মহাপণ্ডিত আল বিরুনির কথা

ড. মোহাম্মদ আমীন

মধ্যযুগের আরবীয় শিক্ষাবিদ, গবেষক, গণিতজ্ঞ, জ্যোতিঃপদার্থবিদ, রসায়নবিদ, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানী, ভূগোলবিদ, ইতিহাসবেত্তা, পঞ্জিকাবিদ, দার্শনিক, চিকিৎসাবিজ্ঞানী এবং বহু ভাষাবিদ পণ্ডিত হিসেবে বিশ্বখ্যাত আল বিরুনি ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে ৪ঠা সেপ্টেম্বর (মতান্তরে ৩রা সেপ্টেম্বর), বৃহস্পতিবার ইরানের খাওয়ারিজম শহরের উপকণ্ঠে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্ণ নাম “আবু রায়হান মোহাম্মদ ইবনে আহমদ আল বিরুনি”। তবে তিনি আবু রায়হান আল বিরুনি বা আবু রায়হান মোহাম্মদ ইবনে আহমদ আল বিরুনি নামেও পরিচিত। তিনি রুশীয় তুর্কিস্তানের রাজধানী খাওয়ারিজিমের নিকটবর্তী খিওয়ায় বসবাস করতেন। শহরের বাইরে বসবাস করতেন বলে সাধারণ্যে তিনি আল-বেরুনি নামে পরিচিত ছিলেন।  স্বাধীন চিন্তা, মুক্তবুদ্ধি, সাহসিকতা, নির্ভীক সমালোচনা ও বিজ্ঞানভিত্তিক মতামত প্রদানের জন্য যুগশ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত আল-বেরুনিকে বহুবার  রাজরোষাণলে পড়তে হয়েছে। জেল খাটতে হয়েছে।  তিনিই সর্বপ্রথম  ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। অধ্যাপক মাপার মতে, “আল-বেরুনি শুধু মুসলিম বিশ্বেরই নন, বরং  সমগ্র বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীদের একজন ছিলেন।”

তাঁর বাল্যকাল অতিবাহিত আল-ইরাক বংশীয় রাজপতি আবু মনসুর বিন আলী বিন ইরকের তত্ত্ববধানে। তিনি সুদীর্ঘ ২২ বছর রাজকীয় অনুগ্রহে কাটিয়েছেন। তাই শাসকদের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ্য কৃতজ্ঞতাবোধ। কিন্তু শাসকবর্গ থেকে স্বাধীন মতামতের জন্য বহু যাতনা সহ্য করতে হয়েছে। ২২ বছর ছিলেন রাজার অনুগ্রহে। কিন্তু তার অনুগ্রহ বেশিদিন কপালে জোটেনি। তার লালন-পালনকারী সেই রাজার রাজ্যে আক্রমণ করেন সুলতান মাহমুদ। দখল করে নেন সেই রাজ্য। আপনভূমির এমন পরাজয় মেনে না নিতে পেরে রাজ্য থেকে বের হয়ে দু’চোখ যেদিকে যায় সেদিকে চলে যান আল বিরুনি। একসময় আল বিরুনিকে সুলতান মাহমুদ তার দরবারে আসন গ্রহণ করতে বলেন।

আল বিরুনির মাতৃভাষা ছিল খাওয়ারিজিম আঞ্চলিক ইরানি ভাষা। কিন্তু তিনি তার রচনাবলি আরবিতে লিখে গেছেন। তিনি আরবিতে কিছু কবিতাও রচনা করেন।  শেষের দিকে কিছু গ্রন্থ ফারসি অথবা আরবি ও ফারসি উভয় ভাষায় রচনা করেন।  সংস্কৃত, গ্রিক  হিব্রু ও সিরীয় ভাষাতেও তার পাণ্ডিত্য ছিল।

আল বিরুনি ১০০৮ খ্রিষ্টাব্দে শাহ আবুল হাসান আলি ইব্‌ন মামুনের দরবারে যথামর্যাদায় গৃহীত হন। মামুনের মৃত্যুর  পর তাঁর ভাইয়ের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন।  ১০১৬-১৭ খ্রিষ্টাব্দে  মামুন নিহত হলে  সুলতান মাহমুদ খাওয়ারিজম দখল করে নেন।  তখন তিনি গণিতবিদ আবু নাসের মানসুর ইবন আলি ও চিকিৎসক আবুল খায়ের আল-হুসায়ন ইবন বাবা আল-খাম্মার আল-বাগ দাদদি-সহ গজনি চলে যান।  তখন হতে তিনি গাজনি শাহী দরবারে জ্যোতির্বিদ হিসেবে অবস্থান করতে থাকেন। তিনি কয়েকবার সুলতান মাহমুদের সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম ভারতে গমন করে ছিলেন। গজনির সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ভারতে প্রায় ১২ বছর অবস্থান করেন। এখানে সংস্কৃত ভাষা শেখেন এবং হিন্দু ধর্ম, ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি, দেশাচার, সামাজিক প্রথা, রাতিনীতি, কুসংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি ভারতীয় কিছু আঞ্চলিক ভাষায়ও জ্ঞান লাভ করেছিলেন।  এক যুগের অধ্যায়ন ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান থেকে রচনা করেন বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ কিতাবুল তারিকিল-হিন্দ।

জ্যোর্তিবিজ্ঞান নিয়ে বিভিন্ন কথা বলতেন। তাই সুলতান মাহমুদ তাকে বন্দি করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। সুলতান মাহমুদের মৃত্যুর পর তার ছেলে মাসউদ সিংহাসনে আরোহণ করেন। আল বিরুনির বিখ্যাত গ্রন্থের নাম  কানুন মাসউদি।  এটি সুলতান মাহমুদের পুত্র সুলতান মাসউদের নামে নামায়িত এবং সুলতান মাসউদের নামে উৎসর্গিত।  গ্রন্থটি  মোট ১১ খণ্ডের। কথিত হয়,  বিশাল এই গ্রন্থটির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সুলতান মাসউদ খুশি হয়ে একটি হাতির ওজনের পরিমাণ রৌপ্য আল বিরুনিকে উপহার দেন। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ না করে সুলতানকে ধন্যবাদ দিয়ে   সব রৌপ্য রাজকোষে ফিরিয়ে দেন। গ্রন্থটির প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ডে জ্যোতির্বিজ্ঞান, তৃতীয় খণ্ডে ত্রিকোণমিতি। চতুর্থ খণ্ডে গোলাকার জ্যোতির্বিদ্যা (Spherical Astronomy); পঞ্চম খণ্ডে চন্দ্র-সূর্যের মাপ, গ্রহ ও  দ্রাঘিমা; ষষ্ঠ খণ্ডে সূর্যের গতি প্রকৃতি; সপ্তম খন্ডে চন্দ্রের গতি প্রকৃতি; অষ্টম খণ্ডে চন্দ্রের দৃশ্যমানতা ও গ্রহণ; নবম খণ্ডে স্থির নক্ষত্র দশম খন্ডে পাঁচটি গ্রহেরর বিবরণ এবং একাদশ খণ্ডে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

আল-বিরুনি নিজে উল্লেখ করেছেন যে, তার গ্রন্থের সংখ্যা ১১৪টি। তন্মধ্যে ১০৩টি গ্রন্থ নিজে সম্পূর্ণ  করে গেছেন। এছাড়া আবু নাসের মানসুর ১২টি, আবু সাহল আ-মাসিহি ১২টি, আবু সাহল আল-মাসিহি ১২টি, আবু আলি আল-হাসন ইবন আলি আল-জিলি একটি পুস্তক  আল-বেরুনির লেখা বলে উল্লেখ করেছেন। ফলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৮টি।  অনেকে  বিভিন্ন সূত্রের উল্লেখ করে বলেন, তার রচিত গ্রন্থের সর্বমোট সংখ্যা ১৮০টি।

আজ ১৩ই ডিসেম্বর মহাপণ্ডিত ও বিশ্বখ্যাত মধ্যযুগীয় জ্ঞানতাপস আল বিরুনির মৃত্যুদিবস। শুবাচ বিশ্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও ভাষাতত্ত্ববিদ আল বিরুনিকে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছে।

কিতাব-ই-সায়দানা’ নামের বিখ্যাত ভেষজ বইটি তিনিই লিখেছেন। সুলতান মাহমুদ গজনির শাসনামলে তিনি ভারতবর্ষে পা রাখেন। আলোচিত বই ‘তারিখ আল হিন্দ’ সে সময়কার লেখা। তিনি ত্রিকোণমিতি নিয়ে বিভিন্ন ধারণা দেন। ট্যানজেন্ট সারণি তাঁরই তৈরি।

আল বিরুনিই প্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞানী যিনি অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেন। তিনিই প্রথম আর্টেজীয় কুপ ও প্রাকৃতিক ঝরনা সৃষ্টির আসল রহস্য উদ্‌ঘাটন করেন। তিনিই প্রথম বিজ্ঞানী যিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্রের সুস্পষ্ট পার্থক্য নিরূপণ করেন। আল বিরুনি শুদ্ধ ও সূক্ষ্ণ গণনার একটি বিস্ময়কর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। যার বর্তমান নাম দ্যা ফরমুলা অব হিন্টার পোলেশন। আল বিরুনিকে বলা হয় প্রাকৃতিক পাপড়িসূত্রের জনক। বিভিন্ন প্রকার ফুলের পাপড়ির সংখ্যা হয় ৩, ৪, ৫, ৬, ১৮  হবে, কিন্তু কখনো ৭ বা ৯ হবে না। তিনিই প্রথম এই প্রাকৃতিক পাপড়িসূত্র আবিষ্কার করেন। তিনিই প্রথম ট্যানজেন্ট সারণি তৈরি করেন। তিনি ত্রিকোণমিতি নিয়ে বিভিন্ন ধারণা দেন। 

কিতাবুল তাফহিম তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এটি ৫০৩ অধ্যায়ে বিভক্ত। আল আরাছুল বাকিয়া আলাল কুবানিল কালিয়া গ্রন্থে পৃথিবীর প্রাচীন ও প্রাগৈতিহাসিক কালের কথা তুলে ধরেছেন।   ‘কিতাব-ই-সায়দানা’ নামের বিখ্যাত ভেষজ বিজ্ঞানবিষয়ক বইটির লেখক আল বিরুনি।  তাঁর আর একটি আলোচিত বই ‘তারিখ আল হিন্দ’। । 

তাঁর অমর কীর্তি ১০৩১ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৪২১ হিজরিতে রচিত বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ ‘তাহকিকে মেলালে হেন্দ’ এটি ‘ভারতীয় জাতি সম্পর্কিত গবেষণা’ নামেও পরিচিত। এটি ‘কিতাবুল হিন্দ’ বা ‘ভারততত্ত্ব’ নামেও সুপরিচিত।   বিরুনি এই বইয়ে জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিত বিষয়ে ভারতীয়দের মতামত এবং হিন্দুদের নানা ধর্ম-বিশ্বাসের পাশাপাশি ভারতের ভৌগলিক ও ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে ধরেছেন। পশ্চিমা পণ্ডিতবর্গ মূলত এ বইয়ের মাধ্যমে ভারতের জ্ঞানবিজ্ঞান সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।  বিরুনির এই বই ভারতীয়দের ধর্ম, প্রথা, ইতিহাস ও নানা জ্ঞান সম্পর্কে বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত বই। তাই বিরুনিকে তুলনামূলক নৃতত্বের অগ্রপথিক বলা যায়। 

‘তাহকিকে মেলালে হেন্দ’ ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে সর্বপ্রথম লন্ডনে  এডওয়ার্ড জাকাউ দ্বারা সম্পাদিত মূল আরবি গ্রন্থটি প্রকাশ হয়। ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করা হয়।  বইটির বাংলা অনুবাদ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জনাব আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমি থেকে এটি প্রকাশ হয়। 

মৃত্যুর ১৩ বছর আগে নিজের কাজের একটি তালিকা করেন আল বিরুনি। তালিকা অনুযায়ী তার রচিত মোট গ্রন্থের সংখ্যা ১১৪টি। গণিত, জ্যামিতি ও এ বিশ্বের গঠন সম্পর্কে ৫০৩ অধ্যায়ের বৃহৎ পুস্তক ‘কিতাবুল তাফহিম’ আল বিরুনি রচিত। ‘ইফরাদুল ফা’ল ফিল আমরিল আযলাল’ গ্রন্থে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ছায়াপথ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন তিনি। পৃথিবীর প্রাচীনকালের ইতিহাস নিয়ে তার অনবদ্য রচনা ‘আল আছারুল বাকিয়া আলাল কুবানিল কালিয়া’। যুক্তিবিদ্যায়ও তিনি বই রচনা করেছেন।

আল-বিরুনি ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দে ১৩ই ডিসেম্বর, মোতাবেক ৪৪০ হিজরির ২রা রজব ৭৫ বছর বয়সে র্তমান আফগানিস্তানের গজনিতে মারা যান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সম্মানে একটি ছাত্রাবাসের নামকরণ করা হয়।

 

মহাপণ্ডিত আল বিরুনির কথা


১.শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) থেকে শুবাচির প্রশ্ন শুবাচির উত্তর: (১-১৫)

২.শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) থেকে শুবাচির প্রশ্ন শুবাচির উত্তর: (১৬-৩০)

৩. শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) থেকে শুবাচির প্রশ্ন শুবাচির উত্তর: (৩১-৪৫)

 

শুবাচ -ওয়েবসাইট: www.draminbd.com
error: Content is protected !!