লাইবেরিয়া (Liberia) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (আফ্রিকা)

ড. মোহাম্মদ আমীন 

লাইবেরিয়া (Liberia)

লাইবেরিয়া পশ্চিম আফ্রিকার আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলে অবস্থিত একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ১৯শ শতকে স্বাধীন মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ দাসেরা জনবিরল এ দেশটি প্রতিষ্ঠা করে। লাইবেরিয়ার উত্তরে সিয়েরা লেওন ও গিনি, পূর্বে কোত দিভোয়ার এবং দক্ষিণ ও পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর অবস্থিত। রাজধানীর নাম মনরোভিয়া। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এখানে একটি ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ হয়, যাতে দেড় লক্ষ লোক মারা যায় এবং দেশটির অর্থনীতি ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়।

ল্যাটিন লিবার (liber) শব্দের অর্থ মুক্ত। লাইবেরিয়া নামের অর্থ লিবার্টি (liberty) এবং লাইবেরিয়া নামটি লির্বার্টি শব্দের উপর ভিত্তি করে চয়ন করা হয়েছে। লাইবেরিয়া শব্দ মুক্ত বা মুক্তদেশ অর্থ প্রকাশ করে। ভূখ-টিতে ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে আফ্রিকান-আমেরিকান মুক্ত দাসদের একটি উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় আমেরিকো-লাইবেরিয়ানস (Americo-Liberians) নামের একটি নতুন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী সৃষ্টি করে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। লাইবেরিয়া খোঁজে পাওয়া বা জোরপূর্বক দখল করে উপনিবেশ সৃষ্টি করা কোনো দেশ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র মুক্ত দাসদের অভিবাসিত করে এটি উপনিবেশের মত প্রতিষ্ঠা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর নামানুসারে লাইবেরিয়ার রাজধানীর নামকরণ করা হয় মনরোভিয়া।

মসলা-বাণিজ্যকালে অ-ইংরেজভাষী ইউরোপদের কাছে লাইবেরিয়া ম্যালাগুয়েরটা কোস্ট (Malaguetta Coast), ইংরেজিতে পিপার কোস্ট নামে পরিচিত ছিল। ইউরোপ মহাদেশে মেলেগুয়েটা (Malaguetta ) জাতের মরিচের প্রবল চাহিদা ছিল। এ এলাকায় ওই মরিচ প্রচুর উৎপন্ন হতো। তাই নাম দেওয়া হয়েছিল মেলেগুয়েটা। অষ্টাদশ শতকে ইংরেজ অভিযাত্রীরা এর নাম দিয়েছিল ইউন্ডওয়ার্ড কোস্ট (Windward Coast) বা প্রতিবাত উপকূল বা বায়ুর উজানে অবস্থিত উপকূল। উল্টো বায়ু প্রবাহের কারণে এর উপকূলীয় জলরাশি ছিল প্রচ- অস্থির। ইউরোপীয়ান জাহাজগুলো সহজে এখানে ভিড়তে পারত না। তাই ভূখ-টির নাম ইউন্ডওয়ার্ড কোস্ট রাখা হয়েছিল।

লাইবেরিয়ার মোট আয়তন ১,১১,৩৬৯ বর্গকিলোমিটার বা ৪৩,০০০ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগের পরিমাণ ১৩.৫১৪%। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, লাইবেরিয়ার জনসংখ্যা ৪৫,০৩,০০০ জন এবং প্রতি বর্গকিলোমিটার লোকসংখ্যা ৩৫.৫ জন। আয়তন বিবেচনায় লাইবেরিয়া পৃথিবীর ১০৩-তম বৃহত্তম দেশ এবং জনসংখ্যা বিবেচনায় ১২৫-তম। কিন্তু জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় পৃথিবীর ১৮০-তম জনবহুল দেশ।

২০১৫ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, লাইবেরিয়ার জিডিপি (পিপিপি) ৬.৭৫৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ২,০০০ ইউএস ডলার। অন্যদিকে, ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, জিডিপি (নমিনাল) ২.০২৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৪৮৪ ইউএস ডলার। মুদ্রার নাম লাইবেরিয়ান ডলার। রাজধানী মনরোভিয়া। সরকারিভাবে লাইবেরিয়ার অধিবাসীদের লাইবেরিয়ান বলা হয়। ১৮২২ খ্রিস্টাব্দের ৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা আমেরিকান কলোনাইজেশন সোসাইটির মাধ্যমে মুক্তদাসদের অভিবাসনের সূচনার মাধ্যমে এটি প্রতিষ্ঠা পায়। ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি লাইবেরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি পায়। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের ৬ জানুয়ারি বর্তমান সংবিধান গৃহীত হয়। মাত্র ১৫% লাইবেরিয়ান ইংরেজি ভাষায় কথা বললেও দেশটির সরকারি ভাষা ইংরেজি। তবে আরও ৭টি ভাষা সরকারিভাবে স্বীকৃত। লাইবেরিয়ার অধিবাসীর ৪০% খ্রিস্টান, ২০% মুসলিম ও ৪০% আদি স্থানীয় ধর্মের অনুসারী।

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও জননন্দিত নেতা নেলসন মেন্ডেলা লাইবেরিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। পশ্চিম আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম ন্যাশনাল পার্ক সাপো ন্যাশনাল পার্ক এখানে অবস্থিত। এ পার্কে ১২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী আছে। জীববৈচিত্রের অসাধারণত্বের জন্য এটি বিশ্বের ২৬১-তম প্রাকৃতিক বিস্ময় ঘোষিত হয়েছে। এ অভয়ারণ্যটির আয়তন যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলসের চেয়ে বড়। দুর্লভ পিগমি জলহস্তী এ পার্কে পাওয়া যায়। হাইতির পর লাইবেরিয়া পৃথিবীর দ্বিতীয় কৃষ্ণশাসিত প্রজাতন্ত্র। লাইবেরিয়াকে পাখির স্বর্গরাজ্য বলা হয়। এখানে ৭০০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এখানে এমন একপ্রকার পাখি পাওয়া যায়, যার মৌমাছির চেয়ে বড় ক্ষুদে শুড় আছে এবং মৌমাছির মতো শব্দ করে (include a bird that is a wee bit larger than a honey bee- the bee warbler.)।

লাইবেরিয়া এখন পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশসমূহের একটি। তবে ১৯৫০ এর দশকেও দেশটি কৃষ্ণাঙ্গশাসিত পৃথিবীর অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ ছিল। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হতে দেশটির আর্থিক অবস্থা খারাপ হতে হতে চরম পর্যায়ে নেমে আসে। ওই গৃহযুদ্ধে ৭ বছরে ২ লক্ষ লোক নিহত হয়েছিল। লাইবেরিয়ার নারী নেতা, প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর সংখ্যা একত্রে নরওয়ে, সুইডেন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মোট নারী নেতার সংখ্যার চেয়ে বেশি। লাইবেরিয়া আফ্রিকা মহাদেশের বৃহত্তম লৌহ আকরিক উৎপাদনকারী দেশ। লাইবেরিয়ার জাতীয় পতাকা অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পতাকার মতো। ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই পতাকাটি গৃহীত হয়।

লাইবেরিয়ায় শহরের লোকজন পাশ্চাত্য পোশাক পরিধান করে। তবে গ্রামীণ লোকজন এখনও ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন পোশাক পরিধান করে। এটি ছিল পৃথিবীর একমাত্র আমেরিকান উপনিবেশ। আফ্রিকার দেশসমূহের মধ্যে লাইবেরিয়াতে প্রথম একজন মহিলা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে নির্বাচিত হার্ভাড অধীত অর্থনীতিবিদ অ্যালেন জনসন শেরলিফ লাইবেরিয়ার প্রথম নির্বাচিত মহিলা প্রেসিডেন্ট। লাইবেরিয়ার বাণিজ্যের ৭০% হয় যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে।

ঘানা (Ghana) : ইতিহাস ও নামকরণ

রোয়ান্ডা (Rwanda) : ইতিহাস ও নামকরণ

গিনি (Guinea) : ইতিহাস ও নামকরণ

গিনি-বিসাউ (Guinea-Bissau) : ইতিহাস ও নামকরণ

কেনিয়া (Kenya) : ইতিহাস ও নামকরণ

লেসোথো (Lesotho): ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (আফ্রিকা), ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!