বিশেষণে বন্ধুতার জয়

এবি ছিদ্দিক

“আজ সকালে সাফা এই বার্তাটি পাঠিয়েছে। এই বার্তাটি তুমিই নাকি তাকে পাঠিয়েছ,” হাতের মোবাইলটি টমের হাতে দিতে দিতে ছাফিয়া বলল। ছাফিয়ার হাত থেকে মোবাইলটি নিজের হাতে নিয়ে টম বার্তাটি উচ্চস্বরে পড়তে শুরু করল:

এবি ছিদ্দিক

“ছাফিয়া অনেক মেধাবিনী। কিন্তু তার অনেক খারাপ অভ্যাস রয়েছে। এই যেমন, সে কেবল সুন্দরী ও অহংকারিনী মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুতা করে আর কম সুন্দরী মেয়েদের অবজ্ঞা করে। তার মতো সুন্দরী বান্ধবী থাকার চেয়ে না-থাকাটাই উত্তম। সে হয়তো এখন বুঝতেছে না যে, এমন নীচ মানসিকতা মানুষের পতন ডেকে আনে। পরিবারের কনিষ্ঠতম সন্তান বলে মা-বাবাও তাকে কিছু বলে না। তোমরা দেখবা, একদিন তার সকল বান্ধবীরা তাকে ফেলে চলে যাবে।”

বার্তাটি পড়ে টম রীতিমতো থ বনে গেল। সে কেন তার প্রিয় ছাত্রী সম্পর্কে এমন বাজে মন্তব্য করতে যাবে? তারচেয়ে বড়ো কথা, ছাফিয়া এমন স্বভাবের মেয়ে মোটেও নয়। টম গত দুই বছর ধরে তাকে ব্যাকরণ শেখাচ্ছে। এ দুবছরে শেখার প্রতি অদম্য আগ্রহ ও শ্রদ্ধবোধ ছাড়া অন্য কোনো দিক লক্ষ করবার অবকাশ ছাফিয়া মুহূর্তের জন্যেও দেয়নি। যতক্ষণ টমের সঙ্গে সময় কাটাত, ততক্ষণ বাংলা ভাষার মজায় ডুবে থাকাই ছিল দুজনের স্বভাব। আর, সাফা কিনা বলছে…।
বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নিজেকে কিছুটা সংযত করে টম থমথমে অবস্থার ইতি ঘটাল।
: এসব আজেবাজে কথা আমি লিখিনি।
— আমি জানি!
: কী! তার মানে তুমি এসব বিশ্বাস করনি?
— বিশ্বাস করলে কি আর রোজকারমতো ব্যাকরণ পড়তে চলে আসতাম?
: জবাবদিহির অভিপ্রায়েও তো আসতে পার। নাকি?
— তা তো আমি মোবাইলের মাধ্যমেও করতে পারতাম। এসব নিয়ে কোনো অনুযোগ নেই বলেই তো নিত্যদিনের কার্যসূচিতে কোনো ব্যাঘাত ঘটতে দিইনি।
: শুকরিয়া। কিন্তু আমার ওপর এতটা আস্থা রাখছ কীভাবে?
— তোমার শেখানো ব্যাকরণই তোমাকে বাঁচিয়ে দিল!
: ব্যাকরণ! এসবের সঙ্গে ব্যাকরণের কী সম্পর্ক?
— দুই বছর আগে হলে হয়তো কোনো সম্পর্ক থাকত না। কিন্তু এই দুই বছরে আমি অনেক কিছু শিখেছি, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে— লেখার ধরন দেখেই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে চিনে ফেলা।
: আমি কিন্তু এখনও তোমার কথার আগাগোড়া বুঝতে পারছি না। লেখার ধরনের সঙ্গে এসবের কী সম্পর্ক?
— এখনও বুঝলে না! এই নাও মোবাইল। বার্তাটি ভালোভাবে আবারও পড়।
টম বার্তাটি আবারও পড়ল। কিন্তু এবার প্রথমবারের চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগের সঙ্গে পড়ল। আর, বার্তা পড়তে পড়তে টমের বিষণ্ণ চেহারা আবারও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
: আরে! এখানে তো শব্দের যাচ্ছেতাই প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে!
— ঠিক! তাই তো তোমার প্রতি ন্যূনতম সন্দেহেরও সৃষ্টি হয়নি।
: বাহ্! এতদিনে তোমাকে ব্যাকরণ শেখানোর ফল পেলাম! এবার বার্তাটির অপপ্রয়োগগুলো দেখিয়ে দাও তো দেখি।
— বার্তাটির প্রথম বাক্যের মধ্যেই প্রথম ভুলটি রয়েছে। ‘ছাফিয়া অনেক মেধাবিনী’ বাক্যটিতে ‘মেধাবিনী’ হচ্ছে বিধেয় বিশেষণ। আর, তুমি শিখিয়েছ, বিধেয় বিশেষণের কোনো লিঙ্গভেদ হয় না। অর্থাৎ, বিধেয় বিশেষণ সর্বদা পুরুষবাচক হয়। আর তাই, শুরুর বাক্যটিতে ‘মেধাবিনী’-র পরিবর্তে ‘মেধাবী’ লিখতে হবে। যে আমাকে এই নিয়ম শিখিয়েছে, সে নিজেই এই নিয়মটির প্রয়োগ জানবে না, তা কীভাবে হতে পারে!
: বাহ্! চমৎকার! এই না-হলে আমার মেধাবিনী ছাত্রী! কিন্তু ‘মেধাবিনী’ যে বিধেয় বিশেষণ, তা কীভাবে বুঝলে?
— যে বিশেষণ, বিশেষিত পদের পরে বসে, তাকে বিধেয় বিশেষণ বলে। আমার স্মৃতিশক্তি ততটাও দুর্বল নয় যে, এক বছর আগে শেখানো কোনো পাঠ ভুলে যাব। বুঝেছ?
: তা তো দেখাই যাচ্ছে। ভুল ধরা কিন্তু এখনও শেষ হয়নি…
— ‘… সুন্দরী ও অহংকারিনী মেয়েদের… ‘ বাক্যাংশে বিশেষণের প্রয়োগও যথাযথভাবে হয়নি।
: এখানে তো ‘সুন্দরী’ ও ‘অহংকারিনী’ পদ দুটি বিধেয় বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। আর, ‘মেয়েদের’ হচ্ছে স্ত্রীবাচক শব্দ। তাহলে লিঙ্গ অনুসারে বিশেষণের প্রয়োগে ত্রুটি কোথায়?
— দেখাই যাচ্ছে, অন্যকে বিভ্রান্তিতে ফেলার কৌশল বেশ ভালোভাবে রপ্ত করে ফেলেছ। কিন্তু আজ আমি প্রস্তুত হয়েই এসেছি।
: তাহলে ভুলের কারণ বিশ্লেষণে আর দেরি কীসে?
— তবে শোন— বাংলা শব্দকে বিশেষিত করতে ব্যবহৃত বিশেষণের কোনো লিঙ্গভেদ হয় না; সেটি সরাসরি বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হোক, কিংবা বিধেয় বিশেষণ হিসেবে। আর, ‘মেয়ে’ হচ্ছে একটি বাংলা শব্দ। তাই, ‘মেয়ে’ শব্দটির পূর্বে ও পরে স্ত্রীবাচক বিশেষণ ব্যবহার না-করে সর্বদা পুরুষবাচক বিশেষণ ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ, ‘অহংকারী মেয়ে’, ‘সুন্দর মেয়ে’, ‘বুদ্ধিমান দাদি’ প্রভৃতি লেখাটাই সংগত।
: তাহলে পরের বাক্যে লেখা ‘সুন্দরী বান্ধবী’ লেখাটাও ভুল হয়েছে, তাই না?
— মোটেও না। তৎসম শব্দের পূর্বে ব্যবহৃত বিশেষণ অবশ্যই লিঙ্গ অনুসারে লিখতে হবে। ‘বান্ধবী’ হচ্ছে তৎসম শব্দ। তাই ‘বান্ধবী’-র পূর্বে ব্যবহৃত বিশেষণেরও স্ত্রীবাচক রূপ লেখাটা আবশ্যক। অর্থাৎ, ‘সুন্দরী বান্ধবী’, ‘কিশোরী বালিকা’, ‘রূপবতী স্ত্রী’, ‘জ্যেষ্ঠা কন্যা’ প্রভৃতি হচ্ছে যথাযথ প্রয়োগের উদাহরণ।
: তুমি প্রকৃত অর্থেই প্রস্তুত হয়ে এসেছ। আর কোনো ভুল?
— ‘কনিষ্ঠতম সন্তান’ অংশে ‘কনিষ্ঠতম’-ও হচ্ছে অপপ্রয়োগ। ‘কনিষ্ঠ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘সবচেয়ে ছোটো’। তাই শব্দটির সঙ্গে পুনরায় ‘-তর’ বা ‘-তম’ প্রত্যয় যুক্ত করাটা অসংগত। অর্থাৎ, উৎকর্ষের সর্বাধিক্য বোঝাতে ব্যবহৃত ‘কনিষ্ঠ’, ‘লঘিষ্ঠ’, ‘গরিষ্ঠ’ ‘বলিষ্ঠ’, ‘পাপিষ্ঠ’, ‘শ্রেষ্ঠ’ প্রভৃতি শব্দের সঙ্গে পুনরায় ‘-তর’ ও ‘-তম’ প্রত্যয় যুক্ত করা যাবে না।
: আর?
— ‘সকল বান্ধবীরা’ লেখাটাও অসংগত। কেননা, ‘সকল’ হচ্ছে বহুবচন নির্দেশক বিশেষণ। তাই, কোনো বিশেষ্য বা সর্বনামকে বিশেষিত করতে পূর্বে ‘সকল’ বিশেষণটি ব্যবহার করে ওই বিশেষ্য বা সর্বনামের সঙ্গে পুনরায় বহুবচন নির্দেশক বিভক্তি যুক্ত করলে বাহুল্য হয়ে যায়।
: আর কোনো কিছু বাদ পড়েছে কি?
— ‘বুঝতেছে’ ও ‘দেখবা’; এদুটি। মূলত ‘দেখবা’ ক্রিয়াপদটি দেখার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝেছি যে, এই বার্তাটি তুমি পাঠাওনি। গত দুই বছর ধরে তোমাকে চিনি। এই দুবছরে তোমাকে একবারও ক্রিয়াপদের শেষে ‘-বা’ যুক্ত করে বলতে শুনিনি এবং লিখতে দেখিনি। জানি, ‘করবা’, ‘বুঝবা’, ‘পড়বা’ প্রভৃতি রূপ অশুদ্ধ বলেই তুমি ব্যবহার কর না। আর, চলিত রীতিতে ক্রিয়াপদের শেষে ‘-তেছে’, ‘-তেছি’, ‘-তেছেন’ প্রভৃতি যুক্ত করা যে অশুদ্ধ, তা কে না জানে!
: আগামী এক সপ্তাহ তুমি পড়াবে, আমি শিখব!

আর, এভাবেই ব্যাকরণজ্ঞান টম ও ছাফিয়ার মধ্যেকার বন্ধুতা আরও দৃঢ় করে দিল।

সূত্র: বিশেষণে বন্ধুতার জয়, এবি ছিদ্দিক, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)


All Link

গীতি ও সংগীত : নজরুলগীতি ও রবীন্দ্রসংগীতের পার্থক্য

প্রায়শ ভুল হয় এমন কিছু শব্দের বানান/২

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

প্রশাসনিক প্রাশাসনিক  ও সমসাময়িক ও সামসময়িক

বিবিধ এবং হযবরল : জ্ঞান কোষ

সেবা কিন্তু পরিষেবা কেন

ভাষা নদীর মতো নয় প্রকৃতির মতো

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/১

কি না  বনাম কিনা এবং না কি বনাম নাকি

মত বনাম মতো : কোথায় কোনটি এবং কেন লিখবেন

ভূ ভূমি ভূগোল ভূতল ভূলোক কিন্তু ত্রিভুবন : ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ

মত বনাম মতো : কোথায় কোনটি এবং কেন লিখবেন

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/১

দৈনন্দিন বিজ্ঞান লিংক

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/২

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৩

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৪

কীভাবে হলো দেশের নাম

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/১

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/২

এককথায় প্রকাশ

শব্দের বানানে অভিধানের ভূমিকা

আফসোস নিয়ে আফসোস

লক্ষ বনাম লক্ষ্য : বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন

ব্যাঘ্র শব্দের অর্থ এবং পাণিনির মৃত্যু

যুক্তবর্ণ সরলীকরণ আন্দোলন : হাস্যকর অবতারণা

রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার কিছু শব্দ

error: Content is protected !!