মজার কটি বাগ্‌ধারা: বুৎপত্তি উৎস এবং ইতিহাস

কমলেশ মিস্ত্রি

গ্যাঁড়াকল

গ্যাঁড়া শব্দটি এসেছে সংস্কৃত গণ্ডক (গন্ডার) থেকে। গণ্ডক > গংডঅ> গঁড়া > গেঁড়া বা গ্যাঁড়া। গ্যাঁড়া শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায় বাইশ কবির মনসা-মঙ্গল বা বাইশায়। গ্যাঁড়াকল নিশ্চয়ই গন্ডার ধরার কল বা ফাঁদ। এই কল বা ফাঁদে পড়লে গন্ডার বের হতে পারত না। সেখান থেকেই ফাঁদ বা বিপদ অর্থে গ্যাঁড়াকল শব্দের ব্যবহার হয়ে আসছে। ভালোই গ্যাঁড়াকলে (বিপদে/ঝামেলায়)পড়া গেল দেখছি।

আচাভুয়ার বোম্বাচাক – সম্ভব নয় এমন কিছু; অসম্ভব ব্যাপার। (তার মতো ভীত লোক লোক দাঁড়িয়ে থেকে প্রতিবাদ করল? এ তো আচাভুয়ার বোম্বাচাক)। অত্যুদ্ভুত (সংস্কৃত) > অচ্চব্‌ভুদ > অচ্চব্‌ভুয়া > আচাভুয়া (বাংলা)। আচাভুয়া অর্থ আশ্চর্যজনক; অদ্ভুত ; অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন।

“ওঝা ধন্বন্তরি বেটা বড়ো আচাভুয়া।
হুঙ্কারে জীয়াইল বেটা যত কাটা গুয়া।”
– মনসামঙ্গল, বিজয়গুপ্ত।

“দুগ্ধ খাইবারে চাহে কান্দে ওয়া ওয়া।
তা দেখিয়া রাজকৈন্যা হইল আচাভুয়া।”
– গোরক্ষবিজয়, শেখ ফয়জুল্লাহ।

বোম্বাচাক

বোম্বাচাক শব্দ বিশ্লেষণ করলে দুটো শব্দ পাওয়া যায় – বোম্বা ও চাক। পর্তুগিজ বোম্বা (Bomba) একধরনের ড্রাম বা ঢাকের মতো বাদ্যযন্ত্র। আবার, এই বোম্বা বাজিয়ে যে গান গাওয়া হয় তার নামও বোম্বা। বোম্বা> বোম (বাংলায়)। বোম্বাচাক এক ধরনের গান যা বোম্বা বাজিয়ে পশ্চিমবঙ্গের কোনো কোনো জায়গায় বারোয়ারি (প্রথম দিকে বারো জন উদ্যোক্তার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হতো) পূজায় গাওয়া হতো। বোম্বাচাক শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায় হুতোম প্যাচার নকশায়। আচাভুয়ার বোম্বাচাক বলতে এখন অসম্ভব ব্যাপার বোঝায়।

তোলোহাঁড়ি

১। তোলে হাঁড়ি নয়, শব্দটা হবে তোলোহাঁড়ি।

তোলোহাঁড়ি – (আলংকারিক অর্থ) কালো ও গম্ভীর (তোলোহাঁড়ির মতো কালো ও গম্ভীর মুখ)।

তোলো – (পর্তুগিজ) পানি রাখার মাটির একধরনের বড়ো কালো পাত্র।

তোলোহাঁড়ি – পানি রাখার মাটির একধরনের বড়ো কালো হাঁড়ি।

খেলায় গো-হারা হেরে মুখ একেবারে তোলোহাঁড়ি করে রেখেছ দেখছি।

২। আউলিয়া চাঁদ: আউল চাঁদ, আউলা চাঁদ – যে অল্পেই আকুল হয়; এই হাসে এই কাঁদে এমন লোক; পাগল। আউল (আরবি) – পাগল; খ্যাপাটে ; ভবঘুরে; দরবেশ। আর ছেলে পেলে না! এমন আউলিয়া চাঁদ পছন্দ করেছ। একে নিয়ে সংসার করবে কীভাবে?

৩। শুভংকরের ফাঁকি – ধোঁকা দেওয়ার উপায়। শুভংকর দাস – মূল নাম ভৃগুরাম দাস। পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলায় জন্ম। দৈনন্দিন হিসাব-নিকাশের কাজ খুব সহজ নিয়মে বের করে বিখ্যাত হন। কবিতার ছন্দে রচিত তাঁর অঙ্ক কষার নিয়ম “শুভংকরী আর্যা”। কেউ হিসাবে গরমিল করে হিসাব মিলেয়ে দিলে বা কাজে বড়ো ধরনের ফাঁকি দিলে ‘শুভংকরের ফাঁকি’ বাগধারার ব্যবহার করা হয়। অফিসের আসবাবপত্র কেনায় বড়ো ধরনের শুভংকরের ফাঁকি পাওয়া গেছে। খরচ হতে পারে বড়োজোর দশ হাজার টাকা, হিসাব দেওয়া হয়েছে এক লাখ টাকার।

৪। সপ্তমে চড়া – (আলংকারিক অর্থ) ক্রোধে অত্যুচ্চ স্বর করা; প্রচণ্ড উত্তেজনা, রাগে গলা চড়িয়ে চিৎকার করা।

সপ্তম – সংগীতের স্বরগ্রামের সর্বোচ্চ সুর ‘নি’ (সা রে গা মা পা ধা নি)।সপ্তমে চড়া ( মূল অর্থ / বাচ্যার্থ) স্বরগ্রামের সপ্তম সুরে ওঠা। তাই, কেউ উচ্চৈঃস্বরে কথা বললে বা চিৎকার করলে এ বাগধারার ব্যবহার করা হয়। আস্তে কথা বলতে পারো না? সব সময় গলা সপ্তমে চড়িয়ে কথা বলো কেনো?

৫। বক দেখানো (কথ্য ভাষায়) – বকের মুখ ও গলার মতো হাত বাঁকিয়ে অন্যকে অশোভনভাবে বিদ্রুপ করা। ছেলেটা একেবারে উচ্ছন্নে গেছে। কেউ কিছু বললেই তাকে বক দেখায়।

৬। খড় দজ্জাল নয়, খর দজ্জাল হবে। খর – ( উচ্চারণ – খর্) প্রচণ্ড ; কঠোর। দজ্জাল (আরবি) – অত্যাচারী ব্যক্তি। খর দজ্জাল – প্রচণ্ড অত্যাচারী। আর বলিস না। শ্বশুর যেমন তেমন শাশুড়ি তো একেবারে খর দজ্জাল।

৭। কেবলা হাকিম/ ক্যাবলা হাকিম – অনভিজ্ঞ ও বোকা লোক (মূল অর্থ অনভিজ্ঞ বিচারক)। কেবলা (আরবি) – স্থূলবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি; বোকা লোক। হাকিম (আরবি) – বিচারক। তার কথা আর কী বোলব। কেবল হাকিমের মতো দাঁড়িয়ে থেকে সব অনাচার দেখল। কিছুই বলতে পারল না। নিরেট মূর্খ বা বোকা লোক অর্থে কেবলা হাকিম বাগধারার পাশাপাশি ক্যাবলারাম, ক্যাবলাকান্ত, হাঁদারাম, ভ্যাবা গঙ্গারাম ও হাঁদা গঙ্গারাম ব্যবহার করা যায়।

৮। ফেকলু পার্টি – (কথ্য ভাষায়) আজেবাজে লোক; কদরহীন লোক। ফক্কিকা (সংস্কৃত)/ ফাংকি (হিন্দি)/ ফাক (আরবি) > ফাঁকিবাজ > ফেকলু (কথ্য বাংলা) – ফাঁকিবাজ। সারাদিন ফেকলু পার্টির সাথে ঘুরে বুদ্ধি-সুদ্ধি তো সব জলাঞ্জলি দিয়েছ। কারো কথার আর তোয়াজ করো না।

৯। নিরানব্বইয়ের ধাক্কা – সঞ্চয়ের প্রবৃত্তি; টাকা জমানোর প্রবৃত্তি। “নিরানর্ব্বুইএর ধাক্কা – সঞ্চিতার্থের শততম মুদ্রা পূর্ন করার নিমিত্ত প্রাণপণ চেষ্টা; একবার টাকা জমিলে, জমাইবার ঝোঁক।” – বঙ্গীয় শব্দকোষ, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। “ধনীর চিন্তা ধন ধন নিরানর্ব্বুইএর ধাক্কা।” – দাশরথি রায়ের পাঁচালী। “সঞ্চয় নিতান্ত অধিক হইয়া উঠিতে থাকিলে বাছাই করা দুঃসাধ্য হয়। তাহা ছাড়া সঞ্চয়ের নেশা বড়ো দুর্জয় নেশা। একবার যদি হাতে কিছু জমিয়া যায় তবে জমাইবার ঝোঁক আর সামলানো যায় না। আমাদের দেশে ইহাকেই বলে নিরেনব্বুইয়ের ধাক্কা। য়ুরোপ বড়োলোক জমাইতে আরম্ভ করিয়া এই নিরেনব্বুইয়ের আবর্তের মধ্যে পড়িয়া গেছে।” – চারিত্রপূজা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাক্যে প্রয়োগ – এমনই তার নিরানব্বইয়ের ধাক্কা যে সে একটা টাকা খরচ করতে চায় না।

১২। ছাঁদনাতলা – বিয়ের জন্য রচিত মণ্ডপ: ছাঁদ> ছাঁদন> ছাঁদনা। এখানে ছাঁদ অর্থ রচনা করা (নির্মাণ করা); গাঁথা ( মালা গাঁথা)। তলা অর্থ স্থান (ঝরনাতলা); পাদদেশ (গাছতলা)। ছাঁদনাতলা – (বিশেষ করে) বিয়ের জন্য রচিত তলা বা স্থান বা মণ্ডপ। বয়েস তো কম হলো না এবার ছাঁদনাতলায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নাও।

টা ও টি

 ছেলেটা, ছেলেটি, লোকটা, লোকটি, বাঘটা, বাঘটি, গানটা, গানটি, নদীটা, নদীটি – চলিত ভাষায় প্রমিতরূপ হিসাবে পদাশ্রিত নির্দেশক ‘টি’ ও ‘টা’ দুটোই ব্যাকরণসিদ্ধ।

“কখন ‘টা’ হবে, আর কখনই-বা ‘টি’ হবে, তা নির্ভর করে বক্তার মনোভাব ও যে-শব্দটির সঙ্গে প্রত্যয়টি লাগানো হচ্ছে তার উপর। “সম্মান, আদর, স্নেহ প্রভৃতি ভাব প্রকাশে ‘টি’-র ব্যবহার বেশি। নতুন অধ্যাপকটি ভালো পড়ান। বরটা দেখতে বেশ খারাপ। ছেলেটি বেশ। ছেলেটা চোর।” – সংসদ ব্যাকরণ অভিধান, অশোক মুখোপাধ্যায়।

নির্দিষ্টতা বা সুনির্দিষ্টতা বোঝাতে ‘টি’ হবে, না ‘টা’ হবে? নির্দিষ্টতা বা সুনির্দিষ্টতা বোঝাতে সংখ্যাবাচক শব্দ ও নির্দেশক সর্বনামের পরে ‘টি’ ও ‘টা’ দুটোর যে-কোনোটাই যুক্ত করা যেতে পারে। যেমন- বিশটি বছর তোমার সঙ্গে দেখা নেই। তোমার কাছে পঞ্চাশটা টাকা হবে? এটি দেখতে বেশ সুন্দর। ওটা আমার পছন্দ না। কোনটি সঠিক আপনিই বলুন? এটা ঠিক আছে।

“অধিকং ন দোষায়”
-ছেলেটা যা হয়েছে না! একটা কথাও শোনে না। হবে না! বাপটা যেমন ছেলে তো তেমনই হবে।

কিন্তু, বাবুটা বেশ সুন্দর, তাই না?

বাংলা ভাষার উদ্ভব

“বাঙ্গালা ভাষাটা প্রাকৃতের রূপভেদ। কিন্ত টোলের পণ্ডিতেরা এই ভাষায় অপর্যাপ্ত সংস্কৃত শব্দ আনয়ন করিয়া ইহার শ্রী বদলাইয়া দিয়াছেন; এইজন্য কাহারও কাহারও মনে হইতে পারে, বাঙ্গালা ভাষা সংস্কৃত হইতে উদ্ভূত হইয়াছে… গীতিকাগুলো পাঠ করিলে সে ভুল ঘুচিয়া যাইবে। খাঁটি বাঙ্গালা যে প্রাকৃতের কত নিকট ও সংস্কৃত হইতে কত দূরবর্ত্তী তাহা স্পষ্টভাবে হৃদয়াঙ্গম হইবে। এই সকল গাথায় ‘হস্তী’ শব্দ ‘আত্তি’, ‘বর্ষা’ শব্দ ‘বস্যা’, ‘শ্রাবণ’ শব্দ ‘শাওন’, ‘মিষ্টি’ শব্দ ‘মিডা’ প্রভৃতি প্রাকৃত ভাবেই সর্ব্বদা ব্যবহৃত হইয়াছে। এখনও এই ভাষায় চাষারা পাঁড়াগায়ে কথা কহিয়া থাকে। পণ্ডিত মহাশয়ের টোলে ঘুরিয়া আমাদের মাথা ঘোলাইয়া গিয়াছে; আমারা অভিধানের সাহায্যে প্রাকৃতশব্দ সংশোধনপূর্ব্বক সেই সংশোধিত ভাষাটাকেই বাঙ্গালা ভাষা বলিয়া পরিচয় দিতেছি।” – দীনেশচন্দ্র সেন।

All Link

error: Content is protected !!