মৌসুম মৌসুমি, অংশগ্রহণ ও অংশ গ্রহণ এবং ব্যথিত ব্যতীত

ড. মোহাম্মদ আমীন
মৌসুম ও মৌসুমি
মৌসুম: মৌসুম, আরবি উৎসের বাংলা শব্দ। উচ্চারণ: মোউ্শুম্। শব্দের অর্থ (বিশেষ্যে)—
  • ঋতু, কাল: এই মৌসুমে জমিটা চাষ করা গেল না।
  • দক্ষিণ পশ্চিম দিক থেকে আগত বায়ুস্রোত যার প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষা ঋতুর সূচনা হয়, বর্ষাকাল: বর্ষা মৌসুমে জলে থই থই করে বিলঝিল।
মৌসুমি: মৌসুমি, ফারসি উৎসের বাংলা শব্দ।উচ্চারণ: মোউ্‌শুমি। মৌসুমি শব্দের অর্থ (বিশেষণে)—
  • বর্ষাকালীন, বৃষ্টি আনে এমন: মৌসুমি বায়ু।
  • ঋতুগত, বিশেষ ঋতুতে উৎপন্ন: মৌসুমি জ্বর, মৌসুমি ফল, মৌসুমি ফুল, মৌসুমি দুর্যোগ।

অংশগ্রহণ ও অংশ গ্রহণ

ড. মোহাম্মদ আমীন

‘অংশ’ ও ‘গ্রহণ’ শব্দদুটো পরস্পর সেঁটে বসে গঠন করেছে অংশগ্রহণ। এখানে ‘অংশ’ ও ‘গ্রহণ শব্দের সার্থক মিলন ঘটেছে। ফলে উভয়ের অর্থ বা মৌলিকত্ব বহুলাংশে ক্ষুণ্ন হয়েছে। যেমন হয়ে থাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে।

অন্যদিকে, ‘অংশ গ্রহণ’ দুটি পৃথক শব্দ নিয়ে গঠিত। এখানে ‘অংশ’ ও ‘গ্রহণ’ পরস্পর নিরাপদ দূরত্বে অবস্থানপূর্বক বাক্য-সমাজের শালীন শব্দ-ফাঁক বজায় রেখে অবস্থান করে। তাই অবিবাহিত নারী-পুরুষের মতো উভয় শব্দের অর্থ বা মৌলিকত্ব অক্ষুণ্ন থেকে যায়।
‘অংশগ্রহণ’ শব্দের অর্থ যোগ দেওয়া। যেমন: সভাপতি সাহেব যথাসময়ে সভায় অংশগ্রহণ করেছেন। ‘অংশ গ্রহণ’ বাগ্‌ভঙ্গির অর্থ ভাগ নেওয়া। যেমন: সমিরা তার পিতার সম্পত্তির প্রাপ্য ‘অংশ গ্রহণ’ করেছেন। অতএব ‘অংশগ্রহণ’ অর্থে ‘অংশ গ্রহণ’ লেখা সমীচীন নয়।
ব্যথিত ও ব্যতীত
 ‘ব্যথিত’ ও ‘ব্যতীত’ উভয় শব্দের অর্থ ভিন্ন।  ‘ব্যথিত’ শব্দের অর্থ— আঘাতপ্রাপ্ত; ব্যথাযুক্ত; দুঃখপ্রাপ্ত; ব্যথা পেয়েছে এমন। ‘ব্যতীত’ শব্দের অর্থ— বিনা; ছাড়া; বাদে; আওতামুক্ত বা প্রয়োজন নয় এমন।
জলৌকা ও জলৌকাবৃত্তি

জলৌকা: সংস্কৃত/তৎসম জলৌকা (জল+ওক+আ (টাপ)] অর্থ (বিশেষ্যে)—  নিজেকে সংকুচিত প্রসারিত করতে পারে এমন মসৃণ ও পেশিবহুল দেহবিশিষ্ট কেঁচোজাতীয় উভলিঙ্গ অমেরুদণ্ডী দুমুখো জলজ প্রাণী যা জীবদেহের রক্ত চুষে খেয়ে জীবন ধারণ করে; যাকে সাধারণভাবে জোঁক বলা হয়।জোঁক কেঁচোর মতে এনিলিডা পর্বের জীব। এরা এনিলিডা পর্বের হিরুডিনিয়া উপপর্ব গঠন করে। কেঁচোর মতো জোঁকেরও ক্লাইটেলাম ও গমনাঙ্গ সিটে (setae) আছে।

স্যাঁতসেঁতে ভিজেমাটিতে একজাতীয় খুদে জোঁক বাস করে। বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষায় এই খুদে জোঁকগুলো ‘খেউরা জোঁক/ খেউরাজোঁক বা ‘চিনা জোঁক/চিনাজোঁক’ নামে পরিচিত। যদি তিন-চারটি জোঁক একসঙ্গে একটি ছোট মনুষ্যশিশুর রক্ত শোষণ করে, তবে শিশুটি রক্তশূন্যতার জন্য মারাও যেতে পারে।
অনেকে মনে করেন, এজাতীয় খুদে জোঁকের উৎপত্তি স্থল চীন। তাই নাম চীনাজোঁক। এটি আসলে ঠিক নয়। বানানটি চীনাজোঁক নয়, চিনাজোঁক। ‘চিনাজোঁক’ শব্দে বর্ণিত চিনা, চীন বা চায়না নয়। এটি তামিল/তেলেগু ভাষার শব্দ। যার অর্থ ছোটো। অর্থাৎ চিনাজোঁক অর্থ: ছোটো জোঁক।
প্রয়োগ: শশা হেন মশাগুলো জলৌকা কুঞ্জর শুণ্ডাকার-কবি কঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী।
জলৌকাবৃত্তি: জলৌকাবৃত্তি অর্থ—  কোনোরূপ অবদান ব্যতিরেকে অন্যের সম্পদ ভোগ করে জীবন নির্বাহ করা,  নীরবে অন্যের সম্পদ হরণ করে নিজেকে পুষ্ট করা, অন্যকে শোষণ করে জীবিকা নির্বাহ করা, চৌর্যবৃত্তি। 
 বানান বিভ্রাট: চিনাবাদাম বনাম চীনাবাদাম; চীনাজোঁক বনাম চীনাজোঁক: 
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে লিখেছে— চীনাবাদাম। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ভুল থাকলে আমাকে ভুল লিখতে হবে, এমনটি আমি মনে করি না। এই অভিধানে অনেক ভুল আছে। যারা লিখেছেন তারা হয়তো ব্যুৎপত্তি জানেন না। চিনাজোঁক বানানটিও ভুল লিখেছেন। চীনেমাটি কীভাবে হয়? চীনা বানানে কীভাবে ঈ-কার হয়? চীন বানানে ঈ-কার হতে পারে, কারণ এটি তৎসম বলা হচ্ছে। চীনা, চীনে এগুলো বাংলা প্রত্যয়যোগে গঠিত শব্দ এবং তৎসম নয়। বাদাম ফারসি। আর চিন্না> চিনা তামিল শব্দ। সুতরাং, ঈ-কার বিধেয় নয়।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, চিনাঘাস, চিনাজোঁক, চিনাবাদাম, চিনামাটি, চিনেজোঁক, চিনেমাটি, চিনেবাদাম প্রভৃতি অতৎসম (বাংলা/বিদেশি/মিশ্র) শব্দ। বাংলা একাডেমি প্রণীত প্রমিত বাংলা বানানবিধিতে বলা হয়েছে, “অতৎসম শব্দে ঈ-কার হয় না।” তাই বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান যদি এসব শব্দের বানানে ঈ-কার দিয়ে থাকে, তাহলে ধরে নিতে মুদ্রণপ্রমাদ। আক্কেল থাকলে আগামী সংস্করণে শুদ্ধ করে নেবে।
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
আমি শুবাচ থেকে বলছি
error: Content is protected !!