রহস্যময় শব্দসংসার (১০)

রহস্যময় শব্দসংসার (১০)

আবদুশ শাকুর

রহস্যময় শব্দসংসার (১০)
উঞ্ছবৃত্তি: উঞ্ছ শব্দটির অর্থ হলো, মাঠের শস্য কেটে নেওয়ার পর পরিত্যক্ত শস্যকণা খুঁটে খুঁটে সংগ্রহ। উঞ্ছের দ্বারা যিনি জীবিকা নির্বাহ করেন তাঁর বৃত্তিই হলো উঞ্ছবৃত্তি। জনসাধারণের সব সময় ব্যাকরণ জানার বা ঘাঁটাঘাঁটির প্রয়োজন পড়ে না – তাই উঞ্ছ বস্ত্তটি কী, সেটি এখন অভিধান না খুলে অনেকেই বলতে পারবেন না। তবে উঞ্ছবৃত্তি কী, তা কিন্তু সকলেই জানেন – কায়ক্লেশে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যাঁর জীবন চলে তিনিই উঞ্ছবৃত্তিনির্ভর বলে পরিচিত। প্রায়ই দেখা যাচ্ছে – তিনি অতিশয় অকিঞ্চিৎকর কিছুর জন্যেও অন্যের কাছে হাত পাতছেন বলে সকলে তাঁকে হেয় জ্ঞান করছে।
বিচিত্র ও বিতর্কিত বৃত্তিসমৃদ্ধ বর্তমান সমাজে উঞ্ছবৃত্তিকে সবচেয়ে হেয় বৃত্তি বলেই জ্ঞান করা হয় এবং ব্যবহারও করা হয় শুধু মন্দ অর্থেই। এ যেন ঘৃণ্য ভিক্ষাবৃত্তির চেয়েও হীন মানের বৃত্তি। অথচ এককালে উঞ্ছবৃত্তিই ছিল দরিদ্র সৎ মানুষের সকলের সমীহ সৃষ্টিকারী একমাত্র বৃত্তি। মূল্যবোধের এ নিদারুণ অবক্ষয় লক্ষণীয়।

একচ্ছত্র: একচ্ছত্র শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো, যে ছত্রে কেবল একজনমাত্র ব্যক্তির অধিকার বর্তমান – অর্থাৎ রাজার। এই শব্দটির আড়ালে ছত্র বা ছাতা ব্যবহারের প্রাচীন ইতিহাস লুকিয়ে আছে। ছত্রের আদিযুগে ছাতা ছিলো ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। ছাতা তখন ব্যবহার করতেন শুধু রাজা বা সম্রাটরাই। ফলে রাজশক্তি ও ছাতা তখন সমার্থক শব্দ বলে বিবেচিত হতো। রাজশক্তির প্রতীকই ছিলো ছত্র। একচ্ছত্র শব্দটির উৎপত্তিও ছাতার ওই ক্ষমতা থেকেই।
যাহোক, ছাতার দাপট কালে কালে অন্তর্হিত হয়েছে। এ রঙবেরঙের রেইনকোটের যুগে কালো রঙের নিরীহ ছাতার এতখানি গৌরবহানি ঘটেছে যে পিতা নতুন ছাতা হাতে গুঁজে দিলেও পুত্র লজ্জায় ওটা রাস্তায় নেমে খোলে না, ভিজে ভিজেই চলে। গরিবের অপরিহার্য কার্যটি করার জন্য পুরাতন ছাতার মেরামতকারী কোথাও বসার জায়গাও পায় না, একমাত্র বুড়ো বটতলা ছাড়া। কিন্তু ছত্রের হারানো দাপটের সঙ্গে হারিয়ে যায়নি একচ্ছত্র শব্দটির দাপট। প্রতাপের অখন্ডতা বোঝাতে শব্দটি আজও আমরা ব্যবহার করে চলেছি। তবে প্রতাপটা এখন ‘প্রজাবিশেষে’র – রাজার নয়।
এলাহি কাণ্ড: আরবি ইলাহি শব্দের বাংলা রূপান্তর হলো এলাহি। বাঙালি মুসলমান সমাজে চিঠিপত্র, হিসাবের খাতাপত্র ইত্যাদির শীর্ষদেশে এলাহি ভরসা কথাটি লেখার রেওয়াজটা সেকাল থেকে চলে আসছে এবং একালেও বহাল আছে। আরবি ইলাহি এবং হিন্দি ভরসা মিলে তৈরি হয় শুভ কামনাসূচক বাংলা বাক্যভঙ্গি এলাহি ভরসা। এই বাক্যভঙ্গির মধ্যে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, নির্ভরতা এবং তাঁর অসীম মহিমার কীর্তন সবই প্রকাশ পায়। আরবি ইলাহি শব্দের অর্থ হলো আমার আল্লাহ।
কিন্তু ভাষার গতি বড়োই বিচিত্র। এই এলাহি ভরসার পাশাপাশি কালে কালে দেখা যায় যে এলাহি কান্ড, এলাহি কারখানা, এলাহি ব্যাপার ইত্যাদি বাক্যভঙ্গি তৈরি হয়ে গেছে – যেগুলোর মধ্যে এলাহির মূল অর্থের বদলে চলে এসেছে কেবল এলাহির বিশালত্ব ও ক্ষমতাসূচক গুণাবলি। দেখা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের চোখে যে আয়োজনটি বিশাল কিংবা যা করা তাদের সাধ্যাতীত, সেই ব্যাপারগুলোই তারা প্রকাশ করছে এলাহি শব্দ দিয়ে। বলাবাহুল্য ব্যাপারটি সমাজ-মনস্তত্ত্বের।
এই একই মনস্তাত্ত্বিক কারণে হিন্দুদের অবতার রাম বা রাঘব তাঁর দেবত্ব, বীরত্ব, মহত্ত্ব ইত্যাদির বদলে ছাগল, বোকা, পাঁঠা, বোয়াল ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ভাষার এই পাকেচক্রে পড়ে রামছাগলের রাম হয়ে আকারের বড়োত্বকে এবং রামবোকার রাম হয়ে বোকামির শীর্ষত্বকে বুঝিয়ে থাকেন মহামহিম রাম।

কদর্য: কু মানে কুৎসিত এবং অর্য অর্থ স্বামী – এই ব্যুৎপত্তির পটভূমিতে প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় কদর্য শব্দটির একমাত্র অর্থ ছিল কুৎসিত স্বামী। আসলে যে সে স্বামীও নয়, যে ব্যক্তি স্ত্রীপুত্রকন্যাকে নিপীড়ন করে ধনসঞ্চয় করতো সেই মহাকৃপণ পরিবারপতিকেই বলা হতো কদর্য। শব্দসংসারের ক্রিয়াকলাপ এমনি খেয়ালি আর স্বেচ্ছাচারী যে কদর্য শব্দটি সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় প্রবেশ করেছে তার নিজস্ব অর্থটি ভুলে। ফলে এ আধুনিক ভাষার অনেক কিছুকেই সে ইচ্ছেমতো বিশেষিত করছে। এ ভাষায় তাই কদর্য বলতে কেবল কুৎসিত স্বামী বোঝায় না, স্বামী-অস্বামী নির্বিশেষে যা কিছু কুৎসিত বিশ্রী গর্হিত তাকেই বলা হয় কদর্য – যেমন কদর্য আচরণ, কদর্য চেহারা, কদর্য কথাবার্তা ইত্যাদি। এতে কুৎসিত স্বামীটি হয়তো কিছু স্বস্তি পেতে পারে। (চলবে)

শুবাচে দিয়েছেন: প্রদীপ ভাদুড়ি

রহস্যময় শব্দসংসার: ওয়েবসাইট লিংক
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক

রহস্যময় শব্দসংসার: শুবাচ লিংক

 

error: Content is protected !!