত্র + ইন্‌), কৃতী ( স. কৃত + ইন্‌)।
‘কৃতী’ শব্দটিও ইন্‌-প্রত্যায়ন্তের কারণে ‘ত্ব’ প্রত্যয় যুক্ত হলে হ্রস্ব ই-কার হবে। যেমন, কৃতিত্ব।
কিন্তু সমাসবদ্ধ না হয়ে বিভক্তি যোগ হলে দীর্ঘ ঈ-কারান্ত রূপ পরিবর্তিত হয়ে হ্রস্ব ই-কার হবে না। যেমন : প্রাণীকে, মন্ত্রীর।
 
একটু ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ বলছি। সম্ভবত নীন প্রত্যয় নিয়ে কোন জটিলতা নেই। কোন ক্ষেত্রেই নীন প্রত্যয়ে বৃদ্ধি হয় না; যেমন কুল+নীন=কুলীন, নব+নীন= নবীন, অভ্যন্তর+নীন=অভ্যন্তরীণ। আপনি লিখেছেন সর্বজন+নীন=সার্বজনীন, কিন্তু আমার জানামতে সর্বজন+নীন=সর্বজনীন (অর্থ: সবার জন্য)। অন্যদিকে সার্বজনীন মানে সবার মধ্যে প্রবীণ বা শ্রেষ্ঠ, এই শব্দটি নীন প্রত্যয়ান্ত কি না তা বলতে পারছি না।
আমার মনে হয় যৌথশব্দে একটি আদিস্বর বৃদ্ধি পাবে না দুটি বৃদ্ধি পাবে, আগেরটি পাবে না পরেরটি পাবে এই জটিলতা কেবল ষ্ণ, ষ্ণ্য ও ষ্ণিক এই তিনটি প্রত্যয়ের জন্য প্রযোজ্য। অন্যান্য প্রত্যয়ে এমন সংশয় দেখাই যায় না।
 
একাকী কিন্তু একাকিত্ব
একাকী= একা+আকিন্। আকিন্, ইন্ প্রভৃতি প্রত্যয়ান্ত শব্দের শেষে -ত, -তা, -ত্ব প্রভৃতি প্রত্যয় যুক্ত হলে ঈ-কার, ই-কার হয়ে যায়। অতএব শুদ্ধ হচ্ছে: একাকিত্ব। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, একমাত্র একাকিত্ব বানানই প্রমিত। একাকীত্ব বানানের কোনো শব্দ ওই অভিধানে নেই।
 
 
ত্রিবর্ষ
সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয় যুক্ত করার নিয়মানুসারে দুটি শব্দ দিয়ে গঠিত সমাসবদ্ধ শব্দের পরপদ যদি ‘বর্ষ’ হয়, তবে সমাসবদ্ধ শব্দটির সঙ্গে প্রত্যয় যুক্ত হলে পূর্বপদের সংখ্যাবাচক শব্দের মূল স্বরের বৃদ্ধি হয় না। সেক্ষেত্রে ত্রিবর্ষ+ষ্ণিক(ইক) = ত্রিবার্ষিক হওয়ার কথা। কিন্তু আধুনিক বাংলা অভিধান ‘ত্রিবার্ষিক’ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত করেনি। বরং অভিধানটিতে উল্লেখ আছে, ত্রিবর্ষ+ইক = ত্রৈবার্ষিক; যার অর্থ ইতোমধ্যে জনাব কে এম সেলিম ভাই তাঁর মন্তব্যে উল্লেখ করেছেন।
কিন্তু বাংলা বানান অভিধান ‘ত্রিবার্ষিক’ ও ‘ত্রৈবার্ষিক’ উভয় শব্দই কোনো ধরনের শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা মন্তব্য ছাড়া অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাই একান্ত লিখতে হলে আমি ‘ত্রিবার্ষিক’ শব্দটিই বেছে নেব।
 
সন্ধি
‘সন্ধি’ শব্দটির গঠন আপনার উল্লেখ-করা তিনটি উপায়েই সম্ভব।
১) প্রত্যয়যোগে: সংস্কৃত ‘√ধা’ ধাতুর পূর্বে ‘সম্’ উপসর্গ এবং পরে ‘ই’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘সন্ধি’ শব্দটি গঠন করে। অর্থাৎ, সম্+√ধা+ই = সন্ধি। যেহেতু ‘সন্ধি’ শব্দটির গঠনের সময় শেষে ‘ই’ প্রত্যয় যুক্ত হয়েছে, সেহেতু শব্দটি প্রত্যয় সাধিত।
২) ‘সন্ধি’ শব্দটির সন্ধি বিচ্ছেদ করলে দেখা যায়— সম্+ধি = সন্ধি। এখানে ‘সম্’ হচ্ছে তৎসম উপসর্গ। অতএব, ‘সন্ধি’ উপসর্গ যোগে গঠিত।
৩) দুই নম্বরেই উল্লেখ করেছি যে, ‘সন্ধি’ শব্দের সন্ধি বিচ্ছেদ হচ্ছে— সম্+ধি = সন্ধি।
 

পাছাভারাক্রান্ত শব্দ

কার্যকর, কার্যকরী ও কার্যকারী— শব্দের অর্থ ও পদমর্যাদা অভিন্ন। তাই ব্যবহার এবং প্রয়োগেও কোনো পার্থক্য নেই। বাংলা একাডেমি আধুুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত এই শব্দ-তিনের অর্থ— বলবৎ, ফলদায়ক, উপযোগী, ক্রিয়াসাধক প্রভৃতি।সংস্কৃতে শুধু প্রাণী নয়— কাগজ-কলম, লতাপাতা, আকাশ-বাতাস, দিন-মাস, সময়-অসময় এমনকি জল-বল আর চিন্তাচেতনাকেও ইন-প্রত্যয় লাগিয়ে স্ত্রীবাচক প্রকৃতির করে নেওয়ার বিশেষ রেওয়াজ বেশ জনপ্রিয় ছিল। সে সূত্রে সংস্কৃতে ‘কার্যকর’ শব্দের অন্ত্যে ইন-প্রত্যয় লাগিয়ে ‘কার্যকরী’ ও ‘কার্যকারী’ শব্দ গঠন করা হয়েছে। এরূপ ইন-প্রত্যয় আক্রান্ত আরও অনেক শব্দের ব্যবহার বাংলায় দেখা যায়। যেমন— বিবরণী, জন্মবার্ষিকী, শতাব্দী প্রভৃতি।
সংস্কৃতের অনুসরণে বাংলায় এমন শব্দের ব্যবহার চালু হলেও প্রকৃত অর্থে বাংলায় ইন-প্রত্যয়ান্ত শব্দ না-হলেও চলে। অধুনা বাংলায় ইন-প্রত্যয়ান্ত শব্দের ব্যবহার ক্রমশ কমে আসছে। এটি বাংলার স্বকীয়তার পরিচায়ক। ।ৎ
 
বানান সংস্কার: উচ্চারণ নির্ভর বানান
 
ধৃষ্টতা ক্ষমা করবেন। আমার অজ্ঞতা প্রথমেই স্বীকার করে নিচ্ছি। আমি ধ্বনিতত্ত্ববিদ, আমি নই। অর্ধস্বর (semi-vowel), সন্নিভ(approximant), শ্রুতি (glide), এবং বাংলা phonology-তে কী কী phoneme, allophone, semi-vowel ও দ্বিস্বর আছে সেই ধারণা আমার একেবারে নেই।
আপনার মতে বানান হবে উচ্চারণের উপর নির্ভর করে। এই যুক্তিতে অটল থাকলে আপনার প্রতিটি কথা সত্য, আমরা ভুল বর্ণ দিয়ে বানান লিখছি।
আর আমার বিরোধিতার কারণ হল, শব্দের বানান ঠিক হয়েছে এর উৎস বা গঠনের উপর নির্ভর করে, উচ্চারণ পরে বিবর্তিত হয়ে গেছে। ধরা যাক যোগ শব্দ নিয়ে কথা বলি। এটি একটি সংস্কৃত শব্দ, সংস্কৃতে এর বানান উচ্চারণানুগ এবং যথার্থ। বাংলায় এসে শব্দটির উচ্চারণ পাল্টে জোগ হয়ে গেল। তো, আমরা শব্দের বানান ঠিক রেখে নিজের মত উচ্চারণ করেছি। আর তাতেই আপনার মতে মহা অনর্থ ঘটে গেছে, ভুল হচ্ছে, বৈজ্ঞানিক ভাবে বাংলা বানান হচ্ছে না- ইত্যাদি ইত্যাদি সমস্যা।
এখন সবগুলো বাংলা শব্দের বানান উচ্চারণের মত করে দিলে কেমন হয়? অর্থাৎ আপনার প্রস্তাব মেনে নিলে কেমন হয়? তাহলে আর বিভিন্ন শব্দের গঠন, সন্ধি, প্রকৃতি-প্রত্যয় ব্যাকরণ দ্বারা ব্যাখ্যা করা যাবে না। যদি মেনে নিই যে কয়েকটি বর্ণের উচ্চারণ সংস্কৃত থেকে বাংলায় আসার সময় পাল্টে গেছে, তাহলে আর বাংলা বানান মেনে নিতে দ্বিধা হওয়ার কথা নয়।
আপনি বলেছেন আমি য এর জ উচ্চারণ সমর্থন করেছি, বস্তুত সংস্কৃত য, বাংলায় কিছু শব্দে জ রূপে উচ্চারিত হয়।
আপনি বলেছেন আমি য কে য় এর সাথে গুলিয়ে ফেলেছি। বস্তুত য এর সংস্কৃত উচ্চারণ বোঝাতে বাংলায় য় প্রচলিত হয়। যোগ আর বিয়োগ যে একই শব্দ, তা আপনার জানা নেই। আপনি জানেন কেবল যোগ শব্দে জ ঘৃষ্ট ব্যঞ্জন, আর বিয়োগের য় হল অর্ধস্বর!
আপনি বলেছেন যে আমি বুঝতে পারছি না /w/ (অন্তস্থ-ব) ও /ভ/ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধ্বনি। অথচ আমি কোথাও এ দুটিকে সমধ্বনি দাবি করিনি।
স্ব যুক্তবর্ণ, আমার ভুলের জন্য দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।
আপনি বলেছেন [ক্খ] ধ্বনি বুঝাতে ক্ষ [কষ] বা ক্ষ্ম [ক্খ্ম] ব্যবহারে সমস্যা কোথায় তা আমি বুঝতে পারছি না। আসলে আমি আপনাকে বোঝাতে পারছি না সংস্কৃত ক্ষ (যার সংস্কৃত উচ্চারণ ক্ ষ) বাংলায় এসে ভিন্নরূপে উচ্চারিত হচ্ছে।
কেন অন্য ভাষার ভাল কিছু আমার চোখে পড়েনি? এর কারণ বাংলা ভাষার দোষ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তাই আমি অন্য ভাষার দোষগুলোই আলোকপাত করব।
রবীন্দ্রনাথ বলেন “ইংরেজিতে বানানে-উচ্চারণে ভাসুর-ভাদ্রবৌ সম্পর্ক, পরস্পরের মাঝখানে প্রাচীন শব্দতত্ত্বের লম্বা ঘোমটা। ইংরেজিতে লিখি ট্রেআসূরে (treasure) পড়ি ট্রেজার; লিখি ক্‌নৌলেডগে (knowledge) পড়ি নলেজ্‌; লিখি রিঘ্‌টেওউস (righteous) পড়ি রাইটিয়স।” আচ্ছা তাহলে আপনার মতে ইংরেজির ভাষার কীরূপ সংস্কার প্রয়োজন? না কি সব সার্জারি শুধু বাংলা বর্ণমালার উপর দিয়ে যাবে? আুমি তো ধ্বনিতত্ত্ব বিরোধী ইংলিশ নিয়ম দেখালাম, আপনি কি ইংলিশ ভাষার যে ভাল দিকগুলো আমি দেখতে পাইনি- সেগুলো দেখাতে পারেন? (অভিজি অভি)
 
শানচ প্রত্যয়
√দীপ্‌ + শানচ=দীপ্যমান। শানচ প্রত্যয় থেকে ‘মান’ কীভাবে এসেছে এর কোন ব্যাকরণগত ব্যাখ্যা জানা আছে কারও? একবার শুনেছিলাম পাণিনির ব্যাকরণে হরিণ নীতি ব্যাঘ্র নীতি নামের কী কী যেন নিয়ম ছিলো সংস্কৃত প্রকৃতি-প্রত্যয় সম্পর্কিত। সে অনুযায়ী নাকি ‘শ’ বর্ণ ‘ম’ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। এমন কোন নিয়ম কি শুনেছেন কেউ? জানাবেন দয়া করে।
 
সিদ্ধান্তকৌমুদী গ্রন্থের ৭/২/৮২ শ্লোকে শানচ্ প্রত্যয় নিয়ে বলা হয়েছে “আনে মুক্” যার মানে “শানচ্ প্রত্যয়ের আন পরে থাকলে ধাতুর উত্তর মুম্ আগম হয়। উদাহরণ দেওয়া হয়েছে সেবমান। √সেব্+শানচ্= সেবমুম্+আন=সেবমান।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য সকল সংস্কৃত শব্দে শানচ্ প্রত্যয় মান রূপে বিবর্তিত হয় না। যেমন অধীয়ান, ক্রীণান, দদান, দীহান প্রভৃতি সংস্কৃত শানচ্ প্রত্যয়ান্ত শব্দ।
আপনি হরিণ নীতি ব্যাঘ্র নীতি বলতে যা বোঝাতে চেয়েছেন সেগুলো সম্ভবত গোযূথাধিকার, সিংহদৃষ্টি অধিকার, মণ্ডুকপ্লুতি ও গঙ্গাস্রোতপ্রবাহ। এসব অধিকার ব্যাকরণের সকল শাখায় সমানভাবে প্রযোজ্য। শানচ্ প্রত্যয়ে বা যে কোন প্রত্যয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এসব অধিকারের কোন আলাদা গুরুত্ব নেই।
এছাড়া শানচ্ প্রত্যয়যোগে কিছু শব্দে য ফলার আগমন ঘটে। যেমন দীপ্যমান, দৃশ্যমান প্রভৃতি; যা সবক্ষেত্রে ঘটে না (সেবমান, বহমান)। এই ব্যত্যয় কেন ঘটে, তাও ঠিকমত বোঝা যাচ্ছে না।  (অভিজিৎ অভি)

সূত্র: নিচের তিনটি বই।

error: Content is protected !!