মাতৃভাষা দিবস: ৮ই ফাল্গুন নয়, ২১শে ফেব্রুয়ারি কেন

ড. মোহাম্মদ আমীন

মাতৃভাষা দিবস: ৮ই ফাল্গুন নয়, ২১শে ফেব্রুয়ারি কেন

৮ই ফাল্গুন নয়, ২১শে ফেব্রুয়ারি কেন?

ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে ফেব্রুয়ারি। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির তারিখ সারা বিশ্বে অপরিবর্তিত থাকে। তাই ২১শে ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বে অভিন্ন দিন হিসেবে পাওয়া যায়। বঙ্গাব্দের ৮ই ফাল্গুন পরিবর্তনশীল দিন। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেও বাংলাদেশের ৮ই ফাল্গুন অভিন্ন নয় বা ভিন্ন হয়ে যেতে পারে।
অধিকন্তু, ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দেও এখনকার মতো বছর গণনার ক্ষেত্রে সর্বস্তরে বঙ্গাব্দের চেয়ে গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির প্রাধান্য ছিল।
আন্দোলনকারীগণ ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখ আন্দোলন করেছেন। ভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত অধিকাংশ দলিলে ২১শে ফেব্রুয়ারি লেখা আছে।
সে সময় ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত সব সাহিত্যে ২১শে ফেব্রুয়ারি বর্ণিত। ৮ই ফাল্গুন নয়।
বঙ্গাব্দ স্থানীয় এবং গ্রেগরীয় অন্তর্জাতিক। স্বাভাবিক কারণে মাতৃভাষা আন্দোলনের মতো আন্তর্জাতিক একটি ঘটনার তারিখ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক একক প্রাধান্য পেয়েছে।
বঙ্গাব্দ ও গ্রেগরীয় পঞ্জিকার সঙ্গে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার কোনো সম্পর্ক নেই। এ দুটি প্রত্যয় হলো সময় পরিমাপের দুটি ভিন্ন একক। যেমন: মিটার, ফুট, সের ইঞ্চি।
 
 

২১শে না কি ২১এ

প্রথমে বলে রাখি: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান (পরিশিষ্ট গ) অনুযায়ী (বাংলা তারিখ ও সময়) একমাত্র প্রমিত শব্দ ২১শে। ওখানে ২১এ বানানের কোনো শব্দ নেই। ওই অভিধানমতে ২১শে কথার উচ্চারণ একুশে। অতএব, শুদ্ধ ও প্রমিত হচ্ছে ২১শে। ২১এ কথার উচ্চারণ হয় একুশ-এ; এমন লিখবেন না। ২১শে লিখুন, ২১এ লিখবেন না।
 
বাংলায় তারিখ লেখার নিয়ম
বাংলা একাডেমি এ বিষয়ে কী বলে? ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’ হচ্ছে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত সর্বশেষ অভিধান। যা ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয়। ওই অভিধানের পরিশিষ্টে (পরিশিষ্ট গ) বাংলা তারিখ ও সময় কীভাবে লেখা হবে তা বর্ণিত হয়েছে।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে—
১ তারিখ লেখা হয়েছে: ১লা, উচ্চারণ /পয়্‌লা/ [যেমন: ১লা জানুয়ারি।]
২ তারিখ লেখা হয়েছে: ২রা, উচ্চারণ /দোশ্‌রা/ [ যেমন: ২রা ফেব্রুয়ারি।]
৩ তারিখ লেখা হয়েছে: ৩রা, উচ্চারণ /তেশ্‌রা/;[ যেমন: ৩রা মার্চ।]
৪ তারিখ লেখা হয়েছে: ৪ঠা, উচ্চারণ /চোউ্‌ঠা/; [ যেমন: ৪ঠা এপ্রিল]
৫ তারিখ লেখা হয়েছে: ৫ই, উচ্চারণ /পাঁচোই/; [ যেমন: ৫ই মে]
৬ তারিখ লেখা হয়েছে: ৬ই, উচ্চারণ ছওই; [ যেমন: ৬ই জুন]।
১৯ তারিখ লেখা হয়েছে: ১৯শে, উচ্চারণ /উনিশে/; [ যেমন : ১৯শে জুলাই]।
২১ তারিখ লেখা হয়েছে: ২১শে, উচ্চারণ /একুশে/;[ যেমন: ২১শে ফেব্রুয়ারি]।
——————————————————
২১ এ ফেব্রুয়ারি বা একুশ-এ ফেব্রুয়ারি নয়। ২১শে ফেব্রুয়ারি বা একুশে ফেব্রুয়ারি। একুশ-এ ফেব্রুয়ারি হাস্যকর।]
 

‘শহিদ মিনার’ না কি ‘শহিদমিনার’?

শহিদদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য নির্মিত মিনার বা শহিদদের নিমিত্ত মিনার বা শহিদের স্মরণে মিনার— প্রভৃতি অর্থ প্রকাশের জন্য ‘শহিদমিনার’ বা ‘শহিদ মিনার’ কথাটি ব্যবহার করা হয়।
অনেকে বলেন— সমাসবদ্ধ শব্দে ফাঁক রাখা যায় না। তাই ‘শহিদ মিনার’ কথাটি শুদ্ধ নয়। শুদ্ধ হবে ‘শহিদমিনার’ বা ‘শহিদ-মিনার’। তাই তারা মনে করেন ‘শহিদ মিনার’ অশুদ্ধ। আসলে কি অশুদ্ধ?
না, ‘শহিদ মিনার’ কথাটি অশুদ্ধ নয়, বরং ব্যাকরণগতভাবে সম্পূর্ণ শুদ্ধ ও প্রমিত এবং অধিক দৃষ্টিনন্দন। এবার দেখা যাক তার কারণ:
সমাসবদ্ধ পদ একসঙ্গে লিখতে হয়, এটি সত্য— তবে সবসময় নয়? কখন? “উচ্চারণ, অর্থদ্যোতকতা ও শ্রুতিমাধুর্য বিবেচনায় যখন সুবিধা মনে হয়, তখন। নতুবা, ফাঁক রেখে লেখাই বিধেয়, এটিই বাংলার বৈশিষ্ট্য।”
বাংলা ব্যাকরণে অসংলগ্ন সমাস বলে একটি কথা আছে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, “সমাসবদ্ধ পদ অসংলগ্নভাবেও লেখা যায়। অসংলগ্নভাবে লেখা হলেও তা সমাসবদ্ধ পদ হিসেবে গণ্য হয়।” বাংলায় সমাসের প্রয়োজনীয়তা বহুলাংশে ইচ্ছা-নির্ভর বিষয়। ‘জয় বাংলা’ কথাটিকে অভিধান যতই সমাসবদ্ধ পদ হিসেবে ‘জয়বাংলা’ বলুক না কেন—, ‘জয় বাংলা’ লিখলে ব্যাকরণগতভাবে কিংবা অর্থ ও শ্রুতিমাধুর্য প্রকাশে কোনো বিঘ্ন হয় না, বরং শ্রতিমাধুর্য বৃদ্ধি পায়।
‘বিজয়দিবস’ আর ‘বিজয় দিবস’, উভয় ধারাই শুদ্ধ ও ব্যাকরণসম্মত। প্রথমটি— ‘সংলগ্ন সমাস’ এবং দ্বিতীয়টি ‘অসংলগ্ন সমাস’। তেমনি শুদ্ধ- নিখিল বাংলা চিরন্তন আকালি যুব সংহতি সমিতি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম সমিতি প্রভৃতি।
সুতরাং, ‘শহিদ মিনার’ ও ‘শহিদমিনার’ দুটোই শুদ্ধ, প্রমিত এবং ব্যাকরণসম্মত। অধিকন্তু, প্রচলন ও জনপ্রিয়তার দিকে এগিয়ে আছে ‘শহিদ মিনার’।

অতএব, নির্দ্বিধচিত্তে লিখুন— শহিদ মিনার।

 
 
এই পোস্টের লিংক: https://draminbd.com/মাতৃভাষা-দিবস-৮ই-ফাল্গুন/
 
 
প্রয়োজনীয় কিছু লিংক
 
error: Content is protected !!