মূধন্য-ণ ও দন্ত্য-ন এর উচ্চারণ

ড. মোহাম্মদ আমীন
অশুদ্ধ উচ্চারণে আমার মতো দক্ষ আর আছে বলে মনে হয় না। কখনও সচেতনভাবে উচ্চারণ শেখার চেষ্টা করিনি, চট্টগ্রামে থাকাকালীন এর প্রয়োজনীয়তাও অনুভূত হয়নি। চাকুরিতে ঢোকার পর বুঝলাম শুদ্ধ উচ্চারণের গুরুত্ব অপিরিসীম। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার জন্মপ্রভাবে আমার বক্তৃতার ‘ভালো ভালো কথা’ গলা থেকে বের হতো ‘বালো বালো কতা’ হয়ে। তাই শ্রোতৃবৃন্দ না-হেসে পারতেন না। ‘আমড়া’ হয়ে যেত আমরা, ‘ধন্যবাদ’ হয়ে যেত দন্যবাদ। হাসি থামানোর জন্য বক্তৃতার শুরুতে আমার দুর্বলতা প্রকাশ করে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করতাম। এটাতে হাসি বন্ধ হতো কিন্তু প্রমিত উচ্চারণের জন্য আমার মনের কান্না বন্ধ হতো না।। এভাবে বুড়ো হয়ে গেলাম।
কিছুদিন আগে অক্সফোর্ড শ্যায়ারে রচনার বাসায়, আমার “ফল নয়, ভাত খাব” কথা শুনে বলল,
ভাব্বা, আপনি কিন্তু ‘‘পল নয়, বাদ খাব’’ বলেছেন।
এ বয়সে উচ্চারণ শিখতে হবে ?
শেখার কোনো বয়স নেই।
উস্তাদ কে হবে?
আমি।
এখন মাঝে মাঝে ওখানে গেলে উচ্চারণ শেখার চেষ্টা করি, যদিও শেষ বয়সে এমন অনিয়মিত শিক্ষার কার্যকরতা নিয়ে আমার যথেষ্ট সংশয় আছে। এবার আসি আসল কথায়।
একদিন বললাম, দন্ত্য-ন ও মূর্ধন্য-ণ উচ্চারণে কোনো তফাত নেই।
রচনা বলল, অবশ্যই আছে। বর্ণ যেহেতু ভিন্ন উচ্চারণও সেহেতু ভিন্ন হবেই। তবে পার্থক্য সূক্ষ্ম বলে অনেকে ধরতে পারে না।
কীভাবে উচ্চারণ করব?
মূর্ধন্য-ণ ট-বর্গের বর্ণ। তাই ট ঠ ড ঢ বর্ণসমূহের উচ্চারণস্থলই ণ-বর্ণের উচ্চারণ-স্থল।
দন্ত্য-ন হচ্ছে ত-বর্গের বর্ণ। তাই ত থ দ ধ বর্ণের উচ্চারণস্থলই ন-এর উচ্চারণ-স্থল।
দাঁতের যে স্থানে জিহ্বা লাগিয়ে আমরা ত থ দ ধ উচ্চারণ করি সেই একই স্থানে হালকাভাবে জিহ্বা লাগিয়ে দন্ত্য-ন উচ্চারণ করতে হবে। ন-উচ্চারণ-স্থানের একটু উপরে মূর্ধার যে স্থানে জিহ্বা লাগিয়ে ট ঠ ড ঢ উচ্চারণ করা হয় ঠিক সেই স্থানে অপেক্ষাকৃত হালকা আদরে জিহ্বা লাগিয়ে ণ উচ্চারণ করতে হবে। এভাবে উচ্চারণ করলে উভয় বর্ণের উচ্চারণ-পার্থক্য কিছুটা হলেও অনুভব করা যাবে।
জন গণ মন অধিনায়ক করুন বরণ হে
গণনা করুণানিধি কৃষ্ণ করুণা হে।
উপরের বাক্য দুটোর জন, গণ, মন, অধিনায়ক, করুন, বরণ, গণনা, করুণানিধি, কৃষ্ণ, করুণা শব্দগুলোর মূর্ধধন্য-ণ ও দন্ত্য-ন বর্ণনামতে উচ্চারণ করলে উচ্চারণ পার্থক্যটা আরও স্পষ্ট হয়ে যাবে। এভাবে উচ্চারণ করুন : ধরন, ধারণ, কারণ, কর্তন – – -।
আমি বললাম, দন্ত্য-স আর মূর্ধন্য-ষ কী হবে?
দন্তের যে স্থানে জিহ্বা লাগিয়ে ট ঠ ড ঢ ণ- উচ্চারণ করা হয় সেখানে জিহ্বা লাগিয়ে ষ- উচ্চারণ করুন। আর যে স্থানে জিহ্বা লাগিয়ে ত থ দ ধ ন- উচ্চারণ করা হয় সেখানে জিহ্বা লাগিয়ে স- উচ্চারণ করুন। জিহ্বার ডগাকে তালুর সঙ্গে লাগিয়ে দিলে এসে যাবে শ। যেমন : সতিন মনে শতিন নয়।
বিশ বোতল বিষ।
দশ সাল আগে কেনা শাল।
পরিষ্কারের পুরস্কার
মেস থেকে বহিষ্কার।
শেষ

 

Language
error: Content is protected !!