রবীন্দ্রনাথ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা

ড. মোহাম্মদ আমীন
ড. মোহাম্মদ আমীন
উভয় বঙ্গের অনেক খ্যাতিমান হিন্দু ও এবং প্রভাবশালী বহু মুসলিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। সে তুলনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিষ্ঠার পর শিক্ষক নিয়োগ-সহ যাবতীয় উন্নয়নে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা ছিল ইতিবাচক। ইতিবাচক এই অর্থে তিনি পক্ষেও মন্তব্য করেননি আবার বিপক্ষেও মন্তব্য করেননি। যার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরের মাথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে ব্যাপক সংবর্ধনা দেন। যদি প্রত্যক্ষভাবে বিরোধিতা করতেন তাহলে প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরের মাথায় কি তাঁকে সংবর্ধনা দিত? সে তুলনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিষ্ঠার পর এর উন্নয়নের রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা ছিল অনেকটা  ইতিবাচক। অনেকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথ বিরোধিতা করেছিলেন তা ঠিক নয়।  সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে তখন কেউ জানত না, বাংলাদেশে নামের একটি নতুন স্বাধীন দেশ হবে কিংবা পাকিস্তান নামের একটি দেশনাম নিয়ে ভারত দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। জানা থাকলে বিরোধিতাটার প্রক্রিয়া তখন হয়তো অন্যরকম হতো।
১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়। তবে  বঙ্গভঙ্গের পর ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে  লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব আসে। উদ্দেশ্য ছিল মুসলমান সংখ্যাঘরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের জন্য উচ্চ শিক্ষার পথ অবারিত করা। অনেকে মনে করেছেন, তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছিল মুসলিমদের জন্য জন্মের আগে আকিকা করার মতো হাস্যকর। যেন: গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের আর্থসামাজিক ও শিক্ষার অবস্থা বিবেচনায় ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে  আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা মুসলিম জনগোষ্ঠীর শিক্ষার উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণের কোনো  কার্যকর পদক্ষেপ ছিল না। কারণ, তখন পূর্ববঙ্গে এত সংখ্যক মুসলিম শিক্ষার্থী ছিল না যে, যাদের পড়ার জন্য শিক্ষাখাতের বরাদ্দ হতে বিশাল অংশ খরচ করে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।  
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রথম প্রবল বিরোধিতা এসেছিল পূর্ব বাংলা অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের মুসলিমের পক্ষ হতে। তন্মধ্যে মৌলানা আকরাম খান ও আব্দুর রসুল অন্যতম। পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের ধারণা ছিল: পূর্ব বঙ্গের দশ হাজার মুসলিমের মধ্যে হাইস্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা মাত্র ১ জন। কলেজ পর্যায়ে ছাত্র সংখ্যা আরও কম। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে সেখানে মুসলমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা হবে হাতে গোনা কয়েকজন। ৯৮ ভাগই হবে নন-মুসলিম। অথচ এটি প্রতিষ্ঠা কর হচ্ছে তাদের শিক্ষার জন্য। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে প্রাইমারি এবং হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করা হলে মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার হার বাড়বে। অধিকন্তু, যদি এ মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয় তাহলে মুসলমানদের জন্য যে সরকারি বাজেট বরাদ্দ আছে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ব্যয় হয়ে যাবে। ফলে নতুন করে প্রাইমারি বা হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। যেগুলো আছে সেগুলোও অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিধা নেবে সব সম্প্রদায়ের লোকজন। সেজন্য পূর্বববেঙ্গর অনেকে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় চাননি। শুধু তাই নয়, ২৪ পরগণা জেলা মহামেডান এসোসিয়েশন ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই ফেব্রুয়ারি ঢাকায় প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা করে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, ড. রাসবিহারী ঘোষ, রাজনীতিবিদ সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়-সহ অনেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করেন।  তাঁর এই বিরোধিতার কারণটি সাম্প্রদায়িক ছিল না। কারণ ছিল ব্যাখ্যাতভাবে যৌক্তিক। প্রথমত: তিনি জানতেন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে হিন্দুরাই লেখাপড়া করবে। অথচ খরচ করা হবে মুসলিম সম্প্রদায়ের শিক্ষার জন্য নির্ধারিত বরাদ্দ হতে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দ্বারা মুসলিমদের প্রকৃতপক্ষে কোনো উপকারই হবে না। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে হাইস্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হলে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষাবিস্তার অনেক কার্যকর ও বিস্তৃত হবে । কারণ তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার মতো মুসলিম ছাত্র পুরো পূর্ববঙ্গে পঞ্চাশ জনও ছিল না। যারা ছিল তাদের অধিকাংশ কলকতায় থাকে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ই তাদের প্রধান পছন্দ। দ্বিতীয়ত, তিনি জানতেন না যে, দেশভাগ হয়ে পূর্ববঙ্গ পূর্ব পাকিস্তান হয়ে যাবে এবং পরে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পাবে। তৃতীয়ত: ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে সংগত কারণে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ কমে যাবে।
ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কী করলে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা থেকে সড়ে দাঁড়াবেন? স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চারটি নতুন অধ্যাপক পদ সৃষ্টির বিনিময়ে তার বিরোধিতার অবসান করেছিলেন। পরবর্তীকালে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শিক্ষক নিয়োগে সহযোগিতা করেন। এ থেকে বোঝা যায়, তার বিরোধিতা সাম্প্রদায়িক ছিল না। আসলে তখন পূর্ববঙ্গে মুসলিমদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আদৌ প্রয়োজন ছিল না। এটি বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ ছিল।
অনেক বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। তা আদৌ ঠিক নয়। তিনি বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ছিলেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তার সমর্থন যেমন ছিল না, তেমনি বিরোধিতাও ছিল না। তিনি  এ বিষয়ে নিশ্চুপ ছিলেন।  বলা হয়, ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে মার্চ কলিকাতা গড়ের মাঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়। ওই সভায় রবীন্দ্রনাথ না কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করে  বলেছিলেন, “মূর্খের দেশে আবার কিসের বিশ্ববিদ্যালয়, তারা তো ঠিকমতো কথাই বলতে পারে না।” অথচ ওই দিন তিনি কলকাতাতেই ছিলেন না। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে মার্চ তিনি কুষ্টিয়ার শিলাইদহে ছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ  বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য অনেক আন্দোলন করেছেন। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর ক্ষতিপূরণ হিসেবে পূর্ববঙ্গে  বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা তাঁর কাছে আনন্দের বা ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করার মতো কোনো ঘটনা ছিল না। তবে এ বিষয়ে তিনি পক্ষে বা বিপক্ষে ব্যাপক ও বৃহত্তর পরিসরে কিছু বলেননি।   কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তার কোন অভিপ্রায়ই পাওয়া যায় না। তাই বঙ্গভঙ্গ রদের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়ে  তাঁর প্রকাশিত অভিপ্রায়ের কোনো প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায় না। অনেকে বলেন ছোটোখাটো মন্তব্য ছিল। থাকতে পারে এবং মানুষ হিসেবে, সর্বোপরি বিদ্যমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তা ছিল নিতান্তই স্বাভাবিক। তবে এটা ঠিক যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তার সমর্থনমূলক কোনো বক্তব্যও ছিল না। বলা যায়, বঙ্গভঙ্গ সমর্থকদের পুরস্কার হিসেবে দেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তে তিনি  খুশি ছিলেন না।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে রবীন্দ্রনাথের কোনো অনুকূল অবদান ছিল না। তবে বঙ্গভঙ্গ রদের পর  তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের জন্য  স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে চিঠি লিখেছিলেন। 
 
১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল  রবীন্দ্রনাথকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার উপাধি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের  ২৯ শে জুলাই এক বিশেষ সমাবর্তনে কবিকে এই উপাধি প্রদানের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তিনি  উপস্থিত হতে পারেননি। তাঁর অনুপস্থিতিতেই বিশেষ সমাবর্তনে এই উপাধি প্রদান করা হয়। ওই সমাবর্তনেই স্যার আবদুর রহিম, স্যার জগদীশচন্দ্র বসু, স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, স্যার যদুনাথ সরকার, স্যার মুহাম্মদ ইকবাল এবং কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কেও সম্মানসূচক ডি লিট, উপাধি প্রদান করা হয়। রবীন্দ্রনাথ যদি সরাসরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করতেন, তাহলে ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় তাঁকে সংবর্ধনা দিত না।
error: Content is protected !!