লিথুয়ানিয়া (Lithuania) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (ইউরোপ)

ড. মোহাম্মদ আমীন

লিথুয়ানিয়া (Lithuania)

লিথুয়ানিয়ার সরকারি নাম রিপাবলিক অব লিথুয়ানিয়া। উত্তর ইউরোপের ৩টি বাল্টিক রাষ্ট্রের অন্যতম লিথুয়ানিয়া রাষ্ট্রটি বাল্টিক সাগরের দক্ষিণ-পশ্চিম তটরেখায় অবস্থিত। এর উত্তরে লাতভিয়া, পূর্ব ও দক্ষিণে বেলারুশ,  দক্ষিণে পোল্যান্ড এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে রাশিয়ান এক্সক্লেভ (Russian exclave) কালিনিনগার্ড অবলাস্ট (Kaliningrad Oblast)। নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৮৪.১% লিথুয়ানিয়ান, ৬.৬% পোলস, ৫.৮% রাশিয়ান, ১.২% বেলরুশিয়ান এবং বাকিরা অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর লোক।

প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যে ১৫ টি প্রজাতন্ত্র হয়েছে তন্মধ্যে লিথুয়ানিয় একটি। বাকি প্রজাতন্ত্রগুলো হচ্ছে :  রাশিয়া, ইউক্রেন, জর্জিয়া, বেলরুশিয়া, উজবেকিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইযান, কাজাখাস্তান, কিরগিজস্তান, মলদোবা, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, লাতভিয়া ও এস্তোনিয়া। লিথুনিয়ার ম্যাপ ভালভাবে দেখলে মনে হবে একজন রকাবিলি গায়ক গান করছে। তবে এটি বুঝতে হলে আপনাকে রকাবিলি গায়কের গানের ঢঙটা দেখতে হবে আগে।

লিথুয়ানিয়ান ভাষার শব্দ লিটি (lieti)) শব্দ হতে লিথুয়ানিয়া নামের উৎপত্তি। এর অর্থ একত্রীকরণ বা ঐকবদ্ধ করণ। এখানে অনেকগুলো উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর লোক বসবাস করত। তাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্য ও কোন্দল লেগে থাকত। তাই তাদেরকে প্রায় সময় বহিঃশত্রুর আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হতো। এ জন্য কতিপয় উপজাতীয় নেতা উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে এক নেতৃত্বে অধিনে নিয়ে আসেন। এবং দেশটির নাম দেন লিথুয়ানিয়া। আর একটি অভিমত,  মধ্য লিথুয়ানিয়ার ছোট নদী লিইটাভা (Lietava) থেকে লিথুনিয়া নামের উৎপত্তি। তাদের অভিমত, লিথুয়ানিয়ান শব্দ লাই (lie) হতে সৃষ্ট লিটি (lieti) শব্দ হতে লিথুয়ানিয়া নামের উৎপত্তি। এর অর্থ ঢালা বা ঝরা।

আবার অনেকে মনে করেন, প্রাচীন শ্লাভিক শব্দ লাইয়াটি (liyati) অর্থ ঢাকা এবং গ্রিক এ লিয়ে সন (a-lei-son)) অর্থ কাপ, ল্যাটিন লিটাস (litus) অর্থ  সমুদ্র তীর এবং তসারিয়ান  শব্দ লাইজাম (lyjäm) অর্থ হ্রদ। ষোড়শ শতকে পণ্ডিতবর্গ লুক্সেবার্গ নামের উৎপত্তির সঙ্গে ল্যাটিন শব্দ লিটাস (litus) শব্দের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেয়েছেন। তাদের অভিমত, ল্যাটিন লিটাস শব্দের অর্থ টিউব। কাষ্ঠ দ্বারা বিশেষভাবে তৈরী লিটাস নামের এ তূরী বাজিয়ে লিথুনিয়ান উপজাতীয় লোকজন বিভিন্ন উৎসব পালন করত। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রবাদ হচ্ছে বৃষ্টি প্রবাদ। লিইটাস (lietus) শব্দের অর্থ বৃষ্টি। এ শব্দ হতে  লিথুনিয়ান শব্দ লায়েটুবার (Lietuva) উৎপত্তি। যার অর্থ বৃষ্টিস্নাত দেশ।

লিথুয়ানিয়ার মোট আয়তন ৬৫,৩০০ বর্গকিলোমিটার বা ২৫,২১২ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয়ভাগের পরিমাণ ১.৩৫ %। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, লিথুয়ানিয়ার মোট জনসংখ্যা ২৮,৯৩,৩৩৬ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৪৫। আয়তন বিবেচনায় লিথুয়ানিয়া পৃথিবীর ১২৩-তম কিন্তু জনসংখ্যা বিবেচনায় ১৪১-তম বৃহত্তম দেশ। অন্যদিকে, জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় লিথুয়ানিয়া পৃথিবীর ১২০-তম জনবহুল দেশ। সরকারিভাবে লিথুয়ানিয়ার অধিবাসীদের লিথুয়ানিয়ান বলা হয়। রাজধানীর নাম ভিলিনিয়াস। দাপ্তরিক ভাষা লিথুয়ানিয়ান।

২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, লিথুয়ানিয়ার জিডিপি (পিপিপি) ৮১.১৪৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ২৮,১৫৩ ইউএস ডলার। অন্যদিকে জিডিপি (নমিনাল) ৪১.৭৭৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ১৪,৩১৮ ইউএস ডলার।  মুদ্রার নাম ইউরো। এককেন্দ্রীক সংসদীয় প্রজাতন্ত্রের লিথুয়ানিয়ার আইন সভার নাম সিয়ামাস। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ১১ মার্চ লিথুয়ানিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন হতে স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ওই বছর ১১ মার্চ স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়।

১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের স্বাধীনতাকালে লিথুয়ানির বর্তমান পতাকা গ্রহণ করা হয়। তা ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। লিথুয়ানিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার এ পতাকার ব্যবহার স্থগিত হয়ে যায়। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ২০ মার্চ লিথুয়ানিয়ার পতাকা আবার গ্রহণ করা হয়। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের পতাকাটি কিছুটা পরিবর্তন করে পুনরায় গ্রহণ করা হয়।

১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে  ফ্রান্সের বিজ্ঞানীদের পরিচালিত গবেষণা অনুযায়ী লিথুয়ানিয়া ভৌগোলিকভাবে ইউরোপের কেন্দ্রে অবস্থিত। ইউরোপ মহাদেশে শেষ দেশ হিসাবে ১৩৮৭ খ্রিষ্টাব্দে  লিথুয়ানিয়া জাতি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে। লিথুয়ানিয়ান ভাষা গ্রিক, ল্যাটিন, জার্মান, সেলটিক ও স্লাভ ভাষার চেয়ে প্রাচীন। ইন্দো-ইউরোপীয়ান গোষ্ঠীভুক্ত লিথুয়ানিয়ান ভাষা সংস্কৃতের খুব কাছাকাছি একটি ভাষা। কিছু কিছু ভাষাবিজ্ঞানীর অভিমত, লিথুয়ানিয়ান পৃথিবীতে বিদ্যমান সকল ভাষার মধ্যে প্রাচীনতম একটি ভাষা। এটি বাল্টিক অঞ্চলের প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম ভাষা। ১৫৪৭ খ্রিষ্টাব্দে  লিথুয়ানিয়া প্রথম বই প্রকাশিত হয়।

লিথুয়ানিয়াকে সারস-এর দেশ (land of storks) বলা হয়। এটি দেশের জাতীয় পাখি। বর্তমানে লিথুয়ানিয়ায় ১৩,০০০ জোড়ার অধিক সারস রয়েছে। লিথুয়ানিয়ানদের বিশ্বাস, শিশুরা সারস পাখিতের চড়ে আসে। লিথুয়ানিয়ার শিশুরা এখনও বিশ্বাস করে যে, তারা সারসের পিঠে চড়ে এসেছে। ভুট্টা হতে ভোদকা তৈরির কৌশল প্রথম লিথুয়ানিয়ানরা আবিষ্কার করে। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ১১ মার্চ লিথুয়ানিয়া প্রথম সোভিয়েত ইউনিয়ন হতে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। লিথুয়ানিয়া পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যার নিজস্ব জাতীয় সুগন্ধি (perfume) রয়েছে। এর নাম লিথুয়ানিয়ান সুগন্ধি (Scent of Lithuania)। সরকারিভাবে  লিথুয়ানিয়ার স্বাধীনতা দিবস ১৬ ফেব্রুয়ারি এবং স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার দিবস ১১ মার্চ।

অনেকগুলো সংরক্ষিত এলাকা ও ন্যাশনাল পার্কসহ লিথুয়ানিয়ার এক তৃতীয়াংশ বন। বাস্কেটবল দেশের প্রিয় খেলা। লিথুয়ানিয়ার রাজধানীতে ১৫৭৯ খ্রিষ্টাব্দে  প্রতিষ্ঠিত ভিলিনিয়াস ইউনিভার্সিটি পশ্চিম ইউরোপের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়।  পোপ দ্বিতীয় জন পল এর মা ছিলেন লিথুয়ানিয়ান বংশোদ্ভুদ। চতুর্দশ শতকে লিথুয়ানিয়া ছিল ইউরোপের বৃহত্তম দেশের অন্যতম। তখন বর্তমান বেলারুশ, ইউক্রেন, পোল্যান্ড ও রাশিয়ার কিয়দংশ নিয়ে লিথুয়ানিয়া বিস্তৃত ছিল।

জনগণের মাথাপিছু তপ্ত বায়ু বেলুনের সংখ্যা বিবেচনায় লিথুয়ানিয়ার স্থান পৃথিবীতে প্রথম। ভিলিনাস ইউরোপের কয়েকটি রাজধানী শহরের অন্যতম একটি, যেখানকার লোকজন তপ্ত বায়ু বেলুনে চড়ে ওড়তে পারে। লিথুয়ানিয়ায় ৮১৬টি নদী এবং ২,৮০০টি হ্রদ আছে।


কসোভো (Kosovo) : ইতিহাস ও নামকরণ

লাতভিয়া (Latvia) : ইতিহাস ও নামকরণ

লিচটেনস্টেইন (Liechtenstein) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

Knowledge Link

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

 

error: Content is protected !!