বুরুন্ডি (Burundi) ইতিহাস ও নামকরণ

ড. মোহাম্মদ আমীন

বুরুন্ডি (Burundi)

বুরুন্ডি পূর্ব আফ্রিকার একটি স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র। এর উত্তরে রুয়ান্ডা, পূর্বে ও দক্ষিণে তাঞ্জানিয়া, পশ্চিমে তাংগানিকা হ্রদ ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র অবস্থিত। এলাকাটি অতীতে গোত্র রাজারা শাসন করত। ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে জার্মানি অঞ্চলটি দখল করে উপনিবেশ স্থাপন করে। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা লাভের পূর্ব-পর্যন্ত এটি প্রথমে জার্মান ও পরে বেলজীয় উপনিবেশ ছিল। বুজুম্বুরা বুরুন্ডির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। এটাকে অনেক সময় মধ্য আফ্রিকার দেশও বলা হয়।

বুরুন্ডি শব্দের অর্থ রুন্ডিদের ভূমি। পূর্ব আফ্রিকার গ্রেট হ্রদ অঞ্চলে অবস্থিত স্থলবন্দি এ জনপদে রুন্ডি নামক জনগোষ্ঠীর লোকজন বসবাস করত। তারা এলাকটিকে জঙ্গল থেকে বসতযোগ্য এলাকায় পরিণত করেছিল। রুন্ডি বেলজিয়ান শব্দ। অনেকের মতে রুন্ডি নয়; বস্তুত উরুন্ডি বা রুয়ান্ডা হতে বুরুন্ডি শব্দের উৎপত্তি। জার্মান ও বেলজিয়াম শাসনকালীন দেশটি ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে, স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত রুয়ান্ডা-উরুন্ডি নামে পরিচিত ছিল। আবার অনেকে বলেন, আদিবাসী রুয়ান্ডা ও উরুন্ডি নামক দুটি আদিবাসীর নাম হতে রুয়ান্ডা-উরুন্ডি নামের উৎপত্তি।

বুরুন্ডির মোট আয়তন ২৭,৮৩৪ বর্গকিলোমিটার বা ১০,৭৪৫ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগের পরিমাণ ৭.৮%। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, বুরুন্ডির জনসংখ্যা ১.০৩,৯৫,৯৩১ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটার লোকসংখ্যা ৩১৪ জন। আয়তন বিবেচনায় বুরুন্ডি পৃথিবীর ১৪৫-তম বৃহত্তম দেশ এবং জনসংখ্যা বিবেচনায় ৮৬-তম। কিন্তু জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ৪৫-তম জনবহুল দেশ।

২০১৪ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, বুরুন্ডির জিডিপি (পিপিপি) ৮.৩৭৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৯১০ ইউএস ডলার। অন্যদিকে, জিডিপি (নমিনাল) ৩.০৯৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৩৩৬ ইউএস ডলার। মুদ্রার নাম বুরুন্ডিয়ান ফ্রাঙ্ক। রাজধানী বুজুম্বুরা। পৃথিবীর পাঁচটি দরিদ্র দেশের একটি হচ্ছে রুয়ান্ডা। দেশটির জনগণের মাথাপিছু আয় পৃথিবীর সবচেয়ে কম। যুদ্ধভীতি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুসংস্কার এবং এইডসসহ বিভিন্ন মারাত্মক উন্নয়ন পরিপন্থি সমস্যায় দেশটি চরমভাবে জর্জরিত।

সরকারিভাবে বুরুন্ডির অধিবাসীদের বুরুন্ডিয়ান বলা হয়। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের ১ জুলাই দেশটি বেলজিয়াম হতে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১ জুলাই প্রজাতন্ত্র ঘোষিত হয়। বুরুন্ডির অধিবাসীর ৮০-৯০ ভাগ খ্রিস্টান। ৫% অধিবাসী প্রাচীন ধর্মবিশ্বাসের অনুসারী। ২-৫% সুন্নি মুসলিম। মুসলিমদের প্রায় সবাই শহর এলাকায় বাস করে। কিরুন্ডি ও ফ্রেঞ্চ দেশটির সরকারি ভাষা। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জুন বরুন্ডির পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়।

২,৬৭০ মিটার উঁচু মাউন্ট হেহা বরুন্ডির সর্বোচ্চ বিন্দু। পার্বত্যময় বুরুন্ডি সবুজে সবুজে আচ্ছাদিত। উপত্যাকা ও কলাবাগানের সবুজ সমারোহ পুরো পরিবেশকে অপূর্ব দেখায়। এখানে প্রচুর চা ও কফি বাগান রয়েছে। চা ও কফি জিডিপির সিংহভাগ যোগান দেয়। অসংখ্য প্রজাতির বণ্যপ্রাণী এখানে খেলা করে ইতস্তত। বেলজিয়াম হতে স্বাধীনতা পাওয়ার পর বরুন্ডি প্রথম কৃষ্ণাঙ্গশাসিত প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। বুরুন্ডির প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে নিহত হলে সৃষ্ট জাতিগত দাঙ্গায় ২ লক্ষ বুরুন্ডিয়ান নিহত হয়। আফ্রিকাসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো হানাহানি, অনৈক্য ও সংকীর্ণ স্বার্থসিদ্ধি আর ধর্মীয় উন্মাদনায় এতই অন্ধ থাকে যে, প্রকৃত কল্যাণ হতে তারা দূরে থেকে যায়।

বুরকানা ফাসো

error: Content is protected !!