মহার্ঘ ও মহার্ঘভাতা, জঙ্গি, উত্তমমধ্যম বনাম প্রহার

ড. মোহাম্মদ আমীন

মহার্ঘ ও মহার্ঘভাতা, জঙ্গি, উত্তমমধ্যম বনাম প্রহার

সংযোগ: https://draminbd.com/মহার্ঘ-ও-মহার্ঘভাতা-জঙ্গ/

মহার্ঘ ও মহার্ঘভাতা

তৎসম মহার্ঘ (মহৎ+অর্ঘ)  অর্থ— (বিশেষণে) অত্যন্ত মূল্যবান,  মহামূল্য; দুর্মূল্য। উচ্চারণ মহার্‌ঘো। সংস্কৃত মহার্ঘ আর বাংলা ভাতা মিলে মহার্ঘভাতা। বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত মহার্ঘভাতা অর্থ—  মূল্যবৃদ্ধি বা মুদ্রাস্ফীতির কারণে বেতনভোগীদের প্রদত্ত অতিরিক্ত ভাতা, দুর্মূল্যভাতা। উচ্চারণ: উচ্চারণ মহার্‌ঘোভাতা।  দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে অথচ  বেতন আগের মতো রয়ে গেছে; কিংবা পরবর্তী  বেতন স্কেল   দিতে পারেনি বা দেওয়া হয়নি কিংবা দেওয়ার সময় আসেনি এরূপ মধ্যবর্তী সময়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি বিবেচনায় বেতনভোগীদের যে ভাতা দেওয়া হয় তাকে মহার্ঘভাতা(dearness allowance) বলা হয়।

জঙ্গি

জঙ্গি ফারসি উৎসের শব্দ। বাক্যে এটি সাধারণত বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর উচ্চারণ— জোংগি। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে জঙ্গি অর্থ—
  • সামারিক, যুদ্ধবিষয়ক,
  • মারমুখো।
ইদানীং জঙ্গি শব্দটি ‘সামরিক’ ও ‘যুদ্ধবিষয়ক’ অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত হয় না। এটি এখন কেবল নেতিবাচক মারমুখো অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত হয়। একসময় জঙ্গি শব্দটি এমন নেতিবাচক ছিল না। যুদ্ধবিষয়ক অর্থে বেশ ইতিবাচক ছিল। বাংলাদেশে যুদ্ধের কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সংগৃহীত উড়োজাহাজের সঙ্গে জঙ্গি শব্দটি এখনো ইতিবাচক যুদ্ধ অর্থে প্রয়োগ করা হয়। যেমন: জঙ্গিবিমান।

নানা কারণে শব্দের অর্থ পরিবর্তন হয়; নানা প্রেক্ষাপটে ইতিবাচক শব্দ নেতিবাচক এবং নেতিবাচক শব্দ ইতিবাচক অর্থ ধারণ করতে পারে। জঙ্গি শব্দের ভাগ্যেও এমন ঘটেছে। বর্তমানে জঙ্গি শব্দটি উগ্র, সন্ত্রাসী, চরমপন্থি প্রভৃতি নেতিবাচক অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত হয়। ‘জঙ্গি’ এখন একটি অপরাধমূলক বিশেষণ।

 

উত্তমমধ্যম বনাম প্রহার

‘উত্তমমধ্যম’ শব্দের অর্থ লাঞ্ছনাসহ প্রহার, বিস্তর পিটুনি, প্রচণ্ড প্রহার প্রভৃতি। বস্তুত এ সকল অর্থ প্রকাশে বাগ্‌ধারাটি ব্যবহার করা হয়। উত্তম ও মধ্যম শব্দের মিলনে উত্তমমধ্যম। উত্তম অর্থ ভালো, অত্যন্ত এবং মধ্যম অর্থ মাঝারি। সুতরাং, উত্তমমধ্যম অর্থ: ‘অত্যন্ত ও মাঝারি’। কিন্তু ‘উত্তমমধ্যম’ বাগ্‌ধারার প্রচলিত আভিধানিক অর্থ ‘অত্যন্ত ও মাঝারি’ নয়। অন্যান্য বাগ্‌ধারার ন্যায় এটিও তার বাহ্যিক অর্থ বিসর্জন দিয়ে নতুন অর্থ ধারণ করেছে। সেটি হচ্ছে লাঞ্ছনাসহ প্রহার।
কাউকে শুধু প্রহার করলে সেটি উত্তমমধ্যম বলা যাবে না। উত্তমমধ্যম বাগ্‌ধারার প্রকৃত অর্থের পরিস্ফুটন ঘটাতে হলে প্রহারের সঙ্গে অপমান থাকাও প্রয়োজন। (১) শিক্ষক ছাত্রটিকে দুষ্টামি করার জন্য প্রহার করলেন; (২) শিক্ষক ছাত্রটিকে দুষ্টুমি করার জন্য উত্তম-মধ্যম দিলেন। এখানে প্রথম বাক্য প্রকাশ করছে, শিক্ষক ছাত্রটিকে শুধু পিটুনি দিয়েছে এবং তা প্রচণ্ড নয়; কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যে প্রকাশ করছে শিক্ষক ছাত্রটিকে শুধু মারেননি, অপমানও করেছেন; মানে মারধর করেছেন। হতে পারে সে অপমান কান ধরে দাঁড়িয়ে রাখা বা অন্যকিছু।
তবে প্রচণ্ড প্রহার, বিস্তর পিটুনি অর্থেও ‘উত্তমমধ্যম’ শব্দ প্রয়োগ করা হয়। এর কারণ আছে। প্রচণ্ড পিটুনি দিলে কাপড়চোপড় উলট-পালটসহ বিভিন্নভাবে অপমান এমনিতে ঘটে যায়। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাংলা উত্তমমধ্যম অর্থ প্রচণ্ড প্রহার, মারধর।
সূত্র: বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়।

— √

error: Content is protected !!