বড়দা বড়দি, মেজপা মেজদি, সেজদা সেজদি, ন-দা ন-দি; কনেদা কনেদি, দুয়োদা দুয়োপা, ছোড়দা ছোড়দি

ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/বড়দা-বড়দি-মেজপা-মেজদি-সেজ/
 
জ্যেষ্ঠতার ক্রমানুসারে পারিবারিক সম্বোধন
কামাল তার বাবা-মায়ের কনিষ্ঠ সন্তান। তার বড়ো পরপর সাত ভাই আছে। পলাশ তার বাবা-মায়ের কনিষ্ঠ সন্তান।  তার পরপর সাত বড়ো বোন আছে। তারা তাদের  বড়ো সাত ভাই বা সাত বোনকে  কী শব্দে সম্বোধন করবে? যদি এর বেশি ভাইবোন থাকে তাহলে কীভাবে ডাকব?
জ্যেষ্ঠতার ক্রম অনুসারে  প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ, পঞ্চম ও কনিষ্ঠ জাতককে কী সম্বোধন করা হবে তা বিভিন্ন অভিধানে বর্ণিত আছে। এর পরের জাতকদের  কী সম্বোধন করা হবে তা নেই। তবে বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থ, সাহিত্যকর্ম, আঞ্চলিক ও পারিবারিক পর্যায়ে ক্রমানুসারে জাতকদের নানাভাবে সম্বোধিত হতে দেখা যায়। নিচে এর কিছু নমুনা দেওয়া হলো: 
প্রথম জাতক (বড়/বড়ো): প্রথম জ্যেষ্ঠ জন সাধারণত বড়দা/বড়দি, বড়ো দাদা/বড়ো দিদি, বড়ো ভাই/ বড়ো আপা; বড়ো  বোন প্রভৃতি কথায় সম্বোধিত হতে দেখা যায়। অভিধানমতে, বড়দা অর্থ (বিশেষ্যে) জ্যেষ্ঠ বা বড়ো ভাই এবং বড়দি অর্থ (বিশেষ্যে)— জ্যেষ্ঠ বা বড়ো বোন। 
ড. মোহাম্মদ আমীন

দ্বিতীয় জাতক (মেজ/মেজো):  সাধারণত দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠকে ডাকা হয় মেজদা/মেজদি; মেজো দাদা/মেজো দিদি, মেজো ভাই/মেজো আপা; মেজো বোন। অভিধানমতে, মেজদা/ মেজদি  অর্থ বিশেষ্যে ভাই/বোনদের মধ্যে বয়সে বড়ো ও দ্বিতীয়। মেজদা/মেজদি হলো মেজো দাদা ও মেজো দিদির সংক্ষিপ্ত রূপ। এটি আঞ্চলিক রূপও।

তৃতীয় জাতক (সেজ/সেজো): তৃতীয় জনকে ডাকা হয়সেজদা/সেজপা, সেজো দাদা/সেজো দিদি, সেজো ভাই/সেজো আপা; সেজো বোন। ওপরের দুটি সম্বোধনের মতো এটিও প্রায় সব  এলাকায় একইভাবে সম্বোধিত হয়। অভিধানমতে,  সেজদা/ সেজদি  অর্থ (বিশেষ্যে) ভাই/বোনদের মধ্যে বয়সে বড়ো ও তৃতীয়; ভাই বা বোনদের মধ্যে তৃতীয় জাতককে সেজো ভাই বা সেজো বোন বলা হয়। সেজদা/সেজদি হচ্ছে যথাক্রমে সেজো দাদা ও সেজো  দিদির সংক্ষিপ্ত রূপ।
চতুর্থ জাতক (ন): চতুর্থ জনকে ডাকা হয় ন-দা/ন-দি, নদাদা/নদিদি, নভাই/ন- আপা; নবোন প্রভৃতি অভিধানমতে, সংস্কৃত ‘নব’ হতে উদ্ভূত ‘ন’ অর্থ— (বিশেষ্যে) জ্যেষ্ঠতার ক্রমানুসারে চতুর্থ বা সেজোর পরবর্তী। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো কোনো স্থানে ‘ন’-এর পরিবর্তে ‘ধন’ ‘ফুল’ ‘রাঙা’ ‘সোনা’ বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়।” যেমন: ধনদা/ধনদি; সোনাদা/সোনাদি;  রাঙাদা/রাঙাদি; রাঙা ভাই/ রাঙা আপা।
পঞ্চম জাতক (ফুল, কনে):  পঞ্চম জাতক বা পঞ্চম জ্যেষ্ঠ সাধারণত ফুলদা/ফুলদিদি; ফুল ভাই/ ফুল আপা বাগ্‌ভঙ্গিতে সম্বোধিত হয়। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, ফুল অর্থ (বিশেষণে) ভাইবোনদের মধ্যে বয়ঃক্রম অনুসারে পঞ্চম স্থানীয়। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ঠাকুরমার ঝুলি গ্রন্থের কলাবতী রাজকন্যা গল্পে আছে, “এক যে রাজা। রাজার সাত রাণী। বড়রাণী, মেজরাণী, সেজরাণী, ন-রাণী, কনেরাণী, দুয়োরাণী আর ছোটরাণী।”  এই সূত্রে অনেকে পঞ্চম জনকে ডাকেন কনেদা/কনেদি; কনে ভাই/ কনে আপা।
আমি এক পরিবারে পঞ্চম ভাইকে পঁচাদা সম্বোধিত হতে শুনেছি।   পঁচা শব্দের সঙ্গে আবার পচা (নষ্ট বাসি) শব্দকে মিলিয়ে ফেলবেন না। অনেকে নষ্ট বাসি অর্থদ্যোতক পচা বানানেও চন্দ্রবিন্দু দিয়ে দেয়। পশ্চিমবঙ্গেও পঞ্চম জাতককে ডাকা হয় ফুলদা/ফুলদি।  অভিধানমতে, ফুল অর্থ (বিশেষণে) ভাইবোনদের মধ্যে বয়ঃক্রম অনুসারে পঞ্চম স্থানীয়।
ষষ্ঠ জাতক (দুয়ো): দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ঠাকুরমার ঝুলি গ্রন্থের কলাবতী রাজকন্যার গল্পে ষষ্ঠ রানিকে বলা হয়েছে দুয়োরানি। এর অনুসরণে অনেকে ষষ্ঠ জনকে ডাকেন দুয়ো-দা/দুয়ো-দি; দুয়ো ভাই/ দুয়ো আপা। আমার স্ত্রী তার ছয় নম্বর মামাকে ডাকে চিনিমামা। এরূপ  নানা পরিবারভিত্তিক সম্বোধনও দেখা যায়। 
সপ্তম জাতক:  সপ্তম জনকে ডাকা যায় সুয়োদা/সুয়োদি, সুয়ো ভাই সুয়ো আপা। সুয়ো শব্দ সাত থেকে আসেনি। অভিধানমতে, সংস্কৃত সুভগা থেকে আগত সুয়ো অর্থ সোহাগিনী, প্রিয়, আদরণীয়। পরপর ছয় জাতকের জন্মের পর সপ্তম জাতক এলে মনে করা হতো আর হবে না। তাই সে শেষ জাতক হিসেবে সুয়োরানির মতো সবার মুখে সুয়ো-দা/সুয়ো-দি কথায় সম্বোধিত হতো। অনেকে  ক্রমানুসারে সপ্তম জ্যেষ্ঠ জাতককে সপ্তদা/সপ্তদি শব্দে সম্বোধিত করে থাকেন।
অষ্টম  জাতক জন: অষ্টম জাতককে বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। কোথাও ডাকা হয় আটুদা/আটুদি। আবার কোথাও টাদা/টাদি; টুনুদা/টুনুদি। আটুই সম্বোধনেও সম্বোধিত হয়।
নবম জাতক: নবম জাতককে সাধারণত  নবদা/নবদি, নব দাদা/নব দিদি, নব ভাই/ নব আপা; নব বোন প্রভৃতি সম্বোধনে ডাকা হয়। সংস্কৃত নবতি থেকে উদ্ভূত খাঁটি বাংলা  নব অর্থ— নয়, নবম, ৯ সংখ্যা।  

দশম জাতক:  মনে করুন, আপনি কনিষ্ঠ জাতক। আপনার পরে আর কোনো জাতক নেই। সেক্ষেত্রের আপনার অব্যবহিত পূর্বের জাতক হবে ছোড়দা/ ছোড়দি; ছোটো ভাই/ ছোটো আপা; ছোটো দাদা/ ছোটো বোন; ছোড়দা/ছোড়পা। কনিষ্ঠ বা সর্বশেষ জাতক হিসেবে ছোটো জন ছোড়দা/

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

ছোড়দি; ছোটো ভাই/ ছোটো আপা; ছোটো দাদা/ ছোটো বোন; ছোড়দা/ছোড়পা প্রভৃতি নামে সম্বোধিত হয়। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, ছোড়দা ও ছোড়দি অর্থ— (বিশেষ্যে) যথাক্রমে দাদা ও দিদিদের মধ্যে যে কনিষ্ঠ।

আঞ্চলিকভাবে ভিন্ন নামেও ডাকতে দেখা যায়। বড়ো  জনকে  অনেক জায়গায়  বিশেষ করে মুসলিম পরিবারে ‘মিয়াঁভাই’ নামেও সম্বোধন করা হয়।  যশোর অঞ্চলে জাতকদের ক্রমানুসারে ডাকা হয় বড়ো, মেজো, সেজো, ন /নোয়া, গুরে, টুরে, ফুল, ছোটো ইত্যাদি।  মাগুরা  অঞ্চলে ক্রমটি হলো যথাক্রমে: বড়ো, মেজো, সেজো, নুয়া, তুয়া, ফুল ও  দুল ।একসময় সিলেটে বড়ো ভাইকে ঠাকুভাই এবং মেজো ভাইকে নিয়াভাই ডাকা হতো।ছোট জনকে ডাকা হতো কনা ভাই। [সূত্র: শুবাচ মন্তব্য]

যদি কারও সাত জনের চেয়ে বেশি ভাই বা বোন থাকে তাহলে তাদের কী কী নামে সম্বোধন করা হবে? সেক্ষেত্রে সব যে পরপর ভাই হবে কিংবা বোন হবে তা প্রায় অসম্ভব। মাঝখানে ভাই আসতে পারে আবার বোনও আসতে পারে। সুতরাং, জাতকগণ সাধারণত অষ্টক্রমের মধ্যে থেকে যায়। আর যদি নাই পড়ে তাহলে সম্বোধনের আগে সংশ্লিষ্ট জাতকের নামটি জুড়ে দিতে পারেন। যেমন: কারো পরপর পনেরতম ভাই/বোনটির নাম রূপা। তাকে ডাকা যায় রূপাদা/রূপাদি; রূপা ভাই/ রূপা আপা। এমন সম্বোধন যদি ভালো না লাগে তাহলে পারিবারিকভাবে পছন্দমতো একটি সম্বোধন বানিয়ে নিন। আমার স্ত্রীর চোদ্দ মামা। তাদের নানা নামে ডাকা হতো। যেমন:  বড়োমামা, মেজমামা, সেজমামা, ন-মামা, কনেমামা, চিনিমামা, মিষ্টিমামা, কালামামা, লালমামা, লেবুমামা- – – আর মনে নেই। একদম ছোটো জনকে ডাকে কনামামা। এখন বউ সিরিয়াল দেখায় ব্যস্ত। শেষ হলে জেনে নিয়ে জানাব।

ধরুন আপনার চোদ্দো ভাই বা চোদ্দো বোন। আপনি মধ্যম জাতক। আপনার বড়ো যত ভাই বা যত বোন, ঠিক তত জন ছোটো ভাই বা ছোটো বোন। সেক্ষেত্রে আপনি বড়ো সাত জনকে ওপরে বর্ণিত নিয়মে সম্বোধন করতে পারেন।  ছোটোদের জন্য  কোনো  নতুন সম্বোধনের প্রয়োজন নেই।  আপনি তাঁদের নাম ধরে ডাকতে পারেন।
error: Content is protected !!