যৌন বিকৃতি: উরোল্যাগনিয়া এক্সিবিশনিজম গ্যালাকটোফিলিয়া নেক্রোফিলিয়া পেডোফিলিয়া ফ্রটিউরিজম বিস্টিয়ালিটি ভয়েরিজম Voyeurism

যৌন বিকৃতি (paraphilia): যৌন বিকৃতি কত প্রকার তার সঠিক সংখ্যা বলা সম্ভব নয়। এটি বাড়তে পারে ক্রমশ।  ভারতের এক গবেষণায় ৫৪৯ রকমের যৌন বিকৃতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই মে যুক্তরাষ্ট্রের এপিএ ‘ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়্যাল অব মেন্টাল ডিসঅর্ডার্স-৫’ (ডিএসএম-৫)  শিরোনামের প্রতিবেদনে মাত্র ৮ প্রকার যৌন উত্তেজনাকে যৌন বিকৃতির তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। যৌন বিকৃতির অনেক শ্রেণি এবং উপশ্রেণি রয়েছে। সব যৌন-গবেষক সবগুলোকে যৌন বিকৃতি বলেননি।
যৌন বিকৃতি বা মনোরোগ বিজ্ঞানের ভাষায় যৌন বিকৃতিকে প্যারাফিলিয়া (Paraphilia) বলা হয়। গ্রিক παρά (প্যারা)  এবং গ্রিক φιλία (-ফিলিয়া)  থেকে প্যারাফিলিয়া শব্দের উদ্ভব। সুতরাং, এর আক্ষরিক অর্থ: পাশের বন্ধু, প্রেমিক, নিকটস্থ বন্ধু, কাছের প্রেমিক প্রভৃতি।  আগে নিকট জনের যৌন কর্মকাণ্ড সম্পাদিত হতো। তবে প্যারাফিলিয়া শব্দের প্রায়োগিক অর্থ অস্বাভাবিক  যৌনকর্মকাণ্ডের প্রতি আকর্ষণ বা যৌন তৃপ্তি লাভের জন্য অস্বাভাবিক কিছু করা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে যৌন বিকৃতিকে মানসিক রোগ বা মানসিক বৈকল্য হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। কোন কোনো যৌনক্রিয়া স্বাভাবিক না কি অস্বাভাবিক তা নির্ধারিত হয় তিনটি পর্যায়ে। এগুলো হলো (ক) সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বা রীতিনীতি (খ) ধর্ম এবং (গ) স্থানীয় আইন। স্থানভেদে  তিনটি  নিয়ামিই পরিবর্তশীল। তাই  যৌন বিকৃতির সজ্ঞার্থও পরম বা চূড়ান্ত নয়। উদাহরণস্বরূপ, একসময় পৃথিবীর সব দেশে সমকাম যৌন বিকৃতি হিসেবে অবৈধ ছিল।  ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে অনেকগুলো দেশে সমকাম একটি আইনসিদ্ধ যৌনক্রিয়া হিসেবে স্বীকৃত। যদিও পায়ুকামের ফলে পায়ুপথের ব্যথা এবং ক্ষতির কারণে পায়ুকামকে ‘ক্ষতিকর যৌনতা’ বা ‘অনিরাপদ যৌনতা’ হিসেবে দেখা হয়। 
ইউরোল্যাগনিয়া (Urolagnia): অনেকে অন্যের প্রেশ্রাব করা বা মূত্রত্যাগ দেখে কিংবা প্রস্রাব করার ঘটনাকে চিন্তা করে যৌন তৃপ্তি পায়। এটাকে বলা হয় ইউরোল্যাগনিয়া। গ্রিক  ouron (মূত্র, প্রস্রাব) এবং lagneia (লোভ, লালসা) শব্দের সমন্বয়ে ইউলোল্যাগনিয়া শব্দের উদ্ভব। যার আক্ষরিক অর্থ মুত্রলোভ। এটা একটা যৌনবিকৃতি বা মানসিক রোগ। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা লুকিয়ে বা নানা অজুহাতে অন্যের প্রেশ্রাব বা মূত্রত্যাগ অবলোকন কিংবা  প্রস্রাব করার বিষয়টি চিন্তায় এনে যৌন তৃপ্তি পায়। 
এক্সিবিশিনিজম(Exhibitionism): অনেকে নানা অজুহাতে নিজের শরীরের গোপন অংশ কিংবা নির্দিষ্ট পরিবেশে সাধারণত অন্যের দর্শন রোধ করার জন্য ঢেকে রাখা হয়  এমন অঙ্গ অন্যকে দেখিয়ে যৌন তৃপ্তি অনুভব করে। এদের কেউ উলঙ্গ হয়ে আবার কেউ বা প্রকাশ্য স্থানে নানা অজুহাতে প্রস্রাব বা মলত্যাগ করে অন্যকে নিজের যৌনাঙ্গ প্রদর্শনের মাধ্যমে যৌনসুখ  পায়। যৌন তৃপ্তির জন্য এরূপ অশ্লীলভাবে দেহকে অনাবৃতকরাকে বলা হয় এক্সিবিশিনিজম। বাংলায় বলা যায়  বিলসন কাম বা প্রদর্শনীবাদ।
গ্যালাকটোফিলিয়া (Galactophilia):শিশু মায়ের স্তন থেকে দুগ্ধ পান করছে অনেকে এটি দেখে যৌন তৃপ্তি পায় বা মনে যৌন তৃপ্তি জাগে। এটাকে বলা হয় গ্যালাকটোফিলিয়া। চিকিসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি যৌন বিকৃতি। যা মানসিক রোগ নামে অভিহিত।
নেকরোফিলিয়া: মৃত নগ্ন শরীর দেখে অনেকে যৌন তৃপ্তি অনুভব করে।  এটাকে বলে নেক্রোফিলিয়া। নেকরোম্যানিয়া ও নেকরোফিলিয়া সমার্থক শব্দ। নেকরোফিলিয়া (necrophilia) কথার অর্থ— মৃতদেহের প্রতি যৌন আকর্ষণ বা মৃতদেহের সঙ্গে যৌনসঙ্গম করার প্রবল ইচ্ছা। এটি মারাত্মক যৌনবিকৃতি এবং অপ্রতিরোধ্য নেশা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সাংঘাতিক একটি মানসিক রোগ। এই রোগে আক্রান্তরা লাশঘরে গিয়ে এমনকি কবর থেকে লাশ তুলে কিংবা কবরের মধ্যে নেমে মৃতদেহের সঙ্গে যৌনসংগম করে। কয়েকদিনের পুরানো লাশ হলেও তাদের কিছু যায় আসে না।  Necromania নামের একটি চলচ্চিত্র হয়েছে। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তিপ্রাপ্ত ৫৪ মিনিটের এই পর্নো ছবিটির পরিচালক ছিলেন Ed Wood।
পেডোফিলিয়া(Pedophilia):  শিশুদের প্রতি যৌনসঙ্গম করার আকাঙ্ক্ষাকে বলা হয়  পেডোফিলিয়া। গ্রিক paidós  ও philía  হতে হতে Pedophilia শব্দের উদ্ভব। paidós অর্থ শিশু এবং  philía  অর্থ বন্ধুত্ব, বন্ধুতা বন্ধুত্বপূর্ণ ভালোবাসা। Pedophilia কথার শাব্দিক অর্থ শিশুর প্রতি ভালোবাসা, শিশুবন্ধু। তবে এখন এর অর্থ শিশুদের সঙ্গে যৌনসঙ্গমের লিপ্সা, শিশুধর্ষণের আকাঙ্ক্ষা প্রভৃতি।
ফ্রটিউরিজম(Frotteurism): ভিড়ের মধ্যে বা যে-কোনো স্থানে নানা কৌশলে নানাভাবে কারো শরীরে নিজের শরীর বা শিশ্ন বা যৌনাঙ্গ ঘষে বা ছুঁয়ে দিয়ে যৌনসুখ লাভের  ইচ্ছাকে ফ্রটিউরিজম (Frotteurism) বলা হয়। এরূপ ব্যক্তি ভিড়ের মধ্যে আকর্ষিত ব্যক্তির শরীরের কাছে গিয়ে শরীর স্পর্শ করার চেষ্টা করে বা কনুই দিয়ে  বুক স্পর্শ করে কিংবা শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে শিশ্ন বা যৌনাঙ্গ ঘর্ষণ করে যৌনসুখ লাভ করে। এটা এক ধরনের যৌন বিকৃতি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ফ্রটিউরিজম। ফরাসি ক্রিয়াপদ frotter হতে Frottage শব্দের উদ্ভব এবং তা হতে ফ্রটিউরিজম। Frotter অর্থ ঘষা, ঘর্ষণ করা (to rub)। Frotteur শব্দটি  ফরাসি বিশেষ্য। যার শাব্দিক অর্থ যে ঘর্ষণ করে, ঘর্ষণকারী ব্যক্তি (one who rubs)। জার্মান যৌনবিদ রিচার্ড ভন ক্রাফট-ইবিং (Richard von Krafft-Ebing) রচিত সাইকোপ্যাথিয়া সেক্সুয়ালিস (Psychopathia Sexualis) গ্রন্থের মাধ্যমে শব্দটি জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পরবর্তীকালে Clifford Allen ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে যৌন বিকৃতিবিষয়ক গ্রন্থে frotteurism শব্দটি ব্যবহার করেন। The Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders গ্রন্থেও শব্দটিকে বর্ণিত অর্থে frottage হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে চতুর্থ সংস্করণে শব্দটি পরিবর্তন করে লেখা হয় ফ্রটিউরিজম  frotteurism । ফ্রটিউরিজম নামের মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের শরীর বা শরীরের কোনো অংশ অন্যের শরীরে ঘষে যৌনানন্দ লাভ করে। তাই এর এমন নাম ও ব্যুৎপত্তি।
বিসটিয়ালিটি (Bestiality): অনেক মানুষ অন্য কোনো জন্তু বা ইতর প্রাণীর সঙ্গে যৌনসঙ্গম করে কিংবা যৌনসঙ্গম অবলোকন করে যৌন তৃপ্তি পায়।  এটাকে বলা বিসটিয়ালিটি । এটি এক ধরনের যৌন বিকৃতি। ইংরেজি অভিধানমতে, Bestiality refers to any and all sexual relations between a human and an animal. অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে জন্তুর যে-কোনো প্রকার যৌনসঙ্গমকে বলা হয় বিসটিয়ালিটি (Bestiality)। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়  এটি একটি মারাত্মক যৌন বিকৃত বা মানসিক রোগ।
ভয়োরিজম (Voyeurism): অনেকে অন্যের একান্ত গোপনীয় কর্ম— গোসল করা, পোশাক পরিবর্তন, উলঙ্গ অবস্থা প্রভৃতি দেখে যৌন সুখ অনুভব করে। এটাকে বলা হয় ভয়োরিজম (Voyeurism)। এর বাংলা ঈক্ষণকাম। এটি একটিযৌন বিকৃতি (paraphilia)।  ফরাসি voir থেকে ভয়োরিজম (Voyeurism) শব্দের উদ্ভব। voir অর্থ দেখা (to see); এটি ইতিবাচক। তবে Voyeurism শব্দের voir নেতিবাচক। বহুল খ্যাত লেডি গোডিভা কিংবদন্তি, থমাসের উঁকি দিয়ে দেখা এবং তা থেকে উদ্ভূত ‘Tom Peeping’ ঘটনার বরাদে voir শব্দটি নেতিবাচক অর্থ পেয়ে ভয়োরিজম (Voyeurism) কথার বর্তমান অর্থ ধারণ করে।
লেডি গোডিভা (Lady Godiva) ছিলেন অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগের শেষ প্রান্তে বর্তমান একজন সম্ভ্রান্ত মহিলা। তিনি ১০৬৬ মতান্তরে ১০৮৬ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান। তৎকালীন ধনকুবের আর্ল অফ মার্সিয়া লিওফ্রিক [(Leofric, Earl of Mercia) ৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দ—১০৫৭ খ্রিষ্টাব্দ] ছিলেন তার স্বামী।  প্রভাবশালী স্বামীর প্রভাব এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান-সহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে উদারহস্তে দান করার জন্য লেডি গোডিভা তৎকালে সর্বমহলে প্রবল খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তবে এখন তার পরিচিত স্বামী বা তাঁর নিজের দান-খয়রাতের জন্য নয়। তাঁর নামে প্রচলিত একটি কিংবদন্তির জন্য। কিংবদন্তিটি হলো নিম্নরূপ:
লেডি গোডিভার স্বামী লিওফ্রিক প্রজাদের ওপর অত্যন্ত উুঁচ হারে নিপীড়নমূলক কর ধার্য করেন। এর প্রতিবাদে গোডিভা একদিন বিনাপোশাকে কেবল তার লম্বা চুল দিয়ে শরীরের যতটুকু অংশ ঢাকা যায় ঠিক ততটুকু অংশ ঢেকে ইংল্যান্ডের পশ্চিম মিডল্যান্ডের রাজপথে ঘোড়ায় চড়ে শহর প্রদক্ষণের সিদ্ধান্ত নিলেন।  এটি জানতে পারে রাজ্যের সব প্রজা ওই সময়ের জন্য দরজা-জানালা বন্ধ করে গৃহে অবস্থান নেন। থমাস (Thomas) নামের এক লোক উঁকি দিয়ে (voyeur ) গোডিভার উলঙ্গ দেহ দেখার জন্য অবস্থান নেন এবং লেডি গোডিভার উলঙ্গ দেহ দেখে নেন।   গোডিভাকে এভাবে উঁকি দিয়ে দেখার জন্য থমাসকে অন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। মতান্তরে হত্যা করা হয়েছিল। 
থমাসের উঁকি দিয়ে গোডিভার উলঙ্গ শরীর দেখা হতে সৃষ্টি হয় ভয়োরিজম (Voyeurism) শব্দ এবং ‘Peeping Tom’ বাগ্‌ধারা
নারীপুরুষ উভয়ের মধ্যে এমন বিকৃতি দেখা যায়। তবে তুলনামূলকভাবে পুরুষে এমন বিকৃতি বেশি দেখা যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটি  একটি মানসিক রোগ। যাদের এমন লক্ষণ আছে তাদের দ্রুত মানসিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
জানা অজানা অনেক মজার বিষয়: https://draminbd.com/?s=অজানা+অনেক+মজার+বিষয়
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
আমি শুবাচ থেকে বলছি
error: Content is protected !!