বিসিএস বাংলা : ফররুখ আহমদ

ফররুখ আহমদ : একনজরে জীবন ও কর্ম

ড. মোহাম্মদ আমীন

 মুসলিম রেনেসাঁর কবি
ফররুখ আহমদ ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’ নামে পরিচিত। তাঁর কবিতায় বাংলার অধঃপতিত মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণের অণুপ্রেরণা প্রকাশ পেয়েছে। তাই তাঁকে ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’ বলা হয়। আধুনিকতার সকল লক্ষণ তাঁর কবিতায় পরিব্যাপ্ত। তাঁর কবিতায় রোমান্টিকতা থেকে আধুনিকতায় উত্তরণের ধারাবাহিকতাও পরিস্ফুট। “সাত সাগরের মাঝি” ফররুখ আহমদের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। এই গ্রন্থে ১৯টি কবিতা আছে। এই কাব্যগ্রন্থে তিনি যে-কাব্যভাষার সৃষ্টি করেছেন তা স্বতন্ত্র এবং স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল।

জন্ম, পিতামাতা ও শিক্ষাজীবন
কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফররুখ আহমদ ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই জুন মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানার মাঝাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা খান সাহেব সৈয়দ হাতেম আলী এবং মাতা রওশন আখতার। পিতা ছিলেন পুলিশ ইন্সপেক্টর। ফররুখ আহমদ ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে খুলনা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার রিপন কলেজ থেকে আইএ পাস করে স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন ও ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে বিএ শ্রেণিতে ভর্তি হন, কিন্তু পরীক্ষা না দিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।

কর্মজীবন
ফররুখ আহমদ প্রথমে কলকাতার আইজি প্রিজন অফিস ও সিভিল সাপ্লাই অফিসে কয়েক বছর চাকরি করেন। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে তিনি ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পর ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় এসে রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রে স্টাফ শিল্পী হিসেবে যোগ দেন। এখানে তিনি জনপ্রিয় খেলাঘর অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করতেন।

নিজের বিয়ে নিয়ে লেখা কবিতা
১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে খালাতো বোন সৈয়দা তৈয়বা খাতুন (লিলি)-এর সঙ্গে ফররুখ আহমদের বিয়ে হয়। নিজের বিয়েকে উপজীব্য করে ফররুখ আহমদ “উপহার” নামের একটি কবিতা লেখেন যা “সওগাত” পত্রিকায় অগ্রহায়ণ ১৩৪৯ সংখ্যায় ছাপা হয়।

ফররুখ আহমদের প্রথম কবিতা: খ্যাতি অর্জনকারী কবিতা
কিশোর বয়সে কবিতা রচনার মধ্য দিয়ে ফররুখ আহমদ সাহিত্যাঙ্গনে প্রবেশ করেন। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে ‘লাশ’ কবিতা লিখে তিনি প্রথম খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি ছিলেন মুসলিম পুনর্জাগরণবাদী কবি। তাঁর কাব্যের মৌলিক প্রবণতা মুসলিম সংস্কৃতির গৌরবকীর্তন ও জাতীয় চেতনার পুনর্জাগরণ। পাকিস্তানবাদ, ইসলামিক আদর্শ ও আরবইরানের ঐতিহ্য তাঁর কবিতায় উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠেছে।

রাষ্ট্রভাষা বাংলা বিরোধীদের প্রতি ফররুখ আহমদ
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই ফররুখ আহমদ আশ্বিন ১৩৫৪ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৪৭) সংখ্যা মাসিক সওগাাত-এ “পাকিস্তান : রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য” নিবন্ধে লিখেছেন, “গণতান্ত্রিক বিচারে যেখানে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া উচিত সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাকে পর্যন্ত যাঁরা অন্য একটি প্রাদেশিক ভাষায় রূপান্তরিত করতে চান তাঁদের উদ্দেশ্য অসৎ। পূর্ব পাকিস্তানের সকল অধিবাসীর সাথে আমিও এই প্রকার অসাধু প্রতারকদের বিরুদ্ধে আমার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।”

ফররুখ আহমদের কাব্যগ্রন্থ
কাব্যগ্রন্থ : সাত সাগরের মাঝি (ডিসেম্বর, ১৯৪৪), সিরাজাম মুনীরা (সেপ্টেম্বর, ১৯৫২), নৌফেল ও হাতেম (জুন, ১৯৬১)-কাব্যনাট্য; মুহূর্তের কবিতা (সেপ্টেম্বর, ১৯৬৩), ধোলাই কাব্য (জানুয়ারি, ১৯৬৩), হাতেম তায়ী (মে, ১৯৬৬)-কাহিনীকাব্য, নতুন লেখা (১৯৬৯), কাফেলা (অগাস্ট, ১৯৮০), হাবিদা মরুর কাহিনী (সেপ্টেম্বর, ১৯৮১), সিন্দাবাদ (অক্টোবর, ১৯৮৩), দিলরুবা (ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৪)।

ফররুখ আহমদের শিশুতোষ গ্রন্থ ও ইউনেস্কো পুরস্কার
পাখির বাসা (১৯৬৫), হরফের ছড়া (১৯৭০), চাঁদের আসর (১৯৭০), ছড়ার আসর (১৯৭০), ফুলের জলসা (ডিসেম্বর, ১৯৮৫)। ফররুখ আহমেদ রচিত অন্যতম শিশুতোষ গ্রন্থের নাম “পাখির বাসা”। এই গ্রন্থের জন্য তিনি ইউনেস্কো পুরস্কার লাভ করেন।

পুরস্কার ও মৃত্যু
ফররুখ আহমদ ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দ প্রেসিডেন্ট পদক “প্রাইড অব পারফরমেন্স” এবং ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে আদমজী পুরস্কার ও ইউনেস্কো পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৭ ও ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি যথাক্রমে মরণোত্তর একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ শে অক্টোবর ঢাকায় তিনি মারা যান।

কায়কোবাদ

বাংলা সাহিত্যবিষয়ক লিংক

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

শুদ্ধ বানান চর্চা/১

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/২

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ

Language
error: Content is protected !!