রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পিরালি ব্রাহ্মণ বলা হয় কেন?

ড. মোহাম্মদ আমীন

 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পিরালি ব্রাহ্মণ বলা হয় কেন?

পিরালি ব্রাহ্মণ হলো বাংলার ব্রাহ্মণ সমাজের একটি “থাক” বা উপসম্প্রদায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-সহ ঠাকুর পরিবারের সদস্যবৃন্দ ছিলেন এই থাকভুক্ত ব্রাহ্মণ।ঐতিহাসিকভাবে “পিরালি” শব্দটি নেতিবাচক ও অপবাদমূলক অর্থে প্রয়োগ হয়ে আসছে।
নগেন্দ্রনাথ বসুর “বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস” গ্রন্থে ব্রাহ্মণ কাণ্ডের তৃতীয় ভাগে ব্যোমকেশ মুস্তফী “পিরালী ব্রাহ্মণ বিবরণ” প্রথম খণ্ডে কুলাচার্য নীলমণি ভট্টের কারিকা অবলম্বনে পিরালি থাকের উৎপত্তির বিবরণ দিয়েছেন।
সেখানে বলা হয়েছে: যশোর জেলার চেঙ্গুটিয়া পরগনার গুড়-বংশীয় জমিদার দক্ষিণারঞ্জন রায় চৌধুরীর চার পুত্র কামদেব, জয়দেব, রতিদেব ও শুকদেব। তন্মধ্যে কামদেব ও জয়দেব তৎকালীনন স্থানীয় শাসক মামুদ তাহির ওরফে পির আলির প্রভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। শাস্তিস্বরূপ যাঁরা ধর্মান্তরিত হননি তাঁরা-সহ পুরো পরিবারকে সমাজচ্যুত করা হয়। ব্যোমকেশ মুস্তফীর অনুমান, পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি কোনো সময়ে এই ঘটনটি ঘটে। রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষ পিঠাভোগের জমিদার জগন্নাথ কুশারী শুকদেবের কন্যাকে বিবাহ করেন। ফলে তিনি পিরালী থাকভুক্ত হয়ে যান। এভাবে রবীন্দ্রনাথও পিরালি থাকভুক্ত ব্রাহ্মণ হয়ে যান।
প্রসঙ্গত, প্রাচীন যশোর জেলার পিঠাভোগ গ্রামের (বর্তমান খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার) পিরালি ব্রাহ্মণ পুরুষোত্তম কুশারীর বংশধর, মহেশ্বর কুশারী এবং তার ছেলে পঞ্চানন কলকাতায় চলে যান। মহেশ্বর কুশারীর অপর সন্তান প্রিয়নাথ কুশারী পিঠাভোগ গ্রামে থেকে যান। তার বংশধরগণ এখনো পিঠাভোগ গ্রাম-সহ খুলনা বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছেন।
পিরালি ব্রাহ্মণ হওয়ায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারের সঙ্গে হিন্দুরা জাতচ্যুত হওয়ার ভয়ে পারিবারিক সম্পর্ক করত না। তাই ঠাকুর পরিবার যশোরের পিরালি পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক করতেন। এ কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তার জেষ্ঠভ্রাতা ভারতের প্রথম আইসিএস সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও যশোরের পিরালি ব্রাহ্মেণের মেয়ে বিয়ে করাতে হয়েছে। ১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দে নাদিয়ার এক জমিদারের ছেলে জানকীনাথ ঘোষাল দ্বারকানাথ ঠাকুরের পৌত্রী এবং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্থ কন্যা স্বর্ণকুমারী দেবীকে বিয়ে করেন। পিরালি ব্রাহ্মণ বংশের মেয়ে বিয়ে করায় জানকীনাথকে পরিবারচ্যূত করা হয়েছিল।
পিরালি ও ব্রাহ্ম প্রতিক্রিয়া: রবীন্দ্রনাথ ধর্মমতে হিন্দু ছিলেন না, ছিলেন ব্রাহ্ম।তাই হিন্দুদের কাছে রবীন্দ্রনাথের পুরো পরিবারই ছিল অস্পৃশ্য। এ কারণে রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কোনো সন্তান-সন্ততির অনুকূলে উঁচু বলে কথিত কোনো হিন্দু পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথের পরিবারের বৈবাহিক সম্পর্ক হতো কেবল বঙ্গদেশের নীচ বংশের পিরালি ব্রাহ্মণদের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথের পরিবারকে উচ্চবংশীয় হিন্দুরা, মুসলমানদের চেয়েও বেশি ঘৃণা করত।
বর্তমানে যারা রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু বলে গর্ব করে, একসময় তারাই তাঁর পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের চেয়ে আইবুড়ো থাকা বা রাখাকে শ্রেয় মনে করত। এ কারণে রবীন্দ্রনাথকে বিবাহ করাতে হয়েছে, তাদের পরিবারের অধস্তন কর্মচারী খুলনার ফুলতলার বেণীমাধব রায় চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণীর সঙ্গে।পরে যার নাম রাখা হয়েছে মৃণালিনী দেবী।
রবীন্দ্রনাথের মেয়ের ক্ষেত্রেও এমন ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথের মেয়ে মীরার বিবাহ দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথকে প্রচণ্ড আর্থিক কষ্টে পড়তে হয়েছে। কাবুলিওয়ালা গল্পে এর বর্ণনা কিছুটি পাওয়া যায়। মীরার স্বামীর আব্দার মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হতো রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথের সামনেই মীরার স্বামী সিগারেট টানতেন, মাতলামি করতেন। তবু রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ করার সাহস পেতেন না। তিনি ব্রাহ্ম, হিন্দু নন। বাকি সবাই কুসংস্কারে হাবুডুবু খাওয়া ধার্মিক হিন্দু।

রবীন্দ্রনাথের বড়ো ভাই উপমহাদেশের প্রথম আইসিএস সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো প্রাজ্ঞ ব্যক্তিকেও বিয়ে করার সময় প্রচুর বেগ পেতে হয়েছে। যেসব হিন্দু এখন রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু বলে গর্ববোধ করে তাদের বলছি— রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না, যেমন নজরুল ছিলেন না মুসলিম।তাঁরা কবি, তাঁরা সাহিত্যিক। অবশ্য জীবনের শেষদিকে এসে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ধর্মের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। নজরুল দীর্ঘকাল চেতনাহীন থাকায় এমন কিছু দেখানো সম্ভব হয়নি। সুস্থকালে তিনি মা-কালীর ভক্ত ছিলেন। (সূত্র:

রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না, ড. প্রমিতা দাশ লাবণী)

সূত্র:
১. নগেন্দ্রনাথ বসু, বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস।
২. প্রশান্তকুমার পাল, “রবিজীবনী” প্রথম খণ্ড, ভূর্জপত্র, কলকাতা, ১৩৮৯ বঙ্গাব্দ, পৃষ্ঠা ৪
৩. Thompson, Jr., E (১৯২৬), Rabindranath Tagore: Poet and Dramatist, Read, পৃষ্ঠা 12.
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক
error: Content is protected !!