লাতভিয়া (Latvia) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (ইউরোপ)

ড. মোহাম্মদ আমীন

লাতভিয়া (Latvia)

লাতভিয়ার দাপ্তরিক নাম রিপাবলিক লাতভিয়া। এটি উত্তর ইউরোপের  বাল্টিক অঞ্চলে অবস্থিত ৩টি বাল্টিক রাষ্টের একটি। এর উত্তরে এস্তোনিয়া, দক্ষিণের লিথুয়ানিয়া, পূর্বে রাশিয়া এবং দক্ষিণপূর্বে বেলারুশ। সুইডেনের সঙ্গে লাতভিয়ার সামুদ্রিক সীমানা রয়েছে। এককেন্দ্রীক রাষ্ট লাতভিয়ায় ১১৮টি প্রশাসনিক বিভাগ রয়েছে। তন্মধ্যে ১০৯টি মিউনিসিপালিটি এবং ৯টি শহর। নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর ৬১.৪% লাতভিয়ান, ২৬% রাশিয়ান, ৩.৪% বেলারুশিয়ান, ২.২% ইউক্রেনিয়ান, ১.৩% পোলশ, ১.২% লিথুয়ানিয়ান এবং ২.২% অন্যান্য।

লাতভিয়া ছিল প্রাক্তন সোভিয়েত ইউইনয়নের একটি প্রজাতন্ত্র। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে রাশিয়া, ইউক্রেন, জর্জিয়া, বেলরুশিয়া, উজবেকিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইযান, কাজাখাস্তান, কিরগিজস্তান, মলদোবা, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়া ও এস্তোনিয়া নামের ১৫টি প্রজাতন্ত্র সৃষ্টি হয়। লাতভিয়া তন্মধ্যে অন্যতম। লাতভিয়ার ম্যাপ দেখতে কিছুটা ঈগলের বাচ্চার মতো মনে হয়।

আঞ্চলিক নাম লিট্টিগালি (Lettigalli) হতে লাতগ্যাল (Latgale) নামের উৎপত্তি। লেট (let) শব্দের উৎপত্তি হয়েছে লাইয়েট থেকে। এর অর্থ একাধিক বাল্টিক জলীয় নামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে। গেইল (মgale) শব্দের অর্থ ভূমি বা সীমান্ত ভূমি। এ বিবেচনায় লাটাভিয়া শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে নিজেদের অধিকারে থাকে নিজস্ব ভূমি। যে ভূমিতে অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। এ নাম দ্বারা এ জাতি নিজেদেরকে স্বতন্ত্রধারায় চিহ্নিত করেছেন।

লাতভিয়া উত্তর-পূর্ব ইউরোপে বাল্টিক সাগরের পূর্ব তীরে লিথুয়ানিয়া ও এস্তোনিয়ার মধ্যস্থলে অবস্থিত রাষ্ট্র। ঢেউ খেলান পাহাড়ের সারি ও ঘণ অরণ্যে এবং এগুলির মধ্যে অবস্থিত বহু নদনদী, হ্রদ ও জলাভূমি নিয়ে লাতভিয়ার নয়নাভিরাম ভূ-প্রকৃতি গঠিত। এখানে লাতভীয় জাতির লোকেরা সামান্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠ, তবে রুশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আকার বেশ বড়। রিগা বৃহত্তম শহর, প্রধান বন্দর ও রাজধানী।

১৩শ শতক থেকে লাতভিয়া ক্রমান্বয়ে জার্মানি, পোল্যান্ড ও রুশদের দ্বারা শাসিত হয়। ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে  প্রতিবেশী এস্তোনিয়া ও লিথুয়ানিয়ার সঙ্গে এটিও স্বাধীনতা লাভ করে। রাষ্ট্র তিনটি বাল্টিক রাষ্ট্র নামে পরিচিত লাভ করে। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে  সোভিয়েত ইউনিয়ন বলপূর্বক বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো দখল করে নিয়েছিল।

১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে  লাতভিয়া পুনরায় স্বাধীনতা লাভ করে এবং একটি সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করে। ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ নভেম্বর লাটাভিয়ার বর্তমান পতাকা প্রথম গ্রহণ করা হয়। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পতাকার ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর একই পতাকা ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ফেব্রুয়ারি পুনরায় গৃহীত হয়।

১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ নভেম্বর লাতভিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ৫ আগস্ট দেশটি সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলে চলে যায়। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ১০ জুলাই দখল করে নেয় নাজি-জার্মান। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে  লাতভিয়া আবার সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ৪ মে দেশটি সোভিয়েত ইউনিয়ন হতে স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ২১ আগস্ট স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে  ১ মে লাতভিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদান করে।

লাতভিয়ার মোট আয়তন ৬৪,৫৮৯ বর্গকিলোমিটার বা ২৪,৯৩৮ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগের পরিমাণ ১.৫৭%। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, লাতভিয়ার জনসংখ্যা ১৯,৯৭,৫০০ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৩৪.৩। আয়তন বিবেচনায় লাতভিয়া পৃথিবীর ১২৪-তম এবং জনসংখ্যা বিবেচনায় ১৪৮-তম বৃহত্তম দেশ। জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ১৬৬-তম জনবহুল দেশ। সরকারিভাবে লাতভিয়ার অধিবাসীদের লাতভিয়ান বলা হয়। রিগা দেশের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। দাপ্তরিক ভাষা লাতভিয়ান।

২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, লাতভিয়ার জিডিপি (পিপিপি) ৪৯.৮৯১ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ২৪,৬১৯ ইউএস ডলার। অন্যদিকে জিডিপি (নমিনাল) ২৭.৮২২ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ১৩,৭২৯ ইউএস ডলার। মাথাপিছু আয় বিবেচনায় লাতভিয়া পৃথিবীর ৫২-তম ধনী দেশ। মুদ্রার নাম ইউরো। সংসদীয় গণতন্ত্রের এ দেশটির আইনসভার নাম সায়েমা।

লাতভিয়ায় জ্যাকবস জিউফেস নামের একজন দর্জি জিনস কাপড় আবিষ্কার করেন। লেভি স্ট্রাউসাস তাকে আর্থিকভাবে জিনস প্রস্তুতে সহায়তা করেন। লাতভিয়ার ৫০% বন। পরিবেশ বান্ধব রাষ্ট্র বিবেচনায় লাতভিয়ার স্থান পৃথিবীতে দ্বিতীয়। জনসংখ্যা অনুপাতে ফ্যাশন মডেলের সংখ্যা বিবেচনায় লাতভিয়ার স্থান পৃথিবীতে প্রথম। এখানে প্রায় প্রতি এলাকায় কয়েকজন করে ফ্যাশন মডেল রয়েছে।

পৃথিবীতে মাত্র তিনটি দেশে বরফ-হকি অত্যন্ত জনপ্রিয়। দেশগুলো হচ্ছে কানাডা, ফিনল্যান্ড ও লাতভিয়া। ইন্টারনেটের গতি বিবেচনায় লাতভিয়ার স্থান বিশ্বে পঞ্চম। এটি হংক ও নেদারল্যান্ডের মধ্যবর্তী স্থান। লাতভিয়ার মধ্যে প্রবাহিত ১২,৫০০ নদী দেশটাকে স্যামন মাছের প্রাচুর্যভূমে পরিণত করেছে। এখানে পাওয়া যায় ২৭,৭০০ প্রজাতির অধিক উদ্ভিদ ও প্রাণিকুল। হরিণ, বন্য শুয়োর, আমেরিকান হরিণ, লিনাক্স, ভল্লুক, শেয়াল, বীবর এবং নেকড়েসহ নানা হিংস্র প্রাণীর আস্তান লাতভিয়া।


কাজাখস্তান (Kazakhstan) : ইতিহাস ও নামকরণ

কসোভো (Kosovo) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

Knowledge Link

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

 

error: Content is protected !!