শব্দের আদিতে কখন ব্য এবং কখন ব্যা দেবেন

ড. মোহাম্মদ আমীন

শব্দের আদিতে কখন ব্য এবং কখন ব্যা দেবেন?

নিচের লেখাটি ব্যাকরণ বিশেষজ্ঞদের জন্য নয়। ব্যাকরণে দক্ষ ব্যক্তিবর্গ কিংবা বৈয়াকরণগণ পড়বেন না। যারা ব্যাকরণ জানেন না, কিন্তু শুদ্ধ বানান শিখতে চান, কেবল তাঁরা পড়বেন।
———————————————————————
‘ব্য’ আর ব্যা’ নিয়ে বানানে অনেককে বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়। বিশেষ করে ‘য-ফলা’ যদি শব্দের শুরুতে ব্যবহৃত ব-ধ্বনির সঙ্গে হয় তাহলে বিভ্রান্তি মারাত্মক হয়ে ওঠে।
 
কয়েকটি ব্যতিক্রম (ব্যক্তি এর উচ্চারণ বেক্‌তি) ব্যতিরেকে শব্দের আদিতে ব্যবহৃত ‘ব্য’ ও ‘ব্যা’-এর উচ্চারণ সাধারণত অভিন্ন।উচ্চারণ একই
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
হওয়া সত্ত্বেও কোথাও ‘ব্য’ , আবার কোথায় ‘ব্যা’ দিতে হয়। তাই বানান লেখার সময় লেখক দ্বিধায় পড়ে যান। এই দ্বিধা দূরীভূত করার জন্য নিচের নিমোনিকগুলো খেয়াল করতে পারেন।
 
১. শব্দের আদিতে /ব্য/: /বি-/ উপসর্গের পর /অ/-বর্ণ দিয়ে শুরু শব্দ সন্ধিবদ্ধ হয়ে /ব্য/ হয়। যেমন: বি+অগ্র= ব্যগ্র; বি+অঙ্গ= ব্যঙ্গ; বি+অক্ত= ব্যক্ত, ব্যক্ত+ই= ব্যক্তি, বি+অঞ্জন= ব্যঞ্জন, বি+অতিক্রম= ব্যতিক্রম, বি+অতিব্যস্ত= ব্যতিব্যস্ত, বি+অতিরেক= ব্যতিরেক, ব্যত্যয়= বি+অত্যয়, বি+অধিকরণ= ব্যধিকরণ, বি+অবধান= ব্যবধান, বি+অবসায়= ব্যবসায়, বি+অবস্থা= ব্যবস্থা, বি+অবহার= ব্যবহার; বি+অভিচার= ব্যভিচার, বি+অয়= ব্যয়, বি+অর্থ=ব্যর্থ, বি+অস্ত= ব্যস্ত। অনুরূপ: ব্যঙ্গাত্মক, ব্যঙ্গোক্তি, ব্যজন, ব্যঞ্জনা, ব্যতিক্রম, ব্যতিব্যস্ত, ব্যতিরেক, ব্যতিহার, ব্যতীত, ব্যপদেশ, ব্যবচ্ছিন্ন,ব্যবচ্ছেদ, ব্যবসায়ী, ব্যবস্থাপক, ব্যবহৃত, ব্যষ্টি।
 
ব্যতিক্রম:/বি-/ উপসর্গ দিয়ে শুরু হয়নি এমন কিছু শব্দের বানানের শুরুতে /ব্য/ দেখা যায়। যেমন: ব্যথা, ব্যথিত, ব্যথী। মনে রাখবেন ব্যথা নিরাকার। তাই তার বানানেও আ-কার নেই। ব্যথা অনুভব করা যায়, আ-কার নেই বলে দেখা যায় না।
 
২. শব্দের আদিতে /ব্যা্/ এর প্রয়োগ: /বি-/ উপসর্গের পর /আ/ বর্ণ দিয়ে শুরু শব্দ সন্ধিবদ্ধ হলে /ব্যা/ হয়। যেমন: বি+আকুল = ব্যাকুল; বি+ আঘাত= ব্যাঘাত, বি+আখ্যা= ব্যাখ্যা, বি+আধি= ব্যাধি, বি+ আহত= ব্যাহত। অনুরূপ: ব্যাকরণ, ব্যাদান, ব্যাপক, ব্যাপার, ব্যাপী, ব্যাপৃত, ব্যাপক, ব্যাপ্ত, ব্যাপ্তি, ব্যায়াম, ব্যাহত।
 
৩. বিদেশি শব্দের বানানে অবিকল্প /ব্যা/: বিদেশি শব্দের বানানে অবিকল্প /ব্যা/ হয়, /ব্য/ হয় না। যেমন: ব্যাংক, ব্যাগ, ব্যাজ, ব্যাট, ব্যাটারি, ব্যাডমিন্টন, ব্যান্ড, ব্যান্ডেজ, ব্যাপটিস্ট, ব্যানার, ব্যারাক, ব্যারিস্টার, ব্যালট, ব্যালে, ব্যারিস্টার, ব্যারোমিটার ইত্যাদি।
বিদেশি ও অতৎসম শব্দ পেলে চোখমুখ বন্ধ করে শব্দের প্রথমে ‘ব্যা’ দিয়ে দিন। বৈয়াকরণগণ আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
 
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.।
 
পাণ্ডা
মন্দির বা আশ্রমের সেবায়েতগণকে পাণ্ডাবলা হয় না; পান্ডা বলা হয়। তাঁরা ‘পান্ডা’ বলে তাঁদের পান্ডা বলা হয়। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, হিন্দি পান্ডা অর্থ— (বিশেষ্যে) তীর্থস্থানের পূজারী; (ব্যঙ্গে) প্রধান ব্যক্তি। নেপালি পান্ডা অর্থ ভালুকজাতীয় সাদাকালো রঙের লাজুকপ্রকৃতির ছোটো প্রাণী।
 
সৎমা
‘সৎ’ অর্থ ভালো, সুতরাং ‘সৎমা’ অর্থ ভালো যে মা। কিন্তু সৎমায়ের মতো নিষ্ঠুর আর কেউ কী আছে? সৎমায়ের নৃশংসতার কতো করুণ কাহিনি প্রত্যহ আমাদের শুনতে হয়, অনেককে দেখতে হয়, কাউকে কাউকে ভুগতেও হয়। তো এমন নিষ্ঠুর ও নৃশংস মায়ের নাম কীভাবে ‘সৎমা’ হলো? সংস্কৃত সপত্নী থেকে ‘সতিন’ এবং সতিন থেকে ‘সৎ’ এসেছে। এ ‘সৎ’ এর সঙ্গে ‘মা’ যুক্ত হয়ে গঠিত হয়ছে সৎমা। মূলত সতীনের ‘সৎ’ থেকে ‘সৎমা’ শব্দের উৎপত্তি। তাই ‘সৎমা’ শব্দের ‘সৎ’ ভালো ‘সৎ’ নয়; সতিন সৎ।
 
অপরাধী কিন্তু নিরপরাধ
এবি ছিদ্দিক
 
‘নিঃ’ উপসর্গটি দুই উপায়ে হতে পারে। একটি হচ্ছে র্-জাত, অন্যটি স্-জাত। ‘নিঃ’-এর র্-জাত রূপ হচ্ছে ‘নির্’। এই ‘নির্’ উপসর্গটির অন্যতম প্রয়োগ হচ্ছে— কোনো শব্দের পূর্বে বসে মূল শব্দটি যে অর্থ ধারণ করে, তার অভাব বা অনুপস্থিতি নির্দেশ করা। যেমন—
আকার নেই (অনুপস্থিত) যার > নিরাকার;
আশ্রয়ের অভাব > নিরাশ্রয়;
আশা নেই যেখানে > নিরাশা;
অহংকার নেই যার > নিরহংকার প্রভৃতি।
 
এখানে লক্ষ করবার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে— অভাব বা অনুপস্থিত নির্দেশ করার ক্ষেত্রে ‘নির্’ উপসর্গটি কেবল বিশেষ্যের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, এবং যুক্ত হওয়ার পর বিশেষ্যকে বিশেষণে বদলে দেয়। অর্থাৎ, বিশেষ্যকে বিশেষণে রূপ দেওয়াই ‘নির্’ উপসর্গ যুক্ত করার মূল উদ্দেশ্য। এ-কারণে কোনো বিশেষণের সঙ্গে উল্লেখ-করা অর্থে ‘নির্’ উপসর্গ যুক্ত করে কোনো শব্দ গঠন করা হলে, তা বাহুল্য দোষে দুষ্ট হয়ে যায়। এরূপ বহুলতায় দুষ্ট দু-একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া হলো—
 
১. নিরপরাধী: ‘অপরাধ’ হচ্ছে বিশেষ্য পদ। এই ‘অপরাধ’-এর সঙ্গে ‘ইন্’ প্রত্যয় যুক্ত করে গঠন করা ‘অপরাধী’ একটি বিশেষণ পদ। তাই, এটির শুরুতে পুনরায় বিশেষণ নির্দেশক ‘নির্’ উপসর্গ যুক্ত করলে বাহুল্য হয়ে যায়। এই বহুলতা এড়াতে ‘নির্’ উপসর্গ ‘অপরাধী’-র পূর্বে যুক্ত না-করে ‘অপরাধ’-এর শুরুতে যুক্ত করে ‘নিরপরাধ’ লিখতে হবে।
 
২. নিরহংকারী: ‘অহংকার’ হচ্ছে বিশেষ্য পদ। এই ‘অহংকার’-এর সঙ্গে ‘ইন্’ প্রত্যয় যুক্ত করে গঠন করা ‘অহংকারী’ একটি বিশেষণ পদ। তাই, এটির শুরুতে পুনরায় বিশেষণ নির্দেশক ‘নির্’ উপসর্গ যুক্ত করলে বাহুল্য হয়ে যায়। ড. মোহাম্মদ আমীনের ভাষায় বললে— ব্যাপারটা অনেকটা টাই বাঁধা গলায় আরেকটি টাই পরিয়ে দেওয়ার মতো হাস্যকর। এই বহুলতা এড়াতে ‘নির্’ উপসর্গটি ‘অহংকারী’-র পূর্বে যুক্ত না-করে ‘অহংকার’-এর শুরুতে যুক্ত করে ‘নিরহংকার’ লিখতে হবে।
 
প্রয়োগ:
ক. অসংগত: ড. মোহাম্মদ আমীন একজন নিরহংকারী ব্যক্তি।
সংগত: ড. মোহাম্মদ আমীন একজন নিরহংকার ব্যক্তি।
খ. অসংগত: নিরপরাধী লোকটিকে সাজা দেওয়া ঠিক হয়নি।
সংগত: নিরপরাধ লোকটিকে সাজা দেওয়া ঠিক হয়নি।
 
 
 
 
সূত্র:  https://draminbd.com/শব্দের-আদিতে-কখন-ব্য-এবং-ক/
 
শুবাচ-এর ওয়েবসাইট: www.draminbd.com
 
error: Content is protected !!