লুনুলা এবং সাদা বনাম শাদ

ড. মোহাম্মদ আমীন

লুনুলা এবং সাদা বনাম শাদা

এই পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/লুনুলা-এবং-সাদা-বনাম-শাদা/

লুনুলা

মানুষের নখের ধবধবে সাদা অংশের নাম ‘লুনুলা (lunula। লুনুলা লাতিন শব্দ। যার অর্থ চাঁদ। নখের সাদা অংশটি দেখতে চাঁদের মতো । তাই নাম লুনুলা। সময়ের সঙ্গে লুনুলা চাঁদের মতো বড়ো ছোটো হয়, তবে কখনো পূর্ণিমার চাঁদ হয় না। কারণ, মানুষের জীবন কখনো পরিপূর্ণ হতে পারে না। আমার দাদি আমার নখের লুনুলা দেখে বলেছিলেন, “এই চাঁদ বুদ্ধি, প্রেম আর রোমাঞ্চ নিয়ে আসে, তোমার বুদ্ধি গজাচ্ছে। বিয়ের সময় এসে গেছে গো নাতি।”
ভালো করে তাকিয়ে দেখুন- এই সাদা একদম ব্যতিক্রম, ঠিক আপনার মতো।মন দিয়ে তাকালে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়।দেখা যায় আপন সত্তার উদগ্রীব বিকাশ- আকাশের চাঁদে যেমন কবিরা প্রেমিকার মুখ দেখতে পায়।
তোমারে লেগেছে এত যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে- – -।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
চাঁদের হাসির বাধ ভেঙেছে – – -।
চকচকে নখ, করে ঝকঝক। জীবনটা যতই বন্ধুর হোক, বন্ধু করে নিন। বন্ধুরকে বন্ধু করার নামই জীবন। নখকে দর্পণ তো আর এমনি এমনি বলা হয়নি। আপনার কোনো প্রিয়জন কখনো কি বলেছেন—
“তোমার নখের নিচে চন্দ্র দোলে—
ওটিই আমার ছবি তোমার
মুগ্ধ আকাশ কোলে।”
আপনিও কি কখনো বলেছেন:
“তোমার নখের বুকে চন্দ্র দোলে প্রিয়—
জোছনামাখা ভালোবাসা
বুকটা ভরে নিও।”

যদি না বলে থাকেন লুনুলার দিকে তাকিয়ে এক্ষুনি বলে ফেলুন—
 
দেখো— তোমার নখের কোণে ধবধবে এক চাঁদ
চলো ওই আলোতে জড়িয়ে দুজন;
কাটিয়ে দিই এ রাত।
ভালোবাসাময় একটি রাত অনন্ত জোছনার চেয়েও স্নিগ্ধ।
দেখুন ভেবে, ঠিক কি না।
প্রিয়জনের একটুকু আদর বিশ্বের বড়ো বিস্ময়,
অতলান্তিক সাগর।
 

সাদা বনাম শাদা

বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত ফারসি সাদা অর্থ— (বিশেষণে) শ্বেত, শুভ্র (সাদা বরফ); শ্বেতকায় (সাদা ভল্লুক), সরল, অকপট, (সাদাসিধে), অলংকারহীন (সাদামাঠা, সাদামাটা), অলিখিত (সাদা কাগজ), সহজ (সাদা মনের মানুষ), স্পষ্ট (সাদা কথা)। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে শাদা বানানের কোনো শব্দ নেই। জীবনে কত পরীক্ষা দিয়েছি, কোথাও শাদা লিখিনি।
 
চর্যাপদের কবিগণ থেকে শুরু করে বড়ু চণ্ডীদাস হয়ে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল প্রায় সব লেখকই সাদা লিখেছেন। বাংলাসাহিত্যের দুশো খ্যাতিমান লেখকের মধ্যে শাদার পক্ষে দশ জনের বেশি পাওয়া যাবে না। অনেকে বলেন: ‘সাদা’ শব্দের ফারসি উচ্চারণ শাদা। তাই শাদা লেখা সমীচীন। তাদের দাবি মেনে নিলে বাংলায় আর দন্ত্য-স রাখার প্রয়োজন নেই। কারণ, বাংলার সব দন্ত্য-স বর্ণের উচ্চারণ তালব্য-শ দিয়ে নির্দেশ করা হয়। অথচ শাদা লেখিয়েগণ কেবল সাদার দন্ত্য-স ছাড়া আর সব স বিনা দ্বিধায় ব্যবহার করেন।
 
হুমায়ুন আজাদকে প্রশ্ন করেছিলাম, শাদা লিখেন কেন? “ফারসি শব্দ তাই।”, তিনি বলেছিলেন। বলেছিলাম, ফারসি ‘সাল’ তো ‘শাল’ লিখেন না, শাদা লিখবেন কেন? “তোমাকে কৈফিয়ত দিতে হবে না কি? তোমার আমলাগিরি সচিবালয়ে।” তাঁর উত্তর।

আর কোনোদিন প্রশ্ন করিনি। পরে তাঁর কথায় বুঝেছি, কোনো কোনো লেখক কেবল নিজের লেখায় আলাদা বৈশিষ্ট্য আনার জন্য এমন কিছু
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
বানান বানান, যা সাধারণ অধিকজনস্বীকৃত বানান হতে ভিন্ন। এরকম বানান টেকেনি।হুমায়ুন আজাদ ‘শাদা বাঙলা’র জন্য কি না করেছেন; কিন্তু এখন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানেও ‘সাদা বাংলা’।
 
সাদা শব্দের ফারসি উচ্চারণ কী, কেন শাদা লিখব কিংবা কেন সাদা লিখব না— এসব বিষয় নিয়ে গবেষণার মতো মেধা ও যোগ্যতা কোনোটা আমার নেই। আমি সাদা লিখি।

কারণ: শিশুবেলা থেকে এ পর্যন্ত সব অভিধানে সাদা দেখে আসছি, লিখে আসছি। পরীক্ষায় সাদা খাতায় white অর্থ সাদা লিখে আস্তে আস্তে মাস্টার্স, তারপর পিএইচডি পর্যন্ত করেছি। বিসিএস পরীক্ষাও সাদা লিখে পাশ করেছি। চাকুরিতে যোগদানের পর সরকারি সব লৈখিক যোগাযোগে সাদা লিখে চাকুরির প্রায় শেষপ্রান্তে চলে এসেছি। সব বিধিবিধানই সাদা, কোথাও শাদা নেই। আমার দাদা তামাক পাতাকে শাদাপাতা লিখতেন। তার যুক্তি, সাদা পাতার সঙ্গে যাতে তামাকপাতা মিলে না যায়।
 
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে শাদা বানানের কোনো শব্দ নেই। শিক্ষার্থীদেরও শিখতে হয় সাদা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পুস্তকসমূহে সাদা লেখা হয়। শাদা শেখালে প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা বিসিএস পরীক্ষায় গ্রাহ্য হবে না। তাই আমি সাদা লিখি, সাদা লেখা শেখাই। ভুলেও শাদা লিখিনি কখনো।
 
বানান নিয়ে কতিপয় লেখকের এরকম বানানামি, বাংলার বানান বিভ্রাটের অন্যতম কারণ। এমন দলছুটে আচরণ আদর্শ বানান রীতি প্রতিষ্ঠার একটা বিরাট অন্তরায়। কোনো বিষয়ে বাঙালির ঐকমত্য দেখা যায় না।
error: Content is protected !!