লাও (Laos) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (এশিয়া)

ড. মোহাম্মদ আমীন

লাও (Laos)

লাও নামের দেশটির ইংরেজি বানান Laos। এটি দীর্ঘদিন ফ্রান্সের শাসনাধীন ছিল। তবে বানান যাই হোক, উচ্চারণ কিন্তও লাও এবং শেষের অক্ষরটি উহ্য থেকে যায়। ‘লাও’ ভাষা হতে ‘লাও’ নামের উদ্ভব। এর অর্থ একটি লাওসের বা লাওসিয়ান। কিংবদন্তি এ যে, ভারতীয় শব্দ লভ (Lava) হতে লাওস নামটি এসেছে। লভ হচ্ছে ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত দেবতা যমজ সন্তানের একজন। অনেকে মনে করেন, আই-লাও বাগভঙ্গি হতে লাওস নামটির উৎপত্তি হয়েছে। এর অর্থÑ সে স্থান, যেখানে লাও বংশের লোকজন বসবাস করে। লাও নামের উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত প্রবাদগুলোর মধ্যে হস্তী প্রবাদটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। লাওসের প্রাচীন নাম লাঙ সাঙ (Lan Xang) বা লাও সাঙ। এর অর্থ মিলিয়ন হস্তীর দেশ। দেশটিতে প্রচুর হস্তী ছিল। তাই এর নাম লানসাঙ। যা পরবর্তীকালে অপভ্রংশে লাও বা লাওস নামে স্থিতি পায়।

আবার অনেকে বলেন, মোঙ লাও (Lao) হতে লাও নামের উদ্ভব। এর অর্থ লাও দেশ। দেশটির সরকারি নাম লাও ডেমোক্র্যাটিক পিপলস রিপাবলিক। লাও ভাষায় দেশটির নাম মুয়াঙ লাও (Muang Lao) বা প্যাথেট লাও (Pathet Lao)। উভয় শব্দগুচ্ছের আক্ষরিক অর্থ লাও দেশ বা লাওদের দেশ।

১৮৯৩-১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত লাও ফ্রান্সের ইন্দোচায়নার অংশ হিসাবে শাসিত হয়। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ জুলাই লাও ফ্রান্স হতে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ৯ নভেম্বর হতে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত লাওসিয়ান সিভিল ওয়ার চলে। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ২ ডিসেম্বর লাওসের বর্তমান পতাকা গৃহীত হয়। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ২ ডিসেম্বর লাও রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়। রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হওয়ার পর থেকে দেশটির সরকারি নাম লাওস পিপলস ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক (Lao People’s Democratic Republic) কিন্তু এখন সবাই বলে লাওস (Laos), প্রকৃত উচ্চারণ লাও।

লাও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একমাত্র স্থলবেষ্ঠিত দেশ। সমুদ্র নেই বলে এখানে কোনো নৌবাহিনিও নেই। মেকঙ লাওসের অন্যতম নদী। যোগাযোগ, ফিশিং, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাষাবাদের জন্য এ নদীকে লাওসের প্রাণ বলা হয়। মেকঙ নদী ‘মায়ে নাম খং’ নামেও পরিচিত। এর অর্থ সকল নদীর জননী বা মাদার অব অল রিভারস। সমুদ্রের সঙ্গে যোগাযোগহীন লাওয়ের জন্য সত্যি, এ নদী সকল নদীর জননী। এ দেশে অবস্থিত খোন পেপেঙ (Khone Papeng) দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম জলপ্রপাত।

লাওসের অধিকাংশ জনগণ বুড্ডিস্ট। সারা বিশ্বে লাও সততা ও সারল্যের জন্য খ্যাত। সামান্য প্রাপ্তির মধ্যেও কত আনন্দ, সামান্য পেয়েও কত শান্তিতে জীবনকে উপভোগ করা যায়, তা লাওসের জনগণকে দেখলে অনুধাবন করা যায়। শপিঙে তারা খুব হিসাবি কিন্তু অত্যন্ত বিশ্বাসপ্রবণ। ঠকলেও নিজেদে অভাগা ভাবে না, বরং যারা ঠকিয়েছে, তাদের আচরণ অনুভব করে, তাদের জন্য সহানুভূতি প্রকাশ করে। লাওসের বাজারে নিজেদেও মুদ্রা লাও কিপ এর ন্যায় থাই বাথ ও মার্কিন ডলারও গ্রহণ করা হয়।

লাও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি স্থলবেষ্ঠিত দেশ। এর উত্তরপশ্চিমে মায়ানমার ও চায়না, পূর্বে ভিয়েতনাম, দক্ষিণে কাম্বোডিয়া এবং পশ্চিমে থাইল্যান্ড।
লাওয়ের মোট আয়তন ২,৩৬,৮০০ বর্গকিলোমিটার বা ৯১,৪২৮.৯৯১ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় অংশের পরিমাণ ২ %। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে দেশের মোট জনসংখ্যা ৬৮,০৬,৩৯৯ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যা ২৬.৭। আয়তন বিবেচনায় লাও পৃথিবীর ৮৪-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু জনসংখ্যা ও জনসংখ্যা বিবেচনায় ১০৪-তম বৃহত্তম দেশ। অন্যদিকে জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ১৭৩-তম জনবহুল দেশ। এর মানে জনসংখ্যার তুলনায় দেশের আয়তন অনেক বড়। লাওয়ের জিডিপি (পিপিপি) ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে ৩৪.৪০০ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ৪,৯৮৬ ইউএস ডলার। অন্যদিকে জিডিপি (নমিনাল) ১১.৬৭৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ১,৬৯০ ইউএস ডলার। গিনি ৩৬.৭ এবং এইচডিআই ০.৫৬৯ (মধ্যম)। মুদ্রার নাম কিপ [Kip (LAK0]। রাজধানী ভিয়েনতিয়েন।

লাওসকে পৃথিবীর সবচেয়ে মারাত্মক বোমাগ্রস্ত (World’s Most Bombed Country) দেশ বলা হয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় এ দেশটিতে ২ বিলিয়ন টনেরও অধিক বোমা ফেলা হয়েছিল। বিশ্বের আর কোথাও এমন বোমাবর্ষণ ঘটেনি। সাধারণ জনগণ বোমাবর্ষণ দেখে বিমূঢ় হয়েছে কিন্তু কেন এ নিষ্ঠুরতা তার কোনো উত্তর পাইনি। লাউসের অনেক স্থান পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় হলেও এখনও সেখানে অনেক অবিস্ফোরিত বোমা থেকে যাওয়ার শঙ্কায় পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় অনেক স্থান উন্মুক্ত করে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মানুষ কত নিষ্ঠুর, কত পাশব, কত জঘন্য তা লাওয়ের মতো নীরিহ মানুষের দেশে বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় প্রতিভাত।


বার্মা (Burma) : ইতিহাস ও নামকরণ

কিরগিজিস্তান (Kyrgyzstan) : ইতিহাস ও নামকরণ

জাপান (Japan) : ইতিহাস ও নামকরণ

জাপান (Japan) : ইতিহাস ও নামকরণ

জর্ডান (Jordan) : ইতিহাস ও নামকরণ

কাজাখস্তান (Kazakhstan) : ইতিহাস ও নামকরণ

কুয়েত (Kuwait): ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!