শশি শশী খরগোাশ ও চন্দ্র: খরগোশ থেকে চন্দ্র, চন্দ্র থেকে খরগোশ

ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/শশি-শশী-খরগোাশ-ও-চন্দ্র-খর/
চাঁদে খরগোশ, গেল কীভাবে
ড. মোহাম্মদ আমীন
চাঁদে কী চড়কা কাটা বুড়ি থাকে? ফুলটুসকির আকস্মিক প্রশ্ন।
না। চাঁদে থাকে খরগোশ। খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ হাজার অব্দের পূর্বে এক মহাজ্ঞানী পৃথিবী থেকে  চাঁদে খরগোশ দেখেছেন।
আমরা যে পড়েছি চাঁদে বুড়ি থাকে।  তার একটা চড়কা আছে। সে বসে বসে ওই চড়কায় তার নাতির জামা বানানের জন্য সুতো কাটে।
 রবীন্দ্রনাথই কেবল চাঁদে বুড়ি দেখেছেন। এ তো সেদিনের কথা। আমরা রবীন্দ্রনাথের দেখা বুড়িকে চাঁদের বুড়ি বলছি। তুমি কি কখনো চাঁদে কোনো বুড়ি দেখেছ? চাঁদ আর ‍বুঁড়ি নিয়ে কোনো শব্দ আছে?
নাই। কিন্তু চাঁদ আর খোরগোশ নিয়ে অনেক শব্দ আছে। কবিতায় আছে, সাহিত্যে আছে, রবীন্দ্রনাথে আছে, নজরুলে আছে। তোমাদের পরীক্ষাতেও আসে। আসে না?
আসে তো।
আপনি কি চাঁদে কখনো খরগোশ দেখেছেন? ফুলটুসকি জানতে চাইল।
আমি চাঁদে জোছনা আপু ছাড়াকে আর কিছু দেখতে পাই না।  আমার দৃষ্টি আর ভাবনাশক্তি দুটোই ঘাটতির কবলে।
চাঁদ কীভাবে এলো?
ইংরেজিতে যা ‘moon’ বাংলায় তা ‘চাঁদ’। ‘মুন’ শব্দটি জর্মন ভাষাগোষ্ঠীর একটি থেকে এসেছে, যার সঙ্গে লাতিন ‘mensis’ শব্দের সম্পর্ক রয়েছে। ১৬৬৫ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত ইংরেজি ভাষায় মুন বলতে কেবল চাঁদকেই বুঝাত। ১৬৬৫ খ্রিষ্টাব্দে তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত অন্যান্য গ্রহের প্রাকৃতিক উপগ্রহের ক্ষেত্রেও এই মুন শব্দটি প্রয়োগ করা শুরু হয়। ‘moona’ শব্দের লাতিন প্রতিশব্দ ‘Luna’। অন্য গ্রহের প্রাকৃতিক উপগ্রহের সঙ্গে পৃথিবীর প্রাকৃতিক উপগ্রহের পার্থক্য করার জন্য চাঁদকে ইংরেজিতে মুন না বলে অনেক সময় লুনা বলা হয়ে থাকে। ইংরেজিতে চাঁদের বিশেষণ হিসেবে ‘লুনার’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। 
তো বাংলায় আমরা চাঁদ বলি কেন?
বাংলায় ‘চাঁদ’ এসেছে সংস্কৃত ‘চন্দ্র (চন্দ্‌+র)’ থেকে। চন্দ্ ধাতুর অর্থ দীপ্তি পাওয়া উজ্জ্বল হওয়া, আলোকিত হওয়া। এটা রাতে আমাদের পৃথিবীকে আলোকিত করে না?
করে তো।
তাহলে চন্দ্রকে শশ বলা হয় কেন? শশ অর্থ তো খরগোশ।
খরগোশ কি আলো দেয়?
তোমার কী মনে হয়?
দেয় না। তাহলে চন্দ্র আর খরগোশকে কেন সমার্থক?
শশ (উচ্চারণ: শশো) তৎসম শশ (√শশ্‌+অ) শব্দের মূল ও আদি ও মুখ্য অর্থ — খরগোশ।
কীভাবে?
আজ থেকে দশ হাজার বছর আগের কথা। শোকাতুর এক বৈয়াকরণ জম্পতি শোকের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে রাতে ঘর থেকে বের হয়ে  তাঁর পাঠশালার মাঠে চলে গেলেন। সেদিন ছিল পূর্ণিমা। জোছনায় চারদিক ফকফকা। তারা দুজন এক ঢিবির ওপর  গিয়ে বসল।  বৈয়াকরণ  চন্দ্রের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে।
শোকাতুর কেন?
তাদের একটা খুব সুন্দর শশ ছিল। তারা সেটাকে শশী নামে ডাকত। কয়েকদিন আগে শশটি মারা যায়। তাই।
তারপর কী হলো?
তারা তো চাঁদের দিকে তাকিয়েই আছেন।  হঠাৎ  দেখলেন, চাঁদে একটি শশ বসে আসে। অবিকল তাদের শশের মতো— লম্বা দুটো কান, চারটি পা, দুটি চোখ– -।
সত্যি? 
হ্যাঁ।
যাহ্‌!
আসলে এটি তাদের শশ ছিল না।
তাহলে কী ছিল?
চন্দ্রে দৃশ্যমান ছায়াটি দেখতে অনেকটা শশ বা খরগোশের মতো। তাই শশ-শোকাতুর বৈয়াকরণ মনে করলেন ওটিই তার শশ। মরার পর  স্বর্গে  গিয়ে চাঁদ হয়ে তাকে দেখতে এসেছে।  বৈয়াকরণ অভিভুত। পত্নীকে বললেন, “ওই দেখো  আকাশে, আমাদের শশ বসে বসে হাসছে।” “কই গো” বলে পত্নী আকাশের দিকে তাকালেন। “ওমা, তাই তো?  ওগো, এতো চাঁদ নয়? এ তো শশ। চাঁদ বুঝি চলে গেছে?”
উভয়ে শশ শশ  বলে চিৎকার দিলেন, “ তোমারা সবাই দেখে যাও, আমাদের শশ।
পাড়ার সবাই ছুটে এলো পড়িমড়ি। মনে হয়ে ভূত হয়ে ফিরে এসেছে। একজও ওঝাকেও সঙ্গে নিলেন।
শশ কোথায়? পড়শিরা জানতে চাইল
আকাশে। 
সবার দৃষ্টি আকাশে।
তাই তো, আকাশে কোনো চাঁদ নেই। এ তো শশ।  সত্যি তো! এতদিন যাকে চন্দ্র বলে আসছি সে তো আসলে একটা শশ।
 বৈয়াকরণ বলল, না, এ চন্দ্র নয়। আমাদের শশ।
তাহলে চন্দ্র কোথায়?
শশ হয়ে গেছে।
সে থেকে চন্দ্রের এক নাম হয়ে গেল শশ। 
“তা না হয় বুঝলাম” ফুলটুসকি বলল, “কিন্তু চন্দ্রকে শশবিন্দু, শশলক্ষণ, শশলাঞ্ছন, শশাঙ্ক— এসব বলা হয় কেন?”
চাঁদের পেটে  শশ বা খরগোশ থাকে। তাই শশ-ধারক রূপে কল্পনা করে চাঁদ বা চন্দ্রকে শশধর বলা হয়।  বৈয়াকরণের শশটি এখন কে লালন করছে?
চাঁদ।
চন্দ্র বা চাঁদ বা খরগোশকে লালন করে। তাই চাঁদের আরেক নাম শশভৃৎ।
যেমন: পরকে  লালন করে বলে কাকের আরেকনাম পরভৃৎ।
লাঞ্ছন অর্থ কলঙ্ক। শশ বা খরগোশকে চাঁদের কলঙ্ক হিসেবে কল্পনা করে চাঁদের প্রতিশব্দ করা হয়েছে শশলাঞ্ছন
চাঁদকে শশাঙ্ক বলা হয় কেন? 
অঙ্ক মানে কোল, দাগ, চিহ্ন, অলংকার, ভূষণ।  শশ আর অঙ্ক শব্দের সন্ধি থেকে শশাঙ্ক (=শশ+অঙ্ক)।  শশাঙ্ক শব্দে বর্ণিত   অঙ্ক শব্দের অর্থ কোল, অলংকার ভূষণ প্রভৃতি। চাঁদের  অঙ্কে বা কোলে শশ থাকে। তাই চাঁদের আরেক নাম শশাঙ্ক বা শশ বা খরগোশের কোল। 
এটা না হয় বুঝলাম, কিন্তু চাঁদকে শশিকর শশিকলা শশিকান্ত শশিপ্রিয়া শশিভূষণ শশিশেখর বলা হয় কেন? 
শশী (শশ্‌+ইন্) অর্থ (বিশেষ্যে)— শশ, চন্দ্র, শশধর, শশাঙ্ক, চাঁদ প্রভৃতি।
তাহলে, শশিকর শশিকলা শশিকান্ত শশিপ্রিয়া শশিভূষণ শশিশেখর প্রভৃতি শব্দে শশি কেন?
শশী ইন্‌ প্রত্যয় যোগে গঠিত শব্দ। ইন্‌ প্রত্যয়ান্ত শব্দের সঙ্গে পুনরায় প্রত্যয় যুক্ত হলে ঈ-কারটি ই-কার হয়ে যায়। যেমন: মন্ত্রী, কিন্তু মন্ত্রিবর্গ, মন্ত্রিপরিষদ, মন্ত্রিসভা, সহযোগী, কিন্তু সহযোগিতা; প্রাণী, কিন্তু প্রাণবিজ্ঞান। 
শশিকর শশিকলা শশিকান্ত শশিপ্রিয়া শশিভূষণ শশিশেখর অর্থ চাঁদ হলো কেন?
প্রথমে বলি শশিকর (শশী+কর)। এখানে কর অর্থ কিরন বা রশ্মি।  শশী অর্থ  শশ বা খরগোশ। চাঁদ বা শশী  কিরণ দেয়। তাই চাঁদের অপর নাম শশিকর। আবার কর অর্থ হাত। সে অর্থে শশিকর অর্থে চন্দ্র বা শশ ধারণকারী হাত। অর্থাৎ যে শশী বা যে খরগোশ কিরণ দেয় সেটি শশিকর। চাঁদের বুকে শশী আছে। সেই শশী কিরণ দেয়। তাই চাঁদের অপর নাম শশিকর। 
কিন্তু, শশিকলা? শশীতে কলা এলো কীভাবে? শশী যদি খেয়ে ফেলে? কলা খোরগশের খুব প্রিয় খাদ্য।
 শশীকলার কলা খাওয়ার কলা নয়। এই কলা অর্থ— রাশিচক্রের সূক্ষ্ম ভাগ বা অংশ। যে বিশেষ তন্তুদ্বারা দেহের বিভিন্ন অশং গঠিত সেটিও  বলতে পার।  ইংরেজিতে যাকে বলা হয় tissue।  শশী অর্থ— খরগোশ আর কলা অর্থ রাশিচক্রের সূক্ষ্ম ভাগ। চাঁদের কিয়দংশ শশী বা খরগোশ ধারণ করে থাকে। তাই চাদের অপর নাম শশিকলা। 
শশিকান্ত হবে কেন? কান্ত শব্দের অর্থ তো স্বামী।
কান্ত শব্দের অনেক অর্থ। বিশেষ্যে কান্ত অর্থ— স্বামী, পতি; প্রণয়ী; রত্ন, কুমকুম; লোহা এবং (বিশেষণে) সুন্দর, মনোরম, কমনীয়; প্রিয়। শশিকান্ত শব্দের কান্ত অর্থ— সুন্দর, মনোরম, কমনীয়।  খরগোশ বা শশী নামের পশু ধারণকারী চাঁদটি দেখতে সুন্দর, মনোরম আর কমনীয়। তাই তার নাম শশিকান্ত।
শশিভূষণ বলা হয় কেন?
ভূষণ অর্থ অলংকার। শশী আর ভূষণ মিলে শশীভূষণ (শশী+ভূষণ)। সুতরাং, শশিভূষণ অর্থ শশী বা খরগোশের অলংকার।  চাঁদে খরগোশের মতো বসে থাকা ছায়াটিকে চাঁদের ভূষণ কল্পনা করে চাঁদকে শশিভূষণ বলা হয়। চাঁদের শেখরে শশী থাকে। তাই এর আরেক নাম শশিশেখর।
শশিপ্রিয়া অর্থও কি চাঁদ? না।
 না।
কিন্তু এখানেও যে শশী খরগোশ আছে?
শশিপ্রিয়া অর্থ রাত। 
শশী আবার চাঁদ থেকে রাত হয়ে গেল?
শশী  আর  প্রিয়া মিলে শশিপ্রিয়া (শশী+প্রিয়া)। যার শাব্দিক অর্থ  শশী বা খরখোশ বা চাঁদের প্রিয়া।  শশী ধারণকারী চাঁদ কেবল রাতে আসে। দিনে আসে না।  তাই রাতকে চন্দ্রের প্রিয়া কল্পনা করে রাতের নাম রাখা হয়েছে শশিপ্রিয়া। 
শশিমুখী মানে কি খরগোশের মতো মুখ?
না।
মুখ থেকে মুখী। শশী আর মুখী মিলে শশিমুখী (শশী+মুখী)।
তাহলে শশিমুখী শব্দের অর্থ হয়—   খরগোশের মতো মুখ যে রমণীর।
এটি শাব্দিক অর্থ।  খরগোশ অর্থ শশী আবার চন্দ্র অর্থও শশী। তাই এখানে শশীমুখী অর্থ খরগোশের মতো মুখবিশিষ্টা নয়। এর অর্থ— চন্দ্রের মতো মুখবিশিষ্টা,  চন্দ্রবদনা। এটি স্ত্রীবাচক শব্দ।  রমণীর মুখকে চাঁদের মতো কল্পনা করে সুন্দরী রমণীদের বলা হয় শশিমুখী।
  যে রমণী শশী অর্থ খরগোশ জানে, কিন্তু প্রতিশব্দ যে চাঁদ তা জানে না তাকে শশিমুখী বললে কী হবে?
 মেয়ে, তুমি বেশি কথা বলো।
কল্পনা করে শশ শব্দের একটি অর্থ চন্দ্রকলা
 “যে সর্বদা আত্মগোপন বা নিজেকে লুকিয়ে রাখার মনোবৃত্তিতে ভোগে” তাকে এককথায় কী বলা হয়?
শশবৃত্তি।
কারণ?
খরগোশ সর্বদা আত্মগোপন করার মনোবৃত্তি পোষণ করে। তাই খরগোশের মতো আত্মগোপন করার মনোবৃত্তিকে এককথায় শশবৃত্তি বলা হয়। উচ্চারণ শশোবৃত্‌তি। এটি তৎসম শব্দ এবং বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
অনুরূপ: খরগোশের মতো অত্যন্ত চঞ্চল ও ব্যস্ত-সমস্ত ব্যক্তিকে বলা হয় শশব্যস্ত। শষবিষাণ অর্থ খরগোশের শিং-এর মতো আজগুবি বস্তু, আকাশ-কুসুম কল্পনা।
জানা অজানা অনেক মজার বিষয়: https://draminbd.com/?s=অজানা+অনেক+মজার+বিষয়
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
আমি শুবাচ থেকে বলছি
error: Content is protected !!