শব্দ শব্দার্থ উচ্চারণ; পদ পদার্থ বাক্য এবং ব্যুৎপত্তি ও সমার্থক শব্দ

ড. মোহাম্মদ আমীন

এটি খসড়া এখান থেকে চূড়ান্ত করে শুবাচে প্রকাশ করা হবে ক্রমশ

এই পোস্টের লিংক: https://draminbd.com/শব্দ-শব্দার্থ-উচ্চারণ-পদ/

 শব্দ শব্দার্থ উচ্চারণ; পদ পদার্থ বাক্য এবং ব্যুৎপত্তি ও সমার্থক শব্দ

১. অ অ অ

অ ভুক্তি তিনটি। অ বাংলা বর্ণমালার প্রথম স্বরবর্ণ ও মৌলিক স্বরধ্বনি অ-এর প্রতীক। ২.অ (অব্য/বিশেষ্যে) সমাসে অন্য পদের পূর্বে অনৌচিত্য, অভাবাদি (অযত্ন), বৈপরীত্য (অশান্ত), অল্পতা (অপ্রতুল) অন্যত্ব (অমুসলিম, অবাঙালি) প্রভৃতি অর্থসূচক বর্ণ; (বাংলায়) প্রবলতাসূচক বর্ণ (অকষ্ট-অত্যন্ত কষ্ট) অত্যন্ত (অমূল্য) প্রভৃতি অর্থ প্রকাশ করে। যেমন: অকমনীয়, অকম্পন, অকর্কশ, অকর্ম, অকর্মণ্য, অকলুষিত, অকল্পনীয়, অকল্যাণকর, অকাতরে, অকলুষ, অকর্মিষ্ঠ, অকার্যকর, অকীর্তি, অকূল, অক্রীত, অক্ষুণ্ন। ৩.অ (অব্যয়ে) সম্বোধন অনুকম্পা প্রভৃতি অর্থসূচক ধ্বনি। অ, বুঝেছি।
 
আরবি إمْرَأة (ইমরাতুন) বা ফারসি عورت (আৱরত) হতে বাংলা আউরত> আওরত> অওরত শব্দের উদ্ভব। উচ্চারণ: অও্‌রত্‌। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, অওরত আরবি উৎসের শব্দ। বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত অওরত অর্থ— নারী, পত্নী (অওরত মার্চ)।  অওরত মার্চ (উর্দু: عورت مارچ‎) অর্থ নারী কুচকাওয়াজ। এটি পাকিস্তানের একটি নারীবাদী আন্দোলন। ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই মার্চ সর্বপ্রথম করাচিতে এই আন্দোলনের সূচনা। পাকিস্তানের নারীদের সর্বপ্রকার স্বাধীনতা আদায় অওরত মার্চ আন্দোলনের উদ্দেশ্য। অওরত শব্দের কয়েকটি সমার্থক শব্দঅঙ্গনা, অঙ্গনাজন, অন্তঃপুরচারিণী, ন্তঃপুরবাসিনী, অন্তঃপুরিকা, অবলা, কামিনী, নারী, রমণী,  বনিতা,  বামা,  মহিলা,  মানবী,  মানুষী মেয়ে, মেয়েছেলে, মেয়েমানুষ,  মেয়েলোক,  যোষা,  যোষিৎ, যোষিতা, ললনা, শর্বরী, স্ত্রী,  স্ত্রীজন, স্ত্রীলোক, পত্নী, ভার্যা প্রভৃতি।  আরবি إمْرَأة (ইমরাতুন) বা ফারসি عورت (আৱরত) হবে বাংলা আউরত> আওরত > অওরত শব্দের উদ্ভব। শুবাচ


৩. অংশগ্রহণ, অংশ গ্রহণ
সংস্কৃত/ তৎসম অংশগ্রহণ (অংশ+গ্রহণ) অর্থ— যোগ দেওয়া, যুক্ত হওয়া (সভায় অংশগ্রহণ)। উচ্চারণ অংশোগ্রোহোন্। মনে করুন, যোগ মানে যুক্ত।তাই কোথাও যোগ দেওয়া অর্থ প্রকাশে ‘অংশ’ ও ‘গ্রহণ’ একীভূত হওয়ার মতো সেঁটে বসে। সভাপতি যথাসময়ে সভায় অংশগ্রহণ করেছেন। অংশ গ্রহণ, কথার অর্থ— বুঝে পাওয়া, বুঝে নেওয়া, অংশকে গ্রহণ। বুঝে নিলে অংশ বিযুক্ত হয়ে যায়, পৃথক হয়ে যায়। অধিকন্তু, অংশ গ্রহণ করলে বা অংশকে গ্রহণ করতে গেলে পক্ষদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। তাই প্রাপ্য অংশকে ‘গ্রহণ করা’ কথাটি ফাঁক রেখে লিখতে হয়। সমিরা ভাইদের কাছ থেকে পিতার সম্পত্তির অংশ গ্রহণ করেছেন। ভাগ গ্রহণকারীকে বলা হয় অংশল বা অংশহরী। 
 
৪. অংশাংশি, অংশাংশী
সংস্কৃত/তৎসম অংশ থেকে উদ্ভূত অংশাংশি অর্থ— (বিশেষ্যে) ভাগবাঁটোয়ারা, ভাগাভাগি। উচ্চারণ: অংশাংশি। ভাগাভাগি বানানে ই-কার। তাই ভাগাভাগি অর্থদ্যোতক অংশাংশি বানানেও ই-কার। সংস্কৃত/তৎসম ‘অংশাংশী (অংশ+√অন্‌শ্‌+ ইন্) অর্থ— (বিশেষ্যে) অবতার ও অবতারী, দেবী। উচ্চারণ: অংশাংশি। নিমোনিক: দেবী বানানে ঈ-কার। তাই অবতার-অবতারী অর্থদ্যোতক ‘অংশাংশী’ বানানেও ঈ-কার। দেবী-সংশ্লিষ্ট সব সংস্কৃত শব্দের বানানের শেষে ঈ-কার দিতে হয়। তাই অনুরূপ অর্থদ্যোতক অংশাংশী বানানেও ঈ-কার দিতে হয়। ভাগের ভাগকে বলা হয় অংশাংশ। ভিন্ন ভিন্ন ভাগে বিভক্ত অংশকে বলা হয় অংশিত। যা ভাগ করা যায় তাকে বলা হয় অংশনীয়।
 

৫. অকস্মাৎ, অগ্নিসাৎ, অগ্নিসাক্ষী

সংস্কৃত অকস্মাৎ (ন+কস্মাাৎ); উচ্চারণ অকোশশাঁত্; অর্থ হঠাৎ, সহসা, মুহূর্তের মধ্যে। ষত্ববিধি মতে ক-এর পরের স, ষ হওয়ার কথা। এখানে হয়নি কেন? কারণ সাৎ প্রত্যয়ের দন্ত্য-স, মূর্ধন্য-ষ হয় না। যেমন: অগ্নিসাৎ, ভূমিসাৎ, ধূলিসাৎ, বারিসাৎ। এটি না-হয় সাৎ প্রত্যয়ের জন্য হলো, কিন্তু অগ্নিসখা (অগ্নি+সখা), অগ্নিসাক্ষী (অগ্নি+সাক্ষী), অগ্নিসেবন (অগ্নি+সেবন), অগ্নিস্ফুলিঙ্গ (অগ্নি+স্ফুলিঙ্গ) বানানে মূর্ধন্য-ষ হলো না কেন? কারণ এগুলো সমাসবদ্ধ পদ। এখানে সখা, সাক্ষী, সেবন ও স্ফুলিঙ্গ প্রত্যেকটি অর্থবহুল  একক শব্দ এবং বানানে ষ নেই, স রয়েছে। সমাসবদ্ধ পদ না হলে অগ্নিসখা, অগ্নিসাক্ষী, অগ্নিসেবন, অগ্নিস্ফুলিঙ্গ  শব্দগুলোতে স-এর স্থলে ষ হতো। কারণ ষত্ববিধি মতে একই শব্দে অ আ ভিন্ন স্বর, ক্ এবং র্  পরবর্তী বিভক্তি বা প্রত্যয়ের স, মূর্ধন্য-ষ হয়ে যায়।
 
 অকর্মা ও ধাড়ি শব্দ পাশাপাশি বসে অকর্মার ধাড়ি কথাটির উদ্ভব ঘটিয়েছে। এখানে বর্ণিত ধাড়ি অর্থ নেতা। সুতরাং, অকর্মার  ধাড়ি বাগ্‌ভঙ্গির অর্থ অকর্মার নেতা। অভিধানমতে,  অকর্মার ধাড়ি কথার অর্থ (বিশেষ্যে) নিতান্ত অলস ব্যক্তি, যে ব্যক্তি অলস্যহেতু কাজ পণ্ড করে।
 
. অকারাদিক্রম
সংস্কৃত অকারাদিক্রম (অকারাদি+ক্রম) অর্থ (বিশেষ্যে) বর্ণমালার ক্রমানুসারে বিন্যাস। অ থেকে হ পর্যন্ত বর্ণানুক্রমে শব্দ বা নামের বিন্যাসকে অকারাদিক্রম বলা হয়। নিমোনিক: অ হচ্ছে বাংলা বর্ণমালার প্রথম বর্ণ এবং অ-কার হচ্ছে প্রথম কার/স্বরচিহ্ন।অকার মানে অ-কার। অ থেকে শুরু হয় বর্ণমালা। অ-কার হচ্ছে আদি।তাই অকারাদিক্রম= অকার+আদি+ক্রম। অকার আদি থেকে ক্রমান্বয়ে অগ্রসর। শব্দটির বানান লেখার সময় এই নিমোনিক-সন্ধিটি মনে রাখুন।
 
. অকার্যকারী, অকার্যকারিতা 
সংস্কৃত অকার্যকারী (অকার্য+√কৃ+ইন্) অর্থ (বিশেষণে) অলস, নিষ্ক্রিয়; অকেজো; অপকর্মকারী; দুষ্কৃতী। অকার্যকারী ইন্-প্রত্যয়ান্ত শব্দ। ইন্-প্রত্যয়ান্ত শব্দের শেষে -তা/ত্ব প্রত্যয়াদি যুক্ত হলে ঈ-কার, ই-কার হয়ে যায়। তাই অকার্যকারী, কিন্তু অকার্যকারিতা। অনুরূপ: অদূরদর্শী, কিন্তু অদূরদর্শিতা, অদূরবর্তী, কিন্তু অদূরবর্তিতা, অদ্বয়বাদী কিন্তু, অদ্বয়বাদিতা/ত্ব; অধিকারী, কিন্তু অধিকারিত্ব; অধোগামী, কিন্তু অধোগামিতা, অনাবাসী কিন্তু, অনাবাসিত্ব, অনুগামী কিন্তু, অনুগামিতা।  অকার্যকারিতার সমার্থক শব্দ অকার্যকরতা। এটি অকার্যকর হতে উদ্ভূত।
 
অকালকুষ্মাণ্ড
অকাল ও কুষ্মাণ্ড মিলে অকালকুষ্মাণ্ড। সংস্কৃত অকালকুষ্মাণ্ড (অকাল+কু+উষ্মা+অণ্ড) অর্থ (বিশেষে) অকাল জাত কুমড়ো; (বিশেষণে) আলংকারিক অর্থমূর্খ, অকর্মণ্য, অপদার্থ। উচ্চারণ: অকাল্‌কুশ্‌শাঁন্‌ডো। ষত্ববিধিমতে,অ আ ভিন্ন স্বর, ক্ এবং র্-এর পরবর্তী বিভক্তি বা প্রত্যয়ের স, মূর্ধন্য-ষ হয়। তাই কু(=ক্+উ)এর পর ষ/ষ্ম হয়েছে। তৎসম শব্দে ট-বর্গের আগে সর্বদা ষ হয়। তাই বানানটি অকাল+কু+ষ্+মা+অণ্ড)= অকালকুষ্মাণ্ড ( উচ্চারণ অকালকুশ্‌শাঁণ্ডো)। ণ্ড= ণ্+ড।
 
অকালবোধন
 ‘অকাল’ ও  ‘বোধন’ শব্দের মিলনে অকালবোধন শব্দের উদ্ভব। অকাল অর্থ অসময়ে, নির্ধারিত সময়ের বাইরে এবং বোধন  অর্থ জাগানো। সংস্কৃত অকালবোধন(অকাল+বোধন) অর্থ (বিশেষ্যে) অসময়ে আবাহন, অসময়ে জাগরিতকরণ। ভারতীয় পুরাণের একটি ঘটনা থেকে শব্দটির উদ্ভব। উচ্চারণ: অকাল্‌বোধন্। শব্দটির রূপতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: অ-কাল {√কল্ (গণনা করা) + অ (ঘঞ্), করণবাচ্য} + বোধন {√বুধ্ (জানা) + অন, ভাববাচ্য}। অকালে বোধন = অকালবোধন। এটি সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস। এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে অসময়ে আরাধ্য দেবতার নিদ্রাভঙ্গ বা আহ্বান করা বা অসময়ে জাগরণ। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিমতে– রাবণকে বধ করার উপযুক্ত শক্তি লাভের জন্য রামচন্দ্র অকালে তথা শরৎকালের আশ্বিন মাসে দেবী দুর্গার বোধন বা নিদ্রাভঙ্গ করেছিলেন। এই নিদ্রাভঙ্গ থেকে ‘অকালবোধন’ বাগ্‌ধারাটির উৎপত্তি। এ নিদ্রাভঙ্গের কারণে বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, দুর্গাপূজার আদি সময় হিসাবে বসন্তকাল নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু অকালবোধনের কারণে বাংলাদেশ-সহ অনেক স্থানে এটি শরৎকালে অনুষ্ঠিত হয়।
 
অকালি
‘অকালি’ পঞ্জাবি শব্দ। এটি সম্প্রদায়ের নাম এবং পদ হিসেবে বিশেষ্য। উচ্চারণ: অকালি। শিখ সম্প্রদায়ের যেসব অনুসারী অকাল-পুরুষ উপাসনা করেন তাদের অকালি বলা হয়। ভারতে এরা বিশেষভাবে ‘অকালি’ হিসেবে পরিচিত। এটি অতৎসম শব্দ। এজন্য শব্দটির বানানে দীর্ঘ-ঈ অনাবশ্যক। অকালি, কিন্তু মাকালী— একটা ল-য়ে ‘ই-কার’ এবং আরেকটায় ‘ঈ-কার’, কিন্তু কেন? ‘কালী’ বা ‘মা-কালী’ একজন হিন্দু দেবী। তাঁর অপর নাম শ্যামা বা আদ্যাশক্তি। শাক্ত সম্প্রদায়ের লোকেরা মা কালীর পূজা করে থাকে। এটি তৎসম শব্দ। তাই এর বানানে দীর্ঘ ঈ-কার আবশ্যক। বাঙালি হিন্দু সমাজে কালীর মাতৃরূপের পূজা বিশেষ জনপ্রিয়। তাই কালীকে মা কালী বা মা-কালী বলা হয়। প্রসঙ্গত, যারা শক্তির উপাসনা করেন, তাদের শাক্ত বলা হয়।
 
অকুল ও অকূ
সংস্কৃত অকুল (ন+কুল) অর্থ (বিশেষ্যে) কল্পিত নীচ বংশ, অবহেলিত ও অনগ্রসর জাতি। উচ্চারণ: অকুল। সংস্কৃত অকূল (ন+কূল) অর্থ— (বিশেষণে) তীরহীন, অপার, অসীম, গভীর, নিবিড়; (বিশেষ্যে) সমুদ্র, (আলংকারিক অর্থে) কঠিন বিপদ, সংকট। 
 
 
অকুস্থল অকুস্থান
আরবি অকু ও সংস্কৃত স্থল নিয়ে গঠিত এবং বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত অকুস্থল (অকু+স্থল) অর্থ যে স্থানে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, ঘটনাস্থল। উচ্চারণ: অকুস্‌থল্। অকুস্থল-এর সমার্থক শব্দ অকুস্থান। এটি আরবি অকু আর সংস্কৃত স্থান নিয়ে গঠিত।
 
অকুলপাথার:
সংস্কৃত অকূল এবং খাঁটি বাংলা পাথার নিয়ে অকূলপাথার (অকূল+পাথার) শব্দটি রচিত। সংস্কৃত অকূল (ন+কূল) অর্থ— (বিশেষণে) তীরহীন, অপার, অসীম, গভীর, নিবিড়; (বিশেষ্যে) সমুদ্র, (আলংকারিক অর্থে) কঠিন বিপদ, সংকট। অন্যদিকে সংস্কৃত পাথস থেকে উদ্ভূত খাঁটি বাংলঅ শব্দ পাথার অর্থ— (বিশেষ্যে) বিস্তীর্ণ জলরাশি, সমুদ্র। সুতরাং, অকূলপাথার অর্থ— অসীম সমুদ্র, দুস্তর পারবার; (আলংকারিক) কঠিন বিপদ, মহাসংকট। বাক্যে এটি বিশেষ্যে হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
 
অখন-তখন
বাংলা অখন-তখন অর্থ— (বিশেষণে) মুমূর্ষু অবস্থাপ্রাপ্ত, মরো-মরো। এটি এখন-তখন শব্দের আঞ্চলিক রূপ। উচ্চারণ: অখোন্‌তখোন্‌। অখন-তখন শব্দের অর্থ মরো-মরো অবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু  অখন ও তখন শব্দের পৃথক অর্থের সঙ্গে মৃত্যু বা মরো-মরো অবস্থার কোনো  সংশ্লিষ্টতা নেই। 
 
অক্ষৌহিণী
অক্ষৌহিণী (অক্ষ+ ঊহিণী) তৎসম শব্দ। পুরাণমতে, পদাতি, অশ্ব, হস্তী ও রথ মিলিয়ে ২,১৮,৭০০ সৈন্যে এক অক্ষৌহিণী। তন্মধ্যে ১০৯৩৫০ পদাতি, ৬৫৬১০ অশ্ব, ২১৮৭০ হস্তী,২১৮৭০ রথ; এই সংখ্যক চতুরঙ্গ সেনাদলকে একত্রে এক অক্ষৌহিণী বলে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শব্দ বাহিনী। বাহিনীর দুটি পৃথক ভুক্তি। সংস্কৃত বাহিনী (বাহ+ইন্+ঈ) অর্থ (বিশেষ্যে) সৈন্যদল; পৌরাণিক ৮১টি হাতি, ৮১টি রথ, ২৪৩টি ঘোড়া এবং ৪০৫ জন পদাতিক নিয়ে গঠিত সেনাসমাবেশ। বস্তুত, পৌরাণিক এই সেনাসমাবেশ থেকে বাহিনী শব্দের উদ্ভব।সেনাসমাবেশ ছাড়ও আর একটি বাহিনী আছে। এই বাহিনী (বাহ+ইন্+ঈ) অর্থ (বিশেষ্যে) প্রবাহিণী, নদী। হিন্দি কাহানি থেকে কাহিনি শব্দের উদ্ভব। এটি অতৎসম শব্দ। তাই ই-কার। বাহিনী সংস্কৃত শব্দ। মূল সংস্কৃত বানানে ‘নী’ আছে। তাই বাহিনী বানানে ঈ-কার।
 
অগস্ট আগস্ট 
লাতিন অগস্ট অর্থ (বিশেষ্যে) গ্রেগরীয় পঞ্জিকার অষ্টম মাস, ১৭ই শ্রাবণ থেকে ১৬ই ভাদ্র পর্যন্ত কালপর্ব, August. আগস্ট। উচ্চারণ: অগস্ট্। এর সমার্থক শব্দ আগস্ট। তবে আগস্ট ইংরেজি শব্দ। ইংরেজি আগস্ট অর্থ (বিশেষ্যে) গ্রেগরীয় পঞ্জিকার অষ্টম মাস, ১৭ই শ্রাবণ থেকে ১৬ই ভাদ্র পর্যন্ত কালপর্ব; August. অগস্ট। অগস্ট ও আগস্ট সমার্থক। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, দুটোই শুদ্ধ।  অগাস্ট অশুদ্ধ। তবে আঞ্চলিক ভাষায় অনেকে অগাস্ট বলেন।
 
অগস্ত্য অগস্ত্যযাত্রা
সংস্কৃত অগস্ত্য (অগ+√স্তৈ+অ) অর্থ— জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুযায়ী যে নক্ষত্রের  উদয় শরৎ ঋতুর আবির্ভাব সূচনা করে, Canopus; ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত মুনিবিশেষ, অগস্ত্য মুনি। উচ্চারণ: অগোস্‌তো। অগস্ত্য থেকে অগস্ত্যযাত্রা (অগস্ত্য+যাত্রা) শব্দের উদ্ভব। এর অর্থ— (বিশেষ্যে) যে যাত্রা থেকে যাত্রী ফিরে আসে না এমন বিশ্বাস; শেষ যাত্রা। অশুভ বলে কল্পিত ভাদ্রমাসের প্রথম দিনে যাত্রা; নিষিদ্ধ যাত্রা। ‍উচ্চারণ: অগোস্‌তোজাত্‌ত্রা।
 
অগস্ত্যযাত্রা শব্দের উদ্ভবকাহন
মহাভারতের অন্যতম চরিত্র অগস্ত্য মুনি, তার শিষ্য বিন্ধ্য পর্বত ও সূর্যদেব অগস্ত্য যাত্রা বাগ্‌ভঙ্গিটির উৎস-কাহিনির সঙ্গে জড়িত। সূর্যদেব তার যাত্রাপথে উদয়াস্তকালে নিত্য সুমেরু পর্বত প্রদক্ষিণ করেন। একদিন বিন্ধ্য পর্বতের বাসনা হলো, সূর্যদেব তাকেও ওইভাবে প্রদক্ষিণ করুক। সূর্য তা মানলেন না। সূর্যের আচরণে বিন্ধ্য পর্বত প্রচণ্ড রেগে যান। তিনি নিজের দেহ বর্ধিত করে সূর্যের গতিপথ আটকে দেন। বিপর্যয়ে পড়ে যায় পৃথিবী। দেবতা, মানুষ, গাছপালা সবাই সঙ্কটে নিপতিত হয়। বিন্ধ্যের এ সর্বনাশা কাণ্ডে সন্ত্রস্ত দেবতারা বিন্ধ্যগুরু অগস্ত্য মুনির শরণাপন্ন হন। অগস্ত্য মুনি ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরে বিন্ধ্যের নিকট উপস্থিত হন। বিন্ধ্য গুরুকে ভূমিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেলন। অগস্ত্য বিন্ধ্যকে বললেন, “আমি যাচ্ছি, যতক্ষণ ফিরে না আসি ততক্ষণ তুমি যে অবস্থায় আছ, সে অবস্থায় থাকবে।” শিষ্যকে নির্দেশ দিয়ে অগস্ত্য মুনি দক্ষিণাপথের দিকে যাত্রা করলেন। অগস্ত্য গেলেন তো গেলেন আর ফিরলেন না। সূর্যের গতিপথ মুক্ত হলো। মহাভারতের অগস্ত্য মুনির এ যাত্রা হতে ‌‌অগস্ত্য যাত্রা বাক্যভঙ্গিটির উৎপত্তি। এ ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ভালো কাজের জন্য প্রতারণা করা অসিদ্ধ নয়।
 
অগণন অগণনীয় অগণিত অগণ্য অগনতি: 
সংস্কৃত অগণ্য (ন+√গণ্+অন) অর্থ— (বিশেষণে) গুনে শেষ করা যায় না এমন, অসংখ্য; নগণ্য, অকিঞ্চিৎকর, তুচ্ছ। উচ্চারণ: অগনোন্‌। এর সমার্থক শব্দ অগণনীয়(ন+√গণ্+অনীয়) । সংস্কৃত অগণিত (ন+√গণ্‌+ত) অর্থ— (বিশেষণে) গোনা হয়নি এমন, গণনার অসাধ্য। উচ্চারণ: অগোনিতো। সংস্কৃত অগণ্য (ন+√গণ+য) অর্থ— (বিশেষণে) অসংখ্য, অনেক; নগণ্য, তুচ্ছ, অকিষ্ণিৎকর। গণ শব্দের বানানে স্বাভাবিক মূর্ধন্য-ণ। তাই গণ ধাতু যোগে গঠিত শব্দেও মূর্ধন্য ণ।
 
প্রসঙ্গত, অগণ্য শব্দের অর্থ  একদিকে অসংখ্য, অনেক, প্রচুর। অন্যদিকে, অগণ্য শব্দের অর্থ— নগণ্য, তুচ্ছ ও অকিষ্ণিৎকর। যা প্রথমোক্ত অসংখ্য, অনেক, প্রচুর শব্দের বিপরীত অর্থ ধারণ করে। অর্থাৎ অগণ্য এমন একটি শব্দ যার মধ্যে পরস্পর  বিপরীত অর্থ বিদ্যমান। যেসব শব্দ একই সঙ্গে পরস্পর বিপরীত অর্থ দ্যোতিত করে তাদের বলা যায় দ্ব্যর্থক শব্দ। অনুরূপ: অপরূপ, পর্যাপ্ত প্রভৃতি। এরূপ আরও শব্দ রয়েছে। জানা থাকলে বলুন।
 
পর্যাপ্ত ও অপর্যাপ্ত নিয়ে সংশয় 
‘প্রচুর’ অর্থে ‘পর্যাপ্ত’‘অপর্যাপ্ত’ যে-কোনোটিই ব্যবহৃত হতে পারে। আবার, ‘প্রচুর’ ও ‘অপ্রচুর’ – এ-রকম সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থেও ‘অপর্যাপ্ত’ ব্যবহৃত হতে পারে। ‘পর্যাপ্ত’ হলো প্রয়োজনের ১০০ ভাগ। ‘অপর্যাপ্ত’ হয় ১০০ ভাগের বেশি (=প্রচুর), অথবা, ১০০%-এর কম (=অপ্রচুর), কিন্তু ১০০% নয়। তবে, সাধারণভাবে, বাক্য থেকে ও পূর্বাপর প্রসঙ্গ থেকে স্পষ্ট হবে ও হতে হবে কী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে কোনো একটি শব্দ, যদি-না ধাঁধা সৃষ্টি করাই হয়ে থাকে শব্দ-ব্যবহারকারী লেখকের বা বক্তার উদ্দেশ্য।
 
 
 
অচিন্ত অচিন্ত্য
অচিন্তনীয় কিন্তু অচিন্ত্য (অনীয় প্রত্যয় যুক্ত হলে য-ফলা সাধারণত লোপ পায়) অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৪ খ্রিস্টাব্দ-১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ) কল্লোলযুগের কথাসাহিত্যিক ও কবি।
 
 
 
 
— — — — — — — — — — — — — — √ — — — — — — — — — — — — — — — —
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক
 
 
 
 
error: Content is protected !!