ব্রুনাই (Brunei) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (এশিয়া)

ড. মোহাম্মদ আমীন

ব্রুনাই (Brunei)

ব্রুনাই, বোর্নিও দ্বীপের উত্তর উপকূলে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অবস্থিত একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। এটি রাজতান্ত্রিক ইসলামি দেশ। এর সরকারি নাম ব্রুনাই দারুসসালাম। এর উত্তরে দক্ষিণ চীন সাগর এবং বাকি সব দিকে মালয়েশিয়ার অন্তর্গত বোর্নিও দ্বীপ। ব্রুনাই হচ্ছে একমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র যারসম্পূর্ণ অংশ বোর্নিও দ্বীপে অবস্থিত। বোর্নিও দ্বীপের বাকি অংশ ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিার অংশ। উল্লেখ্য বোর্নিও দ্বীপের লোকসংখ্যা ৪,০৮,৭৮৬। ব্রুনাই তেল সম্পদে সমৃদ্ধ একটি ধনী রাষ্ট্র। ব্রুনাই এ অঞ্চলের একমাত্র দেশ, যা ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসাবে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্রিটেন ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ১ জানুয়ারি দেশটিকে স্বাধীনতা দিয়ে চলে যায়।

প্রবাদমতে, ‘বারু নাহ’ চীৎকার হতে ব্রুনাই নামের উৎপত্তি। সুলতান আওয়াঙ আলাক বেতাতার (Awang Alak Betatar) ব্রুনাই নামের প্রতিষ্ঠাতা। ব্রুনাই নামের উৎপত্তি নিয়ে সমধিক প্রচলিত প্রবাদটি ‘বারু নাহ’ প্রবাদ নামে পরিচিত। সুলতান বেতাতার, তেমবুরঙ (Temburong) জেলার গ্যারাঙ অঞ্চল থেকে ব্রুনাই নদী পাড় হয়ে বদ্বীপ ভূখ-টির সন্ধান পান। দ্বীপে উঠে তিনি সোল্লাসে চিৎকার দিয়ে বলেন, বারু নাহ! বারু নাহ!! ‘বারু নাহ’ একটি মালয় শব্দ। যার অর্থ ‘এখানে’ অথবা ‘এটাই সে ভূখ-’। বলা হয়, বেতাতারের ‘বারু নাহ’ চিৎকার থেকে এলাকাটির নাম হয় বারুনাহ। যার অপভ্রংশ ব্রুনাই। চতুর্দশ শতকে ভূখ-টির নাম রাখা হয় বারুনাই। সংস্কৃত বরুন শব্দের অর্থ সমুদ্র বা (regent of the ocean)। তবে ব্রুনাই এর পূর্ণ নাম নেগারা ব্রুনাই দারুসসালাম (Negara Brunei Darussalam)। এটি আরবি শব্দ। এর অর্থ শান্তির আলয় (abode of peace) এবং নেগারা শব্দের অর্থ মালয় দেশে অবস্থিত জনপদ (country  in Malay)।

ব্রুনাই নামকরণ ও সুলতান বেতাতারকে নিয়ে আর একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে। কথিত হয়, তিনি ছিলেন বুরানান (Buranun) নামক প্রাচীন এক বর্বর আরবীয় উপজাতির সদস্য। সুলতান বেতাতার স্বীয় গোষ্ঠির নামকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ভূখ-টির নাম বুরানান রাখেন। যার অপভ্রংশ ব্রুনাই। অনেকের মনে করেন, ৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে চাইনিজ রাজা বনি এর নাম হতে ব্রুনাই নামের উৎপত্তি। নামের বানান ও উচ্চারণ দেখে অনেক এটাকে অধিক যৌক্তিক মনে করেন। আবার অনেক ইতিহাসবেত্তা মনে করেন, সংস্কৃত শব্দ ভারুনাই হতে ব্রুনাই শব্দের উদ্ভব। সংস্কৃত বারুনাই শব্দের অর্থ (seafarers) নাবিক। আবার অনেক বলেন, বারুনাই নয়; বরং সংস্কৃত শব্দ ভূমি (অঞ্চল বা এলাকা বা দেশ) হতে ব্রুনাই নামের উৎপত্তি হয়েছে। মালেশিয়ায় বহুল প্রচলিত ভূমিপুত্র শব্দ এবং সংস্কৃত সিংহপুর হতে সিঙ্গাপুর নামের উৎপত্তি প্রাচীনকালে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় সংস্কৃত ভাষার আধিপত্যের পরিচায়ক। সুতরাং সুলতান হতে ব্রুনাই নামের উৎপত্তিটা নিয়ে অনেকে যৌক্তিক কারণে সংশয় প্রকাশ করে থাকেন।

ব্রুনাইয়ের মোট আয়তন ৫,৭৬৫ বর্গ কিলোমিটার বা ২,২২৫ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগ ৮.৬ শতাংশ। এটি এশিয়ার দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। প্রথম ক্ষুদ্র দেশ সিঙ্গাপুর। ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে ব্রুনাইর লোকসংখ্যা ৪১৫,৭১৭ এবং প্রতিবর্গ কিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৬৭.৩ জন। দেশটির মোট জিডিপি ২১.৯০৭ বিলিয়ন ডলার এবং মাথপিছু আয় ৫০,৪৪০ ডলার। আয়তন বিবেচনায় ব্রুনাই পৃথিবীর ১৭২-তম দেশ কিন্তু জনসংখ্যা বিবেচনায় ১৭৫-তম বৃহত্তম দেশ। অন্যদিকে জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় ব্রুনাই পৃথিবীর ১৩৪-তম জনবহুল দেশ। এ দেশের এইচডিআই (০.৮৫২) অত্যন্ত উঁচু এবং পৃথিবীর মধ্যে ৩০-তম অবস্থানে রয়েছে। এর মুদ্রার নাম ব্রুনাই ডলার।

ব্রুনাই দুইটি আলাদা এলাকা নিয়ে গঠিত। তন্মধ্যে পশ্চিম এলাকা বৃহত্তর। দুই এলাকাতে সমুদ্র বন্দর আছে। তবে দুটিই মালয়েশিয়র সারাওয়াক প্রদেশ ঘিরে রেখেছে। বন্দর সরি বেগাওয়ান ব্রুনাইয়ের রাজধানী। ব্রুনাইর জনসংখ্যার মধ্যে ৬৬.৩% মালয়, ১১.২% চায়নিজ, ৩.৪% আদিবাসী, ২.৩% ভারতীয় এবং ১৬.৮% অন্যান্য।

ব্রুনাইয়ের রাজনীতি একটি পরম রাজতন্ত্র কাঠামোতে সংঘটিত হয়। সুলতান একাধারে রাষ্ট্র ও সরকার-প্রধান। ব্রুনাইয়ে ২০ সদস্যবিশিষ্ট একটি আইন প্রণয়ন কাউন্সিল আছে, তবে এর সদস্যরা আইন প্রণয়নে কেবল পরামর্শদাতা হিসাবে কাজ করেন। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দের সংবিধান অনুযায়ী পাদুকা সেরি বাগিন্দা সুলতান হাজি হাসানাল বোলকিয়াহ মুইযাদ্দিন ওয়াদ্দাউল্লাহ হলেন দেশের প্রধান। ১৯৬০-এর দশকে একটি বিপ্ল¬বের পর থেকে ব্রুনাইয়ে সামরিক শাসন জারি হয়ে আছে।

মালয় ও ইংরেজি ব্রুনাইয়ের সরকারি ভাষা। এর অর্ধেকেরও বেশি লোকের মাতৃভাষা মালয়। ইংরেজিভাষী লোকের সংখ্যা ১২ হাজার মতো হবে। প্রায় ১২% লোক চীনা ভাষার বিভিন্ন উপভাষায় কথা বলেন। এছাড়াও বেশ কিছু সংখ্যালঘু ভাষা প্রচলিত।

১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ সেপ্টেম্বর সুলতান তৃতীয় ওমর আলী সাইফুদ্দিন ও স্যার রবার্ট স্কট স্বাীনতার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেন। কিন্তু ব্রুনাই স্বাধীনতা নিতে অস্বীকার করে। ব্রুনাইর অর্থনীতি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা সমৃদ্ধ। এটি পৃথিবীর অল্প কয়েকটি দেশের একটি যেখানে এখনও নারীদের ভোটাধিকার স্বীকৃত নয়। জ্বালানির সহজলভ্যতা ও নামমাত্র আয়কর দিতে হয় বলে গাড়ির দাম খুব কম। ব্রুনাইর প্রতি ২.০৯ জন অধিবাসী একটি করে গাড়ি ব্যবহার করে। ব্রুনাই সরকার বিনামূল্যে নাগরিকদের শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকে। সরকার খাদ্য ও গৃহনির্মাণে প্রচুর ভর্তুকি দিয়ে থাকে। এ দেশের কোনো নাগরিককে ব্যক্তিগত আয়কর দিতে হয় না।

সুলতান হাসানাল বলকিয়াহ ব্রুনাইর ২৯-তম সুলতান। তার পরিবার বিগত ছয়শ বছর যাবত ব্রুনাই শাসন করে আসছে। ফর্বস ম্যাগাজিন অনুযায়ী সুলতান হাসানাল বলকিয়াহর মোট সম্পদের পরিমাণ ২৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার। তিনি বিশ্বে গাড়ি সংগ্রাহক হিসাবে খ্যাত। সুলতান বালকিয়ার ২০টি ল্যাম্বোরগিনিস, ১৬০টি পর্চেস, ১৩০টি রোলস রয়চেস, ৩৬০টি ফেরারিস, ১৭০টি জাগুয়ার, ১৮০টি বিএমডব্লিউ, ৩৬০টি বেন্টলিস এবং ৫৩০টি মার্সিডিজ-বেনজসহ ৫ হাজার কার রয়েছে। এমন বিলাসী আচরণ আর কোনো জাতিতে দেখা যায় না। তার একটি প্রাসাদ রয়েছে, যেখানে ১৫০০টি কক্ষ আছে। গিনিস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অনুযায়ী সুলতান বলিকিয়াহ ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে পৃথিবীর একনম্বর ধনী ছিলেন।

ব্রুনাইবাসী বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে হ্যান্ডস্যাক করে না। অনামিকা দ্বারা কোনো কিছু নির্দেশ করাকে অশোভনীয় মনে করা হয়। তৎপরিবর্তে তারা বৃদ্ধাঙ্গুল ব্যবহার করে। কারও গৃহে প্রবেশকালে ব্রুনাইবাসী সর্বদা তাদের জুতো খুলে প্রবেশ করে। এখানে প্রকাশ্যে অ্যালকোহল পান নিষিদ্ধ। তবে গোপনে ইচ্ছেমতো পান করা যায়। পৃথিবীতে একমাত্র ব্রুনাইতে বেলালগ ট্রি ফ্রগ [Belalong Tree Frog (Rhacophorus belalongensis)] পাওয়া যায়। ব্রুনাইতে এমন ৩৫ প্রকারের ব্যতিক্রমী উদ্ভিদ প্রজাতি রয়েছে, যা ব্রুনাই ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় না।

কোরআন তেলওয়াতকে ব্রুনাইয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক কোরআন তেলওয়াতে বিজয়ী ব্রুনাই নাগরিককে সরকার আজীবন প্রতিমাসে ২০০০ ব্রুনাই ডলার অনুদান দিয়ে থাকে। যা বাংলাদেশি টাকায় ১১,৩৩০ টাকার সমান। ব্রুনাইয়ের সুলতান সবসময় নিজের সম্পদ ও গাড়ি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তিনি গাড়ির বিনিময়ে দেশের মূল্যবান খনিজ সম্পদ তুলে দেন পাশ্চাত্যের হাতে। ব্রুনাইয়ে ব্র্যান্ডেট পণ্যের দাম সিঙ্গাপুরের চেয়ে অনেক বেশি। তাই অনেকে ব্র্যান্ডেট পণ্য ক্রয়ের জন্য সিঙ্গাপুর চলে আসে। এখানে বেড়াতে যেতে হলে প্রচুর অর্থ নিয়ে যাওয়া আবশ্যক। তবে যা দেখা যাবে, তা অর্থের বিচেনায় অনেক দামি।

১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ সেপ্টেম্বর ব্রনাইয়ের পতাকা গৃহীত হয়। পতাকায় খচিত চাঁদের চিহ্নের মধ্যে রাষ্ট্রীয় নীতিবাক্য (Always render service with God’s guidance) আরবি ভাষায় লেখা আছে। তারা নিচে সংলগ্ন একটি ব্যানারে লেখা আছে ব্রুনাই দারআস সালাম। যার অর্থ ব্রুনাই, শান্তির আলয়।


মাদাগাস্কার (Madagascar) : ইতিহাস ও নামকরণ

মালাউই (Malawi) : ইতিহাস ও নামকরণ

মালি (Mali) : ইতিহাস ও নামকরণ

 মৌরিতানিয়া (Mauritania) : ইতিহাস ও নামকরণ

মরক্কো (Morocco) : ইতিহাস ও নামকরণ

মরিশাস (Mauritius) : ইতিহাস ও নামকরণ

মোজাম্বিক (Mozambique): ইতিহাস ও নামকরণ

 

এশিয়া : এশিয়া মহাদেশ : ইতিহাস ও নামকরণ

আফগানিস্তান (Afghanistan) : ইতিহাস ও নামকরণ

আযারবাইজান (Azerbaijan) : ইতিহাস ও নামকরণ

আর্মেনিয়া (Armenia) : ইতিহাস ও নামকরণ

বাহরাইন (Bahrain) : ইতিহাস ও নামকরণ

বাংলাদেশ (Bangladesh) : ইতিহাস ও নামকরণ

ভুটান (Bhutan) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!