শব্দকল্পদ্রুম/৬

লিয়াকত চৌধুরী

বাতাবি> বাতাবি বা বাতাবি লেবু শব্দটি বাংলা শোনায় বটে , আদতে ব্যাটাভিয়া দেশ থেকে এই লেবুর আমদানি বলেই তার নাম বাতাবি। 

বুর্জোয়া >> শব্দটি মার্ক্সীয় তত্ত্বে মধ্যবিত্ত অর্থে ব্যবহৃত হয়। শব্দটির আদি উৎস ফরাসি bourgeois এবং bourgeoisie যার অর্থ হলো নগরবাসী। ফরাসি bourg হল শহর যার সঙ্গে তুলনীয় জর্মান Burg. শহরের লোকেরা কিছুটা অবধারিতভাবেই মধ্যবিত্ত হিসেবে পরিচিত হয়ে গেছে 

বিদ্রোহ>>>দ্রুহ্ ধাতুর অর্থ হচ্ছে হিংসা করা। তা থেকেই এসেছে বিদ্রোহ–বি-দ্রুহ্ +অ। ইংরেজিতে revolution –revolt শব্দ এসেছে লাতিন volvo থেকে,যার অর্থ turn around, roll।ইংরেজিতে শব্দটি এসেছে volv,volut,volu ইত্যাদি রূপে। evolve শব্দের অর্থ roll out। re শব্দের মানে আবার ; revolution অর্থে আবার ঘুরে দাঁড়ানো।এই ঘুরে যাওয়ার সূ্ত্রেই এসেছে revolver= পিস্তল।  

বঙ্গ >>শব্দটির ব্যুৎপত্তি কোথা থেকে তা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে।একটি মত হল, আদিম নিবাসী কোল বা সাঁওতাল প্রভৃতির উপাস্য দেবতা বঙ্গা ও দেবী বঙ্গী থেকে এসেছে বঙ্গ।  অন্য মত নদীমাতৃক বঙ্গ আল বা পাড় দিয়ে ঘেরা, তাই বঙ্গ+আল =বঙ্গাল।   

বানচাল>> নৌকা তৈরির সময় এক তক্তার সঙ্গে অন্য তক্তা জোড় দেওয়ার জন্য যে খাঁজ কাটা হয়, তার নাম বান।এই বান ঢিলে হয়ে যাওয়াকে বলে বানচাল। বাংলায় ভেস্তে যাওয়া অর্থে বানচাল শব্দটির ব্যবহার অর্থ প্রসারের নিদর্শন। আমরা এই বানচাল শব্দটি রাজনীতিতে প্রয়োগ হতে দেখি অনেক।

ভারতবর্ষ>> শব্দটির বর্ষ শব্দের অর্থ দেশ।ভরতের সন্ততি এই অর্থে ভারত শব্দের উদ্ভব।

ভরত শব্দের ব্যুৎপত্তি ভৃ ধাতু থেকে।ভৃ+অত্= ভরত। দুষ্মন্ত এবং শকুন্তলার পুত্রের নাম ভরত,কারণ তিনি ভূপালনে কীর্তিমান ছিলেন। এ ভাবেও ভারত শব্দের উদ্ভব হতে পারে। হিন্দ্ বা হিন্দুস্তান বা india নামের উদ্ভব সিন্ধু শব্দ থেকে। ফারসিতে সিন্ধু হল হিন্দ্ বা হিন্দু। সেখান থেকেই লাতিন হয়ে গ্রিকে শব্দটা গেছে।লাতিনে পাওয়া যায় India শব্দটি।

 বিবাহ>> এই শব্দের ব্যুৎপত্তিতে আছে বহ্ ধাতু।বিশেষরূপে বহন করা হচ্ছে বিবাহ।পুরাকালে স্ত্রীকে হরণ করে বহন করে নিয়ে যাওয়া হত বলেই কি এই নাম? বধূ শব্দেও আছে বহ্ ধাতু,বহ্+উ=বধূ-যাকে বহন করা যায়–বধূ থেকে বউ।যৌতুকের উৎস হল যুত শব্দ থেকে, যার অর্থ যুগল, যার মানে যুগল বর+ বধূ।যুত+ক+অ=যৌতুক।  

মদ> যা মত্ততা ঘটায় তাই মদ।মদ্ ধাতু =to gladden, to animate,to inspire, to intoxicate।সেই অর্থেই প্রেমের দেবতা, যিনি আনন্দ দেন, তিনি হলেন মদন,আবার বসন্ত কালেরও অন্য নাম মদন।মদ্+কির হল মদির, স্ত্রীলিঙ্গে মদিরা।মদ+য= মদ্য।মদ্+ক্ত=মত্ত। প্রমাদও এই মূল ধাতুতে থেকে এসেছে।উন্মাদ=উৎ+মাদ=যে উত্তমরূপে মত্ত। *মদ্+ণক= মাদক। বর্তমানে মদ শব্দটি সুরা অর্থেই সংকুচিত। মাদক=মদ্+ই+অক।মাদক=মদ্+ণিচ্+অক।  

ম্যাজিক> পারস্যের পুরহিত, ভাল ও মন্দ উভয় দেবতার পূজো করত, তার নাম ছিল magi.তার থেকে আগুন উপাসকের নাম হল magus.শব্দটি গ্রিসে হয়ে যায় maggos.যার অর্থ wizard-juggler.গ্রিক magikos থেকে আসছে ম্যাজিক। ফারসি বাজি শব্দের অর্থ খেলা।বাজি খেলাটি যে খেলে সে বাজিগর।সংস্কৃত কৃ ধাতুর প্রভাবে বাজিকর হয় বাংলায়। পরে বাজি শব্দটি খেলা থেকে bet অর্থেই চলছে। 

মেসেজ>শব্দটি মোবাইল ফোনের দৌলতে একটি বাংলা শব্দ হয়ে উঠেছে। message sent/received -উভয়ই এখন চলতি।কিন্তু শব্দটি এসেছে লাতিন missaticum যার অর্থ পাঠানো।ফলে sent message কার্যত পুনরুক্তি। 

মোরা/‘โมรา  : গত ৩০ মে ২০১৭ বাংলাদেশে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়টির নামকরণ করা হয়েছে ‘โมรา। এটি থাই শব্দ। যার যথার্থ উচ্চারণ বাংলায় নেই। অনেকে থাই ‘โมรา’ শব্দটির উচ্চারণ করছেন ‘মোরা’। โมรา শব্দের প্রকৃত উচ্চারণ মোরা নয়, মউরা ও মোরা উচ্চারণের মাঝামাঝি। এর ইংরেজি অর্থ হলো ‘স্টার অব দ্য সি’। যার বাংলা ‘সাগর-তারকা’।  

যবন>>শব্দটির উৎপত্তি Ion থেকে। Ion/Ionia গ্রিসের রাজ্য বিশেষ।অবশ্য সংস্কৃতে শব্দটির একটি বুৎপত্তি নির্দেশ রয়েছে। যু+অন।যু শব্দের অর্থ মিশ্রণ।চতুর্বর্ণ না মেনে নির্বিচারে সকলের সঙ্গে মেলামেশা করে যে,সেই হল যবন।গ্রিক, ইহুদি, জৈন,পারসিক,মুসলমান,খ্রিস্টান– সকলকে বোঝাতেই শব্দটির ব্যবহার।। গ্রিকদের কাছ থেকেই এসেছে নাটকে মঞ্চের পর্দার ধারণা।যবন কন্যারা পর্দা টানার দয়িত্ব নিতেন, তাই থেকে এসেছে যবনিকা শব্দটি।।যবনিকা পতন এসেছে এভাবেই।  

রাস্কেল>> ইংরেজি rascal শব্দটি এসেছে পুরনো ফরাসি rasche / rache থেকে, যার অর্থ ঘা। rascaille শব্দটির অর্থ ঘেয়ো।তা থেকেই ইংরেজি শব্দটি। গালাগালে এটির অর্থবিস্তার ঘটেছে। 

রেনেসাঁস>ফরাসি শব্দ renaissance।বাংলায় তার উচ্চারণ নিয়ে বিভ্রান্তি অনেক – কেউ বলেন রেনেসাঁস,রেনেসাঁ,কেউ বলেন রনেসাঁ।শব্দটির মূল অর্থ পুনর্জন্ম।লাতিন nasci শব্দের অর্থ জন্ম। বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে নবজাগরণ। আমরা বার বার প্রয়োজনে নবজাগরণ চাই বাংলাদেশে।

OPPO শব্দের অর্থ : প্রাচীন ইংলিশ অভিধান অনুযায়ী OPPO, শব্দের অর্থ সহকর্মী বা বন্ধু। [ Opposition শব্দের বিপরীত অর্থ প্রকাশে OPPO শব্দের উদ্ভব, যার অর্থ করা হয় বন্ধু বা সহকর্মী। ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে opposition এর বিপরীত হিসেবে বন্ধু বা সহকর্মী প্রকাশে OPPO শব্দটির উদ্ভব ঘটে।তবে Old English literature or Anglo-Saxon literature- বিশ্লেষণে দেখা যায়, OPPO বা বন্ধু থেকে Opposition। ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে এসে আবার Opposition থেকে OPPO, বন্ধু বা সহকর্মী] । বিস্তারিত

সূত্র : লিয়াকত চৌধুরী, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

দেখুন : বিসিএস সাধারণ জ্ঞান ও  বাংলা বানান

বাংলা শেখার সহজ কৌশল

শব্দকল্পদ্রুম/১

শব্দকল্পদ্রুম/২

শব্দকল্পদ্রুম/৩

শব্দকল্পদ্রুম/৪

শব্দকল্পদ্রুম/৫

শব্দকল্পদ্রুম/৭

 

error: Content is protected !!