শালা, বাংলা সাহিত্যে শালা, শালা বৃত্তান্ত, শ্বশুরশালা ও শালাশালা

ড. মোহাম্মদ আমীন

শালা, বাংলা সাহিত্যে শালা, শালা বৃত্তান্ত, শ্বশুরশালা ও শালাশালা

শালা কত প্রকার ও কী কী
শালাকরণ অনুযায়ী শালা প্রধানত পাঁচ প্রকার। যথা: .আইনগত শালা; ২.গালিগত শালা, ৩.বন্ধুগত শালা, ৪.স্থানগত শালা, ৫.অধ্যয়নগত শালা এবং ৬. বিবিধগত শালা। তবে কোনো কোনো শালাবিদ বলেন, শালা প্রধানত পাঁচ প্রকার। তাঁদের মতে, অধ্যয়নগত শালা মূলত স্থানগত শালার অন্তর্ভুক্ত।শালার, শালার মধ্যেও মতভেদ!

১. আইনগত শালা বা শ্যালক শালা: সংস্কৃতে এই শালা শ্যালক নামে পরিচিত। শ্যালক (শ্যাল+ক) অর্থ— পত্নীর ভ্রাতা। এরা একজাতীয় মনুষ্য-সন্তান। সহজ কথায় শ্বশুরাব্বার সন্তান। ইংরেজিতে বলা হয় ব্রাদার-ইন-ল (Brother-in-law)। অর্থাৎ, বউয়ের ছোটো ভাই যেনতেন শালা নয়, রীতিমতো আইনগত শালা। বউয়ের মন পেতে হলে একে আদর না করে উপায় নেই।যদি প্রেম করে বিয়ে করা হয় এবং শালা দিয়ে প্রেমপত্র আদানপ্রদান হয়ে থাকে— তাহলে আইনগত শালার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। তবে মোবাইলের মাধ্যমে এসএমএস দিয়ে আধুনিক প্রেম ভাবীশালাদের গুরুত্ব অনেক কমিয়ে দিয়েছে।

শিক্ষক বললেন, ‘ব্রাদার ইন ল গো হোম’ অর্থ কী?
ছাত্র বলল, ভাই, এগিন লই বাড়ি যা।

২. গালিগত শালা: গালিগত শালা সর্বসাধারণ। এ জাতীয় শালা গালি দিয়ে বানানো যায়। তাই যে-কেউ যে-কোনো সময় গালি শালা হয়ে যেতে পারে। এই বিধির মাধ্যমে যখন তখন যে-কাউকে, এমনকি নিজেকে নিজেও শালা বানিয়ে ফেলা যায়।মজার বিষয় হলো, কেউ স্বীকার করুক বা না করুক— পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেকটি পুরুষ কোনো না কোনোভাবে এই শালার শ্রেণিভুক্ত। এই বিধির মাধ্যমে বাপকেও শালা বানিয়ে ফেলা যায়। যেমন: “আমার বাপশালাটা আস্ত কিপটে, শালা টাকা দিতে চায় না।” আবার অনেক বাপও তারা ছেলেকে ডাকে শালা।পিতা মোহসন তার স্ত্রীকে তাঁদের সন্তান সম্পর্কে বলছেন,“শালার পুত শালা একটা কথা শুনে না।” এই বাক্যে মোহসীন সাহেব শুধু ছেলেকে নয়, নিজেকেও শালা বানিয়ে ফেলেছেন।

শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে এমপি সাহেব বললেন, শালা কান ধর।
শ্যামল কান্তি বললেন, আমি হিন্দু, আপনি মুসলমান, কীভাবে আপনার শালা হই। আপনার বউকে তো জীবনে দেখিনি।
এমপি সাহেব বললেন, চুপ শালা, গালিতে কুকুরও শালা হয়। কান ধর শালা। শালা, জীবনে অনেক ছাত্রছাত্রীকে কান ধরাইছস।

৩. বন্ধুগত শালা বা বন্ধু শালা: বউয়ের ভাই কিংবা গালি ছাড়াও আর একপ্রকার মনুষ্য শালা আছে। যাকে বলা হয় আদরগত শালা। এক বন্ধু আর বন্ধুকে নিজেদের মধ্যে শালা সম্বোধন করে থাকে। এরা কাউকে ছাড়ে না, এমনকি নিজেকেও। আদর করে ডাকে: ধ্যাৎ শালা। অশিক্ষিতের চেয়ে শিক্ষিতদের মধ্যে এমন বন্ধু শালা বানানোর প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
এই শালা, বিসিএস-এর পূর্ণ রূপ কী? এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বলল।
শালার শালা, এই সহজ প্রশ্নটা জানস না; বাংলাদেশ কুকিং সার্ভিস।
ধ্যাৎ শালা, হয়নি।
কী?
শিক্ষকশালা কী যেন বলেছিলেন, শালার মনে পড়ছে না রে।
চল শালা, সিগারেট খাব।
সিগারেট খাবি? শালার পকেট তো আমার গড়ের মাঠ। দোকানি শালা তো আর বাকি দিতে চাই না।

৪. স্থানগত শালা বা মওজুদ শালা: এই শালা মানুষ নয়, স্থান। কোনো বস্তু বা ব্যক্তি-প্রাণী প্রভৃতি মওজুদ রাখার স্থানকে আদর করে শালা ডাকা হয়। কারণ, আইনগত শালার মতো স্থানগত শালাতেও মজা আছে। যেমন: ছাগলশালা, রন্ধনশালা, হস্তিশালা, গোশালা, কামারশালা, চাকরশালা, পশুশালা ইত্যাদি। এরা শালা, তবে বউয়ের ছোটো ভাই নয়।
সূত্র: বাংলা ভাষার মজা, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
.

শ্বশুরশালা

আমার শ্বশুরশালা পুড়ে গেছে পুরো হঠাৎ আগুন লেগে।আমি কিন্তু শ্বশুরকে ‘শালা’ বলছি না। অত বেআক্কেল আমি নই। ‘শালা’ মনে পত্নীর ভাই নয় কেবল। এছাড়াও আরও অনেক শালা আছে। এই যেমন: অতিথিশালা, অশ্বশালা, কর্মশালা, কামারশালা, গোশালা, ছাগলশালা, দাসশালা, পাঠশালা, মহিষশালা, রন্ধনশালা, শূকরশালা, অতিথিশালা…। এসব ‘শালা’-র কেউ পত্নীর ভাই নয়। এই শালারা হচ্ছে গিয়ে: বাড়ি, আলয়। ঠিক তেমনি ‘শ্বশুরশালা’ মানে শ্বশর বাড়ি, শ্বশুরের আলয়। ‘পাঠশালা’ পাঠের শালা নয়, পাঠের ঘর। অনুরূপ শালাশালা। এর মানে শ্বশুরের সন্তান আর স্ত্রীর পত্নীর ছোটে ভাইয়ের বাড়ি।
.
শালাশালা মানে শ্বশুরশালা মানে শ্বশুরবাড়ি
অভিধানে শালা শব্দের দুটি পৃথক ভুক্তি রয়েছে। সংস্কৃত ‘-শালা [√শল্+অ+আ (টাপ্)] ’ অর্থ (বিশেষ্যে) আলয়, বাড়ি, স্থান, ঘর, কক্ষ, কারখানা, ভান্ডার, সঞ্চয়স্থান। এসব বিষয়ের সামষ্টিক অর্থ প্রকাশপূর্বক বিশেষ্যকে বিশেষভাবে দ্যোতিত করার জন্য শব্দের শেষে ‘-শালা’ যুক্ত হয়। যেমন: পাঠশালা, গোশালা, কামারশালা, পণ্যশালা, কর্মশালা, শূকরশালা, চাকরশালা, হস্তিশালা, বন্দিশালা ইত্যাদি। নজরুল লিখেছেন:
“যত সব বন্দিশালা আগুন জ্বালা ফেল উপড়ি
কারার ওই লৌহ কপাট।”
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত শ্যালক থেকে উদ্ভূত খাঁটি বাংলা শালা অর্থ (বিশেষ্যে) স্ত্রীর ছোটোভাই, সম্বন্ধী; গালিবিশেষ। বাংলা শালা আর সংস্কৃত -শালা মিলিয়ে দিলে হয় শালাশালা (শালার শালা)। অর্থ শালা-নিবাস, যেখানা শালারা থাকে; মানে শ্বশুরবাড়ি। সংস্কৃত ‘-শালা’ শ্বশুর-এর সঙ্গে যুক্ত হলে হয়: শ্বশুরশালা। শব্দটি শ্বশুরকে শ্যালক বলছে না। এটি প্রকাশ করছে শ্বশুরশালা মানে শ্বশুরের শালা বা শ্বশুরের বাড়ি অর্থাৎ শ্বশুরবাড়ি। পাঠাশালার কাজ শেষ করে তিনি কেলিকুঞ্চিকার সঙ্গে দেখা করার জন্য শালাশালায় গেলেন। তার শালাশালার পাশে বিশাল এক কামারশালা।
কেলিকুঞ্চিকা অর্থ: শ্যালিকা।
.
-শালা বৃত্তান্ত
সংস্কৃত ‘-শালা’ অর্থ বিশেষ্যে— আলয়, বাড়ি, স্থান, ঘর, কক্ষ, কারখানা, ভান্ডার, সঞ্চয়স্থান প্রভৃতি। এসব বিষয়ের সামষ্টিক অর্থ প্রকাশপূর্বক বিশেষ্যকে বিশেষভাবে দ্যোতিত করার জন্য শব্দের শেষে ‘-শালা’ যুক্ত হয়। সুতরাং, এই ‘-শালা’ কারও প্রিয়তমা পত্নীর আদুরে ভ্রাতা নয়। যেমন: পাঠশালা, গোশালা, কর্মশালা,শূকরশালা ইত্যাদি।
‘-শাল’, ‘-শালা’র সমার্থক। কোথায় ‘-শালা’ আর কোথায় ‘-শাল’ হবে এর কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। পাণিনিও কিছু বলে যাননি। অনেক বৈয়াকরণ ও সাহিত্যিক, স্ত্রী-প্রত্যয়জ্ঞাপক বিশেষ্যে পুরুষবাচক ‘-শাল’ অধিক ব্যবহার করেছেন।
সাধারণত কোনো শব্দের শেষ বর্ণে আ/ই ধ্বনি থাকলে অ-কারন্ত ‘-শাল’ বেশি লেখা হয়। যেমন: ঘোড়াশাল, হাতিশাল, হস্তীশাল, পক্ষিশাল, কাষ্ঠশাল, প্রাক্ষলনশাল, ময়ূরশাল, বিবিশাল। ব্যতিক্রম: টাঁকশাল। সংশ্লিষ্ট শব্দের শেষে অ/ও ধ্বনি থাকলে ‘-শালা’ বেশি দেখা যায়। যেমন: পাঠশালা, গোশালা, কর্মশালা, ছাগলশালা, মহিষশালা, রন্ধনশালা, দাসশালা, শূকরশালা, অতিথিশালা
তবে ধনদৌলত অ-কারন্ত হলেও চাঁদ-ধরিত্রীর মতো নারীবাচক মনে করে অ-কারান্ত ‘-শাল’ যুক্ত করা হয়। যেমন: টাঁকশাল, ধনশাল, ভান্ডারশাল প্রভৃতি।
তবে এগুলো কোনো ব্যাকরণিক বিধি নয়, প্রচলন মাত্র। এর পরিবর্তন বা ব্যতিক্রম দূষণীয় হবে না।
সূত্র: নিমোনিক বাংলা বানান অভিধান, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

Leave a Comment

You cannot copy content of this page

poodleköpek ilanlarıankara gülüş tasarımıantika alanlarPlak alanlarantika eşya alanlarAntika mobilya alanlarAntika alan yerlerpoodleköpek ilanlarıankara gülüş tasarımıantika alanlarPlak alanlarantika eşya alanlarAntika mobilya alanlarAntika alan yerler
Casibomataşehir escortjojobetbetturkeyCasibomataşehir escortjojobetbetturkey