বুলগেরিয়া (Bulgaria) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (ইউরোপ)

ড. মোহাম্মদ আমীন

বুলগেরিয়া (Bulgaria)

বুলগেরিয়ার সরকারি নাম বুলগেরিয়া প্রজাতন্ত্র। এটি দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ মহাদেশের একটি রাষ্ট্র। দেশটি বলকান উপদ্বীপের পূর্ব পার্শ্বে ইউরোপ ও এশিয়ার ঐতিহাসিক সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। এর পূর্বে কৃষ্ণ সাগর, দক্ষিণে গ্রিস ও তুরষ্ক, পশ্চিমে সার্বিয়া ও মন্টিনেগ্রো এবং ম্যাসিডোনিয়া, এবং রোমানিয়া অবস্থিত। সোফিয়া বুলগেরিয়ার রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। বুলগেরিয়ার ৮০%-এর বেশি লোক বুলগেরীয় অর্থোডক্স গির্জার খ্রিস্টধর্মের অনুসারী। বা এর সাথে সম্পর্কিত। প্রায় ১২% লোক ইসলাম ধর্মের অনুসারী। মূলত উসমানীয় সাম্রাজ্যের শাসনামলে আগত তুর্কি বসতিস্থাপকদের মধ্যে ইসলাম প্রচলিত। বুলগেরিয়ার ম্যাপ দেখতে অনেকটা বিড়াল ছানার মতো। আবার অনেকে বলেন সিংহের মতো। তবে সিংহ আর বিড়াল ছানা দেখতে প্রায় অবিকল।

বুলগেরিয়া নামের উৎপত্তি নিয়ে একাধিক প্রবাদ ও ঐতিহাসিক মতবাদ প্রচলিত আছে। অনেকে মনে করেন, বুলগারস (Heart Shaped Land)) শব্দ থেকে বুলগেরিয়া নামের উৎপত্তি।  বুলগারস হচ্ছে টার্কিক বংশজাত একটি বিলুপ্ত উপজাতি। যারা এ ভুখণ্ডটিতে প্রথম বসত স্থাপন এবং রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। কথিত হয়, বুলগারস শব্দটি প্রোটে-টার্কিক (proto-Turkic) শব্দ বুলগাহ্ হতে সৃষ্ট। তবে কিছু ইতিহাসবেত্তা এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, বুলগেরিয়া শব্দটি একই ভাষার আরও প্রাচীন শব্দ বুলগাক হতে উদ্ভুত। বুলগাহ শব্দের অর্থ মিশ্রিত, ঝাঁকানো বা আলোড়ন। এখানে অবস্থিত উপজাতিদের মধ্যে এক সময় প্রচণ্ড স্বীয় প্রাধান্য বিস্তার নিয়ে উত্তেজনা বিরাজমান ছিল। 

বুলগাক শব্দের অর্থ বিদ্রোহ বা হাঙ্গামা। উপজাতীয়রা পরস্পর বিদ্রোহ বা হাঙ্গামায় লিপ্ত থাকতো। তাই এর নাম হয় বুলগাক। অনেকে মনে করেন, মোঙ্গোলিক (Mongolic) ভাষার শব্দ বুলগারাক হতে বুলগেরিয়া নামের উৎপত্তি। এর অর্থ পৃথক বা বিভেদ। উপজাতিদের মধ্যে প্রবল বিভেদ ও ভিন্নতা ছিল। তবু তারা একই ভূখণ্ডে স্বকীয়তা বজায় রেখে বসবাস করতো। তাই দেশটির নাম হয় বুলগারাক। এ ভূখণ্ডের উপজাতীয় গোষ্ঠীর ৫ হতে দশটি গোত্রে বিভক্ত ছিল। তাই দেশটির নাম হয় বুলগারা। অনেকের মতে প্রোটো-টার্কিক শব্দ বেলগার শব্দ হতে বুলগেরিয়া নামের উৎপত্তি। বেলগার একটি যৌগ শব্দ। বেল (bel) ও গার (gur) শব্দদ্বয় নিয়ে শব্দটি গঠিত। বেল শব্দের অর্থ পাঁচ এবং গার শব্দের অর্থ তীর।

বুলগেরিয়ার মোট আয়তন ১,১৭,০০০ বর্গকিলোমিটার বা ৪৫,০০০ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় অংশ ২%। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের আদম শুমারি অনুযায়ী বুলগেরিয়ার মোট লোক ৭৩,৬৪,৫৭০ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে লোকসংখ্যা ৬৬.২ জন। আয়তন, মোট জনসংখ্যা ও জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় বুলগেরিয়া পৃথিবীর ৯৫-তম বৃহত্তম ও ৯৫-তম জনবহুল দেশ। বর্তমান বিশ্বে জনসংখ্যা, আয়তন ও জনঘনত্ব বিবেচনায় এমন সুসামঞ্জস্য দেশ আর নেই। সরকারিভাবে বুলগেরিয়ার অধিবাসীদের বুলগেরিয়ান বলা হয়।বুলগেরিয়ার জিডিপি (পিপিপি) ১২৮.০৫৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ১৭,৮৬৯। অন্যদিকে, জিডিপি (নমিনাল) ৫৭.৫৯৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৮,০৩৭ ইউএস ডলার। মাথাপিছু আয় (পিপিপি) বিবেচনায় বুলগেরিয়া পৃথিবীর ৭৫-তম ধনী দেশ। মুদ্রার নাম লেভ।

‘বুলগেরীয়’ বুলগেরিয়ার সরকারী ভাষা এবং এ ভাষাতে দেশটির প্রায় ৮৫%  লোক কথা বলে। সংখ্যালঘু ভাষাগুলোর মধ্যে তুর্কি, আলবেনীয়, আর্মেনীয়, গাগাউজ, গ্রিক, ম্যাসেডোনীয় এবং রোমানীয় উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও বুলগেরিয়াতে জিপসি বা রোমানি ভাষা ব্যবহারকারী একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী বাস করে। আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডে রুশ, জার্মান এবং ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়। বুলগেরিয়ার জাতীয় পতাকা ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে  প্রথম গৃহীত হয়। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে  কিছুটা সংস্কার করে এটি পুনরায় গৃহীত হয়। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দের ৫ অক্টোবর  অটোমান সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পরাজয়ের পর বুলগেরিয়া স্বাধীনতা লাভ করে।

ফেসবুকের আবিষ্কারক মার্ক জুকারবার্গ বুলগেরিয়ান বংশোদ্ভুদ। বুলগেরিয়ান বংশোদ্ভুদ জন ভিনসেন্ট অ্যাতানাসফ (John Vincent Atanasoff) প্রথম ইলেকট্রনিক কম্পিউটার আবিষ্কার করেন। বুলগেরিয়ান নাগরিক পিটার পেটরফ Peter Petroff)) ডিজিটাল ঘড়ির আবিষ্কাকর। বুলগেরিয়ান বংশোদ্ভুদ অ্যাসেন জর্দানোপ (Assen Jordanoff) গাড়ির এয়ার ব্যাগের আবিষ্কার করেন। প্রতিবছর বুলগেরিয়ায় ২ লাখ টন মদ উৎপাদিত হয়। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য হলেও বুলগেরিয়ার সরকারি মুদ্রা ইউরো নয়, লেভ। বুলগেরিয়ার এক তৃতীয়াংশ জঙ্গলাবৃত। পৃথিবীতে যত গোলাপ- তেল উৎপাদিত হয় তার ৭০-৮৫% উৎপাদিত হয় বুলগেরিয়ায় এবং তার সবটাই উৎপাদিত হয় গোলাপ উপত্যাকায়।

৬৮১ খ্রিষ্টাব্দে  প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এ পর্যন্ত বুলগেরিয়া তার নাম পরিবর্তন করেনি। এটি ইউরোপ মহাদেশের এমন অপরিবর্তনীয় নামে অবচ্ছিন্নভাবে চলে আসা একমাত্র দেশ। বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়া ৭০০০ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ইউরোপের দ্বিতীয় প্রাচীনতম শহর।  পৃথিবীর প্রাচীনতম স্বর্ণসম্পদের অন্যতম একটি আবিষ্কৃত হয়েছে বুলগেরিয়ার ভার্নায় ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ৮ ডিসেম্বর।  খ্রিষ্টপূর্ব  ৫০০০ অব্দে এ স্বর্ণসম্পদ সঞ্চিত করা হয়। গ্রিস ও ইতালির পর মূল্যবান ও ঐতিহ্যবাহী প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট বিবেচনায় বুলগেরিয়ার স্থান বিশ্বে তৃতীয়। বুলগেরিয়ায় ১৫,০০০ এর অধিক তারাচিয়ান খবর আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রস্তরযুগ হতে বুলগেরিয়ায় মদ প্রস্তুত হয়ে আসছে।

রায়ানা কাসাবোভা (Rayna Kasabova) একজন বুলগেরিয়ান বিমান বাহিনীর বৈমানিক এবং পৃথিবীর প্রথম মহিলা বৈমানিক, যিনি সামরিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সামরিক বাহিনীর ইতিহাসে আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য প্রথম বোমা আবিষ্কার করে বুলগেরিয়ান বিমান বাহিনী। এ বোমা ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ অক্টোবর প্রথম লেফটেন্যান্ট রাডুল মিলকভ ও লেফটেন্যান্ট প্রোডান তারাকচিয়েভ বলকান যুদ্ধে ব্যবহার করেন। বুলগেরিয়ান সেনাবাহিনী কখনও কোনো যুদ্ধে তাদের একটি পতাকাও হারায়নি।

আযারবাইজান (Azerbaijan) : ইতিহাস ও নামকরণ

বেলারুশ (Belarush) : ইতিহাস ও নামকরণ

বেলজিয়াম (Belgium) : ইতিহাস ও নামকরণ

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (Bosnia and Herzegovina) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!