ভাষাঘাতী অভিধান: আজিব: বাংলা একাডেমির কাণ্ড-কারখানা

ভাষাঘাতী অভিধান: আজিব: বাংলা একাডেমির কাণ্ড-কারখানা

Sudip Kumar Biswas

অনুগ্রহ করে ‘শুবাচ’র সকল সদস্য পড়বেন। কি বেহাল দশা বাংলা ভাষার তা বুঝতে পারবেন। লেখাটি বড়, তাই অধৈর্য হবেন না।
কিছুদিন পূর্বে আমি এই “শুদ্ধ বানান চর্চা” ফেসবুক গ্রুপ (শুবাচ)-তে প্রকাশিত ‘অথই’ বানানটির সঙ্গে আরোও কিছু প্রাসঙ্গিক কথাবলেছিলাম। কিন্তু আজ আমি ‘অথই’ থেকে শুরু করে ‘সৌহার্দ’ নিয়ে বলতে চাই। কারণ, প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত, আমার এই মাতৃভাষা দিনে-দিনে অথৈ সাগরে ভেসে যাক তা কিছুতেই হতে পারে না। ১৯৫২, ১৯৬১, ১৯৭২, ১৯৮৬ এবং ১৯৯১ সালে যে ভাষার জন্য প্রাণ আহূতি দিতে হয়েছে, সেই ভাষা আজ বিকৃত আর অপদস্থ হয়ে স্বৈরাচারী মানসিকতার আগ্রাসনে লুপ্ত হতে থাকুক তা অসম্ভব। এই প্রতিরোধ প্রতিকার শুধু আমার নয়, যাঁরা বাংলা ভাষাকে প্রাণ থেকে ভালোবাসেন, নিশ্চই তাঁদের প্রত্যেকেরই।
 
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে ভাষাকে রক্ষা ও তত্বাবধানের জন্য যদি কোন বৃহৎ সংগঠন বা সংস্থা থেকে থাকে তবে তা সকলেরই বিদিত “বাংলা একাডেমী”। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল এই যে, “বাংলা একাডেমী” থেকে প্রকাশিত “আধুনিক বাংলা অভিধান” নামক বাংলা ভাষা ও এর অস্তিত্বগ্রাসী এক সুবিশাল স্বৈরাচারী অগণতান্ত্রিক ভাষাবন্দী গ্রন্থ যা বাংলা ভাষার রাহু হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে। এর সবিস্তার প্রমাণ দিতে গেলে পৃষ্ঠা বেড়ে যাবে, তাই কেবল “শুবাচ”-এর প্রচারিত কিছু বানান নিয়ে কথা বলছি_
 
১. ২০০৮ এবং ২০১৪ সালে “বাংলা একাডেমী” থেকে প্রকাশিত “ব্যবহারিক বাংলা অভিধান”-এ পাশাপাশি ‘অথই’, ‘অথৈ’ বানান দুটি প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই দুটো বানাই শুদ্ধ। কিন্তু ২০১৮ সালে ওই “বাংলা একাডেমী” থেকে প্রকাশিত “আধুনিক বাংলা অভিধান”-এ মাত্র একটি শব্দই রাখা হয়েছে, যেটা হল স্বেচ্ছাচারী ‘অথই’। ৈ-কারে কেন এত ঘৃণা? একটি ৈ-কার বাদ দিয়ে বাংলা ভাষাকে ইংরেজির মত লেখার প্রয়াস চলছে কি?
২. ‘ঐকমত্য’, ‘ঐক্যমত্য’ শব্দ দুটি ২০০৮ এবং ২০১৪ সালে “বাংলা একাডেমী” থেকে প্রকাশিত “ব্যবহারিক বাংলা অভিধান”-এ পাশাপাশি রাখা হয়েছে। কারণ দুটোই ঠিক। অথচ “আধুনিক বাংলা অভিধান”-এ মাত্র একটাই ‘ঐকমত্য’।
 
৩. ২০০৮ এবং ২০১৪ সালে “বাংলা একাডেমী” থেকে প্রকাশিত “ব্যবহারিক বাংলা অভিধান”-এ শীর্ষশব্দ হিসেবে রাখা হয়েছে ‘কতো’ এবং বিকল্প শীর্ষশব্দ হিসেবে ‘কত’। যার অর্থ সংখ্যা বা মূল্য নির্ধারক হিসেবে। অথচ “আধুনিক বাংলা অভিধান”-এ মাত্র ‘কত’-কেই রাখা হয়েছে। তবে এই ‘কত’ বানানটি ‘কতো’ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও আরও একটি ‘কত’ শব্দ রয়েছে। যার উচ্চারণ ‘কত্’। এর অর্থ হলো ‘কলমের নিব’ সুতরাং ‘কতো’ বানানটি অপসারিত করে শব্দটির মধ্যে দূষণ আনিত হয়েছে।
 
৪. ‘কৈ’ শব্দটি ২০০৮ এবং ২০১৪ সালে “বাংলা একাডেমী” থেকে প্রকাশিত “ব্যবহারিক বাংলা অভিধান”-এ শুদ্ধ আকারেই আছে। অথচ “আধুনিক বাংলা অভিধান”-এ এই শব্দটিই নেই। ৈ-কারে কেন এই ক্ষিপ্ততা তাদের? ওখানে মাছের কথা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে ‘কই’ শব্দ? এ রূপটা কি ইংরেজি ভাবের নয়?
 
৫. ‘ঘুষ’ শব্দকে শীর্ষশব্দ এবং ‘ঘুস’ শব্দটিকে বিকল্প শীর্ষশব্দ হিসেবে ২০০৮ এবং ২০১৪ সালে “বাংলা একাডেমী” থেকে প্রকাশিত “ব্যবহারিক বাংলা অভিধান”-এ বর্ণনা করা হয়েছে। সংস্কৃত ‘ঘুষ’ থেকে হিন্দি ‘ঘুস’ হয়েছে। বাংলা ভাষায় এ দুটোর অর্থ একই (উৎকচ) এবং বানানও শুদ্ধ। কিন্তু “আধুনিক বাংলা অভিধান”-এ মাত্র ‘ঘুস’ শব্দটি উল্লিখিত।
 
৬. ‘তরি’ শীর্ষশব্দ এবং ‘তরী’ বিকল্প শীর্ষশব্দ হিসেবে রাখা হয়েছে ২০০৮ এবং ২০১৪ সালে “বাংলা একাডেমী” থেকে প্রকাশিত “ব্যবহারিক বাংলা অভিধান”-এ। যার অর্থ নৌকা। সংস্কৃত √তৃ ধাতুর সঙ্গে ‘ই’ এবং ‘ঈ’ প্রত্যয়যোগে বানান দুটো শুদ্ধ। অথচ “আধুনিক বাংলা অভিধান” ‘তরি’-কেই প্রাধন্য দিয়ে ‘তরী’-কে অশুদ্ধ বলে ঘোষণা দিয়েছে। যা নিছক মিথ্যাচার।
 
৭. ‘দেয়া’ শব্দের অর্থ ‘মেঘ’। আর ‘দেওয়া’ শব্দের অর্থ ‘প্রদান করা’। এবং ওই একই ‘দেয়া’ মানেও প্রদান করা। যা উল্লেখ করা হয়েছে ২০০৮ এবং ২০১৪ সালে “বাংলা একাডেমী” থেকে প্রকাশিত “ব্যবহারিক বাংলা অভিধান”-এ। আর কথাটি সত্যও বটে। কিন্তু “আধুনিক বাংলা অভিধান”-কে অনুসরণ করে “শুবাচ” কর্তৃপক্ষ ‘দেয়া’ বানানটিকে ভুল বলে প্রচার করছে। যা নিছক ভ্রান্তি বৈ আর কিছু নয়। এর জন্য দায় এটা নয়তো? ‘দেয়া’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত দেব>দেও>দেয়া এভাবে!
 
৮. ২০০৮ এবং ২০১৪ সালে “বাংলা একাডেমী” থেকে প্রকাশিত “ব্যবহারিক বাংলা অভিধান”-এ ‘পেতনি’ শব্দকে শীর্ষশব্দ এবং ‘পেত্নী’ শব্দকে বিকল্প শীর্ষ শব্দ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু “আধুনিক বাংলা অভিধান” কেবল ‘পেতনি’-কেই প্রকাশ করেছে। এখানে লক্ষণীয় হল ‘পেতনি’-এর উচ্চারণ ‘পে ত্ নি’। তবে এই ‘ত’ এর অন্তে সরাসরি হস্ ্-চিহ্ন নেই। সুতরাং যে কেউ শব্দটিকে ‘পেতোনী উচ্চারণ করতেই পারে। তবে যদি হস্ ্-এর ব্যবহার হয়েই থাকে উচ্চারণে তাহলে কোন্ অভিপ্রায়ে ‘পেত্নী’-কে বাদ দিয়ে ওই ‘পেতনি’-কে প্রাধান্য দেওয়া হল? যুক্ত বর্ণ বাদ দিয়ে কেবল বর্ণমালা দিয়ে ভাষাকে ইংরেজির মত করে সাজানোর কৌশল নয় তো?
 
৯. ২০০৮ এবং ২০১৪ সালে “বাংলা একাডেমী” থেকে প্রকাশিত “ব্যবহারিক বাংলা অভিধান”- ‘পাদ্রি’ বানানকে শীর্ষশব্দ, এবং ‘পাদরি’ ও ‘পাদ্রী’ কে বিকল্প শীর্ষশব্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। অথচ “আধুনিক বাংলা অভিধান”-এ কেবল ‘পাদরি’-কেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আর বাকি দুটোর কোন অস্ত্বিই নেই। প্রশ্ন হল ‘Padre’ শব্দটির Pad (পাদ্) পর্যন্ত বদ্ধাক্ষর এবং এর পরে যে r রয়েছে সেটা মুক্তাক্ষর। তবে কোন প্রকারে ওই ‘পাদ্’-এর পরে re (রি) যুক্তাক্ষর থেকে মুক্ত হল? এটা না হয় মেনে নিলাম যে, বিদেশী শব্দ জন্য সেখানে ি-কার দিয়ে লেখা হয়েছে। কিন্তু ‘পাদ্রি’-এর এই যুক্ত রূপ বাদ দেওয়া হয় কোন অভিপ্রায়ে? ইংরেজির শরীর গ্রহণ করতে চাইছে কি?
 
১০. ‘ফর্ম’-(Form), ‘ফর্সা’ শব্দের কপালেও একই দশা। “আধুনিক বাংলা অভিধান”-এ কেবল ‘ফরম’ এবং ‘ফরসা’ উল্লিখিত। যার বিকৃত উচ্চারণ অনায়াসে হয়তেই পারে ‘ফরোম’ এবং ‘ফরোসা’। আবার এক কালে র বাদ গিয়ে ফম্, ফসা আকারও নিবে না তাতে নিশ্চয়তা আছে কি? এটা মূল শব্দের ক্ষেত্রে বিপদজনক।
 
১১. ‘বইঠা’-কে প্রধান শীর্ষ শব্দ, এবং বিকল্প শীর্ষশব্দ হিসেবে ‘বৈঠা’, ‘বোঠে’-কে ‘২০০৮ এবং ২০১৪ সালে “বাংলা একাডেমী” থেকে প্রকাশিত “ব্যবহারিক বাংলা অভিধান”- রাখা হয়েছে। এবং এগুলো শুদ্ধও বটে। অথচ “আধুনিক বাংলা অভিধান”-এ শুধু ‘বইঠা’ ব্যতীত আর শব্দ সেখানে নেই। এটা একটা ধৃষ্টতা বৈ আর কী? শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত ‘বহিত্র’ থেকে।
 
১২. ‘বৌ’-কে কী করা হল? ধরে বেঁধে ‘বউ’ করা হয়েছে। কিন্তু এর সুফল কোথায়? আমি তো কেবল এই ‘বউ’ বানানের কুফল বৈ অন্য কিছু লক্ষ্য করছি না। কারণ, সময়ের প্রভাবে উচ্চারণে-উচ্চারণে ‘অলাবু’ পরিবর্তিত হয়ে এরূপ হল_ ‘অলাবু>লাবু>লাউ’। সুতরাং এই ‘বৌ’-কে কষ্ট দিয়ে ‘বউ’ করা হল আর এই ‘বউ’ যে এককালে এমন পরিবর্তন হয়ে (বউ>বু>ব) হয়ে যাবে না সেরূপ কোন দৃঢ়তা আছে?
 
১৩. ‘বিদায়ি’ শব্দের বাননটিকে যদি উচ্চারণ করতে হয় তবে এর উচ্চারণ আসে ‘বিদাই’-এর মত। কিন্তু এর উচ্চারণ দীর্ঘ-ঈ-ী-কারের মত। তথাপিও শব্দটিকে হ্রস্ব-ই দিয়ে লিখেছে ২০০৮ এবং ২০১৪ সালে “বাংলা একাডেমী” থেকে প্রকাশিত “ব্যবহারিক বাংলা অভিধান”-এ। তবে এই অভিধানদুটিতে ‘বিদায়ী’ বানানটিও রাখা হয়েছে। পরন্তু “আধুনিক বাংলা অভিধান’ কেবল ‘বিদায়ি’-কে শুদ্ধ বলছে। যা প্রকৃতপক্ষে অশুদ্ধ। বিদেশি প্রতিটি শব্দই কি ি-কার দিয়ে লিখতে হবে? যার উচ্চারণ দীর্ঘ সেটাকেও? যদি তা-ই হয় তবে বাংলা ভাষার নিজস্বতাকে ধ্বংস করা হবে।
 
১৪. ‘সৌহার্দ’ বানানটিকে শীর্ষশব্দ এবং ‘সৌহার্দ্য’ বানানটিকে বিকল্প শীর্ষশব্দ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ২০০৮ এবং ২০১৪ সালে “বাংলা একাডেমী” থেকে প্রকাশিত “ব্যবহারিক বাংলা অভিধান”-এ। এই দুটো বানানই শতভাগ শুদ্ধ। কারণ ‘সৌহার্দ’ শব্দের বানানটি সংস্কৃত [সুহৃদ্+অ (অন)] এবং ‘সৌহার্দ্য’ শব্দের বানানটি ঐ সংস্কৃত [সুহৃদ্+য (য্যঞ্)] প্রত্যয়যোগে গঠিত। সুতরাং দুটি বানানই শুদ্ধ। কিন্তু “আধুনিক বাংলা অভিধান”-এ মাত্র ‘সৌহার্দ’ শব্দটি উল্লিখিত। আর “শুবাচ” এই বানানটিকেই একমাত্র শুদ্ধ হিসেবে প্রচার করছে।
 
এইরূপভাবে বর্তমান “বাংলা একাডেমি” বাংলা ভাষার শব্দকে বিভিন্ন অহেতুক দিক থেকে বিভাজন করছে। ঐ ঔ বর্ণ দুটিকে যৌগিক স্বর হিসেবে দেখিয়ে এই বর্ণের যে কার চিহ্ন (ৈ ৌ) রয়েছে তা অনেক ক্ষেত্রেই পরিহার করেছে। হস্ ্-এর লোপ ঘটিয়ে, রেফ্-ফলার ব্যবহারও কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এর সুফল কোথায়? বাংলা ভাষাকে যে যুক্তাক্ষর থেকে মুক্ত করে ইংরেজির মত কেবল বর্ণমালা দ্বারাই লিপিবদ্ধ করার প্রচেষ্টা, তা বাংলা ভাষার জন্য এক হুমকি বৈ আর কিছু নয়। যুক্তব্যঞ্জন ভাষাকে বহু ক্ষেত্রে শ্রুতিমধুর করে। ঐ এবং ঔ ধ্বনির কার চিহ্ন ৈ, ৌ যে ধ্বনি ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে সেইরূপ ধ্বনি ব্যঞ্জনা ওই, ওউ, দ্বারা সৃষ্টি হয় না।
 
লক্ষণীয় যে, জার্মান এবং ফ্রান্স ভাষার বর্ণলিপিগুলো ইংরেজি বর্ণমালার মতই। উচ্চারণ পুরোটা ইংরেজির মত নয়। তবে ইংরেজির অনেকটা কাছাকাছি। অথচ তারা তো তাদের ভাষার শব্দকে এইরূপ কেটেকুটে ইংরেজিকরণ করছে না। যেমন: জার্মান শব্দ Herrn যার উচ্চারণ (হ্যার্ন্) এবং অর্থ ‘মহাশয়’। জার্মান Mann উচ্চারণ (মান্) অর্থ ‘স্বামী’। কিন্তু এরা তো এই Herrn শব্দের অতিরিক্ত একটি r এবং Mann এর অতিরিক্ত একটি n বর্জন করে ইংরেজি পর্যায়ে নিচ্ছে না!
 
ফ্রান্স শব্দ: Amour উচ্চারণ ‘আমুর’, অর্থ ‘ভালোবাসা’। Annuler উচ্চারণ ‘আনুলে’, অর্থ ‘বাতিল করা’। কিন্তু এরাও তো পারত ওই Amour-এর অনুচ্চারিত o বর্ণটি এবং Annuler-এর বাড়তি n এবং শেষের অনুচ্চারিত r টি বর্জন করতে! কিন্তু করে নি।
 
Laos লাওস ভাষাতে রয়েছে এই চারটি বর্ণ ຜ ຝ ພ ຟ. এগুলোর উচ্চারণ ইংরেজি F এবং বাংলা ফ-এর মত। কিন্তু পার্থক্য কেবল ধ্বনিটির উচ্চারণ স্তরে বা গতিতে। তবুও তো লাওস ভাষায় এর পরিবর্তনের কোন আবশ্যকতা তারা মনে করছে না। চাইনিজ, জাপানি, কোরিয়ান প্রভৃতি ভাষার মানুষ তো কম উন্নত নয়। তারাতো উন্নয়নের শীর্ষ পর্যায়ে। সর্বত্র তাদের মাতৃভাষার যথেষ্ট সমাদর রয়েছে।
 
এমনকি ইংরেজি শব্দ Future-এর উচ্চারণ ‘ফিউচার’, অর্থ ‘ভবিষ্যৎ’ এবং Laugh-এর উচ্চারণ ‘লাফ্’ বা ‘ল্যাফ্’, অর্থ হাসি। কিন্তু স্বয়ং ইংরেজপক্ষও তো এই Future-কে উচ্চারণ অনুসারে Fucar (ফিউচার) বা Fuchar (ফিউচার) লিখছেনা। অথবা Laugh-কে Lauf (লাফ্) বা Laf (লাফ্) কিংবা Layf (ল্যাফ্) লিখছে না।
 
কিন্তু ‘বাংলা একাডেমি’ কেন অহেতুক বাংলা ভাষাকে কেটে-ছেঁটে অন্যের পাখা লাগিয়ে ময়ূর করতে প্রচেষ্ট? বছরে-বছরে নতুন সংস্করণের কী আবশ্যকতা?
 
একজন বাংলার শিক্ষার্থী অনার্স শেষ করার পর যদি তার পঠিত বানান সকল অশুদ্ধ ভাবতে হয়, যদি এক জন শিক্ষক দুই বছর আগে যা জেনেছে দুই বছর পরই যদি শিক্ষার্থীকে তা শিখাতে গিয়ে ভুল হিসেবে নিজেকে প্রতিহত করতে হয় তবে শিক্ষার মান কী দাঁড়াল? কেউ হয়তো বলবে যে এটা তো ‘আধুনিকতা’। তবে তাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, নিজের অস্তিত্বকে ধ্বংস করে যা কিছু আধুনিকীকরণ করা হয় তা প্রকৃতপক্ষে আধুনিকীকরণ নয়, তা হল আত্মঘাত। নিজেকে স্থির রেখে অন্যকিছুকে নিজের মধ্যে লীন করতে পারলে তাতে নিজে সমৃদ্ধ হওয়া যায়, কিন্তু অন্যকিছুকে গ্রহণ করতে গিয়ে নিজেকে বদলালে নিজস্বতারই পরিসমাপ্তি ঘটে।
 
এই কিছুকাল আগে যখন ‘Home Quarantine’. এবং ‘Isolation’- এর মতো শব্দগুলো উচ্চারণ করতে অল্প-স্বল্প এমনকি উচ্চশিক্ষিতরাও হিমশিম হচ্ছিল এবং এর সঠিক অর্থ উদ্ধার করতে অপারগ হচ্ছিল, তখন কি উচিত ছিল না ‘বাংলা একাডেমি’ থেকে এর কোনো বাংলা প্রতিশব্দ সৃষ্টি করে জনমহলে প্রচার করা? যেমন Home Quarantine- নির্জন গৃহে থাকা, Isolation- ‘নির্জন বাস’ ইত্যাদি আরও ভালো বাংলা? কিন্তু এ নিয়ে উক্ত একাডেমিমহল কিছু ভেবেছে কি না সন্দেহ। যে সৃষ্টি করতে জানে না ধ্বংস করার অধিকার তার নেই। এরূপ সংকটে কিংবা দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে; পণ্যের প্যাকেটের গায়ে, রাজনীতিক কর্মকাণ্ডে, ব্যাবসা-বাণিজ্যে, বিভিন্ন বিজ্ঞাপণে সর্বপ্রথম বাংলা ভাষাকে প্রাধান্য দেওয়া এবং তার পরে প্রয়োজন অনুসারে অন্যন্য ভাষাকে সংযুক্ত করার তাগিদ বা প্রচেষ্টা বাংলা একাডেমির মধ্যে আছে কি? কিছুদিন পূর্বে একটি কোম্পানির বিস্কুটের প্যাকেটে দেখেছিলাম সেখানে কেবল ইংরেজি, আরবি এবং ফারসি ভাষার উল্লেখ। অথচ ওই বিস্কুট আদৌ কোনো বিদেশে রপ্তানি হয় না। কিন্তু সেখানে বাংলা ভাষা অনুপস্থিত।
 
আধুনিকীকরণ যদি করতে হয় তবে কিছু উচ্চারণ যেমন খেলা>খ্যালা, দেখা>দ্যাখা, মেলা>ম্যালা, ভেলা>ভ্যালা প্রভৃতিকে কেন প্রতিষ্ঠা করার নজর নেই? আন্তর্জাতিক বর্ণমালা হিসেবে তো ‘এ্যা’ রয়েছেই এবং আমাদের ভাষাতেও এই এ্যা-ধ্বনি উচ্চারিত হয়।
 
আবার দেখলাম “আধুনিক বাংলা অভিধান”-এ রেফ্ ফলাটিকে বর্ণের উপর থেকে আরও বাম দিকে সরিয়ে আনা হয়েছে। অথচ এই পাণ্ডিত্য কেবল বর্ণের সৌন্দর্যই নষ্ট করেনি, কিছু বিভ্রমও সৃষ্টি করেছে। যেমন: গ ণ থ ধ বর্ণের উপরে ব্যবহৃত রেফ্-ফলা ওই সকল মাত্রামুক্ত স্থান দখল করেছে এবং তা যেন আগের বর্ণের উপরে ব্যবহৃত বলে প্রতিভাত হচ্ছে। এছাড়া যে বানানে রেফ্-ফলার উপরে দীর্ঘ-ঈ-কার আছে সেটা অনুসন্ধান করতে যেন অণুবীক্ষণ প্রয়োজন। “আধুনিক বাংলা অভিধান”-এ বহু সংখ্যাক শব্দ প্রণেতার নাম নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। কী চাইছে “বংলা একাডেমি”? উদ্দ্যেশ্য কী?
 
এই সমস্ত অসামঞ্জস্য পরিবর্তন এনে বাংলা ভাষার কোনো সুফল হবে না। বরং আজ থেকে পঞ্চাশ, এক শত, দুই শত বছর পরে বাংলা ভাষার অস্তিত্ত্ব সমূলে বিনষ্ট হবে। ভাষা এমনিতেই প্রবহমান। অনুন্নত তথা উন্নয়নশীল দেশ হওয়ায় এখনো বাংলা ভাষায় বাণিজ্য বা জীবনযাত্রার প্রভাবে শত শত বেদেশি শব্দ প্রবেশ করছে। এর অন্যতম প্রধান একটি কারণ হলো বাংলা ভাষার প্রতি অবহেলা। টানা ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষায় কথা বলতে গিয়ে তার মধ্যে বাংলা শব্দ ব্যবহার করলে সকলেই এক যোগে হেসে উঠবে ‘ইংরেজি পারে না’ বলে। কিন্তু লজ্জা করা কি তখন উচিত নয়, যখন বাংলা কথার মধ্যে অকারণে ঘন ঘন ইংরেজি শব্দের যোগান দেওয়া হয়? তখন তো বলা উচিত, ‘ওরে কৃতঘ্ন, ওরে ভাষাঘাতী’।
 
তো “বাংলা একাডেমী” যে “আধুনিক বাংলা অভিধান” প্রণয়ন করেছে তা স্পষ্টভাবেই একটি স্বৈরাচারী গ্রন্থ। একটি বাণিজ্যিক বই মাত্র। ‘এক মাত্র উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা’ যেরূপ একটি প্রাণঘাতী ঘোষণা, সেরূপ এই “আধুনিক বাংলা অভিধান”-এ থাকা কেবল একক শব্দসমষ্টিও বাংলা ভাষার জন্য ঘাতক অস্ত্র। বিগত কবি-সাহিত্যিক-লেখকদের বানান যদি এইরূপে অশুদ্ধ ঘোষণা করা হয়, তবে এক কালে বাংলা ভাষার ইতিহাস-ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে যাবে। আর মনে রাখতে হবে, যে জাতির ভাষা ও ঐতিহ্য রক্ষিত হয় না, রক্ষা পায় না, সে জাতি দূর ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হবেই হবে। কারণ ভাষা হলো জাতির প্রাণ আর ঐতিহ্য হলো জাতির অস্তিত্ব। ভাষা-সংস্কৃতি তথা ঐতিহ্যকে রক্ষা করুন, জাতি হিসেবে টিকে থাকবেন, নইলে বিনাশ অনিবার্য।
 
 
 
এই পোস্টের লিংক:  https://draminbd.com/ভাষাঘাতী-অভিধান-আজিব-বাং/
 
error: Content is protected !!