রাজপুতিন সন্ন্যাসী ও দ্বিতীয় নিকোলাস

রাসপুতিন একজন বিখ্যাত রুশ সন্ন্যাসী। জার ২য় নিকোলাসের দরবারের একজন সুদক্ষ, বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব। রাসপুটিনের সময়ে রাশিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্র মস্কোয় ছিল না-ছিল সেন্ট পিটার্সবার্গ, পরবর্তীকালে যা পরিচিত হয়ে ওঠে লেলিনগ্রাদ নামে। তবে এককালে রাশিয়ায় সত্যি সত্যি রাসপুটিন নামে একজন বাস করতেন।তাঁর আসল নাম গ্রিগরি ইয়েফ্লিমোভিচ রাসপুতিন। রাশিয়ার সাইবেরিয়ায় উরাল পর্বতের নিকট তুরা নদীর তীরে প্রোকরোভস্কয় গ্রামে ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দের ২২ জানুয়ারি গ্রিগরি ইয়েফ্লিমোভিচ রাসপুতিন জন্মগ্রহণ করেন। কৈশোর থেকে তিনি ছিলেন আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী। রাসপুতিনের বাবা ঘোড়ার ব্যবসা করতেন। একবার তার কয়েকটা ঘোড়া চুরি হয়। সে সময় বালক রাসপুতিন ঘোড়া চোরের নাম বলে দিয়েছিলেন। গ্রামের লোক বলাবলি করল ছেলে তো খ্রিস্টের আর্শীবাদ পেয়েছে। অল্পদিনে এ কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আঠারো বছর বয়সে তার অতীন্দ্রিয় অনুভূতি আরও প্রবল হয়ে উঠে।

রাসপুতিনের এক বোন এক ভাই। বোনের নাম মারিয়া এবং ভাইয়ের নাম ছিল দিমিত্রি। মারিয়া মৃগরোগী ছিল। দিমিত্রি মারা যায় নিউমোনিয়া রোগে। সেই সময় তিনি শোক ও নিঃসঙ্গতা এড়ানোর জন্য সাইবেরিয়ার বিশাল প্রান্তরে একা একা ঘুরে বেড়াতেন। শোক ও হতাশা এড়াতে ধর্মের আশ্রয় খুঁজছিল সে। এই সময়ে খলেস্টি সম্প্রদায়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। খলেস্টি সম্প্রদায়ের প্রবক্তা ছিলেন সাইবেরিয়ার একজন চাষী। এরা গির্জা মানে না, তথাকথিত আকাশপুস্তক কিংবা ঐশ্বরিক ধর্মীয় পুস্তকেও তাদের বিশ্বাস ছিল না। তারা ছিল জীবনবোধ, বাস্তবতা ও মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ কাল্পনিক বিশ্বাস থেকে মুক্ত উদার মনের মানুষ। রাসপুতিন খলেস্টি সম্প্রদায়ের সাথে এক বছর ঘনিষ্ঠভাবে মেশেন। প্রাসকোভিয়া ফিয়োদরোনভা নামের এক সুন্দরী মহিলার সাথে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহিত জীবনে তিনি দিমিত্রি, মারিয়া ও ভারভারা নামক তিন সন্তানের পিতা।

সংসার করেও সংসারে মন বসাতে পারলেন না।জীবন যাদের বড়ত্বের জন্য, সৃষ্টির জন্য তারা তো আর কুঁড়েঘরে বসে থাকতে পারেন না। ঘুরে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন রাসপুতিন । সাধারণ লোকের বিশ্বাস তিনি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু তিনি তা স্বীকার করতেন না। তবে অজ্ঞ ধর্ম বিশ্বাসের মত রাশিয়ার চাষী সমাজ রাসপুতিনকে ঈশ্বরের নিকটতম বন্ধু ও অলৌকিক শক্তির অধিকারী হিসেবে বিশ্বাস করতেন। সাধারণ মানুষ নানা সমস্যা নিয়ে রাসপুতিনের কাছে যেতেন। যারা যেতেন তাদের সমস্যার সমাধান হয়ে যেত- এমনটিই লোকমুখে প্রচলিত ছিল। অল্প দিনের মধ্যে অনেক লোক রাজপুতিনের শিষ্য হন। শিষ্যদের সঙ্গে নিয়ে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন রাশিয়ার রাজধানী ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু সেন্ট পিটার্সবার্গ গমন করেন । সেন্ট পিটার্সবার্গে যাওয়ার অল্প কয়েক দিনের মধ্যে প্রচুর সংখ্যক শিক্ষিত ও অভিজাত লোক তার ভক্ত ও শিষ্য হয়। বিশেষ করে উচ্চপদস্থ প্রচুর সরকারি কর্মকর্তা তাঁর শিষ্য হয়। শিষ্যরা রাসপুতিনের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। অভিজাত মানুষের নানা সমস্যাও তিনি সমাধান করতে থাকেন।

তখন রাশিয়ায় রোমানভ বংশের শাসন চলছিল। রাশিয়ার সম্রাটকে বলা হত জার। জার ২য় নিকোলাস রাশিয়ার সম্রাট ।তিনি ছিলেন রোমানভ বংশের শেষ শাসক। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে লেলিনের নেতৃত্বে তাঁকে উৎখাত করা হয়েছিল। জারের স্ত্রীর নাম ছিলেন জারিনা আলেকজান্দ্রা। এদের একমাত্র পুত্র আলেকসেই -রাশিয়ার সিংহাসনের ভবিষ্যৎ উত্তরসূরী দূর্ঘটনাবশত ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়। এরপর আঘাতস্থল থেকে অনবরত রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে: হেমোফিলিয়া। চিকিৎসা করে কোন প্রতিকার হচ্ছিল না। রাসপুতিনের অলৌকিক ক্ষমতার কথা জার আর জারিনাও জানতেন। তবে পাত্তা দেন নি। ছেলের বিপদে রাসপুতিনের অলৌকিক ক্ষমতা তার কাছে আশার উৎস হয়ে উঠে। চিকিৎসকরা আলেকসেইর জীবনের আশা ছেড়ে দেন। এ অবস্থায় ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে রাসপুতিনকে জারের প্রাসাদের ডেকে আনা হয়। রাসপুতিনের চিকিৎসায় মৃতপ্রায় আলেকসেই সুস্থ হয়ে যায়। অনেকে বলে জোঁক দিয়ে নাকি রাসপুতিন আলেকসেইর রক্ত শুষে নিয়েছিল । জোঁকের লালায় থাকে হিরুদিন; যা রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। আবার অনেকে বলে অ্যাসপিরিন দিয়ে নাকি আলেকসেই কে সারিয়ে তুলেছিল রাসপুতিন। অ্যাসপিরিন জিনিসটা ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দ থেকেই ইউরোপে পাওয়া যেত।

আলেকসেই সেরে ওঠার পর জার নিকোলাস রাসপুতিনকে রাশিয়া ও জার-পরিবারের বিশ্বস্ত বন্ধু ঘোষণা করেন। তারপর থেকে জারিনা আলেকজান্দ্রার ওপর রাসপুতিনের প্রভাব বাড়তে থাকে। সম্রাজ্ঞী জরিনা রাসপুতিনের কথা ঈশ্বরের কন্ঠস্বর বলে মনে করতেন। ঠিক যেমনটি করা হয় অবতারদের নিয়ে।

রাসপুতিন সাধারণ নিম্ব-মধ্যবিত্ত পরিবার হতে উঠে আসা একজন অসাধারণ ব্যক্তি। যিনি প্রত্যন্ত গ্রাম হতে এলেও রাশিয়ার মত রাষ্ট্রের রাজদরবারে বিপুল সমাদরে গৃহীত হয়েছিলেন। তিনি রাজ দরবারে প্রবেশ করেন নি; যোগ্যতার কারণে তাকে রাজদরবারে ডেকে আনা হয়েছিল এবং যোগ্যতা বলেই তিনি রাজ দরবারে স্বীয় অধিকারকে প্রবল প্রতাপে বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। রাসপুতিনের কাজকর্ম, জ্ঞান ও ব্যক্তিত্ব রাজদম্পতিকে এত বেশি আকৃষ্ট করেছিল যে, রাজ পরিবারের অনেক প্রভাবশালী সদস্যের চেয়েও তিনি ক্ষমতাশীল ছিলেন। যা রাজ পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য ও তাদের অনুগত আমলাদের ক্ষুব্ধ করে তোলেছিল।

১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে সেন্ট পিটার্সবার্গের একদল দুর্নীতিগ্রস্থ- ক্ষমতালোভী রাজ-আমাত্য ও আমলা রাসপুতিনকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রিন্স ফেলিকস ইউসুপভ ছিলেন এই হত্যাকান্ডের মূল উদ্যোক্তা। রাসপুতিনের জন্য তিনি ও তার ভক্ত অনুসারীগণ জারের দরবারে অনেকটা কোনঠাসা হয়ে পড়েছিলেন । ইউসুপভ রাসপুতিনকে তার প্রাসাদে নিমন্ত্রণ করেন।রাসপুতিন ছিলেন সন্ন্যাসী, তিনি মানুষকে বিশ্বাস করতেন। ইউসুপভকে মনে করতেন বন্ধু। রাসপুতিন সরল মনে ইউসুপভের বাড়ি যান। তিনি মনেও করতেন না যে, রাজদরবারের কেউ তাকে হত্যা করবে। কারণ তিনি ছিলেন প্রভাবশালী কিন্তু নির্মোহ। অধিকন্তু তার ক্ষমতা দখলের বা ক্ষমতা অর্জনের কোন সুযোগ ছিল না। যাই হোক, ইউসুপভ প্রতারণামূলকভাবে রাসপুতিনকে প্রচণ্ড শক্তিশালী বিষ মেশানো পানীয় ও কেক খেতে দেন। রাসপুতিন এত গভীর আধ্যাত্মিক শক্তিতে বলীয়ান ছিলেন যে, তাতেও রাসপুতিনের ওপর বিষের ক্রিয়া হয় নি। বিষের ক্রিয়া হয় নি দেখে ক্রোধে উন্মুক্ত ইউসুপভ রাসপুতিনকে গুলি করেন। রাসপুতিন গড়িয়ে গড়িয়ে ইঁট বাঁধানো প্রাঙ্গনে নেমে আসেন। এ অবস্থায় ইউসুপভ ও তার অনুসারীরা রাসপুতিনকে নেভা নদীতে ফেলে হত্যা করে।

রাসপুতিনকে ইতিহাসে নানাভাবে চিত্রিত করা হয়েছে। জারিনার সাথে তার সম্পর্ককে যেভাবে চিত্রিত করা হয়েছে তা কতটুকু সত্য তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। রাসপুতিন ছিলেন ধর্মীয় রহস্য মার্গীয় চর্চাকারী এবং এই ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী একজন ব্যক্তি। জারিনার হেমোফিলিয়া রোগে আক্রান্ত একমাত্র শিশুকে রাসপুতিন অলৌকিকভাবে মুত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন। কোন চিকিৎসকই তার ছেলেকে ভাল করতে পারছিল না। রাসপুতিন অলৌকিকভাবে তার রক্তপাত বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে জারিনা ছেলের জীবন রক্ষায় রাস্পুতিনকে রাজপ্রাসাদেই রেখে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। একজন কৃতজ্ঞ মায়ের দৃষ্টিকোন থেকে দেখতে ও বিচার করলে জারিনা যে কাজটি করেছেন সেটিই হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম।

অনেকে মনে করেন, রাশিয়ার তৎকালীন রাজদম্পতির উপর রাসপুতিনের ব্যাপক প্রভাব ছিল। অবশ্য রাসপুতিনের সে সামর্থ্য ছিল। তিনি ছিলেন একধারে সন্ন্যাসী, দার্শনিক, চিকিৎসা বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ ও ভবিষ্যবক্তা। প্রবল ছিল তার ব্যক্তিত্ব। তার দেহাবয়ব ছিলে অপরূপ। তৎকালীন রাশিয়ায় এমন সুপুরুষ আর ছিলেন না। অনেকে মনে করেন, তার পরামর্শ রাজকার্যে জারকে অনেক বিপদ ও অবাঞ্চিত পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করেছে। তাদের মতে, তিনি রাজ দরবারের একজন সত্যিকার বন্ধু ছিলেন। তাই রাজদম্পতিও তাঁকে অত্যন্ত বিশ্বাস করতেন। অনেকে আবার মনে করেন, তিনি ছিলেন লম্পট, নারীলোভী ও ক্ষমতালিপ্সু। যাই হোক, অবস্থানগত কারণে তিনি ক্রমশ প্রচণ্ড প্রভাবশালী হয়ে উঠেন। তার প্রভাবে অনেকে আমলা ও রাজ আমাত্য ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেন। ফলে তারা রাসপুতিনের বিরুদ্ধে গোপনে নানা কুৎসা ও ষড়যন্ত্র শুরু করে। অনেকে তাকে চরিত্রহীন লম্পট এবং রুশ রাজনীতিতে নানা ধরণের দুষ্কর্মের হোতা বলে অপ্রচার চালায়। ক্ষমতালোভী আমলা-আমাত্যরা রাসপুতিনের জন্য সুবিধা করতে পারছিল না। তাই তাঁরা রাসপুতিনের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র লিপ্ত হয়। এটি ছিল তৎকালীন রাশিয়ায় নিরস্ত্র একজন অতিথির উপর পরিচারিত নিষ্ঠুর ও প্রতারণাময় হত্যাকাণ্ড।

রাসপুতিনের মৃত্যুর এক বছর পর ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে রাশিয়ায় বিপ্লব সফল হয়। জার নিকোলাস ক্ষমতাচ্যুত হন এবং লেনিন ক্ষমতায় আসেন। সব ধর্মে ও সব সমাজে যারা অতীন্দ্রিয় চর্চা করেন, তাদের সন্দেহের চোখে দেখা হয়। অধিকন্তু রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের সুচনা হওয়ায় রাসপুতিন বা জার জারিনা উভয়েই কম্যুনিজমের শত্রু হওয়ায় তাদের বিষয়ে কোন নিরপেক্ষ গবেষণা হয় নি। সংগত কারণে জার নিকোলাস ও তার অনুগতদের, বিশেষ প্রত্যন্ত গ্রাম হতে আসা রাসপুতিনের জন্য যাদের স্বার্থে আঘাত লেগেছিল তারা রাসপুতিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপপ্রচার শুরু করে। এদের অপপ্রচারের কারণে অনেকের কাছে রাসপুতিন লম্পট ও দুষ্কর্মের হোতা হিসেবে পরিচিত। আসলে কি তাই? তাহলে জারদম্পতি কি তাকে রাজদরবারে রাখতেন! বস্তুত তিনি ছিলেন রাজদম্পতির অনুগত এবং তাদের একজন যোগ্য বন্ধু ও কার্যকর পরামর্শদাতা।

error: Content is protected !!