মৌরসি পাট্টা, পাট্টা ও চিট্‌ঠা, মওরস মৌরসি, ওয়ারিশ অর্শা, ঔরস ওয়ারিশ, উৎস ও বৎস, আরবি মত্ব স়ত্ব জ্ঞান

আরবির মত্ব স়ত্ব জ্ঞান
আরবিতে কোনও মূল শব্দ থেকে সেই শব্দ-সম্বন্ধী নতুন শব্দ তৈরি হওয়ার অন্যতম নিয়ম হচ্ছে—  শব্দটার সামনে একটা ম বসা এবং কিছু ধ্বনির একটু আধটু এদিক ওদিক হওয়া। যেমন, হাম্‌দ্‌ praise মুহাম্মদ praised, দর্‌স্‌ lesson মাদ্‌রাসা school; তেমনি সফর্‌-মুসাফির্‌ ইসলাম-মুসলিম জিহাদ-মুজাহিদ শায়র্‌-মুশায়রা নজ়র্‌-মন্‌জ়ুর্‌ ইনাম-মুনিম ঈমান-মুমিন রহম্‌-মরহুম্‌ ইল্‌ম্‌-মালুম। এরকম সহস্র এক আরব্য বচনীর উদাহরণ আছে। এমনকি শব্দের বহুবচন করতে বা বৃদ্ধি-বহুত্ব বোঝাতেও এই নুশ্‌কা কাজে আসে। যেমন নাফা-মুনাফা করার্‌-মুকরার্‌ বারাক-মুবারক। 
আরবির চতুর্থ বর্ণ ث থ়। এর উচ্চারণটা সহজ না, থ আর স এর মাঝামাঝি। সাহেবরা এর থ নিয়েছে আর বাঙালীরা এর স শ নিয়েছে। যেমন Hadith মানে হাদীস। হদিস হদিশ। আরবি পড়া বাঙালি ث এর মূলঘেঁষা উচ্চারণ মনে করিয়ে দিতে কখনও কখনও এটাকে দিয়ে লিখত। এই কারণেই আরবি মিথ়্‌ল্‌ বাংলায় মিছিল হয়ে রয়ে গিয়েছে। তবে এককালের হাদীছ এখন হাদিস হয়ে গেছে। যদিও এখনও অনেক আরবি-পড়া বাঙালি ث এর জায়গায় স এর বদলে পছন্দ করেন।
উৎস ও বৎস
অঙ্ক আর কম্পিউটারে ট্রি বোঝাতে পেরেন্ট-চাইল্ড কথাটা খুব ব্যবহার হয়। কোত্থেকে বেরিয়েছে আর কে বেরিয়েছে, কে জন্ম দিয়েছে কে জন্মেছে, জনক কে জাতক কে, উৎস কে বৎস কে।
ঔরস ওয়ারিশ
আরবিতে বৎস বাচ্চা অওলাদ সন্তান জাতক ইত্যাদি এবং এর সঙ্গে ভাবার্থে মেলে এমন অজস্র শব্দের মূল শব্দটা وارِث ৱারিথ় ৱারিস্‌ ওয়ারিশ। ওয়ারিশ আরবির খুব প্রাচীন একটা শব্দ, তাই এটা থেকে বহু শব্দের জন্ম হয়েছে। এরই হিব্রু wirθ wariθ, একই মানে। আমার নিজের মনে হয় – আরবি ওয়ারিশ, হিব্রু wariθ আর সংস্কৃত ঔরস একই শব্দ। যদিও সংস্কৃতওলারা বলছে উরঃ মানে বুক থেকে জন্মেছে তাই ঔরস পুত্র। বুক থেকে জন্ম …। কে জানে বাবা কী ব্যাপার। এটা বলতে পারব না, তবে এমনিতে বাজারে প্রচুর ফেক এটিমোলজি আছে এটা জানি। শুনলাম পুৎ নামের নরক থেকে উদ্ধার করে, তাই পুত্র পুত্ত্র – এটা ফেক নিউজ, যদিও বহু যুগ ধরে ভাইরাল। আর একটা কথা – ৱারিথ় wariθ herit কথাগুলোর বানান উচ্চারণ এবং মানে বড্ড একরকম।
ওয়ারিশ অর্শা
বাবা মারা গেলে সম্পত্তি পাবে সন্তানরা, কারণ তারাই তাঁর ঔরস জাতক ওয়ারিশ। সে কারণে এখন ওয়ারিশ মানে দাঁড়িয়েছে উত্তরাধিকারী। যে যে ভাষায় ওয়ারিশ কথাটা চলে, সেই সব ভাষাতেই এই মানেটাও চলে। ‘এত বড়ো সম্পত্তির কোনও ওয়ারিশ নেই’। ওয়ারিশ কথাটার পারসি কায়দায় করা বহুবচন ওয়ারিশান কথাটাও বাংলায় চলে। ১৭৮২. ওগুস্তেঁ ওসাঁ তাঁর বইতে লিখেছেন – “আমার পুত্র পৌত্রাদী ও ওয়ারিস আন সহিত কস্মিন কালে দাওয়া নাই’’।
ওয়ারিশ থেকে বাংলায়িত একটা কথা আছে – অর্সা অর্শা অর্শানো। ‘পিতার সম্পত্তি পুত্রে অর্শে’, ‘যত অন্যায় সব তুই করবি আর তার সব দোষ আমাতে অর্শাবে’। ১৮২৫. সমাচার দর্পণে ছাপা হয়েছে— ‘‘যাহার উপর এই আইন না অর্শিবে…।” ১৮৬১. হুতোমের নকশায় আছে— ‘‘স্ত্রীর রক্ষণাবেক্ষণের ভারও তাঁদের উপর আইন মত অর্সায়।” ১৮৭৩. দীনবন্ধু মিত্র কমলে কামিনী নাটকে লিখছেন— “কাছাড়ের সিংহাসন আমাকেই অর্শে।”
ওয়ারিশ থেকে আসা দুটো কথা উর্দু- হিন্দিতে আছে – ৱিরাসত আর ৱরশাল। বাপদাদার সূত্রে যা পাচ্ছে ৱারিস-রা তা ৱিরাসত্‌ inheritance উত্তরাধিকার। ৱারিস থেকে ৱিরাসত। বর্তমান মালিকের মৃত্যুতে তার ওয়ারিশের নামে মিউটেশনকে বলে ৱরশাল।
মওরস্‌ মৌরসি
বৎস-র আরবি ছিল وارِث ৱারিথ় ৱারিস্‌ ওয়ারিশ। এতে ম যোগ করে উৎস-র আরবি হলো مورث মও্‌রথ়্‌ মৌরস; তা থেকে পারসি হয়ে উর্দু-হিন্দিতে  موروث মওরুথ়্‌ মৌরুস। অর্থাৎ কিনা মৌরস মৌরুস মানে জনক। এই একটা শব্দ দিয়েই আরবীতে জনক জননী জিন জেনেসিস এবং এর সঙ্গে ভাবার্থে মেলে এমন অজস্র কথাকে বোঝানো হয়। যেমন পূর্বপুরুষও মৌরস। আজকালকার আরবি বায়োলজি বইতে প্রাণীদেহের জিন বোঝাতেও এই মৌরস শব্দটাই ব্যবহার হয়। ঔরস জাতক, মৌরস জনক, আর তার সঙ্গে -ই প্রত্যয়িত বিশেষণ মৌরসি মানে জনকের বাপতি বাপুত্তি পৈতৃক বাপদাদার। উর্দু-হিন্দিতে মৌরুসি চলে, বাংলায় মৌরসি-টা বেশি চলে। তবে বাংলা উচ্চারণ মৌরোশি। আরবি و দিয়ে ও উ দুটোই বোঝায়। মৌরসি জায়দাদ— পৈতৃক সম্পত্তি, মৌরসি ভাড়াটে—বাপদাদার আমল থেকে বাস করে আসছে যে ভাড়াটে পরিবার।
১৮৭৩. সুলভ সমাচার পত্রিকায় লেখা হয়েছে—  ‘‘প্রজাগণের মৌরস স্বত্ব বিলোপ’’ ।
পাট্টা ও চিট্‌ঠা
উত্তর ভারতে ফিতেকে বলে পাট্টা। এটা দেশি শব্দ। যা পাট পাট করে মানে টান টান করে রাখা যায় তাই পাট্টা। মাটিতে পাট শুকোতে দেয় পাট পাট করে। মেরে পাট করে দেওয়া মানে মেরে লম্বা করে শুইয়ে দেওয়া, আর মেরে গুটিয়ে দেওয়া মানে কুণ্ডলী পাকিয়ে দেওয়া। মাথায় গামছার ফেট্টিও পাট্টা। কুকুরের গলার বেল্টও পাট্টা। ‘উসকে গলে মে পট্টা বাঁধকে লে আও’। মেয়েদের মাথায় বাঁধার ফিতে, জ্বরে মাথায় দেবার জলপটি— সবই পাট্টা। গালপাট্টা, কানপট্টি। দুবার পাট করলে দোপাট্টা। মানে পাট্টা পট্টি ফেট্টি ফিতে হরেদরে একই জিনিস। দফতরি কাগজ লাল ফিতের ফাঁসে বাঁধা থাকে, এই ফিতেটাও পাট্টা, সাহেবদের রেড টেপ।
জমিদারি দফতর থেকে রায়ত যখন কোনও খাজনার হিসেবের বা জমির স্বত্বের বা ভোগ দখলের একটা খসড়া করচা পরচা টাইপের ছিট কাগজ পেতো তাকে প্রজারা বলত— কাচ্চা চিট্‌ঠা – কাঁচা ছিট কাগজ, এটার তত জোর থাকতো না। কিন্তু ফাইনাল সেটলমেন্টের পর, প্রজা তার স্বত্ব অধিকার দায় বুঝে যে কাগজাত পেতো সেটা স্ট্যাম্পড্‌ মোহর লাগানো একটা পাকা দলিল, সেটা বেশ কিছু পাতা ভরা, ফারসিতে প্রচুর লেখালেখি করা মোটা দস্তাবেজ হতো। এই দলিলটা আড়ে দিঘে ফিতে দিয়ে মানে পাট্টা দিয়ে তরিবত করে বেঁধে রায়তকে দেয়া হতো। এটা প্রজাদের কাছে ছিলো আকুল কাঙ্ক্ষিত পাট্টাওয়ালা কাগজ, পাট্টা দলিল। এই পাকা দলিলটাই তার ফিতের পরিচয়েই হয়ে গেলো পাট্টা দলিল বা শুধুই পাট্টা।
জমিদার রায়তকে কখনও কোনও জমির মালিকানা দিত না, শুধু চাষের জন্য লিজ় দিত। একে বলে জমি জমা নেওয়া, এখান থেকেই জমিজমা কথাটা। মানে জমি আমার, তুমি এ বছর বা এই ক বছর চাষ করো, আমাকে খাজনা দিতে থাকো, না পারলে লেঠেলের মার খাও, জমি ছাড়ো। তাই এই পাট্টাবাঁধা দলিলটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হতো লিজ় ডিড। এই কারণে পাট্টার আসল মানে ফিতেবাঁধা দলিল হলেও পাট্টা মানে সর্বত্র লেখা আছে লিজ় এগ্রিমেন্ট।
পাট্টাপ্রাপ্ত প্রজাকে বলা হতো পাট্টাদার। পাট্টা পেতে গেলে জমিদারকে একটা থোক টঙ্কা দিতে হতো, সেটা পাট্টাসেলামি। পাট্টা দিত যে আমলা তাকে বলতো পাট্টাৱার পাটাওয়ার। ‘পাটোয়ারী বুদ্ধি’ এই পাটাওয়ারের। পাট্টার মিউটেশন করাকে বলে পাট্টানামা।
মৌরসি পাট্টা
মোগল আমলের জমিদারি সিস্টেম নিয়ে সে অনেক কথা। তা নিয়ে গাদা গাদা বই, হুমদো হুমদো ডিকশনারি হয়। আমরা শুধু মৌরসি পাট্টা কথাটাই বুঝবো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে যে সব জমির রায়ত তার বাপদাদার আমল থেকে যেসব চষে আসছে এবং জমিদার তার খাজনা আদায়ে সন্তুষ্ট, সেক্ষেত্রে জমিদার সেই রায়তের সঙ্গে সেইসব জমিজিরেত নিয়ে একটা চিরস্থায়ী এগ্রিমেন্ট করত। তাতে বলা থাকত—  রায়ত এর পর থেকে তার বংশানুক্রমে এই জমি চাষ ও ভোগ করতে পারবে, সরকার কোনওদিন আর তার কাছ থেকে জমি আর ছাড়িয়ে নেবে না। তার মানে মৌরস থেকে ঔরস এবং তার ওয়ারিশানে এই অধিকার চারিয়ে যেতে থাকবে। এই বলে যে পাট্টা দেওয়া হতো সেটাই মৌরসি পাট্টা। এটা ঘুরিয়ে প্রায় মালিকানা পাবার মতোই। তার মানে মৌরসি পাট্টা যে পেয়েছে, তাকে আর সেখান থেকে উৎখাত করা যাবে না। এই মানেতেই বাংলা ইডিয়ামটা – মৌরসি পাট্টা নিয়ে গেড়ে বসা।
১৮৩৯. সমাচার দর্পণে লেখা হয়েছে— “তাহাতে মৌরুসী পাট্টাদারেরই স্বত্ব।” ১৮৬৬. দীনবন্ধু মিত্র লিখেছেন— “সাড়ে তিন হাত ভূমির মৌরসি পাট্টা লওয়া কর্তব্য।” শ্যামাসঙ্গীতে আছে — “বিষম পাগল জটে ব্যাটা, শ্মশান ত তার মৌরস পাটা।”
মৌরসি পাট্টা পেলেও খাজনাটা কিন্তু চালিয়ে যেতে হতো। তবে তার মধ্যেও ব্যাপার আছে। যে পাট্টাতে ক়রার করে লেখা থাকত, যে এই হলো তোমার খাজনা, যার পরিমাণ ফিক্সড, পরে কোনওদিন বাড়বেও না কমবেও না তাকে বলতো মৌরসি মুকরারি।
error: Content is protected !!