শব্দ ও পদ: বাংলা ব্যাকরণ

ড. মোহাম্মদ আমীন
ভাষার মৌলিক উপাদান চারটি। যথা: ধ্বনি, শব্দ, বাক্য ও অর্থ। শব্দের প্রাণ হচ্ছে ‘অর্থ’। অর্থ না থাকলে ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছকে শব্দ বলে অভিহিত করা হয় না। যেমন: ক, ল, ম — এ তিনটি ধ্বনি একসঙ্গে জুড়ে দিলে হয়: কলম (ক + ল + ম)। ‘কলম’ বলতে লেখার একটি উপকরণকে বোঝায়। ‘কলম’-এর অর্থ আছে বলেই এটি একটি শব্দ। অনুরূপ: আমি, বাজার, যাই এগুলোও শব্দ। এদের আলাদা অর্থ আছে। তবে, এ রকম আলাদা আলাদা শব্দ দ্বারা মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করা যায় না। এজন্য অর্থপূর্ণ শব্দকে একত্রে জুড়ে দিতে হয়। আর তাই অর্থপূর্ণ শব্দ জুড়ে জুড়ে মানুষ তার মনের ভাব সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করে থাকে।
.
উপর্যুক্ত তিনটি শব্দকে পর পর জুড়ে দিলে হয়: ‘আমি বাজারে যাই।’ এটি একটি বাক্য। এখানে বক্তার মনের ভাব সম্পূর্ণ প্রকাশ পেয়েছে। অতএব বলতে পারি— কতগুলো অর্থপূর্ণ শব্দ যখন একত্র হয়ে বক্তার মনের ভাব সম্পূর্ণ প্রকাশ করে, তখন তা বাক্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
.
আমি, বাজার, যাই— তিনটি অর্থপূর্ণ শব্দ। আমি বাজারে যাই: মনের ভাব প্রকাশক একটি বাক্য। এই বাক্যে ‘বাজার’ শব্দটি বাক্যে ব্যবহৃত হওয়ার সময় কিছুটা (বাজার + এ = বাজারে) বদলে গেছে। শব্দ যখন বাক্যে ব্যবহৃত হয়, তখন শব্দের শেষে এরূপ কিছু বর্ণ/চিহ্ন যুক্ত হয়। এগুলোকে বিভক্তি বলা হয়। বিভক্তি যুক্ত শব্দকে বলা হয় পদ। অর্থাৎ বিভক্তি যুক্ত শব্দকে অথবা বাক্যে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দকে পদ বলে। পদ পাঁচ প্রকার। যথা : ১. বিশেষ্য, ২. বিশেষণ, ৩. সর্বনাম, ৪. ক্রিয়া ও ৫. অব্যয়।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, “অর্থবিশিষ্ট ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টিকে শব্দ (word) বলে।” ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, “কোনো বিশেষ সমাজে নর-নারীর কাছে যে ধ্বনির স্পষ্ট অর্থ আছে, সেই অর্থ যুক্ত ধ্বনি হচ্ছে সেই সমাজের নর-নারীর ভাষার শব্দ।” ড. মুহম্মদ এনামুল হক-এর মতে, “মনের ভাব প্রকাশের জন্য এক বা একাধিক ধ্বনি একত্রিত হয়ে অর্থবোধক হলে তা শব্দ বলে বিবেচিত হয়। শব্দ বলতে মানব কণ্ঠ নির্গত এক বা একাধিক সার্থক (অর্থযুক্ত) ধ্বনিসমষ্টিকে বোঝায়।” ড. সুকুমার সেন বলেন, “অর্থবোধক একটিমাত্র বর্ণ অথবা কয়েকটি বর্ণের সমষ্টিকে শব্দ বা প্রাতিপদিক বলে।”
শব্দ ও পদের পার্থক্য
১. শব্দ অভিধানবদ্ধ, কিন্তু পদ অভিধান থেকে বাক্যে গৃহীত।
২. শব্দ ব্যবহারের আগে গঠিত হয়। পদ, ব্যবহারের পর বাক্যের অর্থদ্যোতক উপাদান হিসেবে উদ্দেশ্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত।
৩. শব্দ সহজ ও সাধিত দু-ধরনের হতে পারে কিন্তু পদ সবসময় সাধিত। সাধিত হওয়া পদের অন্যতম পূর্বশর্ত।
৪. শব্দনির্মাণে প্রতিটি শব্দ একবারই মাত্র নির্মিত হয়, তবে পদনির্মাণ বিরামহীন।
৫. অভিধানের শব্দগুলো বিচ্ছিন্ন ও পরস্পর সম্পর্কবিহীন থাকে, কিন্তু পদগুলো পরস্পরের সঙ্গে ব্যাকরণের রীতি অনুসারে যুক্ত থাকে।
৬. একটি শব্দের একাধিক অর্থ থাকে তবে পদ হিসেবে বাক্য ব্যবহৃত হলে অর্থ বাক্যবিশেষে সুনির্দিষ্ট হয়ে যায়। যেমন: বল খোকা, শুধু বল দিয়ে কি বলা খেলা যায়? এখানে প্রথম বল অর্থ বলা, কওয়া; দ্বিতীয় বল অর্থ শক্তি এবং তৃতীয় বল অর্থ ফুটবল।
এক বা একাধিক ধ্বনির সম্মিলনে যদি কোনো নির্দিষ্ট অর্থ প্রকাশ পায় তবে তাকে শব্দ বলে। শব্দ, অর্থ দ্বারা নিজেকে যোজিত করে ভাষাকে প্রাণ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকে। এই শব্দ যখন বাক্যে ব্যবহৃত হয় তখন তা পদ হিসেবে পূর্ণ অর্থে দ্যোতিত হয়ে ভাষাকে প্রাণময় অর্থাৎ সার্থক বা কার্যকর করে উদ্দেশ্য দ্বারা পূর্ণ করে তোলে।

Leave a Comment

You cannot copy content of this page

poodleköpek ilanlarıankara gülüş tasarımıantika alanlarPlak alanlarantika eşya alanlarAntika mobilya alanlarAntika alan yerler
Casibomataşehir escortjojobetbetturkey