মহাপ্রাণ ন্, ম্, র্ আর ল্: উচ্চারণ

এবি ছিদ্দিক

“ ‘হ্রীণ’ শব্দের উচ্চারণ কীরকম হবে? ‘চিহ্ন’ শব্দের উচ্চারণে ‘হ’ আগে উচ্চারিত হবে, না কি ‘ন’ আগে? ‘ব্রাহ্মণ’ শব্দের উচ্চারণ কীভাবে করা উচিত? ‘আহ্লাদি’ শব্দের উচ্চারণ কীভাবে করতে হয়? ‘হৃদয়’ শব্দের শুদ্ধ উচ্চারণ কী?”— বাংলা শব্দের উচ্চারণ

এবি ছিদ্দিক

নিয়ে নানান প্রশ্নের মধ্যে এই কয়েকটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে বারবার আসে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ধ্বনিমূল এবং ধ্বনিমূলের সহধ্বনি সম্পর্কে জানাশোনা থাকলে একেবারে সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, সাধারণ শিক্ষার্থীকে এই ধ্বনিমূল ও সহধ্বনির সাহায্যে বিষয়টি স্পষ্ট করতে গেলে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আগে ধ্বনিমূল ও সহধ্বনি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করতে হবে। তাই, আমি ওই রাস্তা দিয়ে না-গিয়ে অন্য আরেকটি সহজ পন্থায় এই বিষয়গুলো পরিষ্কার করবার চেষ্টা করেছি।

বাংলা বর্ণমালার বর্গের প্রথম ও তৃতীয় কলামের (ক্, গ্, চ্, ট্, ত্, প্, ব্ প্রভৃতি) ধ্বনিগুলো হচ্ছে অল্পপ্রাণ ধ্বনি। এই অল্পপ্রাণ ধ্বনিগুলোর সঙ্গে যখন ‘হ্’ যুক্ত হয়, তখন সেগুলো মহাপ্রাণ ধ্বনিতে বদলে যায়। অর্থাৎ—
অল্পপ্রাণ ক্ + হ্ = মহাপ্রাণ ক্ = খ্ = kʰ;
অল্পপ্রাণ গ্ + হ্ = মহাপ্রাণ গ্ = ঘ্ = gʰ;
অল্পপ্রাণ চ্ + হ্ = মহাপ্রাণ চ্ = ছ্ = cʰ;
অল্পপ্রাণ দ্ + হ্ = মহাপ্রাণ দ্ = ধ্ = d̪ʰ.

আবার, ন্ [ ণ্ ], ম্, র্, ল্ প্রভৃতি হচ্ছে অল্পপ্রাণ ধ্বনি। এই ধ্বনিগুলোর সঙ্গে ওপরের ন্যায় হ্ ধ্বনি যুক্ত করলে দাঁড়ায়—
অল্পপ্রাণ ন্ + হ্ = মহাপ্রাণ ন্ = ন্হ্ ( ? ) = nʰ;
অল্পপ্রাণ ম্ + হ্ = মহাপ্রাণ ম্ = ম্হ্ ( ? ) = mʰ;
অল্পপ্রাণ র্ + হ্ = মহাপ্রাণ র্ = র্হ্ ( ? ) = rʰ;
অল্পপ্রাণ ল্ + হ্ = মহাপ্রাণ ল্ = ল্হ্ ( ? ) = lʰ.

অর্থাৎ, আমরা /ক/-এর পরে /খ/ যেভাবে উচ্চারণ করি; /গ/-এর পরে /ঘ/ যেভাবে উচ্চারণ করি; /চ/-এর পরে /ছ/ যেভাবে উচ্চারণ করি; শ্বাসের জোর একটু বেশি দিয়ে; একইভাবে /ন/-এর পরে [nʰɔ]; /ম/-এর পরে [mʰɔ]; /র/-এর পরে [rʰɔ]; /ল/-এর পরে [lʰɔ] উচ্চারণ করতে হবে। মোদ্দা কথা হচ্ছে, /চিন্‌nʰo/, /ব্রাম্mʰoন্/ /rʰiনো/, /আল্lʰaদি/ প্রভৃতি উচ্চারণের সময় /হ্/ ধ্বনি উচ্চারণের কোনো দরকার নেই, কেবল /ন্/, /ম্/, /র্/, /ল্/ প্রভৃতি ধ্বনির উচ্চারণে মুখ দিয়ে বেশি বাতাস বের হয় মতো জোর দিয়ে উচ্চারণ— যেভাবে /খ্/, /ঘ্/, /ছ্/, /ঠ্/, /ধ্/ প্রভৃতি মহাপ্রাণ ধ্বনি উচ্চারণ করি— করলেই শুদ্ধ উচ্চারণ পাওয়া যাবে। নিম্নের তুলনা কটি ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারলে বিষয়টি স্পষ্টতর হয়ে যাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে—
১.১। আকাম /আকাম্/; বামন /বামোন্/ (অল্পপ্রাণ ক্ ও ম্)।
১.২। আখ্যান /আক্‌খান্/; ব্রাহ্মণ /ব্রাম্mʰoন্/ (মহাপ্রাণ ক্ ও ম্)।
এখানে ১.২-এর ‘খা’ আর ‘mʰo’ তুলনীয়।

২.১। দান /দান্/; রাশ /রাশ্/ ( অল্পপ্রাণ দ্ ও র্)।
২.২। ধান /ধান্/; হ্রাস /rʰaশ্/ (মহাপ্রাণ দ্ ও র্)।
এখানে ২.২-এর ‘ধা’ আর ‘rʰa’ তুল্য।

৩.১। গদ্য /গোদ্‌দো/; /বন্য /বোন্‌নো/ (অল্পপ্রাণ দ্ ও ন্)।
৩.২। বধ্য /বোদ্‌ধো/ চিহ্ন /চিন্nʰo/ (মহাপ্রাণ দ্ ও ন্)।
এখানে ৩.২-এর ‘ধো’ আর ‘nʰo’ তুলনীয়।

৪.১। আদা /আদা/; আলাল /আলাল্/ (অল্পপ্রাণ দ্ ও ল্)।
৪.২। আধা /আধা/; আহ্লাদ /আল্lʰaদ্/ (মহাপ্রাণ দ্ ও ল্)।
এখানে ৪.২-এর ‘ধা’ আর ‘lʰa’ তুল্য।

প্রসঙ্গত, ব্যঞ্জনবর্ণের বর্গের দ্বিতীয় ও চতুর্থ কলামে যথাক্রমে প্রথম ও তৃতীয় কলামের ধ্বনিগুলোর মহাপ্রাণ রূপ রয়েছে। অর্থাৎ, /ক্/ ধ্বনির মহাপ্রাণ রূপ লিখে প্রকাশ করতে চাইলে /খ্/-এর সাহায্যে প্রকাশ করা যায়। একইভাবে, /গ্/, /চ্/, /জ্/, /ট্/ প্রভৃতি অল্পপ্রাণ ধ্বনির মহাপ্রাণ ধ্বনি নির্দেশের জন্যে যথাক্রমে /ঘ্/, /ছ্/, /ঝ্/, /ঠ্/ প্রভৃতি রূপ রয়েছে। কিন্তু /ন্/, /ম্/, /র্/, /ল্/ প্রভৃতি অল্পপ্রাণ ধ্বনির মহাপ্রাণ উচ্চারণ লিখে প্রকাশ করবার জন্যে শুরুতে উল্লেখ-করা ধ্বনিগুলোর মতো দ্বিতীয় কোনো রূপ নেই। তাই, এই ধ্বনিগুলোর মহাপ্রাণ উচ্চারণ বোঝাতে ইংরেজি বর্ণের সাহায্য নিয়ে /nʰ/, /mʰ/, /rʰ/, /lʰ/ প্রভৃতি রূপ লেখা হয়। আরও একটি বিষয় হচ্ছে— কোনো শব্দের উচ্চারণে ‘ন্হ’, ‘ম্হ’, ‘র্হ’, ‘ল্হ’ প্রভৃতি রূপ লেখা হলে উচ্চারণের সময় /হ্/ ধ্বনি উচ্চারণের সম্ভাবনা থাকে বলে এধরনের উচ্চারণ ইংরেজি বর্ণের সাহায্য নিয়ে লেখা হয়।

[ জ্ঞাতব্য: ১. ব্যঞ্জনধ্বনির সঙ্গে ‘ʰ’ বর্ণটি জুড়ে দিয়ে ‘মহাপ্রাণ’ উচ্চারণ বোঝানো হয়। ২. /ɔ/ দিয়ে /অ/ বোঝানো হয়। ]

সূত্র: মহাপ্রাণ ন্, ম্, র্ আর ল্: উচ্চারণ, এবি ছিদ্দিক, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)


All Link

বিসিএস প্রিলি থেকে ভাইভা কৃতকার্য কৌশল

ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা বইয়ের তালিকা

বাংলা সাহিত্যবিষয়ক লিংক

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/১

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/২

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন /৩

কীভাবে হলো দেশের নাম

ইউরোপ মহাদেশ : ইতিহাস ও নামকরণ লিংক

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/১

দৈনন্দিন বিজ্ঞান লিংক

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/২

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৩

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৪

কীভাবে হলো দেশের নাম

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/১

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/২

বাংলাদেশের তারিখ

ব্যাবহারিক বাংলা বানান সমগ্র : পাঞ্জেরী পবিলেকশন্স লি.

শুদ্ধ বানান চর্চা প্রমিত বাংলা বানান বিধি : বানান শেখার বই

কি না  বনাম কিনা এবং না কি বনাম নাকি

মত বনাম মতো : কোথায় কোনটি এবং কেন লিখবেন

ভূ ভূমি ভূগোল ভূতল ভূলোক কিন্তু ত্রিভুবন : ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ

মত বনাম মতো : কোথায় কোনটি এবং কেন লিখবেন

error: Content is protected !!