য-ফলা: শব্দের প্রথমে য-ফলা, য-ফলাবিধি সমগ্র

ড. মোহাম্মদ আমীন

য-ফলা: শব্দের প্রথমে য-ফলা, য-ফলাবিধি সমগ্র

সংযোগ:  https://draminbd.com/য-ফলা-শব্দের-প্রথমে-য-ফলা-য/

অতৎসম শব্দের আদ্যবর্ণে কখন য-ফলা ও কখন আ-কার যুক্ত য-ফলা হবে

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

শব্দের আদিতে ল-বর্ণের সঙ্গে য-ফলা সর্বদা আ-কার নিয়ে বসে। যেমন: ল্যাং, ল্যাংটা, ল্যাজ, ল্যাটা, ল্যান্ড, ল্যাপটপ, ল্যামিনেশন, ল্যাম্প প্রভৃতি।

মনে রাখুন: বাংলায় বিদেশি শব্দের লিপ্যন্তরে এবং সাধারণত অতৎসম শব্দের বানানে প্রথম বর্ণে সর্বদা আ-কার যুক্ত য-ফলা হয়। যেমন: ব্যাংক, অ্যাসিড, ম্যানেজার, ন্যাকামি, হ্যান্ডশেক, হ্যান্ডবিল, হ্যাংলামি।
শব্দের প্রথমে য-ফলা বিধি নিমোনিক
বিদেশি এবং অতৎসম শব্দের বানানের প্রথমে য-ফলা সর্বদা আ-কার নিয়ে বসে। যেমন:
অ্যাডমিন, অ্যাকাউন্ট, চ্যালা, চ্যাপটা, জ্যাঠা, ড্যাশ, ঢ্যাঁড়শ, ব্যাংক, ট্যাংক, ধ্যাৎ, ত্যাড়া, ত্যাঁদড়ামি, ত্যাঁদড়, ন্যাকড়া, ন্যাড়া, ন্যাতানো, ন্যাকামি, প্যাক, ফ্যাক্স, ফ্যাশন, ফ্যাঁকড়া, ফ্যাকাশে, ফ্যাসিবাদ, ভ্যাবাচ্যাকা, ভ্যান, ব্যাট, ব্যাটা, ব্যানার, ব্যান্ডসংগীত, ম্যাগাজিন, ম্যাচ, ম্যানেজার, ম্যালেরিয়া, ম্যাক্সি, র‌্যাক, র‌্যালি, ল্যাংড়া, ল্যাজ, ল্যাপটপ, ল্যান্ড, ল্যাবরেটরি, শ্যালক, শ্যাম্পু, স্যানাটোরিয়াম, স্যান্ডউইচ, স্যাকরা, হ্যান্ডবিল, হ্যাজাক, হ্যাংলামি — ।

প-য়ে য-ফলাবিধি

বাংলায় এমন কোনো শব্দ সাধারণত দেখা যায় না, যে শব্দের বানানের প্রথমে ‘প্য’ আছে। কোনো শব্দের বানান ‘প্য’ দিয়ে শুরু হলে তার সঙ্গে উচ্চারণভেদে অবশ্যই আ-কার বা চন্দ্রবিন্দু (ঁ) থাকবে।

অর্থাৎ ‘প্য’ দিয়ে শুরু হওয়া প্রত্যেকটি শব্দের বানানে উচ্চারণভেদে নাসিক্য চন্দ্রবিন্দু কিংবা আ-কার থাকে। যেমন:

প-য়ে য-ফলা চন্দ্রবিন্দু (্যাঁ) প্যাঁ: প্যাঁ, প্যাঁক, প্যাঁকাটি, প্যাঁচ, প্যাঁচা, প্যাঁচানো, প্যাঁচালো, প্যাঁড়া, প্যাঁদানি, প্যাঁদানো।
প-য়ে য-ফলা আ-কার (প্যা): প্যাকেট, প্যাচপেচে, প্যাটপ্যাট, প্যাটরা, প্যাটার্ন, প্যাট্রল, প্যাডেল, প্যাড়া, প্যাতেপেতে, প্যানপেনে, প্যানপ্যান, প্যানপ্যানানি, প্যানেল, প্যান্ট, প্যান্টালুন, প্যান্ডেল, প্যারা, প্যারাগ্রাফ, প্যারাশুট।

ন-য়ে য-ফলাবিধি: ন্য ন্যা ন্যু ন্যূ

ড. মোহাম্মদ আমীন
  • ন-য়ে য-ফলা (ন্য): ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ছাড়া ন্যক্কার ন্যগ্রোধ ন্যস্ত — এই তিনটি ও তদ্‌যোগে গঠিত শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দের বানানের প্রথমে সাধারণত ন-য়ে য-ফলা (ন্য) দেখা যায় না।

গঠিত শব্দ: ন্যক্কারজনক।

  • ন-য়ে আ-কার য-ফলা (ন্যা): ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ছাড়া ন্যাওটা, ন্যাংটা, ন্যাংলা, ন্যাকড়া, ন্যাকা, ন্যাটা, ন্যাড়া, ন্যাতনেতে, ন্যাতা, ন্যাবা, ন্যায্য, ন্যায়, ন্যালনেলে, ন্যাস— এই কটি শব্দ কিংবা তদ্‌যোগে গঠিত শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দের বানানের প্রথমে সাধারণত ন-আ-কার য-ফলা (ন্যা) দেখা যায় না।

গঠিত শব্দ: ন্যাংটাগোরা, ন্যায়বিচার, ন্যায়বুদ্ধি, ন্যায়মার্গ, ন্যায়রত্ন, ন্যায়শাস্ত্র, ন্যায়সংগত, ন্যায়সম্মত, ন্যায়াধিকরণ, ন্যায়াধীশ, ন্যাসপাল, ন্যাসী প্রভৃতি। বিস্তারিত নিচের সংযোগে।

  • ন-উ-কার য-ফলা (ন্যু): ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ছাড়া ন্যুব্জ ন্যুব্জ— কিংবা এই দুই শব্দযোগে গঠিত শব্দের বানান ছাড়া আর কোনো শব্দের বানানের প্রথমে সাধারণত ন-য়ে-উ-কার (ন্যু) দেখা যায় না।

গঠিত শব্দ: ন্যুব্জদেহ।

  • ন-ঊ-কারে য-ফলা (ন্যূ): ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ছাড়া ন্যূন কিংবা তদ্‌যোগে গঠিত শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দের বানানের প্রথমে সাধারণত ন-ঊ-কারে য-ফলা (ন্যূ) দেখা যায় না।

যদ্যপি

সংস্কৃত যদ্যপি (যদি+অপি) অর্থ (অব্যয়ে) যদিও, একান্তই যদি। শব্দটির বানানে কোনো আ-কার নেই। ই/ঈ এর সঙ্গে ই/ঈ ভিন্ন অন্য স্বরবর্ণের সন্ধি হলে ই/ঈ-এর স্থানে য-ফলা হয়। পরের স্বর ‘য্-ফলার সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রথম পদের শেষ বর্ণে বসে। যেমন:
যদি+অপি= যদ্যপি,
অতি+উচ্চ= অত্যুচ্চ,
ইতি+আদি= ইত্যাদি

উৎপত্তি বনাম ব্যুৎপত্তি

সংস্কৃত উৎপত্তি (উৎ+√পদ্‌+তি) অর্থ— (বিশেষ্যে) উৎস, উদ্ভব, শুরু, জন্ম, সূচনা, প্রকাশ, অভ্যুদয়। যেমন:
বিশ্বের উৎপত্তি, প্রাণের উৎপত্তি, পানির উৎপত্তি, মানুষের উৎপত্তি, ভাষার উৎপত্তি, রাষ্ট্রের উৎপত্তি, বিজ্ঞানের উৎপত্তি, ধর্মের উৎপত্তি, বাংলাদেশের উৎপত্তি, সাগরের উৎপত্তি; অগ্নিপরীক্ষা কথার উৎপত্তি, ব্যাকরণের প্রভৃতি।
ব্যুৎপত্তি মূলত একটি ব্যাকরণিক শব্দ।বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান মতে ব্যুৎপত্তি (বি+উদ্‌+√পদ্‌+তি) অর্থ (ব্যা.) প্রকৃতি-প্রত্যয়াদি বিশ্লেষণদ্বারা শব্দের গঠনবিচার’; যেমন:
অগ্নিপরীক্ষা শব্দের ব্যুৎপত্তি— [স. অগ্নি+পরীক্ষা]’;
ব্যুৎপত্তি শব্দের ব্যুৎপত্তি—[স. বি+উদ্‌+√পদ্‌+তি];
প্রত্যেক শব্দের ব্যুৎপত্তি— [স. প্রতি+এক];
ব্যূহ শব্দের ব্যুৎপত্তি— [স. √বি+ঊহ্‌+অ]।
মনে রাখুন, য-ফলা পরের বিষয়। ভাষার উৎপত্তির পর শব্দের ব্যুৎপত্তি। তাই উৎপত্তিতে য-ফলা নেই, ব্যুৎপত্তিতে আছে।
সূত্র: কোথায় কী লিখবেন বাংলা বানান: প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

য-য়ে য-ফলা থাকলে রেফ হয় না কেন?

প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মে সমব্যঞ্জনের দ্বিত্বে রেফ বিধেয় নয়। যেমন: বর্ত্তমান নয়, বর্তমান, কর্ম্ম নয়, কর্ম; ধর্ম্ম নয়, ধর্ম, অর্চ্চনা নয়, অর্চনা। বর্জ্জন নয়, বর্জন
যেহেতু য-ফলা হচ্ছে য-এর একটি রূপ, তাই য-য়ে য-ফলা থাকলে তা হবে সমব্যঞ্জনের দ্বিত্ব। সুতরাং, তার ওপর আবার রেফ দিতে নেই। এজন্য
কার্য্যালয় নয়, কার্যালয়
সৌন্দর্য্য নয়, সৌন্দর্য
মাধুর্য্য নয়, মাধুর্য।
ধৈর্য্য নয়, ধৈর্য।
কিন্তু, সামর্থ্য। কারণ, এখানে থ-য়ে আর একটি থ যুক্ত হয়ে দ্বিত্ব হয়নি। অনুরূপ: বর্জ্য, মর্ত্য, দৈর্ঘ্য ইত্যাদি।

শব্দের আদিতে /ব্য/ ও /ব্যা/ এর প্রয়োগ

‘ব্য’ আর’ ব্যা’ নিয়ে বানানে অনেককে বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়। বিশেষ করে ‘য-ফলা’ যদি শব্দের শুরুতে ব্যবহৃত ব-ধ্বনির সঙ্গে হয় তাহলে তো কথাই নেই । কয়েকটি ব্যতিক্রম (ব্যক্তি এর উচ্চারণ বেক্‌তি)ব্যতিরেকে শব্দের আদ্যে ব্যবহৃত অধিকাংশ ‘ব্য’ ও ‘ব্যা’-এর উচ্চারণ সাধারণত একই রকম। উচ্চারণ একই হওয়া সও্বেও কোথাও ‘ব্য’ , আবার কোথায় ‘ব্যা’ হয়। তাই বানান লেখার সময় লেখক দ্বিধায় পড়ে যান। এই দ্বিধা দূরীভূত করার জন্য নিচের বিষয়গুলি খেয়াল করুন:
১. শব্দের আদিতে /ব্য/ এর প্রয়োগ : /বি-/ উপসর্গের পর /অ/-বর্ণ দিয়ে শুরু শব্দ সন্ধিবদ্ধ হয়ে /ব্য/ হয়। যেমন: বি + অগ্র = ব্যগ্র; বি +অঙ্গ = ব্যঙ্গ। তেমনি: ব্যক্ত, ব্যক্তি, ব্যঙ্গাত্মক, ব্যঙ্গোক্তি, ব্যজন, ব্যঞ্জন, ব্যঞ্জনা, ব্যতিক্রম, ব্যতিব্যস্ত, ব্যতিরেক, ব্যতিহার, ব্যতীত, ব্যত্যয়, ব্যপদেশ, ব্যবচ্ছিন্ন,ব্যবচ্ছেদ, ব্যবধান, ব্যবসায়ী, ব্যবস্থা, ব্যবস্থাপক, ব্যবহার, ব্যবহৃত, ব্যভিচার, ব্যয়, ব্যর্থ, ব্যষ্টি, ব্যস্ত।
ব্যতিক্রম : /বি-/ উপসর্গ দিয়ে শুরু হয়নি এমন কিছু শব্দের বানানের শুরুতে /ব্য/ দেখা যায়। যেমন: ব্যথা, ব্যথিত, ব্যথী।
error: Content is protected !!