শহিদ মিনার শহিদ দিবস

দেশের প্রথম শহিদ মিনার
১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী জেলায় রাজশাহী কলেজের নিউ হোস্টেল প্রাঙ্গণে রাতের বেলা দেশের প্রথম শহিদ মিনার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫২ খৃষ্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে পুলিশ শহিদ মিনারটি গুড়িয়ে দেয়।

প্রতিকি শহিদ মিনার (দ্বিতীয় শহিদ মিনার)
১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি নির্মিত ‘শহিদ স্মতিস্তম্ভ¢’ যে স্থান হতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অপসারণ করেছিল ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ২১ শে ফেব্রুয়ারি সেস্থানে কাগজ দিয়ে প্রথম শহিদ স্তম্ভের অনুরূপ একটি শহিদ মিনার তৈরি করা হয়। এ শহিদ মিনারটিতে ফুল দিয়ে প্রথম শহিদ দিবস পালন করা হয়। শহিদ মিনারের স্থানটি কালো কাপড়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল। বর্তমান শহিদ মিনার প্রতিষ্ঠার পূর্বে ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিন বছর কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা স্থানটি ভাষা শহিদদের স্মরণে নির্মিত প্রথম অনানুষ্ঠানিক শহিদ মিনার। ওই তিন বছর প্রতিকি মিনারকে কেন্দ্র করে শহিদ দিবস পালিত হয়।

তৃতীয় শহিদ মিনার
১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি আবেগঘন পরিবেশে প্রথম শহিদ দিবস পালন করা হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বিলুপ্ত ‘শহিদ স্মৃতিস্তম্ভে’র জায়গায় কাগজ ও কালোকাপড় দিয়ে প্রতীকী শহিদ মিনার তৈরী করা হয়। একই দিন কার্জন হলেও অনুরূপভাবে কাগজ ও কাপড় দিয়ে সাড়ে তিন ফুট উঁচু একটি প্রতীকি শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করে শহিদ দিবস উদযাপন করা হয়েছিল। এটি দেশের তৃতীয় শহিদ মিনার। ঢাকা কলেজের ছাত্রছাত্রীরা একই দিন শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ, ইডেন কলেজের অধ্যক্ষা ও ঢাকা কলেজের উর্দুর অধ্যাপক আহসান আহমদ আশ্কের বাঁধার কারণে নির্মাণ করা যায় নি।
সরকারিভাবে শহিদ মিনার নির্মাণের সিদ্ধান্ত ও ভিত্তি-প্রস্তর স্থাপন
মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকারের আমলে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি পূর্তমন্ত্রী আবদুস সালাম মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহিদ মিনার নির্মাণের স্থান নির্বাচন ও ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের ব্যবস্থা পরিদর্শন করে অবিলম্বে একটি পরিকল্পনা পেশ করার জন্য প্রধান প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেন। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২১ শে ফেব্রুয়ারি পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার শহিদ মিনারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। আবু হোসেনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর জনগণ প্রবল আপত্তি তোলে। এ অবস্থায় ভাষা আন্দোলনের শহিদ রিক্সাচালক আউয়ালের ৬ বছর বয়সি কন্যা বসিরনকে দিয়ে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে অনানুষ্ঠানিকভাবে শহিদ মিনারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করান।

আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন
১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২০ শে ফেব্রুয়ারি রাতে বসিরনকে দিয়ে শহিদ মিনারের অনানুষ্ঠানিক ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করার পরদিন অর্থাৎ ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার এককভাবে শহিদ মিনারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন জনগণ স্বাভাবিকভাবে নেবে না জানতে পেরে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টায় পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগের তৎকালীন সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং শহিদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগমকে নিয়ে শহিদ মিনারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।

নির্মাণ-পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ
আবু হোসেন সরকারের আমলে শহিদ মিনার নির্মাণের পরিকল্পনা প্রণয়ন বা বাস্তবায়নের কাজ অগ্রসর হয়নি। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খান পূর্ব বাংলায় প্রথম আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করার পর চিফ ইঞ্জিনিয়ার এম এ জব্বারকে শহিদ মিনার নির্মাণের দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

সরকারিভাবে নির্মিত প্রথম শহিদ মিনার
শহিদ মিনার স্থাপনের জন্য নকশা আহবান করা হয়। প্রকৌশলী এম এ জব্বার ও শিল্পী জয়নুল আবেদিন শিল্পী হামিদুর রহমানকে শহিদ মিনারের জন্য একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের অনুরোধ জানান। শিল্পী হামিদুর রহমান শহিদ মিনারের একটি মডেল, বায়ান্নটি নকশা ও পরিকল্পনার কাগজ পেশ করেন। অন্যান্য স্থপতিরাও নকশা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। গ্রিক স্থপতি ডক্সিডায়েস, চিফ ইঞ্জিনিয়ার এম এ জব্বার এবং শিল্পী জয়নুল আবেদীন সমন্বয়ে গঠিত নির্বাচক কমিটি শিল্পী হামিদুর রহমানের পরিকল্পনা অনুসারে অঙ্কিত নকশাটি অনুমোদন করেন। ওই নকশা অনুসারে ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে শহিদ মিনার নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে আতাউর রহমান সরকারের পতন ঘটলে শিল্পী হামিদুর রহমানকে শহিদ মিনার নির্মাণের দায়িত্ব হতে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অক্টোবর মাসে সামরিক আইন জারি হওয়ার পর শহিদ মিনার নির্মাণের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত শহিদ মিনারের জন্য নির্মিত অসম্পূর্ণ বেদীটিই ছিল সরকারিভাবে নির্মিত দেশের প্রথম শহিদ মিনার।

শহিদ মিনার নির্মাণ কাজ সম্পন্ন কমিটি
১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল আজম খান শহিদ মিনারের নির্মাণ কাজ শেষ করার বিষয়ে সুপারিশ করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মাহমুদ হোসেনকে সভাপতি এবং অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীকে সদস্য-সচিব করে চৌদ্দ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে ড. মমতাজউদ্দিন আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, ড. মোহাম্মদ এনামুল হক, ড. কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই, ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, বাংলা একাডেমীর পরিচালক সৈয়দ আলী আহসান, ইসলামিক একাডেমির পরিচালক আবুল হাশিম প্রমুখ অন্যতম। কমিটিকে ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের ১ মে এর মধ্যে শহিদ মিনার নির্মাণ সম্পর্কে সুপারিশমালা পেশ করতে বলা হয়। কমিটি, শিল্পী হামিদুর রহমানের নকশাটির মূল মডেলের ভিত্তিতে সহজ ও ছোট আকারে একটি শহিদ মিনার নির্মাণের সুপারিশ করেন। সুপারিশ অনুযায়ী ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি শহিদ মিনার নির্মাণের কাজ স¤পন্ন করা হয়। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ আবুল বরকতের বাহাত্তর বছর বয়স্কা মা হাসিনা বেগমকে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শহিদ মিনারটি উদ্বোধন করা হয়। ১৯৬৩ হতে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত নয় বছর এ শহিদ মিনারে কেন্দ্রীয়ভাবে শহিদ দিবস পালন করা হয়।

প্রথম শহিদ দিবস উদযাপন
সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের উদ্যোগে ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ২১ শে ফেব্রুয়ারি, শনিবার প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে শহিদ দিবস উদযাপিত হয়। শহিদ দিবসে রাজধানীতে আড়াই মাইল দীর্ঘ শোভাযাত্রা বের হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে ১৯ ও ২০ শে ফেব্রুয়ারি রোজা রাখার সিদ্ধান্ত হয়। শান্তিপূর্ণভাবে শহিদ দিবস উদ্যাপনের লক্ষ্যে ২৫শে নম্বর সোয়ারিঘাটে কর্মপরিষদের সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়। তাছাড়া ৯৪, নওয়াবপুর রোড, ১নং মৌলভি বাজার, জগন্নাথ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি স্থানেও কেন্দ্র স্থাপিত হয়। মিছিল শেষে আর্মানিটোলা ময়দানে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের আহবায়ক আতাউর রহমান খান সভাপতিত্ব করেন। এ বছর হতে প্রভাতফেরি, নগ্ন-পদযাত্রা এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কালো পতাকা উত্তোলন করার রেওয়াজ চালু হয়। আজিমপুর গোরস্থানে শহিদ আবুল বরকত এবং শফিউর রহমানের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। সন্ধ্যায় ব্রিটানিয়া সিনেমা হলে আবদুল লতিফের সুরে ও পরিচালনায় আবদুল গাফফার রচিত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি পরিবেশন করা হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম শহিদ দিবস ও শহিদ মিনার
১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ শে মার্চ হতে ৩০ শে মার্চ তারিখের মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারী গোলাবর্ষণ করে শহিদ মিনারের স্তম্ভগুলো ধ্বংস করে দেয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ শে ফেব্রুয়ারি কোনোরূপ নির্মাণ কাজ স¤পাদন ব্যতিরেকে শহিদ মিনারের ধ্বংসস্তূপের উপর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম শহিদ দিবস উদযাপন করা হয়।

শহিদ মিনার পুনঃনির্মাণ কমিটি-১৯৭২
১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে রাষ্ট্রপতি আবু সায়ীদ চৌধুরীকে সভাপতি করে শহিদ মিনার পুনঃনির্মাণের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি স্থপতিদের কাছ হতে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে নকশা ও পরিকল্পনা আহবান করেন। শিল্পী হামিদুর রহমান স্থপতি ছিলেন না, তাই তিনি স্থপতি এম এস জাফরের সঙ্গে মিলিতভাবে একটি সংস্থা গঠন করে কমিটির কাছে নকশা ও পরিকল্পনা পেশ করেন। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই মে স্থপতি এম এস জাফর ও শিল্পী হামিদুর রহমান উপস্থাপিত নকশা চূড়ান্তভাবে অনুমোদন ও গ্রহণ করা হয়। সরকার ও উপস্থাপক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি খসড়া চুক্তি স¤পাদন হয়েছিল। চুক্তিটি ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর পূর্ত সচিবের কাছে পেশ করা হয়। কিন্তু পূর্ত বিভাগের অবহেলার কারণে চুক্তি অনুসারে কার্য স¤পাদন করা সম্ভব হয়নি।

বর্তমান শহিদ মিনার : পটভূমি
স্থপতি জাফর ও শিল্পী হামিদুর রহমান উপস্থাপিত নকশাকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সিএন্ডবি বিভাগ ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে কোনো পরিকল্পনা ব্যতিরেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ধ্বংস করা শহিদ মিনারটির স্তম্ভগুলো তড়িগড়ি মেরামত করে দেয়। মিনারের স্তম্ভগুলো মূল শহিদ মিনারের স্তম্ভ¢গুলোর মতো হয়নি। এগুলো উচ্চতায় খাটো এবং সামনের দিকে সামঞ্জস্যহীনভাবে বেশি ঝুকে পড়ে। এরশাদের আমলে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের মূলমঞ্চ এবং স্তম্ভ¢গুলো অক্ষুণœ রেখে সামনের তিন দিকের চত্বরের সংস্কারসহ সামনের রাস্তাটি ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। শহিদ মিনার এখনও সেভাবে রয়েছে। বর্তমান শহিদ মিনারের চেয়ে স্বাধীনতাপূর্ব শহিদ মিনার অনেক বেশি সুন্দর, অর্থবহ এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

শহিদ দিবসীহীন বছর
১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দ হতে প্রতিবছরই শহিদ দিবস অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে ২১ শে ফেব্রুয়ারির পরবর্তী মাস হতে যুদ্ধ শুরু হয় কিন্তু পরবর্তী শহিদ দিবস পালনের পূর্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়।

error: Content is protected !!