মন বনাম হৃদয়; হৃদয় বনাম হৃদয়

ড. মোহাম্মদ আমীন

মন ও মণ

মন: অভিধানে মন শব্দের দুটি ভিন্ন ভুক্তি রয়েছ। প্রথমত: সংস্কৃত মনস থেকে উদ্ভূত মন অর্থ— (বিশেষে) যে বৃত্তির সাহায্যে মানুষ বা অন্যান্য প্রাণী তার চারপাশের জগৎ ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অবহিত হয় এবং কোনো বিষয় চিন্তা বা কোনো বিষয় অনুভব করতে পারে। চিত্ত,
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
হৃদয়, অন্তঃকরণ, অন্তরিন্দ্রিয়। স্মরণ (মনে পড়া)। বোধ, ধারণা ( মনে তারে যেন চিনি আমি চিনি)। ইচ্ছা, প্রবৃত্তি (মন চায় ঘুরে আসি)। নিষ্ঠা (মন দিয়ে কাজ করা। মনোযোগ (লেখাপড়ায় মনোনিবেশ। পছন্দ (মনের মতো বই)।
দ্বিতীয় ভুক্তিমতে, বাক্যে বিশেষ্যে হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা মন অর্থ— ওজনের অধুনালুপ্ত এককবিশেষ, চল্লিশ সের (আনুমানিক ৩৭.৩২৪ কিলোগ্রাম)।
 
 
মণ: মণ বানানের কোনো শব্দ — বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে নেই। আগে মণ দিয়ে যে কাজ চালানো হতো, এখন সে কাজ মন দিয়ে চলে।লম্বা পায়ের মণ এখন হারিয়ে গেছে।
 
 
হৃদয়: সংস্কৃত (√হৃ+অয়) অর্থ (বিশেষ্যে)—  অন্তঃকরণ। বক্ষ, বুক। বুকের ভেতরের অংশ, হৃদপিণ্ড। তোমায় হৃদমাজারে রাখব ছেড়ে দেব না। তোমায় মনের ভেতর রাখব ছেড়ে দেব না। এখানে হৃদয় আর মন একই জিনিস। তার হৃদপিণ্ডে, বুকে ব্যথা করছে। ডাক্তার বলল অস্ত্রোপচার করতে হবে। এখানে হৃদয় অর্থের বদলে মন ব্যবহার করা যাবে না।
 
 
হৃদয় ও মন
 
একটি শব্দ আরেকটি শব্দের কিছুটা সমার্থক হতে পারে, তবে পুরো সমার্থক হতে পারে না। এই সমার্থকতা নির্ভর করে প্রয়োগের ওপর। দুটি ভিন্ন মানুষের মধ্যে অনেক মিল থাকতে পারে, কিন্তু তারা অভিন্ন হতে পারে না। শব্দের ক্ষেত্রেও অনুরূপ। একাধিক বানানের শব্দের অর্থে যতই মিল থাকুক, তা কখনো সম্পূর্ণ সমার্থক হতে পারে না।
 
হৃদয় ও মনের সমার্থকতকার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেশি সত্য। অন্তঃকরণ অর্থ বিবেচনায় মন ও হৃদয় দুটো সমার্থক। তবে অন্য অর্থ বিষয়ে দুটোর ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। হৃদয়কে হৃদপিণ্ড, বক্ষ, বুক, বুকের ভেতরের অংশ বিবেচনা করা হলে এটি মনের মতো চিত্ত, স্মরণ, বোধ, ধারণা, ইচ্ছা, প্রবৃত্তি, নিষ্ঠা প্রভৃতি অর্থ নিতে  পারে না। এসব লালিত হয় মস্তিষ্কে। বুক বা হৃদপিণ্ড কেবল মস্তিস্কের তাড়নায় সাড়া দিয়ে থাকে। হৃদয় তখন একটি প্রত্যঙ্গ। এটি স্পর্শ করা যায়। দেখা যায়। কিন্তু মন অদৃশ্য। এটি কেবল ধারণা বিষয়। হৃদয় বা হৃদপিণ্ডে রোগ হলে হৃদচিকিৎসকের কাছে যেতে হয়। কিন্তু মনে রোগ হলে যেতে হয় মনোচিকিৎসক বা মনোবিজ্ঞানীর কাছে বা পাগলা গারদে। 
 

সিলেবল (Syllable) ও অক্ষর

সংস্কৃত বা বাংলা কোনো ভাষায় syllable এর কোন প্রতিশব্দ নেই। অক্ষর সংস্কৃত শব্দ। তবে বাংলায় শব্দটি কখনো বর্ণ (letter) আবার কখনো সিলেবল (syllable) অর্থে ব্যবহৃত হয়। সংস্কৃতে অক্ষর হলো বর্ণ।
সংস্কৃতে অক্ষর শব্দের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে: অক্ষরং বর্ণনির্মাণং বর্ণমপ্যক্ষরং বিদুঃ –বাচস্পত্য অভিধান। অর্থাৎ, অক্ষর কথার একটি অর্থ বর্ণনির্মাণ এবং অন্য একটি অর্থ বর্ণ।
সানুস্বারশ্চ দীর্ঘশ্চ বিসর্গী চ গুরুর্ভবেৎ।
– ছন্দোমঞ্জরী-তে বলা হয়েছে: সংযোগপূর্বশ্চ তথা পাদান্তগোপি বা।। – ছন্দোমঞ্জরী। অর্থ: অনুস্বার ও বিসর্গযুক্ত, দীর্ঘস্বরান্ত ও যুক্তবর্ণ গুরু বলে গণ্য হয় বিকল্পে পাদান্ত বর্ণ গুরু হয়।
 
শ্রুতবোধ গ্রন্থে আছে:
সংযুক্তাং দীর্ঘং সানুস্বারং বিসর্গসংমিশ্রম।
বিজ্ঞেয়মক্ষরং গুরু পাদান্তস্থং বিকল্পেন্।।
 
অর্থাৎ যুক্তাক্ষর, দীর্ঘস্বর, অনুস্বার ও বিসর্গযুক্ত অক্ষর গুরু হবে, বিকল্পে পাদান্তস্থিত অক্ষর গুরু হয়। ছন্দোমঞ্জরী গ্রন্থে বর্ণ এবং শ্রুতবোধ গ্রন্থে অক্ষর শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং, সংজ্ঞার্থ থেকে অনুধাবন করা যায় যে, বর্ণ আর অক্ষর সমার্থক।
letter ও syllable দুটি পৃথক বিষয়। দুটি পৃথক বিষয়ের জন্য একটি পরিভাষা ব্যবহার করা হলে অর্থ বিভ্রাট হতে পারে।
সিলেবল এর উপযুক্ত পরিভাষা নেই বলে কোনো কোনো অভিধানে এর প্রতিশব্দ লিখেছে অক্ষর। অমূল্যধন মুখোপাধ্যায়, তাঁর ’বাংলা ছন্দের মূলসূত্র’ বইতে syllable অর্থ লিখেছেন: অক্ষর। অন্যদিকে, syllable বোঝাতে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ‘শব্দপাঁপড়ি’, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ‘মাত্রা’ এবং প্রবোধচন্দ্র সেন ‘দল’ শব্দ ব্যবহার করেন।
 
 
 
লিংক: https://draminbd.com/মন-বনাম-হৃদয়-হৃদয়-বনাম-হৃদ/
 
ড. মোহাম্মদ আমীন; কোথায় কী লিখবেন বাংলা বানান: প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
error: Content is protected !!