ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞায় ক্রিয়াপদ, ক্রিয়াপদের শেষে ‘-বেন’: অনুরোধ আজ্ঞা আদেশ

এবি ছিদ্দিক

এই পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/ভবিষ্যৎ-অনুজ্ঞায়-ক্রিয়াপ/
 
মান্য রীতিতে কাউকে ভবিষ্যতে কোনো কাজ করতে আদেশ করবার ক্ষেত্রে যেমন ‘আসবেন’, ‘করবেন’, ‘দেবেন’ প্রভৃতি রূপ লিখতে ও বলতে হয়, তেমনই অনুরোধের ক্ষেত্রেও অবিকল ‘আসবেন’, ‘করবেন’, ‘দেবেন’ প্রভৃতি রূপ লিখতে ও বলতে হয়। অর্থাৎ, মান্য রীতিতে আসিয়েন, করিয়েন, দিয়েন প্রভৃতি রূপের প্রয়োগ অসংগত। কেন অসংগত, তা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। তাই, আলোচনার বাঁক সেদিকে নিয়ে না-গিয়ে বরং অন্য একটি বিষয় খোলসা করবার উদ্দেশ্য সামনে রেখে এই ছোটো লেখাটির পরবর্তী অংশ সম্পন্ন করা হয়েছে।
 
‘যদি আদেশ ও অনুরোধ— উভয় ক্ষেত্রেই একই রূপ ব্যবহার করা হয়, তাহলে লেখক বা বক্তা আদেশ দিচ্ছে, না কি অনুরোধ করছে, তা পাঠক কিংবা শ্রোতা কীভাবে বুঝবে?’— ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞায় উভয় ক্ষেত্রে একই রূপ ব্যবহৃত হওয়ায় এই প্রশ্নটি প্রায়ই আলোচনার বিষয়বস্তুতে চলে আসে, এবং এই নিবন্ধটিতে ভাষার এই দিকটি নিয়েই কিছু লিখবার চেষ্টা করা হয়েছে।
 
ভাষার এরূপ সীমাবদ্ধতা কেবল বাংলায় নয়, প্রতিটি ভাষাতেই কিছু-না-কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক ব্যবহৃত ভাষা ইংরেজিতে ‘do’, ‘open’ প্রভৃতি শব্দের অর্থ ‘করুন’ বা ‘কর’ কিংবা ‘করো’; ‘খুলুন’ বা ‘খোল’ কিংবা ‘খোলো’ প্রভৃতি হতে পারে। কোনো মুসলিম ব্যক্তি যখন অপর মুসলিমের কাছে ‘কেমন আছে’, তা জিজ্ঞেস করে, তখন অনেকে জবাবে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে থাকেন। ‘আলহামদুলিল্লাহ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্যে’। কিন্তু পারিপার্শ্বিক বিষয়াদি ও প্রয়োগক্ষেত্র অনুযায়ী শব্দটির অর্থ হয়ে যায় ‘ভালো আছি’। এরূপ অসংখ্য সীমাবদ্ধ বিষয় প্রতিটি ভাষাতেই বিরাজমান, যেসবের ব্যাখ্যা চিরায়ত ব্যাকরণের বিধিবিধানে পাওয়া যায় না।
 
এরূপ সীমাবদ্ধতা— যেগুলো চিরায়ত ব্যাকরণের নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না— সমাধানের লক্ষ্যেই ভাষাবিজ্ঞানে প্রয়োগার্থতত্ত্ব (pragmatics) নামক শাখার সৃষ্টি। এটি অনেকটা শব্দার্থতত্ত্বের (syntax) মতো। তবে, এটিতে শব্দের অর্থ কেবল বাক্যে প্রয়োগ অনুযায়ী নির্ণয় করা হয় না, করা হয় আনুষঙ্গিক বিষয়াদি ও প্রয়োগক্ষেত্র বিবেচনা করে। কেননা, বক্তা বা লেখক কোন ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তির সঙ্গে ভাব বিনিময় করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে শব্দের অর্থের আমূল পরিবর্তন ঘটতে পারে।
 
কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক: ধরুন, কেউ একজন সকাল দশটায় একটি কাজ শুরু করল। কাজটি শেষ করতে ওই ব্যক্তির দুই ঘণ্টা মতো লাগবে। এখন, ওই লোকটির কোনো এক সহকর্মী কাজ শেষ হতে কতক্ষণ লাগবে, তা জিজ্ঞেস করাতে ওই ব্যক্তি ‘আমার কাজ শেষ হতে হতে বারোটা বাজবে’ বলে উত্তর দিলেন। পরিস্থিতি বা প্রয়োগক্ষেত্র অনুযায়ী এখানে ‘বারোটা বাজবে’ পদবন্ধটি সময় নির্দেশ করছে। আবার, ভিন্ন একটি ক্ষেত্রে একই ব্যক্তিকে একই কাজ দেওয়া হলো। নতুন দৃশ্যে ওই ব্যক্তি খুবই মাথাব্যথায় ভুগছেন। তিনি বারবার নিজের কপালে হাত দিয়ে টিপে ব্যথা উপশমের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ওই সময় একই সহকর্মী পাশে এসে কাজ শেষ করতে কতক্ষণ লাগবে, তা জিজ্ঞেস করলে এবার ওই ব্যক্তি উত্তর দিলেন, “জানি না। তবে এটুকু জানি যে, কাজ শেষ হতে হতে আমার বারোটা বাজবে।” এই নতুন ক্ষেত্রটিতে ‘বারোটা বাজবে’ পদবন্ধটি দিয়ে আর সময় নির্দেশ করা হচ্ছে না। প্রয়োগক্ষেত্রের ভিন্নতার কারণে সময় নির্দেশক ‘বারোটা বাজবে’ পরিবর্তিত হয়ে ‘অনিষ্ট সাধিত হবে’ অর্থে বদলে গিয়েছে।
 
একইভাবে, ‘দেবেন’, ‘আসবেন’, ‘করবেন‘ প্রভৃতি শব্দ দিয়ে কখন অনুরোধ করা হয়, এবং কখন আদেশ করা হয়, তা ওই শব্দগুলো কোন পরিস্থিতে বা ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে। কর্তাবাবু যখন তাঁর কেরানিকে একটু সম্মান প্রদর্শন করে ‘খবরটি মাসুদকে জানিয়ে দেবেন’ বলেন, তখন ‘দেবেন’ হচ্ছে আদেশ। কিন্তু একই কথা যখন কেরানি, কর্তাবাবুকে বলেন, তখন ‘দেবেন’ হয়ে যায় অনুরোধ। শিক্ষক মশাই যখন তাঁর শিষ্যকে সম্মান দেখিয়ে ‘এই সমস্যাটি আমার জন্যে বাড়ি থেকে সমাধান করে আনবেন’ বলেন, তখন তা হয় শিক্ষার্থীর প্রতি আদেশ। কিন্তু শিক্ষার্থী যখন স্যারকে ‘স্যার, এই সমস্যাটি আমার জন্যে সমাধান করে আনবেন’ বলেন, তখন, তা হয়ে যায় অনুরোধ।
 
আর হ্যাঁ, অনুরোধের ক্ষেত্রে এরূপ বাক্যের ব্যবহারে অস্বস্তিবোধ অনুভূত হলে ব্যবহারের জন্যে ‘দয়া করে’, ‘অনুগ্রহপূর্বক’ প্রভৃতি শব্দ তো হাতের নাগালেই রয়েছে।
 
সূত্র: ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞায় ক্রিয়াপদের শেষে ‘-বেন’: অনুরোধ কিংবা আদেশ, এবি ছিদ্দিক, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)
 
error: Content is protected !!