বোদা: পাঁটা ছাগল স্বাদহীন; বোদাল বোদ্ধা বুদ্ধু বৃত্য বৃত্ত: শেষেরটা ফাউ

ড. মোহাম্মদ আমীন
 বোদা: ‘বোদা’ শব্দের আভিধানিক ও প্রমিত অর্থ কী? বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান মতে, ‘বোদা’ শব্দের অর্থ (বিশেষণে) স্বাদহীন, বিস্বাদ। এটি দেশি শব্দ। সম্ভবত সাঁওতাল ভাষা হতে প্রাপ্ত।  বিশ্বনাথ জোয়ারদার সংকলিত অচলন্তিকা নামের অভিধান মতে, ‘বোদা’ শব্দের অর্থ (বিশেষ্যে) পাঁটা, ছাগল। (পাঁটা: বিশ্বনাথ জোয়ারদারের ‘অচলন্তিকা’ গ্রন্থে ‘পাঁটা’ বানানই আছে। যার বর্তমান প্রচলিত বানান ‘পাঁঠা’। অনেকে ‘পাঁটা’ বানান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। ‘অচলন্তিকা’ কথাটি ধারণ করে বিষয়টা বুঝতে হবে। এটাই (পাঁটা) অচলন্তিকা, যা ছিল, এখন নেই। আগে প্রচলিত ছিল, এখন অচল। ‘অচলন্তিকা’ গ্রন্থটিতে এমন বানানের শব্দগুলো তুলে ধরা হয়েছে।)

বোদাটাকে কাঁধে চড়িয়ে বড় রাস্তার দিকে চলল সুখীরাম।” সুখীরাম, স্বপ্নময় চক্রবর্তী

 

বোদাল ও  বোদ্ধা:  বোদাল (বোদ+ল) তৎসম শব্দ। এর অর্থ (বিশেষ্যে) বোয়াল মাছ। তৎসম বোদ্ধা (বুধ্‌+তৃ) অর্থ (বিশেষণে) বুঝতে সক্ষম এমন, সমঝদার, জ্ঞানী।

স্থানিক নাম হিসেবে বোদা: ভোঁদা ও ভোদা

বোদা দেশি শব্দ।বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত বোদা শব্দের অর্থ স্বাদহীন, বিস্বাদ প্রভৃতি। স্থাননাম বিশ্লেষণে অর্থ পাওয়া যায়— জ্ঞানী, বোদ্ধা, পণ্ডিত, ঈশ্বর, বোয়াল মাছ (আঞ্চলিক) প্রভৃতি। এক্ষেত্রে ‘বোদ্ধা’ বা ‘জ্ঞানী’ শব্দহতে ‘বোদা’ শব্দের উদ্ভব। যেমন:
বুদ্ধ ছিলেন যুগের শ্রেষ্ঠ বোদা(জ্ঞানী, পণ্ডিত)।
ঢাকার যানজট জীবনটাকে বোদা(বিস্বাদ) করে দিল।
বোদা(বোয়াল মাছ) মাছটি ধরতে অনেক কষ্ট হয়েছে।
অনেকের মতো, ‘বোদা’ শব্দটি গৌতম বুদ্ধের সংক্ষিপ্ত নাম‘বুদ্ধ’ শব্দের আঞ্চলিক রূপ। বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলায় ‘বোদা’ নামের একটি উপজেলা রয়েছে। আবার অনেকের মতে, বোদেশ্বরী দেবী হতে বোদা  উপজেলার নামকরণ। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য টিক করুন নিচের সংযোগে:
বোদা দেশি শব্দ।বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত বোদা শব্দের অর্থ স্বাদহীন, বিস্বাদ প্রভৃতি। এবং স্থান-নাম বিশ্লেষণে অর্থ পাওয়া যায় : জ্ঞানী, বোদ্ধা, পণ্ডিত, ঈশ্বর বোয়াল মাছ প্রভৃতি। এবার বোদা শব্দের স্থানিক নাম বিশ্লেষণ করা যাক। বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলায় ‘বোদা’ নামের একটি উপজেলা

প্রকাশক: পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

রায়েছে। এর উত্তরে পঞ্চগড় সদর উপজেলা, দক্ষিণে ঠাকুরগাঁও সদর ও দেবীগঞ্জ উপজেলা, পূর্বে দেবীগঞ্জ উপজেলা, পশ্চিমে আটোয়ারী এবং পঞ্চগড় সদর উপজেলা। নাজিরগঞ্জ, শালবাড়ি, মেয়েলিয়া, দৈখাতা ও ময়দানদিঘী ছিটমহলগুলো বোদায় ছিল। ভৌগোলিক অবস্থানই বলে দিচ্ছে বোদার গুরুত্ব।১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে বোদা নামের গ্রামে বোদা থানা গঠিত হয়। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত বিভাজনের পর বোদা থানাকে দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও মহকুমার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১লা ডিসেম্বর বোদা হানাদার বাহিনী মুক্ত হয়।প্রতিবছর এ দিন বোদা মুক্ত দিবস পালন করা হয়। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে বোদা থানাকে পঞ্চগড় জেলার আওতাভুক্ত করে উপজেলায় উন্নীত করা হয়।

 বোদা বেশ প্রাচীন জনপদ। করতোয়া, টাংগন, পাথরাজ নদী বিধৌত বোদা মৌর্য্য যুগেই (খ্রিষ্টপূর্ব ৩২০—খ্রিষ্টপূর্ব ১৮৫) সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে গড়ে উঠে। সম্রাট অশোকের (২৭৩ খ্রিষ্টপূর্ব—খ্রিষ্টপূর্ব ২৩২) আমলেই এটি বৌদ্ধপ্রধান এলাকায় পরিণত হয়। সেসময় এখানে বৌদ্ধদের একটি ছোটো প্যাগোডা বা বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিহারকে ঘিরে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও সাধু-সন্ন্যাসীদের মিলনমেলা গড়ে উঠেছিল। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের স্থানীয়ভাবে বোদ্ধা (জ্ঞানী) বলা হতো। তাই বৌদ্ধবিহারটি বোদ্ধা-বিহার; সংক্ষেপে বোদ্ধা নামে পরিচিতি লাভ করে। কথিত হয়, বোদ্ধা (জ্ঞানী) শব্দ থেকে স্থানটির নাম হয় বোদ্ধা, যা  ক্রম পরিবর্তন ও বিকৃতির মাধ্যমে বোদা নামে স্থিতি পায়। এ বিবেচনায়, বোদা শব্দের স্থানিক ও আভিধানিক অর্থ বোদ্ধা, জ্ঞানী, পণ্ডিত প্রভৃতি। প্রসঙ্গত, এ উপজেলায় এখনো প্রায় ৫০০ শতের অধিক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রয়েছে।
 অন্য একটি প্রবাদমতে, বর্তমানে বোদা নামে পরিচিত উপজেলার প্রাচীন নাম ছিল নগরকুমারী। বোদেশ্বরীর মন্দির প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এর নাম হয় বোদেশ্বরী। যা থেকে বর্তমান বোদা নামের উদ্ভব। আবার অনেকে মনে করেন, বোদাল শব্দ থেকে বোদা শব্দের উদ্ভব। বোদাল অর্থ বোয়াল মাছ। একসময় এখানকার নদীতে প্রচুর বোয়াল মাছ পাওয়া যেত। তাই এলাকাটির নাম হয়, বোদাল, যার বিকৃত ও স্থানিক রূপ বোদা। সে হিসেবে বোদা শব্দের অর্থ- জ্ঞানী, বোদ্ধা, পণ্ডিত, ঈশ্বর বোয়াল মাছ, স্বাদহীন, বিস্বাদ প্রভৃতি। তবে, ইতিহাসবেত্তাদের কাছে শেষের প্রবাদ দুটির চেয়ে প্রথমটি অধিকতর গ্রাহ্য। বোদা নাম শুনে অনেকে হাসাহাসি করে। তারা মনে করে, শব্দটি অশালীন। আমি জানি না, এমন তথ্য তারা কোথায় পেয়েছে। শব্দ কখনো অশালীন হতে পারে না। প্রত্যেক শব্দই আবশ্যক। যারা অর্থ না-জেনে বোদা বা অন্য কোনো শব্দকে অশালীন মনে করে হাসাহাসি করে, উপহাস করে- তারা আসলেই কুলাঙ্গার।
ভোদা: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘ভোদা’ বানানের কোনো শব্দ নেই। তবে ‘ভোঁদা’ বানানের একটি শব্দ আছে। অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত দেশি ‘ভোঁদা’ শব্দের অর্থ— স্থূলকায়, মোটা, মাংসল, স্থূলবুদ্ধি, বোকা, হাবাগোবা ইত্যাদি। যেমন:
ভোঁদা (স্থুলকায়) ছেলেটির হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে।
ছেলেটি এত ভোঁদা(হাবাগোবা) যে, নিজের নামটিও ভালোভাবে বলতে পারে না।
বোদ্ধা বুদ্ধু বৃত্য বৃত্ত: শেষেরটা ফাউ
এটি দেশি শব্দ। এটি বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বুদ্ধ অর্থ জ্ঞানী, প্রজ্ঞাময় প্রভৃতি এবং বুদ্ধু অর্থ মূর্খ, অজ্ঞ প্রভৃতি। অতএব বুদ্ধকে (জ্ঞানী) মূর্খ বা অজ্ঞ করার জন্য বেশি কিছু লাগে না। শুধু একটি উ-কার প্রয়োজন।
ব্রহ্ম অর্থ পরমাত্মা, পরম সত্য, বিধাতা, ব্রাহ্মণ, ব্রহ্মজ্ঞান। কিন্তু ব্রহ্মডাঙা শব্দে ‘ব্রহ্ম’ শব্দের অর্থ অনুর্বর। অতএব ব্রহ্মডাঙা শব্দের অর্থ অনুর্বর উঁচু ভূমি। আবার ব্রহ্ম যখন বন্ধুর সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন ব্রহ্ম অর্থ পতিত। তাই ব্রহ্মবন্ধু অর্থ পতিত ব্রাহ্মণ। ব্রহ্ম শব্দের অর্থ যাই হোক না কেন, ব্রহ্মচর্য অর্থ যৌনসংযম।
বুদ্ধিও ভালো বৃদ্ধিও ভালো। যদি তা ইতিবাচক হয়। বুদ্ধিজীবী অর্থ জ্ঞানখোর মানে বুদ্ধি দ্বারা জীবিকা অর্জন করেন এমন। কিন্তু বৃদ্ধিজীবী অর্থ সুদখোর। বুদ্ধিজীবীর চেয়ে বৃদ্ধিজীবীর প্রভাব সবসময় বেশি থাকে। কারণ, বুদ্ধিজীবী সাধারণত বৃদ্ধিজীবীর কাছে জ্ঞান বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে।
বৃত্য হতে হলে বৃত্ত না হলেও চলে। কারণ শ্রদ্ধেয় হতে হলে গোলাকার হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রসঙ্গত, বৃত্য অর্থ শ্রদ্ধেয় এবং বৃত্ত অর্থ গোলাকার। তাই বিত্তবান হতে হলে বৃত্তবান হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। উল্লেখ্য, বিত্তবান শব্দের অর্থ সম্পৎশালী এবং বৃত্তবান অর্থ চরিত্রবান বা গোলাকার।
সূত্র:
১. বাংলা ভাষার মজা(২), পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি., ড. মোহাম্মদ আমীন
২. সমার্থক ও সমোচ্চারিত শব্দের অর্থভেদ: প্রয়োগ ও প্রমিত প্রয়োগ, ড. মোহাম্মদ আমীন

শুবাচ-এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ

শুবাচে প্রকাশিত ও প্রকাশনীয় অধিকাংশ লেখা পেতে চাইলে ক্লিক করতে পারেন এই সংযোগে: www.draminbd.com। শুবাচে প্রকাশিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখা নিচের সংযোগসমূহে গিয়ে দেখতে পারেন। ৮ নম্বরে রয়েছে শুবাচগোষ্ঠীর নীতিমালা।
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
error: Content is protected !!