বুঝলে ভুজপাতা, না বুঝলে তেজপাতা: প্রবাদের অর্থ ও ইতিবৃত্ত

ড. মোহাম্মদ আমীন

বুঝলে ভুজপাতা, না বুঝলে তেজপাতা: প্রবাদের অর্থ ও ইতিবৃত্ত

এই পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/বুঝলে-ভুজপাতা-না-বুঝলে-তে/ 

বুঝলে ভুজপাতা, না বুঝলে তেজপাতা এটি একটি বহুল প্রচলিত প্রাচীন বাংলা প্রবাদ। অনেকে লিখে থাকেন বুঝলে ভোজপাতা, না বুঝলে তেজপাতা। আবার অনেকে বলেন বুঝলে বুঝপাতা, না বুঝলে তেজপাতা। প্রথমটি ছাড়া বাকি দুটো বাগ্‌ভঙ্গি ভুল।
তেজপাতা এল কেন?
তেজপাতা এমন একটি বস্তু যা  একবার গরম জলে ডোবালে তুচ্ছ আবর্জনা হয়ে যায়। ফেলে দিতে হয় ভাগাড়ে। ছাগলেও খায় না।
ভোজপাতা বা বুঝপাতা নয় কেন?
বুঝপাতা বানানের কোনো শব্দের অস্তিত্ব বা ইতিহাস বাংলায় নেই। তাই এটি বুঝপাতা নয়। 
তাহলে ভোজপাতা?
ভোজপাতাও নয়। ভোজপাতা অর্থ যে পাতায় ভোজন করা হয়, ভোজন করার পাতা। এক সময় বাসনকোসন ছিল না । তখন বিভিন্ন গাছের পাতায় ভোজন করা হতো । যে পাতায় ভোজন করা হতো তাকে বলা হতো ভোজনপাতা বা ভোজপাতা।  প্রবাদের সংশ্লিষ্টতা জ্ঞান-প্রজ্ঞা নিয়ে। তাই এটি ভোজপাতা  হতে পারে না। 
বাকি থাকে  ভুজপাতা। 
 
ভুজপাতা কী?
ভূর্জপত্র (Bhurjpatra) থেকে ভুজপাতা।
ভূর্জপত্রের বৈজ্ঞানিক নাম Melaleuca Cajuputi।  এর হিন্দি নাম ভুজপত্র। সংস্কৃতে ভূজপত্রক। হিন্দি ভুজপত্র থেকে  ভুজপাতা শব্দের
ড. মোহাম্মদ আমীন
উদ্ভব। কাগজ আবিষ্কারের পূর্বে ভারতে বিশেষ করে পাকিস্তান, কাশ্মীর ও হিমালয়ের বিস্তৃত অঞ্চলে ভুজপত্র বা ভুজপাতা লেখার কাগজ হিসেবে অন্যান্য লেখসামগ্রী হতে অধিক জনপ্রিয় ছিল।
 
ভুজপত্র,  প্রকৃতপক্ষে কোনো পাতা নয়। এটি এক ধরনের গাছের ছাল। এই ছালকে রোদে শুকিয়ে তেল প্রভৃতির সাহায্যে নানা কৌশলে মসৃণ করে মেঝেতে পেতে পত্র, পুস্তক প্রভৃতি লেখা হতো। তাই নাম ভূজপত্রক, ভূর্জপত্র বা ভুজপত্র। খাঁটি বাংলায় ভুজপাতা। প্রসঙ্গত, গাছটি ভারতবর্ষের হিমালয় অঞ্চলে প্রচুর পাওয়া যেত। 
 
“বুঝলে ভুজপাতা, না বুঝলে তেজপাতা” প্রবাদটির সাধারণ অর্থ হলো আপনি যদি বুঝে থাকেন বা আপনার জ্ঞান থাকে, অভিজ্ঞ হন তাহলে আপনার কাছে গাছের ছাল বা সামান্য জিনিসও মূল্যবান কাগজ বা লেখসামগ্রী বা কল্যাণের উৎস হয়ে যায়। যাতে আপনি বই লিখতে পারেন এবং লেখা বই জ্ঞানের ভান্ডার হিসেবে যুগের পর যুগ সংরক্ষিত থাকবে। আর যদি না বুঝেন, তাহলে পুস্তকের পাতাও রান্নায় ব্যবহৃত তেজপাতার মতো তুচ্ছ আবর্জনা হয়ে যায়। যা শেষ পর্যন্ত ফেলে দেওয়ার ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।
 
প্রবাদটির আলংকারিক বিস্তৃত অর্থ জ্ঞান বা জ্ঞানী তুচ্ছ বিষয়কেও মূল্যবান করে তুলতে পারে; অন্যদিকে, মূর্খতা বা মূর্খ মূল্যবান বিষয়কেও  তুচ্ছ করে দিতে পারে। একজন প্রাজ্ঞিক একজন সাধারণ মেধার শিক্ষার্থীকেও অসাধারণ মেধাবী বানিয়ে দিতে পারে; কিন্তু প্রজ্ঞার অভাব হলে অসাধারণ মেধাবী শিক্ষার্থীও সাধারণ হয়ে যেতে পারে।   অন্ধের কাছে ডোবার পচা জল আর গাভির দুগ্ধ বিমল অভিন্ন।  অনুধাবন করতে পারলে কিংবা বুঝতে পারলে  বা  বিষয়জ্ঞান থাকলে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি সাধারণ বিবেচনায় যতই সামান্য হোক না, তা লেখসামগ্রী, জ্ঞান, প্রজ্ঞা বা সমৃদ্ধির ভান্ডার হয়ে উঠে; সাধারণ বিষয়ে হলেও জ্ঞানী  নিজের প্রজ্ঞা দ্বারা তাকে উন্নত করে তুলতে পারে। অন্যদিকে, না বুঝলে কিংবা বিষয়জ্ঞান না থাকলে প্রকৃতপক্ষে যত মূল্যবান বিষয়ই হোক না, তা তুচ্ছ হয়ে যায়।
 
একজন জ্ঞানী তাঁর সৃজনশীল প্রজ্ঞা দ্বারা গাছের সামান্য ছালকেও কাগজ-পুস্তক, মূল্যবান উপকরণ, যন্ত্র বা লেখসামগ্রী বানিয়ে  কালজয়ী কল্যাণকর বস্তুতে পরিণত করে দিতে পারে। অন্যদিকে, একজন্য অজ্ঞের কাছে জ্ঞানের ভান্ডার বা লেখসামগ্রী বা অতি মূল্যবান উপকরণ দিলেও  তা গরম জলে ডোবালে আবর্জনা হয়ে যাওয়া বৈশিষ্ট্যের অধিকারী তেজপাতার মতো তুচ্ছ বা আবর্জনা হয়ে যায়। 
 
 
ভুজপত্র  তৈরির কৌশল: বই শব্দের উদ্ভব
 
প্রথমে বাকলের ভিতরের অংশ প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন মাপে কাটা হতো। এরপর তা রোদে শুকিয়ে তেল দিয়ে মসৃণ করা হতো। তারপর বিশেষ ধরনের তুলি ও রং দিয়ে ভূজপত্রে লিখা হতো। গবেষকদের মতে ভূজপত্রগুলো দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ্যে ৯ ইঞ্চি পরিমাণ হতো। বাকলের ভিতরের অংশকে বলা হতো লেবার যা থেকে পরবর্তীকালে লিব্রে শব্দের উদ্ভব। যার অর্থ বই। হিমালয়ের পদদেশে বসবাসকারী অধিবাসীরা ভূজপত্রের আবিষ্কারক। পাকিস্তান ও কাশ্মীর অঞ্চলে সেকালে লেখালিখির কাজে ভূজপত্রই ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। প্রচীনকালের ভূজপত্রে লিখিত অনেক উপকরণ পাওয়া গেছে। 
 
সামান্য জ্ঞানে কথা বলতে গিয়ে বিপদে পড়ি। ভোজ পাতা নামে কিছুর কথা আমি জানতাম না। বাংলা একাডেমির বাংলা অভিধানে ভোজপাতা নামে কোনো শব্দ পেলাম না। তবে একজন জ্ঞানী যখন জোর দিয়ে বলেছেন যে ভুজপাতায় তাবিজ লেখা হতো। এখনো অনেকে ভুজপাতায় তাবিজ লিখেন।  ভূজপত্র  হচ্ছে ভূজ গাছের সাদা বা বাদামি রঙের বাকল। এটি ছিল খুব পাতলা ও মসৃণ। যা গাছের কাণ্ড থেকে আপনা আপনি উঠে আসে।
 
নবীনা বর্ষায় ভূর্জ পাতায় ‘নবগীত’ রচনার কথা বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি ভূর্জপত্রের বাকলে চিঠিপত্র লিখেছিলেন। কাগজ আবিষ্কারের পূর্বে  প্রাচীন ভারতে লেখার উপকরণ হিসেবে ভূর্জ বা ভূজ গাছের বাকল কাজগ হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রসিদ্ধ ছিল।
 
 
ভূর্জপত্রের বৈজ্ঞানিক নাম Melaleuca Cajuputi।  হিমালয় অঞ্চলে গাছটি প্রচুর পাওয়া যায়। এর হিন্দি নাম ভূজপত্র। সংস্কৃতে বলা হয় ভূজপত্রক। এই গাছ তার পুষ্পবৈশিষ্ট্যের কারণেও অনন্য। সাধারণত এপ্রিল-মে মাসে ভূর্জগাছে ফুল ফোটে।
 
তালপাতা (Palm leaf)
প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে কাগজ হিসেবে তালপাতার ব্যবহারও ছিল। ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্র উপকূলে প্রচুর তালগাছ ছিল। এসব এলাকার লোকজন প্রথমে তালপাতাকে লেখার সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। তালপাতা একদিকে যেমন সহজলভ্য, অন্যদিকে টেকসই। এর পাতা বেশ বড় ও শিরাযুক্ত। প্রায় ২-৩ ফুট দীর্ঘ এবং ১/৪ ইঞ্চি থেকে ৪ ইঞ্চি পর্যন্ত চাওড়া। পাতাগুলো বেশ বড় থাকে তাই তা মাপ অনুযায়ী পাতাগুলো কাটা হয় এবং তা স্থায়ীত বাড়ানোর জন্য পানিতে সিদ্ধ করা হয়। এরপর নানা কৌশলে পাথর দিয়ে ঘষে মসৃণ করা হতো।  অনেক গবেষক তালপাতাকে  The strongest of all writing materials  আখ্যায়িত করেছেন।
 
ধাতুরপাত (Metal Leaf)
লেখসামগ্রহী হিসেবে ধাতুরপাত বেশ জনপ্রিয় ছিল। ধাতুরপাত বিভিন্ন ধরণের ধাতু থেকে তৈরি। ধাতুরপাত হিসাবে সোনারপাত, রুপারপাত, তামারপাত, পিতলেরপাত, ব্রোঞ্জের পাত অধিক ব্যবহৃত হতো। 
 
— √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √ — √
 
 
error: Content is protected !!