মাল্টা (Malta) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (ইউরোপ)

ড. মোহাম্মদ আমীন

মাল্টা (Malta)

মাল্টা নামটি গ্রিক বা পোয়েনিসিয়ান (Phoenician) ভাষা হতে উদ্ভুত। দুই সংস্কৃতির বেশ মিল ছিল। তবে খ্রিষ্টপূর্ব  ৭০০ অব্দে বা তার পূর্বে গ্রিকরাই এ ভূখণ্ডে প্রথম পদার্পন করেছিল। এ বিষয়ে ইতিহাসে অনেক সাক্ষ্য আছে। গ্রিকদের কাছে দ্বীপটি মেলিটা (Melita) নামে পরিচিত ছিল। এর অর্থ (honey) মধু। কথিত হয়, এখানে একসময় প্রচুর মধু উৎপন্ন হতো।  পোয়েনিসিয়ান (Phoenician) ভাষায় দেশটিকে বলা হতো ম্যালেথা (Maleth)। এর অর্থ (a haven)স্বর্গ। প্রাকৃতিক দৃশ্য, আবহাওয়া ও জনগণের ব্যবহার দেশটিতে সত্যিকার অর্থে স্বর্গের মতো গড়ে তুলেছিল। তাই এর নাম হয় মাল্টা।  

মল্টানভাষা ও ইংরেজি ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র মাল্টার সরকাররি ভাষা। এখানকার প্রায় সবাই মাল্টীয় ভাষাতে কথা বলে। এছাড়াও প্রায় ৮০% লোক ইংরেজিতে, ৬৬% লোক ইতালীয় এবং ১৭% লোক ফরাসি ভাষায় কথা বলতে পারে। স্কুল কলেজে এগুলি ছাড়াও জার্মান, রুশ ও স্পেনীয় ভাষাও শিক্ষা  দেওয়া হয়। মাল্টার রাজধানী ভাল্লেত্তা।

মাল্টার আয়তন ৩১৬ বর্গকিলোমিটার বা ১২২ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগের পরিমাণ ০.০০১%। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, মাল্টার মোট অধিবাসী ৪,৪৫,৪২৬ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যা ১৪১০। আয়তন বিবেচনায় মাল্টা পৃথিবীর ২০৭-তম এবং জনসংখ্যা বিবেচনায় ১৭১-তম হলেও জনসংখ্যার ঘনত্ব বিচেনায় এটি পৃথিবীর ৭ম জনবহুল দেশ। মাল্টার রাজধানী ভালেট্টা কিন্তু বৃহত্তম শহর বিকিরকারা। মাল্টার দাপ্তরিক ভাষা মাল্টিজ ও ইংরেজ। প্রধান ধর্ম রোমান ক্যাথলিক। সরকারিভাবে মাল্টার অধিবাসীদের মাল্টিজ বলা হয়। ১৫০ বছর পরাধীন থাকার পর ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ২১ সেপ্টেম্বর দেশটি যুক্তরাজ্য হতে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ ডিসেম্বর এটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ২১ সেপ্টেম্বর মাল্টার জাতীয় পতাকা গ্রহণ করা হয়।

২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, মাল্টার জিডিপি (পিপিপি) ১৪.১২৯ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ৩৩,২১৫ ইউএস ডলার। অন্যদিকে, জিডিপি (নমিনাল) ১০.৫৮২ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ২৪,৮৭৬ ইউএস ডলার। ইউরো দেশটির বিনিময় মুদ্রা হিসাবে স্বীকৃত।

ক্যালিপ্সো (Calypso Cave) মাল্টার একটি ঐতিহাসিক গুহা। কথিত হয়, অডিসি মহাকাব্যে হোমার ক্যালিপসো গুহা সম্পর্কে লিখেছেন। গুহাটি দেখতে আহমরি কিছু না হলেও চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য বিস্ময়কর রকমের সুন্দর। মাল্টা ও গোজোর সমুদ্র সৈকত পায়ে-হাঁটা পর্যটকদের স্বর্গভূমি হিসাবে পরিচিত। ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে  জাতিসংঘের প্রতিবেদন মতে, মাল্টা পৃথিবীর ৪৮-তম সুখী দেশ। এ জরিপে যুক্তরাষ্টের অবস্থান ১৭। 

সিসিলির ৫০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত গোজো, কমিনো ও মাল্টা নামের তিনটি দ্বীপ নিয়ে মাল্টা রাষ্ট্রের অবয়ব। তন্মধ্যে কমিনো দ্বীপ মূলত বসতিহীন। কোনো জনবসতি নেই। নীল হ্রদ এ দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ। এ দ্বীপে কোনো কার নেই। গোজোর উত্তর-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত সান ব্লাস সৈকত লাল বালির সৈকত হিসাবে পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। গোজোর রাজধানী ভিক্টোরিয়া। এটাকে রাবাতও বলা হয়। মধ্যযুগের স্মৃতিবিজড়িত সুন্দর সিটডেলার জন্য বিখ্যাত। এমডিনা (Mdina) মাল্টার প্রাচীনতম রাজধানী। দেওয়াল-ঘেরা এ শহরে অধিবাসীদের শুধু কার দিয়ে চলাচল করার অনুমতি আছে।

ইউনেস্কোর প্রতিবেদন মতে, মাল্টার বর্তমান রাজধানী ভেলেট্টা পৃথিবীর ঘনত্বতম ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত শহরের অন্যতম একটি। এটি  এ পর্যন্ত ইউরোপে পরিকল্পিতভাবে নির্মিত একমাত্র শহর। ১৫৬৫ খ্রিষ্টাব্দের জেরুজালেমের সেন্ট জন এর নির্দেশক্রমে শহরটি নক্সা অঙ্কন করা হয়। মাত্র ১৫ বছরের মধ্যে শহরটির বিনির্মাণ সম্পন্ন হয়। এটি পৃথিবীর দ্রুততম স্কেলড (quickest scaled) শহর। চমৎকার সূর্যাস্ত দেখার জন্য শহরটি যে কোনো বিবেচনায় অনবদ্য।

পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার কিছু অনবদ্য প্রাচীন স্থাপত্য, ভবন ও অবকাঠামো দেখতে হলে মাল্টা ভ্রমণ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। নিরবচ্ছিন্ন সূর্যালো এবং প্রাকৃতিক দৃশ্য ও আবহাওয়ার স্থিতিশীলতার জন্য মাল্টা বিশ্বের সিনেমা অভিনয়ের অন্যতম একটি স্থান। বিখ্যাত সিনেমা গ্ল্যাডিয়েটর, টরি এবং ক্যাপ্টেন ফিলিপস হতে শুরু করে আরও অনেক বিখ্যাত ছবি এবং টিভি শো-এর অভিনয় এখানে হয়েছে। অদ্বিতীয় স্বাদের নানা রকম সুস্বাদু খাবার প্রস্তুত ও উপভোগে মাল্টার জুড়ি মেলা ভার। মাল্টিজ দ্বীপসমূহে ৩৫০টি গির্জা রয়েছে।

————–

লিচটেনস্টেইন (Liechtenstein) : ইতিহাস ও নামকরণ

লিথুয়ানিয়া (Lithuania) : ইতিহাস ও নামকরণ

লুক্সেমবার্গ (Luxemburg) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

Knowledge Link

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

 

error: Content is protected !!