শব্দের আত্তীকরণ: ইদ বানানের যথার্থতা বা ব্যর্থতা

‘ইদ’ ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বড়ো ধর্মীয়োৎসব। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইদ উপলক্ষ্যে যতটা আনন্দোৎসব হচ্ছে, কাদা ছোড়াছুড়িও তারচেয়ে কোনো অংশে কম হচ্ছে না— বাংলা একাডেমি ষড়যন্ত্র করে আনন্দের উপলক্ষ্য ‘ঈদ’ থেকে ‘দীর্ঘ-ঈ’ বাদ দিয়ে ‘ইদ’ বানিয়ে দিয়েছে; যাতে ঈদের (ইদের) আনন্দ মাটি হয়ে যায়!
‘ই-ঈ ভিন্নতার কারণে যে উৎসবের আনন্দ মাটি হয়ে যায়, সে উৎসব পালনের দরকারটাই-বা কী?’— ‘প্রগতিশীল’ তকমাধারীদের অনুকরণে এই প্রশ্ন আমি উচ্চারণ করলে ‘কাফের! কাফের!’ ‘বেইমান!’ ‘বেইমান!’ ‘মুনাফেক!’ ‘মুনাফেক!’ প্রভৃতি রব উঠে যাবে। এসব তকমার কোনোটিই আমি বইতে চাই না, তাই আমি সে কথা বলবার স্পর্ধাও দেখাতে যাব না; বরং একটি প্রয়োজনীয় বিষয়ে খানিক আলোকপাত করে আমার ছোট্ট লেখাটির ইতি টেনে দেব।
উৎস অনুসারে বাংলা শব্দভান্ডারকে পাঁচ শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়— এ তথ্যটি প্রায় প্রত্যেক বাঙালিই জানেন। এই পাঁচটি শ্রেণিভাগের একটি হচ্ছে ‘বিদেশি’। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত যে শব্দগুলো নানান ভিনদেশি ভাষা থেকে নেওয়া হয়েছে, সেগুলোই হচ্ছে বিদেশি শব্দ। কেবল বাংলা ভাষাই নয়, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ভাষাই এরূপ অন্য ভাষা থেকে উপযুক্ত শব্দ নিজের শব্দভান্ডারে যুক্ত করে নিজেকে সমৃদ্ধ করে। প্রতিটি ভাষা আপন শব্দভান্ডার ঋদ্ধ করতে এভাবে অন্যভাষার শব্দ গ্রহণের সময় এক বিশেষ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, যাকে ‘আত্তীকরণ প্রক্রিয়া’ বলা হয়। আত্তীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গৃহীত শব্দসমূহকে আত্তীকৃত শব্দ বলা হয়। কোনো বিদেশি শব্দের বানান লেখার ক্ষেত্রে এই আত্তীকরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি। তা না-হলে ভাষায় বিশৃঙ্খলার অন্ত থাকবে না। আত্তীকরণের নিয়মনীতি সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান রাখেন না বলেই অনেকে শুদ্ধ-সংগততর বানানকে অর্বাচীন-উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করতে দুদণ্ড ভাবেন না। তাই, আত্তীকরণ কী, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত বইকি। এবং এই ‘আত্তীকরণ’ বিষয়টি সম্পর্কে কিছু বলাটাই আমার এই লেখার মূল লক্ষ্য। এবার তাতে যাচ্ছি।
‘আত্তীকরণ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘অঙ্গীভূতকরণ’। ‘অঙ্গীভূত’ মানে ‘অঙ্গের অন্তর্ভুক্ত’; ‘অঙ্গীভূতকরণ’ হচ্ছে ‘অঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করা’। অর্থাৎ, পূর্বে নিজের অঙ্গে বা শরীরের ছিল না, এমন কোনোকিছু আপন অঙ্গ বা শরীরের সঙ্গে যুক্ত করে নেওয়াই হচ্ছে আত্তীকরণ। এখানে অঙ্গ বা শরীর বলতে যে কেবল জীবদেহ হতে হবে, তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; সামগ্রিক বিবেচনায় দেশ, যন্ত্র, নীতিমালা, ভাষা, সংগঠন, প্রতিষ্ঠান প্রভৃতিও এক একটি অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এসব থেকে প্রথমে ‘প্রতিষ্ঠান’ শব্দটির সাহয্য নিয়ে আত্তীকরণ প্রক্রিয়ার বিষয়টি খোলসা করা চেষ্টা করা যাক।
এক বা একাধিক মানুষ মিলে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। ওই মানুষটি বা মানুষগুলোই হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির মূল অঙ্গ। প্রতিষ্ঠানটির মানুষগুলো নিজেদের গড়ে তোলা কারবার টিকিয়ে রাখতে এবং বিশৃঙ্খলা এড়াতে কিছু নিয়মনীতি তৈরি করে। পরে যখন প্রতিষ্ঠানের কার্যকলাপ ও পরিসর বৃদ্ধি পায়, তখন তারা কাজের সুবিধার্থে কিছু নতুন লোক নিয়োগ করে। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা আগে যেভাবেই দিন কাটিয়ে থাকুক-না কেন, নিয়োগ পাওয়ার পর যতক্ষণ ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে থাকবে, ততক্ষণ তাকে প্রতিষ্ঠান-প্রণীত সব বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে। যেমন— মকবুল আহমেদ লুঙ্গি-পাঞ্জাবি ছাড়া অন্য কোনো কাপড় পরেন না। অতিসম্প্রতি তাঁকে ম্যাগনাম এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার পদে নির্বাচন করা হয়। কিন্তু তাতে একটি শর্ত আছে— ম্যাগনাম এন্টারপ্রাইজে সকলে আনুষ্ঠানিক পোশাক পরে কাজ করে, তাই মকবুলকেও কোট-টাই পরে কাজ করতে হবে। লোভনীয় বেতনের চাকরি হওয়ায় মকবুল করেন কী— যতক্ষণ ধরে দায়িত্ব পালন করতে হয়, ততক্ষণ আনুষ্ঠানিক পোশাক পরে কাজ করেন; কাজের সময় শেষ হতেই ওসব স্যুট-বুট খুলে নিজের লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরে নেন। এই যে ম্যাগনাম এন্টারপ্রাইজ মকবুলের অভ্যাস ও নীতিকে তোয়াক্কা না-করে বেশভূষা বদলে দিয়ে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী বানিয়ে নিয়েছে, এটিই হচ্ছে আত্তীকরণ।
বিষয়টি স্পষ্টতর করতে আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছি— ইশমাম একজন বাঙালি। তিনি বাংলাদেশে পাতলা-ঢিলেঢালা কাপড় পরে দিন কাটান। সম্প্রতি তিনি কোনো বিশেষ কাজে ইংল্যান্ডে গিয়েছেন। যাওয়ার সময় ব্যাগভর্তি পাতলা সুতি কাপড় ও টাকা নিয়ে গেলেন। কিন্তু তিনি সেখানে সেসব নিয়ে রীতিমতো বেকায়দায় পড়ে গেলেন— এক তো হিমাঙ্কেরও কয়েক ডিগ্রি নিচে চলে যাওয়া তাপমাত্রায় জমে বরফ হয়ে যাওয়ার জোগাড়, তার ওপর বাংলাদেশ থেকে ব্যাগ ভরে নিয়ে যাওয়া টাকায় কিছুই কেনা যাচ্ছে না; কিনতে হলে ইউরো বা পাউন্ড লাগবে। সমস্যার সমাধান করতে একবন্ধুর কাছ থেকে ঘণ্টার জন্যে একটি ওভারকোট ও একজোড়া বুট ধার করে ব্যাংকে গিয়ে টাকার বদলে ইউরো নিয়ে, এবং সেই ইউরো দিয়ে প্রয়োজনীয় গরম কাপড় কিনে তবেই স্বস্তি ফিরে পেলেন। ইশমাম এখন ওসব উষ্ণ কাপড়ের পাশাপাশি মাথায় সাহেবি টুপি পরে পকেটে ইউরো নিয়ে জাত ব্রিটিশদের মতো লন্ডন শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। নিজের নতুন বেশে কটি ছবি তুলে বন্ধুর মেইলে পাঠালে বন্ধু অনেকটা বিস্মিত হয়ে মন্তব্য করেন— “ইশমাম তো একেবারেই বদলে গিয়েছে; দেখলে চেনাই যায় না!” এই যে, ইংল্যান্ডের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে ইশমামকে এভাবে পুরোনো বস্ত্র ঝেড়ে ফেলে নতুন বেশ নিতে হলো; ইংল্যান্ড ইশমামকে নিজের অভ্যাস মতো বদলে নিয়ে তবেই তার অঙ্গে ধারণ করল, এটিই হচ্ছে আত্তীকরণ। এতে ইংল্যান্ডের চাহিদা অনুযায়ী ইশমামের বেশভূষা বদলে গিয়েছে বটে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে ব্যক্তিটা ইশমামই রয়ে গিয়েছেন। ইশমাম দেশে ফিরে এলে ফের ঢিলেঢালা সুতি কাপড় পড়তে শুরু করবেন, তাতে বন্ধুরও তাঁকে চিনতে কষ্ট হবে না। ইশমামের টাকার সঙ্গেও আত্তীকরণের ঘটনা ঘটেছে। বাঙালি টাকা বিলেতে গিয়ে চলবার জন্যে বিলেতিদের চাহিদা অনুসারে টাকা মশাইকে ‘ইউরো’ রূপটি নিতে হয়েছে। কিন্তু তাতে টাকার অর্থ পূর্বের মতো অর্থই (money) রয়ে গিয়েছে, ‘তাস-গয়না’ বা ‘কোমল পানীয় ইউরো’ হয়ে যায়নি; বাংলায় ফিরলে ফের টাকা হয়ে যেতে পারবে।
ভাষার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি অনেকটা একইরকম। প্রত্যেক ভাষার কিছু স্বীয় বৈশিষ্ট্য থাকে। এসবের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ধ্বনি ও বর্ণ। এক ভাষার ধ্বনি ও বর্ণ অন্যভাষার ধ্বনি-বর্ণ থেকে সবসময়ই ভিন্ন হয়। এসব ধ্বনি-বর্ণ দেশভেদে প্রচলিত পোশাক ও রীতিনীতির মতো। কোনো দেশে কোনো ভিনদেশি এলে যেমন তাকে প্রথমেই নিজের পূর্বাভ্যাস ঝেড়ে ফেলে নতুন দেশের নিয়মনীতি অনুযায়ী নিজেকে শুধরে নিতে হয়, তেমনি কোনো ভাষা যখন অন্য কোনো ভাষা থেকে কোনো শব্দ নির্বাচন করে নিজের ভান্ডারে যুক্ত করতে চায়, তখন সবার আগে কাঙ্ক্ষিত শব্দটিকে ওই ভাষাভাষীর প্রয়োজন মতো পূর্বের ধ্বনি-সংক্রান্ত অসংগতি ঝেড়ে ফেলে ওই ভাষাভাষীর চাওয়া মতো নবরূপে নতুন ধ্বনি ও বর্ণে সেজে নিতে হয়। এতে নির্বাচিত শব্দটি নতুন রূপ পায় বটে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে সেই আগের শব্দই রয়ে যায়৷ নির্বাচিত শব্দটি যতক্ষণ ভিন ভাষাটিতে থাকছে, ততক্ষণ সেটিকে মকবুল-ইশমামের মতো ওই ভাষার দেওয়া বেশে থাকতে হবে। কিন্তু ঘরে ফিরে মকবুল-ইশমামের মতো নিজ ভাষায় ফিরে বরাবরের রূপ নিয়ে থাকতে কোনো বিপত্তি রইবে না। পরিপাটি পোশাক পরে ম্যাগনাম এন্টারপ্রাইজে কাজ করায় কিংবা মোটা-উষ্ণ কাপড় ও বুট-জুতো পরায় যেমন মকবুল-ইশমাম বদলে গিয়ে মন্তু-সাবিত হয়ে যাননি, তেমনি ফরাসি ‘restaurant’ বাংলায় এসে বাংলাভাষীর চাহিদা অনুযায়ী বাংলা ধ্বনি ও বর্ণ ধারণ করে ‘রেস্তোরাঁ’ হয়েছে বলে তার অর্থ ‘শৌচাগার’ হয়ে যায়নি।
ইদের ব্যাপারটিও একই রকম। আরবি ভাষায় দীর্ঘ স্বর আছে বলে আরবেরা /ইːদ্/ উচ্চারণ এভাবে দীর্ঘক্ষণ টেনে করেন। কিন্তু বাংলা ভাষায় কোনো দীর্ঘ স্বর নেই। তাই, আরবেরা নিজেদের কথাবার্তায় শব্দটি কীভাবে টেনে উচ্চারণ করেন, বাঙালির কাছে তা কোনো মাইনে রাখে না। বাংলায় থাকতে হলে মকবুল-ইশমামের মতো, রেস্তোরাঁ-টাকার মতো ইদকেও বাঙালির চাহিদা মেনে নিয়ে তাদের পছন্দসই বেশে সাজতে হয়। আর, নববেশে কিংবা নতুন উচ্চারণে মকবুল-ইশমাম, রেস্তোরাঁ-টাকার মূল সত্তা বা অর্থের যেমন কোনো পরিবর্তন ঘটে না, তেমনই ইদের মূল অর্থেও কোনো বদলাও আসে না। ইশমাম দেশে ফিরে সাহেবি রূপ ঝেড়ে ফেলে ফের বাঙালিতে পরিণত হওয়ার মতো ইদও নিজের ঘর আরবে ফিরে গেলে ইউঁহি ‘ইːদ্’ হয়ে যেতে পারবে।
দুটি প্রশ্ন: ১. যে বাঙালি বলছেন— /ইːদ্/ এভাবে উচ্চারণ না-করলে অর্থ বদলে যাবে— আপনি অপর বাঙালির সঙ্গে কথা বলার সময় /ইːদের্ দিন্/ উচ্চারণ করেন, না কি /ইদের্ দিন্/?
২. যিনি বলছেন— বাংলা একাডেমি বছরে বছরে বাংলা বানানের ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করে বানানের বারোটা বাজাচ্ছে— আপনি কি বাংলা একাডেমি গত এক যুগে বানান পরিবর্তন করেছে, এরূপ কেবল দশটি শব্দ উল্লেখ করতে পারবেন?
[ জ্ঞাতব্য: [ ː ] চিহ্ন দিয়ে দীর্ঘ উচ্চারণ নির্দেশ করা হয়। যেমন sheep = /ʃiːp/ ]
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
আমি শুবাচ থেকে বলছি
— — — — — — — — √— — — — — — — — —
প্রতিদিন খসড়া
আমাদের টেপাভুল: অনবধানতায়
error: Content is protected !!