ব্লাউজ: উৎপত্তি ও ব্যুৎপত্তি, ব্লাউজ ও রানি ভিক্টোরিয়া: ব্লাউজের বোতাম পেছনে কেন

ড. মোহাম্মদ আমীন

 ব্লাউজ: উৎপত্তি ও ব্যুৎপত্তি, ব্লাউজ ও রানি ভিক্টোরিয়া: ব্লাউজের বোতাম পেছনে কেন

ব্লাউজ; উৎপত্তি ও ব্যুৎপত্তি:  ব্লাউজ ফরাসি হতে ইংরেজি ভাষায় আগত কৃতঋণ শব্দ। ফরাসি মহিলা শ্রমিকরা বহুকাল থেকে ঊর্ধ্বাঙ্গে জামার মতো নীল রঙের বিশেষ ধরনের পোশাক পরিধান করত। যাকে বলা হতো ব্লাউজ। পরবর্তীকালে পোশাকটি ব্রিটেনেও জনপ্রিয়তা পায়। ব্লাউজ নামটি লাতিন পেলুসিয়া pelusia) হতে ফরাসি ভাষায় এসেছে। পেলুসিয়া হচ্ছে নীল নদের অদূরে প্রাচীন মিশরীয় শহর পেলুসিয়ামের (pelusium) কেন্দ্রে অবস্থিত একটি অভিজাত পোশাক ও অন্যান্য দ্রব্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। কথিত হয়, এই প্রতিষ্ঠানে প্রথম ব্লাউজ তৈরি করা হয়। মধ্যযুগে মিশরীয় নারীকর্মীরা এটি পরিধান করত। তবে এই ব্লাউজ বর্তমানে উপমহাদেশের নারীরা শাড়ির নিচে যে ব্লাউজ পরে তার মতো ছিল না। মূলত মহিলা কর্মীদের জন্য এই ব্লাউজ বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হতো।
 
আধুনিক ব্লাউজের উদ্ভাবক: মহারানি ভিক্টোরিয়াকে বলা হয় ব্লাউজের উদ্ভবক। ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে রানি ভিক্টোরিয়া শাড়ির সঙ্গে পরিধানের জন্য সাধারণ ব্লাউজের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির একটি ব্লাউজের ডিজাইন করেন। যার প্রস্তুত খরচ ছিল কম এবং কৌশলও ছিল সহজ। ওই বছরই এটি যুবতীদের আনুষ্ঠানিক পোশাক নির্ধারণ করা হয়। ফলে এটি তখনই অভিজাত রমণীদের আনুষ্ঠানিক পোশাক হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয়তা  পেয়ে যায়।
 
ব্লাউজ ও বাঙালি:  ব্লাউজের সঙ্গে বাঙালিদের পরিচয় বেশিদিন আগের নয়। ইংরেজরা  ভারতবর্ষের শাসন ক্ষমতায় আসার আগে শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজ পরিধান করার ধারণাটি এখানকার লোকদের জ্ঞাত ছিল না। রানি ভিক্টোরিয়া সর্বপ্রথম শাড়ির সাথে উর্ধাঙ্গে পরার জন্য ব্লাউজের প্রচলন শুরু করেন। রানি ভিক্টোরিয়া প্রচলিত ও পরিহিত পরিধেয় হিসেবে ভারতবর্ষে বহু বছর অবধি ব্লাউজ ছিল অভিজাত রমণীদের আভিজাত্যের প্রতীক। পুরানো বাংলা ছায়াছবি দেখলেও বিষয়টি টের পাওয়া যায়। সেখানে অভিজাত মহিলাদের ঊর্ধ্বাঙ্গে ব্লাউজ দেখা গেলেও সাধারণ মহিলাদের গায়ে তা দেখা যেত না। 
 
 
শরীরের প্রদর্শনীয় অঙ্গ বা প্রদর্শনশোভ্য অঙ্গ: শরীরের বিশেষ করে মহিলাদের প্রদর্শনশোভ্য অঙ্গ বিষয়ে ইংরেজ বা ইউরোপ আর বাঙালির দৃষ্টিভঙ্গিগত ব্যাপক তফাত ছিল। বঙ্গদেশের নারীদের মুখ, বুক, হাঁটু আর চুল ঢেকে রাখার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু পিঠ বা হাত প্রদর্শনকে সাধারণভাবে নেওয়া হতো এবং তা অশালীন বা অশোভন মনে করা হতো না। কিন্তু পশ্চিমা সমাজে পিঠ ও তলপেট প্রদর্শনকে অশোভন এবং জঘন্য মনে করা হতো। তবে হাঁটু উন্মুক্ত রাখা দূষণীয় ছিল না। ভারতবর্ষের রমণীদের জন্য তা ছিল দূষণীয়।
 
বাঙালি কায়দায় শাড়ি পরায় ক্লাবে ঢুকতে বাধা:  শাড়ি পরিহিতা বাঙালি রমণীদের পিঠ দেখা যায়। পিঠ দেখা যায় এমন পোশাক পরিধান করা ছিল ইংরেজ সংস্কৃতিতে অশোভনীয়। তখন ভারতবর্ষের রমণীরা এরূপ শাড়ি পরিধান করত। এজন্য রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠভ্রাতা ও ভারতবর্ষের প্রথম আইসিএস সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী দেবীকে ইংরেজ আমলে একটি বিশেষ রাজকীয় অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেওয়া সত্ত্বেও ক্লাবে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কারণ তিনি বাঙালি কায়দায় শাড়ি পরেছিলেন। যাতে পিঠ দেখা যাচ্ছিল। তখন ব্লাউজের প্রচলনও ছিল না। এরপর তিনি পিঠ ও তলপেট দেখানো যায়-  শাড়ি পরিধানের এমন পূর্বতন দেশীয় পদ্ধতি পরিবর্তন করে আধুনিক ধারায় শাড়ি পরা চালু করেন। যাতে পেট দেখা যেত না।
 
উপমহাদেশে ব্লাউজের প্রবর্তক: ইংরেজ মেয়েরা ছেলেদের জামার মতো ব্লাউজ এবং নিচে লং স্কার্ট পরিধান করত। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জ্ঞানদানন্দিনীর কন্যা  এবং প্রমথ চৌধুরীর স্ত্রী ইন্দিরা দেবী ইংরজের ব্লাউজের অনুকরণে শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজ পরার  রীতি চালু করেন। তিনি এবং তার মা উপমহাদেশে প্রথম ব্লাউজ পরিধান করেন। 
 
ব্লাউজের বোতাম বা হুক পেছনে কেন: সব পোশাকের বোতাম বা হুক সাধারণত সামনে হয়, কিন্তু ব্লাউজ বা এরূপ প্রকৃতির পোশাকের বোতাম বা হুক পেছনে। কিন্তু কেন? রানি ভিক্টোরিয়া প্রচলিত ব্লাউজ ছিল অভিজাত শ্রেণির রমণীদের পোশাক। ভারতবর্ষেও বহুকাল অবধি কেবল অভিজাত রমণীরাই ব্লাউজ পরিধান করত। মূলত তাদের জন্যই এটি প্রস্তুত করা হতো।  অভিজাত শ্রেণির নারীরা নিজেরা নিজেদের  আনুষ্ঠানিক পোশাক পরত না। দাসীদের দিয়ে পোশাক পরিধান করত। তাই ব্লাউজের পেছনে বোতাম রাখা হয়েছে। যাতে দাসীরা সহজে তা পরিয়ে দিতে পারে। এখনো মেয়েদের ব্লাউজ-প্রকৃতির জামায় বোতাম বা পেছনে হুক রাখা হয়। অবশ্য অনেকে এখন বোতাম বা হুক সামনের দিকে রাখার জন্যও দরজিকে বলে থাকে। কারণ সবার তো আর জামা পরানোর জন্য দাসদাসী নেই।
——————-
 

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com

error: Content is protected !!