রাজা বাদশাহ সম্রাট শাহেনশাহ

রাজা ও বাদশা শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ অভিন্ন। তবে প্রায়োগিক অর্থ ভিন্ন। ‘রাজা’ সংস্কৃত শব্দ এবং ‘বাদশাহ’ ফারসি শব্দ। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান (প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০১৬) অনুযায়ী ‘রাজা’ অর্থ দেশশাসক, নৃপতি, ভূপতি, পদবিশেষ, অতিশয় ধনিব্যক্তি, দাবা খেলার ঘুঁটিবিশেষ। ‘বাদশাহ’ শব্দের অর্থ মুসলমান সুলতান বা সম্রাট, রাজাধিরাজ। দুটো শব্দই শাসক অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত। হিন্দু শাসককে বলা হয় ‘রাজা’ এবং মুসলিম শাসককে বলা হয় ‘বাদশাহ’। ‘রাজা’র চেয়ে ‘বাদশা’র শাসন অধিক্ষেত্র সাধারণভাবে ব্যাপক হতো। ছোটো ভুখণ্ড বা জনপদ নিয়েও রাজার অস্তিত্ব ছিল। প্রাচীনকাল হতে উপমহাদেশ, হিন্দুদের দ্বারা অর্থাৎ রাজাদের দ্বারা শাসিত হয়ে আসছিল। এখানে ছোট ছোট অনেক রাজ্য ছিল, যা রাজারাই শাসন করত।

নবাব হচ্ছে নওয়াবার একটি শাব্দিক রূপ। নওয়াব শব্দটি আরবি নায়েব (প্রতিনিধি) শব্দের বহুবচন। তবে তা একবচন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হিন্দি ভাষায় নওয়াব শব্দটির উচ্চারণ করা হয় নবাব। নবাব শব্দের সাধারণ আভিধানিক অর্থ, মুসলমান সামন্তশাসক। এটি মুগল প্রাশাসনিক ব্যবস্থায় রাজনীতিক পদমর্যাদা ও ক্ষমতানির্দেশক একটি পদবিবিশেষ। ব্রিটিশ যুগে কোনো দপ্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট না-হয়েও ‘নবাব/নওয়াব’ রাষ্ট্র কর্তৃক সম্মানসূচক উপাধি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেকালে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা হিন্দি ভাষা দ্বারা সমধিখ প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাই তারা সাধারণত হিন্দি রীতিতেই এটি উচ্চারণ করতেন। উনিশ শতকের বাঙালি লেখকগণ তাঁদের লেখায় ‘নওয়াব’ ও ‘নবাব’ উভয় শব্দই ব্যবহার করেছেন। এখনও শব্দদুটি বাঙালিদের কাছে অভিন্ন অর্থ বহন করে।

কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে নওয়াব নিয়োগ করা হতো। কিন্তু পূর্ব ভারতের তিনটি প্রদেশে (বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা) নওয়াব নামে কোনো দাপ্তরিক পদ ছিল না। তবে ক্ষেত্রবিশেষে এটি খেতাব হিসেবে ব্যবহূত হতো। মুগলদের অতিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় একই পদমর্যাদা সম্পন্ন পরস্পর স্বাধীন দুজন কর্মকর্তা সুবাহর (প্রদেশ বা কয়েকটি প্রদেশের সমষ্টি) শাসন পরিচালনা করতেন। এঁদের একজন ছিলেন সুবাহদার যিনি প্রশাসন এবং সেই সংঙ্গে বিচার ও প্রতিরক্ষা (এ দুটিকে একত্রে নিজামত বলা হতো এবং সুবাহদার নাজিম হিসেবে পরিচিত হতেন) ব্যবস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন এবং অন্যজন ছিলেন দীউয়ান যিনি রাজস্ব প্রশাসনের (দীউয়ানি) দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতেন। এ দুজনই সম্রাট কর্তৃক সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত এবং সম্রাটের কাছেই দায়বদ্ধ ছিলেন।

মুর্শিদকুলী খান থেকে শুরু করে সিরাজউদ্দৌলার সময় নওয়াবি যুগ নামে পরিচিত, যদিও তাঁদের কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে নওয়াব খেতাব গ্রহণ করেননি। দরবারে আগত অতিথিবর্গ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিকে নওয়াব হিসেবে নয়, নাজিম হিসেবেই সম্মান জানাতেন। যেহেতু ফরমান জারি করা শুধু সম্রাটের এখতিয়ারভুক্ত ছিল। তাই নাজিমগণ পরওয়ানা জারি করতেন, ফরমান নয়। এদের প্রত্যেকেই প্রথাগতভাবে কেন্দ্র থেকে সুবাহদারি সনদ সংগ্রহ করতেন, যদিও তারা ছিলেন স্বাধীন। সমকালীন লেখক ও প্রত্যক্ষদর্শীরাও বরাবর তাঁদের নাজিম বা সুবাহদার বলে উল্লেখ করেছেন।

সম্রাট (Emperor) সাধারণত কোনো একটি স্বাধীন দেশের শাসক কিংবা সাম্রাজ্যের অধীন কোনো রাজ্যের পুংলিঙ্গধারী রাজা বা শাসনকর্তা। প্রাচীন ফরাসি এম্পারিয়র শব্দটি ল্যাটিন ইম্পারেটর শব্দ থেকে আগত। সম্রাটের স্ত্রীলিঙ্গ হিসেবে সম্রাজ্ঞী ব্যবহৃত হয়। সাধারণত একজন সম্রাটের অবস্থান রাজার তুলনায় অধিকতর মর্যাদাসম্পন্ন এবং শীর্ষস্থানীয়।বর্তমান বিশ্বে কেবল জাপানেই সম্রাট পদবি রয়েছে।

রাজা এবং সম্রাট – উভয়েই নির্দিষ্ট কোনো এলাকা বা রাজ্যের শাসনকর্তা হিসেবে ক্ষমতাসীন থাকেন। ইউরোপীয় মানদণ্ডে সম্রাট এবং সম্রাজ্ঞী উচ্চপদস্থ ব্যক্তি হিসেবে পরিগণিত। তবে সাম্রাজ্যের অধীনস্থ রাজ্যের প্রধান হিসেবে সবসময় সম্রাট পদবি ব্যবহার করা হয় না। ব্রিটিশশাসিত অবিভক্ত ভারতে সম্রাট পদবির ব্যবহার হয়নি কিংবা যতটুকুই ব্যবহৃত হয়েছে তা সীমিত পর্যায়ে নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণপূর্বক করা হয়েছে। সম্রাটগণ রাজাদেরকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে ও কেবল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনীতিক সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে ক্ষমতাভার অর্পণ করেছেন। বর্তমানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে সম্রাট সরকার প্রধানের কর্মপরিধি ও সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।

শাহেনশাহ শব্দের আভিধানিক অর্থ শাহানশাহ, রাজাদের রাজা, রাজাধিরাজ। মুসলিম শাসনামলে, শাহ বাংলাদেশ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের পদবি হিসেবে ও ব্যবহৃত হয়ে থাকত। অনেক মুসলিমের নামও দেখা যায় শাহানশাহ বা শাহেনশাহ। শাহ ফারসি শব্দ। প্রাচীন পারসিক ভাষায় শব্দটির রূপ ছিল Xšâyathiya ‘রাজা’। পারসিক ধর্মগ্রন্থ আবেস্তায় এটি ছিল xšaΘra-, “রাজশক্তি বা সমরশক্তি”। প্রাচীন সংস্কৃত kṣatra (ক্ষত্র) থেকে ক্ষত্রিয় (যোদ্ধা) শব্দের উদ্ভব। আধুনিক ফারসি ভাষায় শাহ অর্থ বাদশাহ বা রাজা। ভারতবর্ষের সুলতানি আমলের শাসকেরা এবং মোগল শাসকেরা নিজেদের নামের সাথে শাহ পদবি ব্যবহার করতেন। অনেকে এই পদবির সঙ্গে শাহেন লাগিয়ে বলতেন শাহেনশাহ। তবে এটি ছিল অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানক পদবি। পীর, দরবেশদের নামের পদবিতেও শাহ ও শাহেনশাহ এর বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়।

বাংলা বানান,বাংলা ভাষাসাধারণ জ্ঞানবিষয়ক লেখা পেতে ক্লিক করুন:

error: Content is protected !!