মান্ধাতার আমল: বিশ্বের প্রথম সিজারিয়ান শিশু

ড. মোহাম্মদ আমীন

‘মান্ধাতার আমল’ কথার শাব্দিক বা বাচ্যার্থ মান্ধাতা নামক কোনো ব্যক্তির আমল। কিন্তু এর আলংকারিক অর্থ অর্থ— পুরনো কাল, প্রাচীন কাল। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, মান্ধাতার আমল অর্থ— (বিশেষ্যে) পৌরাণিক রাজা মান্ধাতার আমল, (আলংকারিক) অর্থ— অতি প্রাচীনকাল।

এখন দেখা যাক পৌরাণিক রাজা মান্ধাতা কে এবং কী তাঁর পরিচয়। মান্ধাতা ছিলেন সূর্যবংশের/ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা যুবনাশ্বের পুত্র। তিনি মাত্র এই মান্ধাতা মাত্র ১২ বছর বয়সে বিশাল শরীর লাভ করেছিল। তাঁর রাজধানী ছিল অযোধ্যা। ‘রামায়ণ’ মহাকাব্যের প্রধান চরিত্র রামও ছিলেন একই বংশের সন্তান।যুবনাশ্বের স্ত্রীর কোনো পুত্র হচ্ছিল না।পুত্রলাভের আশায় তিনি মুনিদের আশ্রমে গিয়ে যোগ সাধনা শুরু করলেন। মুনিরা তাঁর সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে পুত্র সন্তানের জন্য যজ্ঞ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। যথাসময়ে যজ্ঞ শুরু হলো। একদিন মাঝরাতে যজ্ঞের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে মুনিগণ কলসি ভর্তি মন্ত্রপূত জল বেদিতে রেখে ঘুমাতে গেলেন। কলসির এই জল কোনো সাধারণ জল ছিল না। যুবনাশ্বের স্ত্রী কলসির এই জল পান করলে পুত্র সন্তান হবে— এটাই ছিল কথা।

শেষ রাতের দিকে তীব্র তেষ্টায় কাতর যুবনাশ্বের অনবধানতাবশত নিজেই সে কলসির জল পান করে ফেললেন। সকালে উঠে মুনিগণ পুরো ঘটনা শুনে মুচকি হেসে বললেন, “বৎস, ভয় নেই। তুমি সন্তান পাবে। তবে এই সন্তান তোমার পেট থেকে বের হবে। জল তো আর বের করা যাবে না। কেবল অবস্থানটা বদল হলো মাত্র।” 

তবে এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। বলা হয় যুবানাশ্বের— না-জেনে ঋষি ভৃগুর স্ত্রীর সন্তান হওয়ার  জন্য রাখা জল  পান করেছিলেন। রাজা যুবনাশ্ব তখন অযোধ্যার রাজা।  সন্তান লাভের জন্য  অশ্বমেধযজ্ঞ-সহ আরও অনেক কিছু করলেন।  কিন্তু সন্তান হচ্ছে না।  রাজা মনের কষ্টে চলে গেলেন অরণ্যে। সেখানে গিয়ে তিনি সন্তান লাভের জন্য তপস্যা শুরু করলেন। একসময় রাজার খুব জল তেষ্টা পায়। তখন তিনি চ্যবন ঋষির আশ্রমে যান। কিন্তু তাঁকে জল দেওয়ার মতো আশ্রমে কেউ ছিল না। এ অবস্থায় তিনি যজ্ঞবেদীর ওপর রাখা জল ভর্তি কলস দেখে সেই জল পান করে নিলেন। ঋষি আশ্রমে ফিরে কাণ্ড দেখে রেগে যান। ঋষি জানান রাজাকে জানান, এই জল তাঁর স্ত্রীর জন্ রাখা হয়েছিল।  এই জল খেলে তাঁর স্ত্রী সন্তান লাভ করতেন। কিন্তু জল যখন রাজা খেয়েছেন তখন ফল তো পেতেই হবে। অতএব, রাজাকে গর্ভবতী হতে হবে।  আরেক মতে, বলা হয় যুবানাশ্ব— না-জেনে ঋষি ভৃগুর স্ত্রীর সন্তান হওয়ার  জন্য রাখা জল  পান করেছিলেন।

যাই হোক,  এ বিষয়ে সবাই একমত যে, যুবনাশ্ব জল পান করে গর্ভবতী হয়েছিলেন। মুনিগণ যুবনাশ্বেরকে গর্ভধারণের কষ্ট থেকে মুক্তি দিলেন। একশো বছর পার হওয়ার পর মুনিভূমের চিকিৎসকদল যুবনাশ্বের রাজার উদরের বামদিক বিদীর্ণ করে শিশুপুত্রটিকে বের করে আনলেন। সে হিসেবে এই শিশুই হচ্ছে বিশ্বের প্রথম সিজারিয়ান শিশু।এর আগে কোনো সিজারিয়ান বেবির কোনো ইতিহাস কোনো গ্রন্থে পাওয়া যায় না।

শিশুটি ভূমিষ্ট হলো ঠিকই, কিন্তু দুগ্ধ পাবেন কোথায়? যুবনাশ্বের পুরুষ, তাঁর তো দুগ্ধগ্রন্থী নেই। বুকের দুধ ছাড়া শিশুটি বাঁচবেনই বা কীভাব? তখন তো আর গুঁড়ো দুধ ছিল না। হায় হায় সাধের সন্তান বুঝি দুধের অভাবে মারা যায়।

সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এলেন স্বয়ং ইন্দ্র। তিনি নিজেই শিশুটিকে খাওয়ানোর দায়িত্ব নিলেন। দেবরাজ ইন্দ্রের অঙ্গুলি ছিল অমৃতক্ষরা। ইন্দ্র শিশুর মুখে নিজের তর্জনী পুরে দিয়ে বললেন, “মাম ধাস্যতি”। অর্থাৎ— আমাকে পান করো। ইন্দ্রের একথা থেকে যুবনাশ্বের শিশু পুত্রটির নাম হয়ে গেল—‘মামধাতা’। যার পরিবর্তিত রূপ— মান্ধাতা।

ধীরে ধীরে বড়ো হতে লাগলেন মান্ধাতা। একই সঙ্গে বিদ্যাবু্দ্ধি আর অস্ত্র চালনায় পৃথিবী-খ্যাত হয়ে গেলেন। তার সঙ্গে বিয়ে হলো চন্দ্রবংশীয় রাজকন্যা ইন্দুমতির। রাজা হওয়ার পর মান্ধাতা রাজধানী অযোধ্য থেকে বিশাল বাহিনী নিয়ে পৃথিবী-জয়ে বের হলেন। যুদ্ধ করতে করতে তিনি সারা পৃথিবী জয় করে ফেলেন। জয় করার জন্য আর কোনো পৃথিবী থাকল না।  অনুমান ৩৫ লাখ বছর আগে সত্যযুগের প্রথম দিকে মান্ধাতা রাজত্ব করেছিলেন। সেই কারণে অনেক প্রাচীনকাল বা অতি পুরানো কিছু বোঝাতে ‘মান্ধাতার আমল’ কথাটি বলা হয়। কিন্তু মান্ধাতার আগে তো আরও অনেক রাজা রাজত্ব করে গেছেন, তাহলে অতি প্রাচীনকাল বোঝাতে মান্ধাতার নাম কেন আসে?

কারণ, মান্ধাতা ছিলেন পৌরাণিক যুগের প্রথম মহাপরাক্রমশালী রাজা। সেকালে তাঁর মতো বিশ্বজোড়া খ্যাতি আর কোনো রাজা অর্জন করতে পারেননি। স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র পর্যন্ত তাঁকে সমীহ করে চলতেন। তাই বিখ্যাত পৌরাণিক শাসকদের মধ্যে মান্ধাতাই ছিলেন প্রাচীনতম মহাপরাক্রমশালী নৃপতি। সংগতকারণে প্রাচীনকালের রাজার কথা বলতেই প্রথম তাঁর নামই চলে আসে।

মান্ধাতার মৃত্যু নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত। কোথাও বলা হয়েছে— মান্ধাতা বিশাল ধনসম্পত্তি ত্যাগ করে বানপ্রস্থে গিয়ে ভগবান বিষ্ণুর চরণে আশ্রয় নিয়েছিলেন। মহাভারতে বলা হয়েছে‚ মান্ধাতা লবণাসুরের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হন। ইক্ষ্বাকু বংশের উত্তরাধিকারী হিসেবে রাজা দশরথ ও তাঁর পুত্রগণ মান্ধাতার বংশধর। দশরথপুত্র শত্রুঘ্ন লবণাসুরকে হত্যা করে মান্ধাতা-হত্যার প্রতিশোধ নেন ।

মান্ধাতার আমল: কে এই মান্ধাতা

লিংক: https://draminbd.com/মান্ধাতার-আমল-কে-এই-মান্ধ/

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com

error: Content is protected !!