ভ্যাকসিন (Vaccine), টিকা, প্রতিষেধক: সংজ্ঞার্থ: ভ্যাকসিন কী; ভ্যাকসিন হওয়ার শর্ত

ড. মোহাম্মদ আমীন

ভ্যাকসিন (Vaccine), টিকা, প্রতিষেধক: সংজ্ঞার্থ: ভ্যাকসিন কী; ভ্যাকসিন হওয়ার শর্ত, আবিষ্কারক,প্রতিরোধ ক্ষমতার বৈশিষ্ট্য, কার্যপ্রণালি, কীভাবে কাজ করে

টিকা বা প্রতিষেধক (Vaccine)

টিকা বা ভ্যাকসিন-এর সংজ্ঞার্থ: টিকা বা ভ্যাকসিন (vaccine) এমন একটি জৈব রাসায়নিক যৌগ, যা নির্ধারিত উপায়ে জীবদেহে প্রয়োগ করলে ওই জীবদেহের ভেতর ওই নির্দিষ্ট রোগের বা ওই নির্দিষ্ট রোগের জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বা অনাক্রম্যতা বা অ্যান্টিবডি সৃষ্টির স্বয়ংক্রিয় সক্ষমতা সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায়, ওই রোগের জীবাণু দেহে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে ভ্যাকসিনের মাধ্যমে গৃহীত যৌগ নবাগত জীবাণুকে অবাঞ্ছিত গণ্যে ধ্বংস করে জীবদেহকে ওই রোগ বা ওই রোগ জীবাণুর আক্রমণ হতে মুক্ত রাখে।  ভ্যাকসিন বা টিকা হতে হলে তার এমন বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে, যাতে গ্রহণকারী ওই রোগের জীবাণুর সংস্পর্শে এলেও ওই রোগে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা থাকবে না। 

টিকার উদাহরণ: পোলিও, বসন্ত, বিসিজি, প্লেগ, টাইফয়েড ওর‌্যাল, টিটেনাস, ডিপথেরিয়া, রেবিস, হেপাটাইটিস-বি, টাইফয়েড, কলেরা, পারটুসিস প্রভৃতি রোগের টিকা।

ভ্যাকসিন শব্দের উদ্ভব: ভ্যাকসিন এবং ভ্যাকসিনেশন শব্দ দুটি এসেছে ভারিওলে ভ্যাকসিনে শব্দ থেকে। টিকার সঙ্গে শব্দ দুটিকে যুক্ত করেছেন গুটিবসন্ত টিকার তথা বিশ্বে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পথিকৃৎ এডওয়ার্ড জেনার।  শব্দদ্বয়ের  দ্বারা তিনি গোরুর পক্সকে নির্দেশ করেছিলেন। গোরুতে সৃষ্টি পক্স রোগ থেকে তিনি গুটিবসন্তের টিকা আবিষ্কার করেন। ভ্যাকসিন নামটি সম্ভবত আবিষ্কারকের গোরুর প্রতি কৃতজ্ঞতার নিদর্শন বলা যায়।

টিকা বা ভ্যাকসিনের প্রস্তুত এবং ঔদ্দেশিক কার্য:  টিকা বা ভ্যাকসিন কোনো প্রাণীর দেহে রোগ সৃষ্টিকারী কোনো ভাইরাস (Virus), ব্যাক্টেরিয়া (Bacteria) বা নির্দিষ্ট প্রকৃতির বীজাণুর  জীবিত বা মৃতদেহ বা তার অংশবিশেষ হতে প্রস্তুত বিশেষ ওষুধ বা প্রতিষেধক যা ওই  প্রাণীর দেহে ওই  ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়া বা বীজাণুর বিরুদ্ধে এমন প্রতিরোধ, অনাক্রম্যতা বা অ্যান্টিবডি সৃষ্টি করে যাতে ওই রোগের জীবাণুর সংস্পর্শে গেলেও রোগ হতে মুক্ত থাকা যায়। যেমন: বসন্ত রোগের টিকা বসন্ত রোগের বিরুদ্ধে ওই রোগের টিকা গ্রহণকারীর প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করে। এ গুণ থাকলেই কেবল কোনো ওষুধ, ভ্যাকসিন হয়। 

টিকার শর্ত:  টিকা হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো—  যে রোগের টিকা গ্রহণ করা হলো শরীরে সে রোগের বা সে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর বিরুদ্ধে  প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অনাক্রম্যতা বা অ্যান্টিবডি প্রদান। ফলে ওই রোগের প্রতিরোধের জন্য কিংবা  ওই রোগের জীবাণুর আক্রমণ হতে বাঁচার জন্য ভ্যাকসিন গ্রহণকারীকে অন্য কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয় না। গৃহীত ভ্যাকসিন যৌগটি গ্রহণকারীর শরীরে নিজে নিজে ওই ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বা অ্যান্টিবডি সৃষ্টি করে। 

টিকার উপাদান:  সাধারণত কোনো রোগ সৃষ্টিকারী মৃতপ্রায় বা মৃত জীবাণু অথবা জীবিত জীবাণুর বিষ থেকে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু-সদৃশ এমন একটি উপাদান বা রাসায়নিক যৌগ তৈরি করা হয় যা দেহে রোগ সৃষ্টি করতে পারে না। বরং এটি অনুরূপ রোগের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে বহিরাগত হিসেবে শনাক্ত করে তার রোগ সৃষ্টিকারী ক্ষমতাকে ধ্বংস বা অকার্যকর করে দেয়।

প্রতিরোধ ক্ষমতার বৈশিষ্ট্য: কোনো রোগের টিকা কোনো জীবদেহে কেবল ওই নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা প্রদানকারী যৌগ সৃষ্টি করে। ফলে টিকা কেবল নির্দিষ্ট রোগের প্রতিষেধক সৃষ্টি করে।  এটি  ত্বকে সুঁই ফুটিয়ে বা অন্য উপায়ে যেমন খাবার ড্রপ প্রভৃতি উপায়ে প্রয়োগ করা যেতে পারে।

টিকা কীভাবে কাজ করে: টিকার মাধ্যমে নির্দিষ্ট রোগের প্রতিষেধক হিসেবে গৃহীত যৌগটি টিকা গ্রহণকারীর শরীর ওই রোগের কোনো জীবাণু প্রবেশ করলে  অবাঞ্ছিত বা ক্ষতিকর  বা অ্যান্টিজেন বা শত্রু  হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে আক্রমণ করে বসে। সত্যিকারের জীবাণু প্রবেশ করলে যেমন অ্যান্টিবডি তৈরি করে, টিকার ক্ষেত্রেও অনুরূভাবে অ্যান্টিবডি তৈরি করে এবং অবাঞ্ছিত জীবাণুকে কীভাবে ধ্বংস করতে হয় তাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠে।  ফলে ভবিষ্যতে যখন সত্যি সত্যি সংক্রমণ ঘটে তখন দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, প্রতিষেধক বা অ্যান্টিবডি তৈরি করে জীবানুগুলোকে ধ্বংস করে ফেলে। তাই টিকা গ্রহণকারী ব্যক্তি ওই রোগের জীবাণুর সংস্পর্শে এলেও ওই রোগে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা থাকে না বললেই চলে।

ভ্যাকসিন বা টিকার আবিষ্কার: ইংরেজ চিকিৎসক ও জীবাণু বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড জেনার (১৭ই মে, ১৭৪৯ – ২৬শে জানুয়ারি, ১৮২৩) টিকা বা ভ্যাকসিনের আবিষ্কারক। গুটিবসন্ত রোগের টিকা আবিষ্কারের মাধ্যমে তিনি বিশ্বে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পথিকৃৎ হওয়ার বিরল গৌরবের অধিকারী হন। তাঁর আবিষ্কৃত গুটিবসন্ত রোগের ভ্যাকসিন পৃথিবীর প্রথম ভ্যাকসিন।  ১৮২১ খ্রিষ্টাব্দে জেনার, রাজা চতুর্থ জর্জ-এর প্রধান চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ পান। একই সঙ্গে  বার্কল-এর মেয়র  এবং ‘জাস্টিস অব দি পিস’ পদেও বারিত হন।জেনারকে রোগ-প্রতিরোধ বিদ্যার অন্যতম জনক বলা হয়। পৃথিবীতে যেসব লোক  অনেক লোকের প্রাণ রক্ষার বিরল কৃতিত্বের অধিকারী তন্মধ্যে প্রথম স্থানে আছেন এডওয়ার্ড জেনার।  তার আবিষ্কার পৃথিবীতে এককভাবে সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রাণ রক্ষা করার কৃতিত্বের অধিকারী।  রয়েল সোসাইটির সদস্য হিসেবে, জীবশাস্ত্রে তিনিই প্রথম কোকিল পাখির ব্রুড পরজীবীতা বিশ্লেষণ করেন। ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে বিবিসির জরিপে  জেনার ১০০ গ্রেট ব্রিটন্স এর তালিকায় স্থান পান। 

আবিষ্কার বৃত্তান্ত:  ১৭৯৬ খ্রিষ্টাব্দের কথা।  তখন গুটিবসন্ত রোগের প্রকোপ ভয়াবহ। এ সময় যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যার ১০% গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছিল। শহরে এ মৃত্যুর হার ছিল প্রায় ২০ শতাংশ। এডওয়ার্ড জেনার দেখলেন,  গোয়ালিনি এবং গোয়ালারা  গুটিবসন্তের (small pox) মড়ককালে ওই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে না। তিনি এর কারণ নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। অতঃপর দেখলেন,  যেসব গোয়ালা-গোয়ালিনি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন না তাদের রক্ত গোরুর বসন্তে সংক্রমিত। তিনি এবার প্রতিরোধক পেয়ে গেলেন।  জেনার বসন্ত রোগের জীবাণু থেকে আবিষ্কার করলেন বসন্তের প্রতিষেধক তথা ভ্যাকসিন বা টিকা। 

প্রথম ভ্যাকসিন প্রয়োগ: আবিষ্কৃত এ টিকা (inoculation) জেমস ফিলিপ নামের ৮ বছরের একটি সুস্থ বালকের শরীরে প্রয়োগ করা হয়।  একটু মৃদু বসন্ত উপসর্গের পর সে আবার সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে এবং সে গুটি বসন্তের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ টিকা হচ্ছে এমন একটি প্রতিষেধক ওষুধ যা গ্রহণ করলে ওই রোগের বিরুদ্ধে শরীরে এমন প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মায়, যা ওই রোগের জীবাণুর সঙ্গে বসবাস কলেও ওই রোগ হওয়ার আশঙ্কা সাধারণত থাকে না। এটিই হচ্ছে সাধারণ ওষুধের চেয়ে ভ্যাকসিনের তফাত।

এই পোস্টের লিংক

https://draminbd.com/ভ্যাকসিন-vaccine-টিকা-প্রতিষেধ/

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
error: Content is protected !!