যুদ্ধোত্তর নতুন বাংলা শব্দ, যুদ্ধকালীন শব্দ: যুদ্ধজাত শব্দ, যুদ্ধশব্দ; সামরিক জান্তা

ড. মোহাম্মদ আমীন

যুদ্ধোত্তর নতুন বাংলা শব্দ, যুদ্ধকালীন শব্দ: যুদ্ধজাত শব্দ, যুদ্ধশব্দ; সামরিক জান্তা

জান্তা জান্তা এবং সামরিক জান্তা

বাংলায় জান্তা বানানের দুটি শব্দ পাওয়া যায়। একটি -জান্তা এবং অন্যটি জান্তা। বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা  -জান্তা অর্থ— জানে এমন, অবগত (সবজান্তা); অভিজ্ঞ (ভবিষ্যজান্তা)। -জান্তা শব্দটির স্বাধীন ব্যবহার বিরল। এটি অন্য শব্দের পরে সেঁটে বসে নতুন অর্থ দ্যোতিত করে। যেমন: সবজান্তা শমসের, ভবিষ্যজান্তা রাসপুতিন, বেদজান্তা ত্রিবেদী। অন্যদিকে, জান্তা অর্থ— গ্যাং (নেতিবাচক অর্থে), হরণকারী দল, স্বেচ্ছাচারী গ্রুপ, পশুবৎ,  হত্যাকারী, অত্যাচারী। যেমন: সামরিক জান্তা, প্রাশাসনিক জান্তা। এই জান্তা সংশ্লিষ্ট বাক্য হতে ফাঁক

ড. মোহাম্মদ আমীন

রেখে বসে। এই জান্তার সঙ্গে আগের জান্তা (-জান্তা) গুলিয়ে ফেলা যাবে না।  অনেকে মনে করেন, স্প্যানিশ শব্দ জুন্টা হতে বাংলা জান্তা শব্দের উদ্ভব। স্প্যানিশ ভাষায় জুন্টা অর্থ— দল, গ্যাং। সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করার পর ওই বাহিনীর যে দল, গ্রুপ, কমিটি বা গ্যাং  জনস্বার্থ উপেক্ষা করে এককভাবে নিজেদের ইচ্ছেমতো স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে তাদের সামরিক জান্তা বলা হয়। বাংলায় এসে স্প্যানিশ জুন্টা, জান্তা রূপ ধারণ করে। তবে শব্দটি তার উৎস অর্থ হারায়নি, বরং আরো ব্যাপকতা পেয়েছে।  অনেকের মতো সংস্কৃত জান্তব (জন্তু+অ) হতে জান্তা শব্দটির উদ্ভব। তাদের মতে, এটি তদ্ভব শব্দ। যেটিই হোক, জান্তা বাংলা ভাষার জন্য একটি নতুন শব্দ। যুদ্ধকালীন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জান্তব কর্মকাণ্ড থেকে ঘৃণা প্রকাশার্থে জান্তা শব্দটির প্রসার ঘটে। 

যুদ্ধোত্তর বাংলা শব্দ: যুদ্ধোত্তর বাংলা শব্দ: ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হতে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত সংঘটিত যুদ্ধসমূহের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কারণে নানাভাবে নানা কারণে উদ্ভূত শব্দকে যুদ্ধোত্তর শব্দ বলা হয়। যুদ্ধকালীন বা যুদ্ধের পর সংবাদপত্র-সহ নানা প্রচার মাধ্যম; কবিসাহিত্যিকদের রচনা; গবেষকদের গবেষণা এবং আরো নানা ক্ষেত্রে এসব নতুন যুদ্ধোত্তর শব্দ সৃষ্টি হয়ে  বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। যুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তরকালে সৃষ্ট বা উদ্ভূত নতুন পরিবেশ-প্রতিবেশ, পরিস্থিতি, নতুন ভাব-ভাবনা, গবেষণা, অভিজ্ঞতা, পেশা, প্রাত্যহিক চাহিদার বহুমুখীনতা, আবিষ্কার প্রভৃতিকে ভাষায় অর্থপূর্ণভাবে প্রকাশের জন্য যুদ্ধোত্তর শব্দ প্রয়োজন হয়।  

যুদ্ধোত্তর নতুন বাংলা কথা/ (অ— ক)
 
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ শব্দগুলো বাংলায় নতুন প্রচলিত হয়। এরূপ কিছু শব্দ নিচে দেওয়া হল :
অন্তরিন(interned) : বিনাবিচারে বন্দি।
অসহযোগ(non-cooperation) : শাসনকার্যে সরকারকে সাহায্য না-করা।
আকাশবাণী : All India Radio.
আজাদ : মুক্ত, স্বাধীন।
 
আন্ডারগ্রাউন্ড(underground) : গুপ্তভাবে দেশের স্বাধীনতার চেষ্টা।
অফিস টাইম(office time) : অফিসে উপস্থিত হওয়ার সময়।
উদ্বাস্তু : গৃহহারা, যাদের ঘরবাড়ি ত্যাগ করতে হয়েছে।
অ্যাটাচে(attache) : সহদূত।
অরোড্রাম(aerodrome) : বিমানপোত উঠানামার স্থান।
 
এসেম্বলি(assembly) : সংসদের বৈঠক, বিধানসভা।
ওভারটাইম (overtime) : নির্দিষ্ট সময়ের অতিরিক্ত কাজ করার মজুরি।
ওয়াক ওভার (walk over) : বিপক্ষ দলের অনুপস্থিতিতে না-খেলেই জয়।
কার্ফু (curfew) : সান্ধ্য-আইন।
কাঁদুনে গ্যাস : (tear gas) : জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য পুলিশের ব্যবহৃত একপ্রকার গ্যাস।
 
কনট্রোল (control) : অন্নবস্ত্রাদি নির্দিষ্ট মূল্য ও পরিমাণে দেওয়ার সরকারি আদেশ।
কমিউনিটি প্রজেক্ট : জনসাধারণের উন্নতির জন্য গ্রামীণ পরিকল্পনা।
কালো টাকা (black money) : সরকারের প্রাপ্য ট্যাক্স না দেওয়ার জন্য গুপ্তভাবে টাকা গ্রহণ।
কালোবাজার : সরকার-নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্যে দ্রব্যাদি বিক্রির স্থান।
ক্যানটিন(canteen): কোনও কারখানা বা সংস্থার অভ্যন্তরে খাওয়ার স্থান।
 
কিউ (queue) : শ্রেণিবদ্ধভাবে কোনও কিছুর জন্য অপেক্ষা করা।
কুইসলিং (quisling): গৃহশত্রু।
 
 
 
যুদ্ধোত্তর নতুন বাংলা কথা/ (গ- ঝ)
 
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ শব্দগুলো বাংলায় নতুন প্রচলিত হয়। এরূপ কিছু শব্দ নিচে দেওয়া হল :
গণ-ডেপুটেশন (mass deputation) : একসঙ্গে বহুলোকের কোন দাবি পেশ করতে যাওয়া।
গণ-মিছিল : সর্বসাধারণের মিছিল।
গণ-স্বাক্ষর : জনসাধারণের স্বাক্ষরযুক্ত দরখাস্ত।
গ্রামদান : ভূ-দানের একটি পদ্ধতি।
 
গান্ধী ক্যাপ : গান্ধী টুপি।
গ্যারাজ (garage) : মোটরগাড়ি রাখার স্থান।
গুণ্ডাশাহি : গুণ্ডারাজ।
গুমটি (goomty) : অপ্রশস্ত দ্বারবিশিষ্ট গম্বুজাকৃতি ছোট কুটির।
চম্পল : একপ্রকার চটিজুতো।
 
ছিনতাই : হঠাৎ কোন কিছু কেড়ে নেওয়া।
জবর-দখল-কলোনি : জোরপূর্বক দখল করা জমিতে গৃহাদি নির্মাণ করে স্থাপিত বসতি।
জয়হিন্দ : হিন্দুস্থান অর্থাৎ ভারতবর্ষ জয়ী হোক।
জওহর কোট : জওহরলাল নেহেরু প্রবর্তিত একপ্রকার হাতকাটা কোট।
জিগির : রব তোলা, স্লোগান।
 
জিপ : সামরিক কাজে ব্যবহৃত একপ্রকার মজবুত ছোট মোটরগাড়ি।
ঝান্ডা : পতাকা।
 
যুদ্ধোত্তর নতুন বাংলা কথা/ (ট— ন)
 
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ শব্দগুলো বাংলায় নতুন প্রচলিত হয়। এরূপ কিছু শব্দ নিচে দেওয়া হল :
টকি (talkie) : সবাকচিত্র
ট্যাক্সি (taxi) : ভাড়াটিয়া মোটরগাড়ি।
ট্যাংক (tank) : যুদ্ধে ব্যবহৃত প্রায় সর্বগামী গোলাবর্ষি যানবিশেষ।
টিভি (TV) : টেলিভিশন।
 
ট্রাফিক জ্যাম (traffic jam) : জনতার ভিড়ে রাস্তা বন্ধ।
ডবল ডেকার (double decker) : দোতালা বাস।
তেভাগা : জমিতে উৎপন্ন ফসলের এক তৃতীয়াংশ কৃষককে শুধু শ্রমের জন্য দেওয়ার পদ্ধতি।
তুফান মেল : দ্রুতগামি রেলগাড়ি।
ধোঁয়াসা (smog) : ধোঁয়া ও কুয়াসা।
 
নই তালিম : নতুন শিক্ষা।
নিয়ন বাতি : নিয়ন গ্যাসে পূর্ণ বৈদ্যুতিক বাতি।
নো-হাউ (know-how) : যন্ত্রবিদ্যা সম্পর্কে জ্ঞান।
নেফা (NEFA) : উত্তর-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চল।
সুত্র : বিবিধার্থ অভিধান, শ্রীসুধীরচন্দ্র সরকার, কলিকাতা, ফাল্গুন, ১৩৬৮ বঙ্গাব্দ।
 
 
যুদ্ধোত্তর নতুন বাংলা কথা/ (প—ফ)
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ শব্দগুলো বাংলায় নতুন প্রচলিত হয়। এরূপ কিছু শব্দ নিচে দেওয়া হল :
পঞ্চম বাহিনী (fifth column) : দেশের মধ্যে গুপ্তভাবে সমর্থক দল।
পাঁচশালা পরিকল্পনা : পঞ্চবার্ষিক যোজনা।
পার্টটাইম (part time) : আংশিক সময়ের কাজ।
প্রভাত ফেরি : প্রভাত নগর কীর্তন।
 
পাইস হোটেল (pice hotel): বিভিন্ন পদের জন্য পৃথক পৃথক মূল্য দিয়ে ভাত ইত্যাদি আহারের স্থান।
পাগলা ঘণ্টা (alarm chain) : বিপদের সংকেতসূচক ঘণ্টা।
পারমিট (permit) : অনুমতিপত্র।
পাসপোর্ট (passport) : বিদেশে যাওয়ার অনুমতিসূচক পরিচয়পত্র।
পুনর্বাসন (rehabilitation) : স্থায়ী বাসস্থান ত্যাগ করে ভিন্ন স্থানে বসতি স্থাপন।
 
পেট্রল (petrol): মোটরগাড়ি চালানোর খনিজ তৈল।
ফোর টুয়েন্টি : ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২০ ধারা। প্রতারক।
 
যুদ্ধোত্তর নতুন বাংলা কথা/ (ব—ভ)
 
বয়কট (boycott) : একঘরে করা, বর্জন করা।
বাস্তুহারা : স্থায়ী বসতবাটি হারিয়েছে যে বা যারা।
বুনিয়াদি শিক্ষা (basic education) : প্রাথমিক শিক্ষা, বুনিয়াদি শিক্ষা।
বুশ শার্ট (bush shirt) : কোট ও শার্টের মিশ্রণে তৈরি একপ্রকার জামা।
বেতার (wireless) : বিনা তারে সংবাদ প্রেরণের ব্যবস্থা।
 
বোনাস (bonus) : বছরের বিশেষ সময়ে কর্মচারীদের অতিরিক্ত মাহিনা প্রদান।
ভূখা মিছিল (hunger march) : খাদ্যের দাবিতে মিছিল।
ভূদান : আচার্য ভাবে-প্রবর্তিত স্বেচ্ছায় জমি দান।
ভিআইপি (VIP) : অত্যন্ত প্রসিদ্ধ বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
ভিসা (visa) : অন্য দেশে গমনের অনুমতিপত্র।
 
যুদ্ধোত্তর নতুন বাংলা কথা (র—হ)
 
রেশন ( ration) : সরকারের খাদ্যদ্রব্যাদির নির্দিষ্ট বরাদ্দ।
রেশন কার্ড (ration card) : বরাদ্দ খাদ্যদ্রব্যাদি সংগ্রহের জন্য কার্ড।
লাইন দেওয়া : শ্রেণিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো।
লাঠিচার্জ : পুলিশের লাঠির সাহায্যে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করা।
লালপাগড়ি : পুলিশ
 
শো (show) : অভিনয়, চিত্র প্রভৃতি প্রদর্শন।
সম্পত্তি-দান : আচার্য ভাবে-প্রবর্তিত ভূ-দানের একটি অঙ্গ।
সাঁড়াশি অভিযান (combing operation) : নিবিড় অভিযান।
সাঁড়াশি বাহিনী ( panzer division) : বিশেষপদ্ধতিতে আক্রমণ চালানের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈন্যদল।
স্টেডিয়াম (stadium) : খেলা দেখার জন্য স্থায়ী আসনসমন্বিত উন্মুক্ত স্থান।
 
হরিজন (মহাত্মা গান্ধী প্রবর্তিত শব্দ) হিন্দু সমাজের অস্পৃশ্য লোক।
হাওয়াই শার্ট: একরকম শার্ট।
হাঁঁকোয়া (heating): মাচানের নিরাপদ উচ্চতায় বসে গুলি চালিয়ে হত্যা করার উদ্দেশ্যে শব্দের তাণ্ডবে চারদিক হতে নানা জন্তু একপাশে তাড়িত করা।
হকারের কর্নার (Hawker’s Corner): ফেরিওয়ালাদের দোকান।
 
 
সুত্র:
১. বাংলায় প্রচলিত বিদেশি শব্দের অভিধান, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।
২. বিবিধার্থ অভিধান, শ্রীসুধীরচন্দ্র সরকার, কলিকাতা, ফাল্গুন, ১৩৬৮ বঙ্গাব্দ।
 
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
 
এই পোস্টের লিংক: https://draminbd.com/যুদ্ধোত্তর-নতুন-বাংলা-শব/
 
প্রতিদিন খসড়া: https://draminbd.com/2020/12/27/প্রতিদিন-খসড়া/

— √

 
error: Content is protected !!