শকুন দিবস: আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস আজ

ড. মোহাম্মদ আমীন

আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস আজ

শকুনের প্রতি ভালোবাস জানাই কৃতজ্ঞতায় কৃতজ্ঞতায়

 দক্ষিণ আফ্রিকার  Birds of Prey Programme (BPP) এবং ইংল্যান্ডের Hawk Conservatory Trust (HCT)  যৌথভাবে ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই সেপ্টেম্বর প্রথম বারের মতো আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস (International Vulture Awareness Day) উদ্‌যাপন করে। বছরের ওই দিনটি ছিল শনিবার। এরপর থেকে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম শনিবার দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

পৃথিবীতে এখন প্রায় ১৫০০ জাতীয় দিবস আছে। তন্মধ্যে শকুন সচেতনতা দিবস যে-কোনো বিবেচনায় শ্রেষ্ঠত্ব ও অনিবার্যতার দাবি রাখে। কোকিল ময়ূর না থাকলেও তেমন ক্ষতি নেই, কিন্তু শকুন-কাক পৃথিবী আর প্রাণিকুলের স্বাভাবিক জীবন ধারা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। শকুনের অবলুপ্তি মানুষের জন্য কত ক্ষতিকর তা যদি মানুষ বুঝতে পারত তাহলে প্রতি ঘরে ঘেরে শকুন লালন করত।   

“মানুষের বন্ধু পরম কাক আর শকুন,
সৌন্দর্যের বিনির্মাতা, চিরন্তন ফাগুন
পূত রাখে ধরা তারা সরিয়ে সর্বনাশা,
তাদের প্রতি ক্ষণে ক্ষণে অতল ভালোবাসা।”

পৃথিবী সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক আগামী পাঁচ বছর কাজ না করে ঘরে বসে থাকলে পৃথিবীর স্বাভাবিক ধারার  তেমন একটা অসুবিধা হবে না, কিন্তু মেথরগণ যদি একদিনের জন্য কর্ম বন্ধ রাখেন তাহলে ভেবে দেখুন কী অসহনীয় হয়ে যেতে পারে পৃথিবী আর পৃথিবীর মানুষের  অবস্থা। শকুনকে বিলুপ্ত করে মানুষ পৃথিবীকে এমন অসহনীয় অবস্থায় নিয়ে গেছে। আমি মনে করি, মূলত এ বোধ সৃষ্টিই আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবসের উদ্দেশ্য। 

শকুন পৃথিবীর সব বিপজ্জনক আবর্জনাকে নিরাপদে ধ্বংস করে দিতে পারে।  যদি আপনি নিজেকে ভালোবাসেন, পৃথিবীকে ভালোবাসেন, প্রকৃতিকে ভালোবাসেন, ভালোবাসেন সুন্দর আর জীবন তাহলে আসুন শকুনকে ভালোবাসা দিয়ে সব ভালোবাসাকে নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রকে সাবলীল রাখি।

পরিবেশ সংরক্ষণে শকুনের বিকল্প নেই। মৃত প্রাণী বা পচা-গলা ও বর্জ্য শকুনের খাবার। তাই শকুনকে বলা হয় প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতাকর্মী; কিন্তু দিন দিন পাখিটি হারিয়ে যাচ্ছে। মৃতদেহ ভক্ষণ করে বলে তাঁদের প্রতি  এ অবহেলা পক্ষান্তরে মানুষের নিজের প্রতি নিজের অবহেলার তুল। বিলুপ্তপ্রায় এ শকুনকে বাঁচাতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোই শকুন সচেতনতা দিবসের উদ্দেশ্য।

শকুন মড়াখেকো মাংসাশী পাখি। তাই তাকে কেউ ভালো চোখে দেখে না। লোভী আর নির্দয় হিসেবে কটাক্ষ করতে গিয়ে অনেকে শকুনের সঙ্গে তুলনা করে থাকে। শকুনের প্রতি নাক সিঁটকানো এই মনোভাবের কারণে পাখিটির বংশ নিপাত হওয়ার জোগাড়। প্রকৃতপক্ষে শকুন মানুষের শত্রু নয়, বন্ধু। প্রাণীজগতে শকুন আর কাকের চেয়ে মানুষের উপকারী বন্ধু আর নেই। কীভাবে শকুন এত উপকারী বন্ধু হলো?
শকুন পচা-গলা মাংস খাওয়াসহ ভয়াবহ অনেক জীবাণু হজম করে পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য করে রাখে।

শকুন (Vulture) তীক্ষ্ণ দৃষ্টির অধিকারী শিকারি পাখিবিশেষ। পাখিটি মৃত প্রাণীর মাংস খেয়ে থাকে। সাধারণত এরা অসুস্থ ও মৃতপ্রায় প্রাণীর চারদিকে উড়তে থাকে এবং প্রাণীটি মরার জন্য অপেক্ষা করে। শকুনের গলা, ঘাড় ও মাথায় কোনো পালক থাকে না। প্রশস্ত ডানায় ভর করে আকাশে ওড়ে।মহীরুহ বলে পরিচিত বট, পাকুড়, অশ্বত্থ, ডুমুর প্রভৃতি বিশালাকার গাছে সাধারণত লোকচক্ষুর অন্তরালে শকুন বাসা বাঁধে। সাধারণত গুহায়, গাছের কোটরে বা পর্বতের চূড়ায় ১-৩টি সাদা বা ফ্যাকাশে ডিম পাড়ে। বাসস্থানের অভাব শকুন বিলুপ্তির অন্যতম একটি কারণ।

শকুনই একমাত্র প্রাণী, যা রোগাক্রান্ত মৃত প্রাণী খেয়ে হজম করতে পারে এবং অ্যানথ্রাক্সযক্ষ্মাখুরারোগের সংক্রমণ থেকে অবশিষ্ট

ড. মোহাম্মদ আমীন

জীবকুলকে রক্ষা করে। অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত মৃতদেহ মাটিতে পুঁতে রাখলেও তা একশ বছর সংক্রমণক্ষম থাকে। অথচ শকুনের পাকস্থলীতে গেলে তা কয়েক মিনিটের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যায়।

বর্তমানে বিভিন্ন দেশে, গবাদি পশু চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘ডাইক্লোফেনাক‘ নামের ব্যথানাশক ওষুধের প্রভাবে শকুন মারা যাচ্ছে।২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ অব ভেটেরিনারি মেডিসিন-এর গবেষক ড. লিন্ডসে ওক  এক গবেষণায় প্রমাণ করেন, পশু চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাক-এর ব্যবহারই শকুন বিলুপ্তির অন্যতম কারণ। ভারতে প্রতিবছর ৩০% শকুন মারা যাওয়ার কারণও ডাইক্লোফেনাক। এজন্য ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে ডাইক্লোফেনাক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। বাংলাদেশে ডাইক্লোফেনাকের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে শকুন প্রায় বিলুপ্তির পথে। আজকাল শকুন দেখা যায় না। অনুরূপ বিষক্রিয়া দেখা যায় কিটোপ্রোফেন ওষুদের ক্ষেত্রেও। শকুনকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে পৃথিবীর অনেক দেশেই পশু-চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাক ও কিটোপ্রোফেনের পরিবর্তে সমান কার্যকর, অথচ শকুন-বান্ধব ‘মেলোক্সিক্যাম’ ওষুধ ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত পশুর মাংস শকুনের কোনো ক্ষতি করে না; কিন্তু ডাইক্লোফেনাক দেওয়া হয়েছে, এমন মৃত পশুর মাংস খেলে কিডনি নষ্ট হয়ে ২-৩ দিনের মধ্যে শকুনের মৃত্যু ঘটে। এ কারণে গত চার দশকে উপমহাদেশে ৭৭ ভাগ শকুন মারা গেছে। ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে সার্কভুক্ত দেশসমূহে প্রায় ৪ কোটি  শকুনের অস্তিত্ব ছিলো, অথচ এই সংখ্যা এখন  ৪০ হাজারে  এসে দাঁড়িয়েছে। এটি মানবজাতি-সহ সকল প্রাণিকুলের জন্য একটি ভয়াবহ সংকেত। যেখানে শকুন টিকতে পারছে না সেখানে মানুষ কীভাবে টিকবে?

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক
এই পোস্টের ওয়েব লিংক: কিছু প্রয়োজনীয় পোস্ট

 

error: Content is protected !!