বৈঙ্গা বা বইঙ্গা শব্দের অর্থ

ড. মোহাম্মদ আমীন 

বৈঙ্গা বা বইঙ্গা শব্দের অর্থ

এই পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/বৈঙ্গা-বা-বইঙ্গা-শব্দের-অ/

চট্টগ্রামের অধিবাসীরা মাঝে মাঝে বাংলাদেশের অন্য জেলা হতে আগতদের বৈঙ্গা ডাকে। গ্রামাঞ্চলে কথাটি প্রায় শোনা যেত। আমাদের এলাকায় অন্য জেলার কিংবা যারা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে পারত না তেমন লোকদের বৈঙ্গা বলা হতো। এরা নানা কাজে চট্টগ্রাম আসত। চট্টগ্রাম শহরেও বৈঙ্গা শব্দটি একই অর্থে ব্যবহার করা হতো। এই বৈঙ্গা অর্থ কী? 
 
বঙ্গিয়া (বঙ্গ+ইয়া=বঙ্গিয়া= বৈঙ্গা) থেকে বৈঙ্গা বা বইঙ্গা শব্দের উদ্ভব। এটি আরকান-চট্টগ্রামের অধিবাসী ও বার্মিজ মগদের উচ্চারিত একটি জাতিবাচক আঞ্চলিক শব্দ।  যা পদ হিসেবে বিশেষ্য। এর প্রায়োগিক ও আলংকারিক অর্থ বঙ্গবাসী, বার্মা বা আরাকানের বাইরে অবস্থিত বঙ্গদেশের অধিবাসী,
    ড. মোহাম্মদ আমীন
বৃহত্তর নোয়খালীর অধিবাসী, বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা ছাড়া অন্য জেলাসমূহের অধিবাসী, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে পারে না এমন বাংলাদেশি, বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ায় এমন লোক, তুলনামূলকভাবে অনভিজাত প্রভৃতি।
 
১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বৃহত্তর চট্টগ্রাম সম্পূর্ণভাবে আরাকান রাজাদের অধীনে শাসিত হয়। তখন বঙ্গদেশ ছিল চট্টগ্রামের জন্য বিদেশ। আরাকান-চট্টগ্রামের এর আগেকার ইতিহাস ছিল অস্পষ্ট। আরাকান-শাসিত চট্টগ্রামের বাইরে  নোয়াখালী হতে শুরু করে বাংলাভাষী অধ্যুষিত বাকি অঞ্চল বঙ্গ, বঙ্গদেশ, বাঙলা, বাঙ্গালা প্রভৃতি নামে পরিচিত ছিল। তন্মধ্যে বঙ্গ ছিল সবচেয়ে পরিচিত নাম। আরকান-চট্টগ্রামের অধিবাসীদের কাছে বাংলাভাষী এলাকা বিশেষ করে প্রতিবেশী বর্তমানে নোয়াখালী নামে পরিচিত এলাকা বঙ্গ নামে পরিচিত ছিল।  বঙ্গদেশের লোকদের আরাকান-চট্টগ্রামের লোকজন বইঙ্গা বা বৈঙ্গা ডাকত।
 
মীরসরাই পর্যন্ত ছিল আরাকান রাজাদের রাজ্যসীমা। মীরসরাইর পর নোয়াখালী ছিল দক্ষিণ দিক হতে বঙ্গদেশের সূচনা-ভূমি। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় নোয়াখালীর লোকদের সঙ্গে আরাকানের লোকদের নানা কারণে যোগাযোগ করতে হতো এবং প্রায়শ যোগাযোগ হতো। ঝগড়া হতো আবার ভালোবাসাও হতো। উভয়পক্ষের মধ্যে যেমন ছিল দরদ তেমনি ছিল ফ্যাসাদ।  এছাড়া অন্যান্য দেশের লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না বললেই চলে। অবশ্য তখন যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে তেমন সুযোগও ছিল না।  এই যোগাযোগে আরাকানিরা নোয়াখালীর লোকদের
         পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
বঙ্গদেশের অধিবাসী বা বাংলাভাষী হিসেবে বঙ্গিয়া বা বৈঙ্গা নামে ডাকত। নোয়াখালীর কোনো মেয়েকে বিয়ে করলে বলা হতো বৈঙ্গা বিয়ে করছে। আমার এক আত্মীয় নোয়াখালীর এক মেয়ে বিয়ে করে আনেন। তাকে উপহাস করে বলা হতো “বৈঙ্গা বিয়া গইজ্জে”। তবে এখন আর তেমন শোনা যায় না।
 
১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে আরাকান-রাজ-শাসিত চট্টগ্রাম বঙ্গের বা বঙ্গভাষী অধ্যুষিত এলাকার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরও চট্টগ্রামের বাহিরে বিশেষ করে নোয়াখালী থেকে আগত লোকদের আগের ধারায় বইঙ্গা বা বৈঙ্গা ডাকার প্রচলন থেকে যায়। তখন চট্টগ্রামের সঙ্গে নোয়াখালীর লোকদের বেশি যোগাযোগ ছিল। চট্টগ্রামের লোকজন তেমন অন্য জেলায় যেত না। তারা নিজেদের অভিজাত ও সমৃদ্ধ মনে করত। তবে শিক্ষাদীক্ষা আর কর্মদক্ষতা এবং ‍বুদ্ধিমত্তায় চাটগাঁইয়ারা নোয়াখালীর লোকদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পারত না। ফলে নোয়াখালীর লোকদের প্রতি সৃষ্টি হয় ক্ষোভ। অধিকন্তু, নোয়াখালীর লোকজন আর্থিক কারণে যে-কোনো কাজ করতে সংকোচ করত না। এজন্য কিছু চাটগাঁইয়া  নোয়াখালীর অধিবাসীদের অনভিজাত, দরিদ্র এবং হতভাগা ভাবত। চট্টগ্রামের অধিবাসীদেরও নোয়খালীর লোকজন নানা কারণে হেয় চোখে দেখত। দীর্ঘদিন দুটি অঞ্চল স্বতন্ত্র ধারায় বেড়ে ‍উঠায় পরস্পর কিছু নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল।  এটি কোনো অস্বভাবিক বিষয় ছিল না। তবে ইদানীং তা দূরীভূত হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।
 
 ফলে বৈঙ্গা শব্দটি ক্রমান্বয়ে আরো নেতিবাচক অর্থ নিয়ে জেলাগত ঈর্ষাদ্বন্দ্বের প্রকাশ হিসেবে  নোয়াখালীর  লোকদের প্রকাশে ব্যবহৃত হতে থাকে। প্রসঙ্গত, চাটগাঁইয়ারা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা যারা বলতে পারত না তাদের সবাইকে নোয়াখালীর অধিবাসী মনে করে  বৈঙ্গা ডাকত। পরে বৈঙ্গা শব্দের অর্থ আরো ভিন্ন আঙ্গিতে বিস্তৃত হয়। এখন  চট্টগ্রামের বাহিরে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আগত বা যারা চট্টগ্রামের আাঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে পারে না তাদের বৈঙ্গা বলে। তবে বিদেশিদের বৈঙ্গা বলে না। আবার অন্য জেলার লোকরা চট্টগ্রামের লোকদের তুচ্ছ করার সুযোগ পেলে ছাড়ত না। এজন্য নিরপেক্ষদের কণ্ঠে ধ্বনিত হতো: সবার মধ্যে আছে ভালো, সবার মধ্যে আছে মন্দ।
 
 
 
 বৈঙ্গা একটি নেতিবাচক শব্দ। চট্টগ্রামের অধিবাসী ছাড়া অন্যদের প্রতি তুচ্ছার্থে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথাটি বলা হতো। বর্তমানে শব্দটির ব্যবহার বিশেষ করে সচেতন মহলে খুব কম। চট্টগ্রামের অধিবাসীরা  অধুনা ক্রমশ নিজেদের চিনতে শুরু করেছে। বুঝতে পারছে, অন্যান্য জেলার লোকদের হেয় ভাবার সুযোগ নেই। আগে চট্টগ্রামের অধিবাসীরা অন্য জেলার লোকদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কও করত না। এখন এই রেওয়াজও ভেঙে গেছে।  আমাদের একটা জিনিস বুঝতে হবে, সবাই ভালোমন্দের মিশেল। এ নিয়ে আমাদের বাংলাদেশ। একই ভাষা, একই সংস্কৃতি, একই জাতি
 
নোয়াখালীর মজুমদার, কুমিল্লার রায়,
চট্টগ্রামের চৌধুরী জলে ভেসে যায়।
দোষেগুণে আমরা সবে ভাই ভাই
এক জাতি এক ভাষা থাকি বাংলায়।
— — — — — — — — — — — — — —  — — — — — — —  — — — — — — —  
 
error: Content is protected !!