মালি (Mali) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম

ড. মোহাম্মদ আমীন

মালি (Mali)

মালি পশ্চিম আফ্রিকার একটি স্থলবেষ্ঠিত স্বাধীন রাষ্ট্র। পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশটির উত্তরে প্রায় অর্ধেক এলাকা জুড়ে রয়েছে সাহারা মরুভূমি। দেশের বাকি অংশ সবুজ তৃণভূমি। গরিব কৃষিভিত্তিক দেশটিতে বিভিন্ন সময়ে খরায় বহু মানুষ ও প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে। দেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষ্ণকায় আফ্রিকি, তাদের বাস গ্রামাঞ্চলে এবং জীবিকা কৃষিকাজ ও পশুপালন। মালিতে বহু খনিজ পদার্থ থাকলেও ব্যবহার খুব অল্প। দেশের জীবনযাত্রার মান ও মাথাপিছু আয় খুব নিম্ন।

মেলেইনকা (Malinke) শব্দ হতে মালি নামের উদ্ভব। মেলইনকা হচ্ছে একটি জাতিগোষ্ঠী, যারা ১২৩০ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত মালি সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মেলেইনকা নামটি তাদের প্রতিবেশী দিয়েছিল। আসলে ওই জনগোষ্ঠীর আসল নাম ছিল ম্যান্ডিনকা (Mandinka)। যার অর্থ ম্যান্ডেনের অধিবাসী (people of Manden)। প্রতিবেশীরা ম্যান্ডিনকা নামকে ভুলবশত মেলেইনকা উচ্চারণ করত। ফলে নামটি দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। নাইজার নদীর অববাহিকায় ম্যান্ডিনকা গোষ্ঠীর লোকের আবাস ছিল। পশ্চিম আফ্রিকায় এখনও ১১ মিলিয়নের অধিক ম্যান্ডিনকা জাতির লোক রয়েছে। মালিনকে (Malinke) ও বামানা (Bamana) ভাষায় মালি শব্দের অর্থ জলহস্তী।

পশ্চিম আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণশাসিত রাষ্ট্র মালি। এটাকে ঘানা সাম্রাজ্যের সুচনাগার বা দোলনা বলা হয়। ৩০০ থেকে ১৫০০ অব্দ পর্যন্ত দেশটি আফ্রিকার তিনটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য ঘানা, মালি ও সোঙ্গাই সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দেশটি ফরাসিদের অধিকারে ছিল। ফ্রান্স তাদের ওয়েস্ট আফ্রিকান উপনিবেশের অংশ হিসাবে এটি শাসন করত এবং ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে নাম দিয়েছিল সুদান। যা এখনও সুদান নামে পরিচিত। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ সুদান মিশরের অধীনে ছিল। সুদান/মালি, ফ্রান্স শাসিত সেনেগালের সঙ্গে যুক্ত মালি ফেডারেশন হতে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুন ফ্রান্স হতে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ মালির বর্তমান পতাকা গৃহীত হয়।

২০১১ খিস্টাব্দে থেকে মালির উওর প্রান্তে তুয়ারেগ জাতি গোষ্ঠীর বিদ্রোহ দেখা দেয়। বিদ্রোহ দমনে সরকারি ব্যর্থতার অভিযোগে মধ্যম পদের কিছু সেনা ২০১২ খ্রিস্টাব্দের ২২ মাচ রাষ্ট্রপতি আমাদো টোরেকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক শাসন জারি করে। অভ্যুত্থান পরবর্তী বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিদ্রোহীরা দেশের উত্তর প্রান্তের তিনটি অঞ্চল অধিকার করে নেয়। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে অঞ্চলগুলো পুনদখলে অভিযান শুরু করে সেনাবাহিনী। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ২০ নভেম্বর মালির রাজধানী বামাকোর র‌্যাডিসন ব্লু হোটেলে আল কায়েদা ইন ইসলামি মাগরেব নামের উগ্রপন্থী গ্রুপের নির্বিচার গুলি বর্ষণে ২৭ জন নিহত হয়।

মালি আফ্রিকার অষ্টম বৃহত্তম দেশ। এর মোট আয়তন ১২,৪০,১৯২ বর্গকিলোমিটার বা ৪,৭৮,৮৩৯ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগের পরিমাণ ১.৬%। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের আদম শুমারি অনুযায়ী মালির জনসংখ্যা ১,৪৫,১৭,১৭৬ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটার লোকসংখ্যা ৩০.৩ জন। আয়তন বিবেচনায় মালি পৃথিবীর ২৪-তম বৃহত্তম দেশ এবং জনসংখ্যা বিবেচনায় ৬৭-তম। কিন্তু জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় পৃথিবীর ২১৫-তম জনবহুল দেশ।

২০১২ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, মালির জিডিপি (পিপিপি) ১৭.৯৮৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ১,১০০ ইউএস ডলার। অন্যদিকে, জিডিপি (নমিনাল) ১০.৩১৯ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৬৩১ ইউএস ডলার। মুদ্রার নাম ওয়েস্ট আফ্রিকান ফ্রাঙ্ক। বামাকো দেশের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। সরকারিভাবে মালির অধিবাসীদের মলিয়ান বলা হয়। সরকারি ভাষা ইংরেজি। তবে দেশটির অধিকাংশ লোক বাম্বারা (Bambara) ভাষায় কথা বলে। অধিবাসীর ৯০% মুসলিম, ৫% খ্রিস্টান এবং বাকিরা প্রাচীন আঞ্চলিক ধর্মরীতির অনুসারী।

মালিয়ান স¤্রাট মানসার মুসার ১৩০০ খ্রিস্টাব্দে হজ্ব যাত্রার ঘটনা মালিকে বিশ্বে পরিচিত করে তোলেছিল। মানসার মুসা হজ্জ যাত্রাকালে ১২,০০ দাস, ৬০,০০০ সঙ্গী এবং ৫০-৩০ পাউন্ড স্বর্ণবোঝাই ৮০টি উট নিয়ে হজের উদ্দেশ্যে মক্কা গমন করেন। যাত্রপথে তিনি প্রতি শুক্রবার যেখানে থেমেছেন, সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন। তিনি এত স্বর্ণ দান করেছিলেন যে, যাত্রাপথের প্রতিটি দেশে মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছিল। এক সময় মালি ছিল স্বর্ণে স্বর্ণে ভরপুর একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র। এখন মালি পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশের একটি। এখানকার ৭০% লোকের দৈনিক আয় ১ মার্কিন ডলারেরও কম। ১০ ভাগেরও কম লোক দৈনিক ২ ডলার আয় করে। অধিবাসীর ৫০% দরিদ্রসীমার নিচে বাস করে। মালির জেনেতে (Djenne) অবস্থিত গ্রেট মসজিদ কাদার তৈরি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মসজিদ।

বামাকো পৃথিবীর ৬ষ্ঠ দ্রুততম জনসংখ্যা বৃদ্ধির শহর। বামাকো শব্দের আক্ষরিক অর্থ কুমির নদী (ঈৎড়পড়ফরষব জরাবৎ)। আসলেই ঠিক। কেউ যদি পাশের নদীর সবচেয়ে কম গভীর জলের স্থানেও মাথা ডুবান, তো তিনি কুমির দেখতে পাবেন। এখানে ৪০টির মতো ভাষা প্রচলিত আছে। তবে সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা বাম্বারা। প্রতি দশজন লোকের ৮ জন বাম্বারা ভাষায় কথা বলে। যদিও সরকারি ভাষা ফ্রেঞ্চ। এখানকার জনগণের কেবল ৫০% পড়তে পারেন।

মালিয়ানদের জাতীয় পানীয় মিষ্টি চা। এটি একই কাপে পর পর তিন বার পান করতে দেওয়া হয়। প্রথম কাপ মৃত্যুর মতো শক্তিশালী, দ্বিতীয় কাপ জীবনের মতো হালকা এবং তৃতীয় কাপ ভালোবাসার মতো মিষ্টি। চতুর্থ কাপ হলো আপনি আর মোটেও স্বাগত জানানোর মতো কেউ নন। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিদায় হন। মালিকে একসময় ঘানা বলা হতো। ঘানা সা¤্রাজ্য (৮০০-১২৩০ খ্রিস্টাব্দ) পশ্চিম মালিভিত্তিক ছিল। সে সময় এটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্র। অষ্টাদশ শতকের পরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইবরাহিম আল ফাজারি মালিকে বলেছেন স্বর্ণ-ভূমি।

আফ্রিকা মহাদেশ : ইতিহাস ও নামকরণ

রিপাবলিক অব দ্যা কঙ্গো

ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো  (Democratic Republic of the Congo)

কোট ডিআইভরি বা আইভরি কোস্ট (Côte d’Ivoire) : ইতিহাস ও নামকরণ

জিবুতি (Djibouti) : ইতিহাস ও নামকরণ

  সূত্র: কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা

error: Content is protected !!