শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

ড. মোহাম্মদ আমীন

সংযোগ: https://draminbd.com/শুদ্ধ-বানান-চর্চা-প্রমিত-4

সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

পর্যবেক্ষণ পরিশীলন ও তত্ত্বাবধান

অধ্যাপক হায়াৎ মামুদ

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক

অধ্যপক মিজানুর রহমান খান

(খসড়া)

সূচি

 দ্বিতীয় অধ্যায়

 বানানে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার কৌশল

 তৃতীয় অধ্যায়

সমাস

চতুর্থ অধ্যায়

বহুবচন পদের ব্যবহার

  পঞ্চম অধ্যায়

কিছু পরিবর্তিত বানান

 ষষ্ঠ অধ্যায়

ধাতু ধাতুরূপ

সপ্তম অধ্যায়

ক্রিয়াপদের সূচনায় এবং

অষ্টম অধ্যায়

ভুল সংশোধন

নবম অধ্যায়

কী লিখবেন এবং কী লিখবেন না

 দশম অধ্যায়

ণত্ববিধি ও নত্ববিধি 

একাদশ অধ্যায়

ষত্ববিধান

দ্বাদশ অধ্যায়

একাধিক বানান শুদ্ধ হলে যেটি লিখবেন

ত্রয়োদশ অধ্যায়

দুষ্ট বানান

চতুর্দশ অধ্যায়

যতিচিহ্নের ব্যবহার

পঞ্চদশ অধ্যায়: পরিশিষ্ট

বাংলা একাডেমি প্রমিত বানান-বিধি

উৎসর্গ

শুবাচি (শুদ্ধ বানান চর্চা গোষ্ঠীর সদস্যবর্গ)

ভূমিকা

‘শুদ্ধ বানান চর্চা প্রমিত (শুবাচ) বানানবিধি’ নতুন কোনো বানানবিধি নয়। বাংলা একাডেমি প্রণীত প্রমিত বানানবিধির সহজ এবং বোধগম্য বর্ণনার কৌশলই শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি। শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ), শুদ্ধ বাংলা চর্চা এবং তার প্রচার ও প্রসারে নিবেদিত সাত লক্ষাধিক প্রাজ্ঞ সদস্যের একটি সক্রিয় গ্রুপ। যারা সারাদেশে শুবাচি নামে পরিচিত। শুবাচ সারাবিশ্বে শুদ্ধ বাংলা চর্চার সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান। এই গ্রুপে প্রতিদিন বাংলা বানান ও বাংলা ভাষাবিষয়ক অনেক  যযাতি প্রকাশিত হয়। প্রত্যহ হাজার হাজার শুবাচি এসব যযাতির আলোচনা-পর্যালোচনা অংশগ্রহণ করে বৌদ্ধিক মন্তব্য করেন।

শুবাচগ্রুপের উপদেষ্টা এবং বৈয়করণগণ দীর্ঘ চার বছর অবধি শিক্ষিত বাংলাভাষী শুবাচিগণের মাতৃভাষাজ্ঞান  পর্যবেক্ষণ করে  বাংলা বানানে তাঁদের কোথায় ভুল হয় এবং কেন হয় আর তা কীভাবে দূরীভূত করা যায় প্রভৃতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। সেই পর্যবেক্ষণের আলোকে বাংলাভাষীর ভুলগুলো সংশোধনের লক্ষ্যে বিধিটি প্রণয়ন করা হয়। যার আলোকে রচিত হয়েছে: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, প্রকাশক পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.।

শুবাচের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে আমি ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে কাজ করে আসছি। শুবাচের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. মোহাম্মদ আমীনের নেতৃত্বে শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) বাংলা বানান চর্চায় যে ভূমিকা রেখে চলেছেন তা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এমন একটি সংগঠনের  উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করার সৌভাগ্য আমার গর্বের বিষয়। আমি ড. মোহাম্মদ আমীন. শুবাচের উপদেষ্টা পরিষদ এবং কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যবৃন্দ-সহ সকল শুবাচির প্রতি শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তাঁরা সম্মিলিতভাবে বাংলা ভাষার প্রচার-প্রসারে যে ব্যতিক্রমধর্মী ও কার্যকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই কাজ কোনো প্রাত্ষ্ঠিানিক স্বীকৃতির ধার ধারে না। ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই মহৎ উদ্যোগকে স্মরণীয় করে রাখবে।

কালজয়ী উদ্যোগ আর  কার্যকর গবেষণার মাধ্যমে ‘শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি’ শুদ্ধ বাংলা চর্চায় একটি মাইল ফলক হয়ে থাকবে।

 অধ্যাপক  হায়াৎ মামুদ, প্রধান উপদেষ্টা

অধ্যাপক  আবুল কাসেম ফজলুল হক

 

প্রথম অধ্যায়

শুদ্ধ বানান চর্চা  প্রয়োজনীয় কিছু বানানবিধি

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা হলেও নানা কারণে বানানে ভুল হয়। এ ভুলের অন্যতম কারণ অধ্যয়নের ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় চর্চার অভাব। মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন, নিয়মিত চর্চা এবং বাংলা অভিধান দেখার মনোবৃত্তি গড়ে তোলার মাধ্যমে বানান ভুল বহুলাংশে দূর করা যায়। কিন্তু অনেকের পক্ষে তা সম্ভব হয় না। শুদ্ধ বানান চর্চা গ্রুপের বিভিন্ন যযাতি থেকে বাংলা বানান ভুলের যেসব বৈশিষ্ট্য আমাদের চোখে পড়েছে সেসব ভুল উল্লেখপূর্বক সংশোধিত রূপ নিচে দেওয়া হলো। বাংলা একাডেমি প্রমিত বানানবিধির আলোকে এটাই হচ্ছে শুবাচ বানানবিধি।

১. বাক্যে ‘ও’ বর্ণের অবস্থান: কখন সেঁটে কখন ফাঁক

বাক্যে ‘ও’ বর্ণের অর্থ  ‘এবং’ নির্দেশ করলে কিংবা বর্ণটি যখন সংযোজক অব্যয় হিসাবে কাজ করে তখন ‘ও’  পদটি অন্য কোনো পদের সঙ্গে সেঁটে বসবে না, পৃথক বসবে। যেমন: রুমেল ও জামাল দুই ভাই। তবে ‘ও’ যখন ‘আরও, এরপর’ প্রভৃতি অর্থ প্রকাশ করে তখন এটি অন্য শব্দের সঙ্গে সেঁটে বসে। যেমন:  (ক) জামালের সঙ্গে কামালও বাজারে যাবে। (খ) শুধু ধন থাকলে হবে না; মনও থাকা চাই। (গ) আজও তুমি এলে না। (ঘ) আরও আরও দাও। (ঙ) আমিও পথের মতো হারিয়ে যাব, আমিও নদীর মতো আসব না ফিরে – – – (শিল্পী হেমন্ত)। (চ) তুমিও কি একটুও হারনি– (শিল্পী মান্না দে)

২. ক্রিয়াপদে ‘ও-কার’ 

সাধারণ মধ্যম পুরুষের (তুমি/তোমরা) বর্তমান কালের রূপের (কর/ধর/বল) সঙ্গে বর্তমান অনুজ্ঞার রূপের (করো/ধরো/বলো) পার্থক্য স্পষ্ট করার জন্য বর্তমান অনুজ্ঞার রূপে ক্রিয়াপদের শেষে ‘ও-কার’ বিধেয়। যেমন: (ক) তুমি এখন কী কর? (সাধারণ বর্তমান) (খ) কাজটা এক্ষুনি করো (বর্তমান অনুজ্ঞা)। সাধারণ-বর্তমান অনুজ্ঞার সঙ্গে পার্থক্য নির্দেশের জন্যও সাধারণ-মধ্যম পুরুষের বর্তমান-অনুজ্ঞার রূপের সঙ্গে ও-কার প্রয়োগ বিধেয়। যেমন :  তুমি/তোমরাবসো, চলো, বলো, করো, ধরো, পড়ো প্রভৃতি।

হল না কি হলো?
গেল না কি গেলো?
করব না কি করবো?
করছ না কি করছো?
করত না কি করতো?
হব না কি হবো?
অভিধান দেখলে বুঝতে পারবেন ক্রিয়াপদের শেষে ও-কার নেই। অতএব, উচ্চারণে এলেও ক্রিয়াপদের শেষে ও-কার বিধেয় নয়। লিখুন: করব, করত, করছ, করছিল, করেছিল, খাব, যাব, নেব, পাব, দেব, হব ইত্যাদি।  তবে ও-কার না দিলে যেসব ক্রিয়াপদের ক্ষেত্রে বাক্যের অর্থ বিভ্রাটের আশঙ্কা থাকে সেসব ক্ষেত্রে ও-কার বিধেয়। যেমন—
‘হল’ বলতে হল (hall)ও বোঝায়, তাই ‘হইল’ ক্রিয়ার চলিত রূপ ‘হলো’ লেখা হয়।‘হত’ বলতে নিহতও বোঝায়, তাই ‘হইত’ ক্রিয়ার চলিত রূপে ‘হতো’ লেখা হয়। ‘করাত’ শব্দের একটি অর্থ— গাছ কাটার যন্ত্রবিশেষ।তাই অর্থ বিভ্রাট এড়ানোর জন্য ‘করাইত’ ক্রিয়ার চলিত রূপে ‘করাতো’ লেখা হয়।
 
অনুজ্ঞাবাচক ক্রিয়াপদে ও-কার ব্যবহার । যেমন:
‘কর’ বলতে কর্, করো, কোরো— তিনটাই বোঝায়।
ধরো শব্দ দিয়ে ধর, ধরো, ধোরো— তিনটি কথাই প্রকাশ করে। কোনটি হবে? তা নির্ভর করে বাক্যের ওপর। কিন্তু বুঝবেন কীভাবে?
ক) তুচ্ছার্থক ক্রিয়াপদের শেষে আগে হসন্ত দেয়া হতো। যেমন— তুই কাজটি কর। আমার সাথে চল্। কথাটি কী বল্। চোরটাকে ধর্‌। এখন কিন্তু হসন্ত দেওয়া হয় না।
খ) তুমি হলে তৎক্ষণাৎ নির্দেশের ক্ষেত্রে ও-কার বিধেয়। যেমন— এক্ষুনি আমার সঙ্গে চলো। কথাটা কী বলো। এখনই কাজটি করো। পড়তে শুরু করো।
গ) তুমি-এর ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ নির্দেশের ক্ষেত্রে দুটো ও-কার ব্যবহার করা হয়। যেমন— এক মাসের মধে কাজটি কোরো। খাওয়ার পর ঘটনাটা বোলো।

৩. ‘দু’ এবং ‘দূ’

কোথায় ‘দু’ হবে আর কোথায় ‘দূ’ হবে এ জটিলতা অনেক সময় বানান ভুলের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শুবাচের যযাতিতে এরূপ ভুল প্রায়শ দেখা যায়। আমরা জানি, দূরত্ব লিখতে ‘দূ’ লাগে। তাই যেসব শব্দে দূরত্ব বোঝায় না সেসব শব্দে উ-কার যোগে ‘দুর’ (উপসর্গ) বা ‘দু +র/রেফ’ হবে। যেমন: দুরবস্থা, দুরন্ত, দুর্বার, দুরাকাঙ্ক্ষা, দুরারোগ্য, দুরূহ, দুর্গা, দুর্গতি, দুর্গ, দুর্দান্ত, দুর্নীতি, দুর্যোগ, দুর্ঘটনা, দুর্নাম, দুর্ভোগ, দুর্দিন, দুর্বল, দুর্জয়, দুঃসময় ইত্যাদি। যেসব শব্দে দূরত্ব বোঝায় সেসব শব্দে ঊ-কার যোগে ‘দূর’ হবে। যেমন: দূর, দূরবর্তী, দূরদূরান্তর, দূরালাপন, দূরীকরণ, অদূর, দূরত্ব, দূরবীক্ষণ, দূরাগত, দূরদৃষ্টি ইত্যাদি।  দূর দ্বীপবাসিনী চিনি তোমারে চিনি (নজরুল)।

৪. ‘আস্ত-ত’ ও খণ্ড-ত

বিদেশি শব্দের বাংলা বানানে সর্বদা ‘আস্ত-ত’ বসবে; খণ্ড-ৎ নয়। তৎসম শব্দের বানানে ‘ত’ ও ‘খণ্ড-ৎ’ উভয়ের ব্যবহার আছে। তবে বিদেশি শব্দের বানানে কোথাও ‘খণ্ড-ৎ’ হবে না। সবসময় ‘আস্ত-ত’ ব্যবহৃত হবে। যেমন: আখেরাত, আদালত, আমানত, আয়াত, কিসমত, কুদরত, কেয়ামত, কৈফিয়ত, খেসারত, জালিয়াত, তফাত, তবিয়ত, দস্তখত, দৌলত, নসিহত, ফেরত, বজ্জাত, বেহেশ্ত, মওত, মজবুত, মতলব, মেহনত, শরবত, শরিয়ত, শাহাদত, সওগাত, সুন্নত, হিম্মত, হেফাজত প্রভৃতি।

৫. বিশেষণ পদ লেখার নিয়ম

বিশেষণ পদ সাধারণত সংশ্লিষ্ট পদ থেকে নিজেকে ফাঁক রেখে বসে। কোনো পদের পূর্বে বিশেষণ বসানো প্রয়োজন হলে কাঙ্ক্ষিত বিশেষণটি পরবর্তী পদের সঙ্গে যুক্ত না-করে পৃথক রাখা সমীচীন। যেমন: নীল আকাশ, জ্যোৎস্না রাত, লাল শাড়ি, পাকা বাড়ি। তবে বিশেষ্যের সঙ্গে যে বিশেষণ বসানো হয় তার কোনো বিশেষণ থাকলে পদদ্বয় একত্রে বসানো যায়। যেমন: বিশ্বসুন্দরী, রক্তলাল, দুগ্ধধবল,  শ্বেতহস্তী ইত্যাদি। তবে ফাঁক রেখে লিখলেও দূষণীয় হবে না। বাংলায় সমাসবদ্ধ পদ ফাঁক রেখে এমন বাক্য হিসেবেও লেখার ব্যাকরণিক বিধান রয়েছে। যেমন: বিজয় দিবস,  যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, স্বাধীনতা দিবস। যে শব্দ বা পদ সমাসবদ্ধ, কিন্তু ধ্বনিগত পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বিশেষ গঠনের ফলে সমাসবদ্ধ পদ কি না সহজে বোঝা যায় না, তাকে ছদ্মবেশী সমাস বলে।  বাক্যও সমাস হতে পারে। বাক্যের মধ্যে লুকায়িত বা আপাতদৃষ্টে বাক্যের অনুরূপ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী সমাসকে বাক্যাশ্রয়ী সমাস বলা হয়। যদি কোনো সমাসবদ্ধ পদ একটি বাক্যের ন্যায় গঠন নিয়ে বাাক্যের মতো অর্থ প্রকাশ করে, তাকে বাক্যাশ্রয়ী সমাস বলে। প্রথমে মনে হয় এগুলো সমাসবদ্ধ পদ নয়, ভালোভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, সমাসবদ্ধ পদ।যেমন: পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন। রক্তদান কর্মসূচি। কোরোনা প্রতিরোধ করো। দুনিয়ার মজদুর এক হও।

৬.  বিদেশি শব্দে দন্ত্য-স

বিদেশি শব্দে মূর্ধন্য-ষ ব্যবহার হবে না, সবসময় দন্ত্য-স ব্যবহার হবে। যেমন পোস্ট অফিস, স্টার, স্টাফ, স্টেশন, স্ট্যাটাস, মাস্টার, ডাস্টার, পোস্টার, স্টক, স্টিমার, ফাস্ট, ক্লাস, স্ট্রিট, বেস্ট প্রভৃতি। অন্যদিকে, ষত্ব-বিধি অনুযায়ী শব্দের বানানে ট-বর্গীয় বর্ণের সঙ্গে মূর্ধন্য-ষ যুক্ত হয়ে সাধারণত ‘ষ্ট’ বসবে। যেমন বৃষ্টি, কৃষ্টি, সৃষ্টি, দৃষ্টি, মিষ্টি, নষ্ট, কষ্ট, তুষ্ট, সন্তুষ্ট, দুষ্ট, স্পষ্ট, অতিষ্ঠ, নিষ্ঠ ইত্যাদি। ব্যতিক্রম : খ্রিষ্ট, খ্রিষ্টীয়, খ্রিষ্টাব্দ।

৭. পদের শেষে ‘-জীবী’ ও ‘-জীব’ শব্দের বানান

পদের শেষে ‘-জীবী’-যুক্ত বাক্যে ঈ-কার হবে। যেমন— কৃষিজীবী, চাকরিজীবী, পেশাজীবী, কলমজীবী, বুদ্ধিজীবী, শ্রমজীবী ইত্যাদি। তেমনি, -জীবী, জীবিত, জীবিকা প্রভৃতি শব্দের ‘-জীব’ বানানে ‘বর্গীয়-জ’ বর্ণে ‘দীর্ঘ ঈ-কার’ হবে। যেমন—সজীব, রাজীব, নির্জীব, জীবিত, জীবিকা, জীবন প্রভৃতি। যে-কোনো জীবী দুটো ঈ-কার নিয়ে চলে। যেমন: মৎস্যজীবী, শ্রমজীবী, চিকিৎসাজীবী, কৃষিজীবী – – -। জীবি কখনো শুদ্ধ নয়। মনে রাখুন, √জীব+ইন্‌= জীবী। -জীবী ইন্‌-প্রত্যয়ন্ত শব্দ। ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দে ইন্‌-এর পরিবর্তে ঈ-কার হয়।

৮. বহুবচন-বাচক ‘-বলি’

পদের শেষে বহুবচন-বাচক ‘-বলি’ (আবলি) ই-কার-যুক্ত হবে। যেমন— দৃশ্যাবলি, কার্যাবলি, শর্তাবলি, ব্যাখ্যাবলি, নিয়মাবলি, তথ্যাবলি, সমস্যাবলি, পদাবলি, সমস্যাবলি প্রভৃতি। মনে রাখবেন, বলী অর্থ— বলবান, শক্তিশালী। পদের শেষের বলি শক্তিশালী নয়। তাই সে ই-কার নিয়ে পদের শেষ যুক্ত হয়। 

৯. পূর্ণ ও পুন

 ‘সম্পূর্ণ’ বা ‘পুরো’ প্রভৃতি অর্থ বোঝালে ‘পূর্ণ’ শব্দটির প-য়ে ‘দীঘ ঊ-কার’ এবং ‘র্ণ’  হবে। যেমন— পূর্ণাবয়ব, পূর্ণরূপ, পূর্ণমান, সম্পূর্ণ, পরিপূর্ণ, পূর্ণমাত্রা, পূর্ণরাত্রি, পূর্ণমর্যাদা, পূর্ণচন্দ্র প্রভৃতি। তবে, ‘পুন’ শব্দাণু দিয়ে ‘পুনঃ/পুন + রেফ/পুনরায়’, বারবার বা আবার প্রভৃতি নির্দেশ করে শব্দটির প-য়ে উ-কার হবে এবং এটি সংশ্লিষ্ট শব্দের সঙ্গে সেঁটে বসবে। যেমন: পুনঃপ্রকাশ, পুনঃপরীক্ষা, পুনঃপ্রবেশ, পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পুনঃপুন, পুনর্জীবিত, পুনর্নিয়োগ, পুনর্নির্মাণ, পুনর্মিলন, পুনর্মিলনী, পুনর্লাভ, পুনর্মুদ্রিত, পুনরুদ্ধার, পুনর্বিচার, পুনর্বিবেচনা, পুনর্গঠন, পুনর্বাসন প্রভৃতি।

১০. স্ত ও স্থ

যে সকল শব্দের শেষে ‘দন্ত্য-স’ আছে সে সকল শব্দের শেষে ‘ত’ কিংবা সংস্কৃত ‘ক্ত’ প্রত্যয়যুক্ত করা হলে শব্দের শেষে ‘স্ত’ হবে এবং শব্দটি বিশেষণে পরিণত হয়। যেমন: বিন্যাস থেকে বিন্যস্ত, আশ্বাস থেকে আশ্বস্ত, সন্ত্রাস  থেকে সন্ত্রস্ত ইত্যাদি।
শব্দের অর্থ ‘যে বা যে স্থানে’ প্রকাশ করলে শব্দটির সঙ্গে ‘স্থ’ যুক্ত হবে। যেমন: গ্রহ থেকে গ্রহস্থ, কণ্ঠ থেকে কণ্ঠস্থ, দেশ থেকে দেশস্থ, গ্রাম থেকে গ্রামস্থ প্রভৃতি।
কোন শব্দে ‘স্ত’ বা ‘স্থ’ বসানো নিয়ে ঝামেলায় পড়লে প্রথমে শব্দটি হতে ‘স্থ’ বাদ দিয়ে দিন। এরপর অবশিষ্ট শব্দাংশ অর্থবোধক হলে  ‘স্থ’ বসানো যাবে, অন্যথায় ‘স্ত’।  যেমন: অধীনস্থ, অন্তঃস্থ, নিকটস্থ, পকেটস্থ, দ্বারস্থ, পরিবারস্থ, কণ্ঠস্থ, ভূগর্ভস্থ, মনস্থ, মুখস্থ, সভাস্থ, সমাধিস্থ, মনস্থ ইত্যাদি শব্দগুলো হতে ‘স্থ’ বাদ দিলেও প্রত্যেকটি শব্দ অর্থবোধক থাকে।
অভ্যস্ত, অস্ত, আশ্বস্ত, নিরস্ত, ন্যস্ত, পরাস্ত, পর্যুদস্ত, প্রশস্ত শব্দগুলো হতে ‘স্ত’ বাদ দিলে শব্দগুলো আর অর্থবোধক থাকে না। তবে এক ব্যতিক্রমও রয়েছে।

 

১১.  ‘কে’ এর ফাঁক-অফাঁক

বাক্যে ‘কে’ এবং ‘-কে’ কখন কোথায় কীভাবে বসবে এ নিয়ে শুবাচে অনেক শুবাচির লেখায় কিছুটা ভিন্নতা এবং সংশয় পরিলক্ষিত হয়। বাক্যের মধ্যে  কে কখনো সংশ্লিষ্ট শব্দের সঙ্গে সেঁটে বসে আবার কখনো ফাঁক রেখে বসে। বস্তুত ‘কে’ যদি নিজে বাক্যের স্বাধীন পদ হিসেবে প্রশ্নজ্ঞাপন করে এবং উত্তরের মূল নির্দেশক হিসেবে  ‘কে’ (Who) অর্থে প্রয়োগ করা হয় তাহলে ওই ‘কে’  সংশ্লিষ্ট শব্দ হতে সর্বদা ফাঁক  বজায় রেখে বসবে। এরূপ কে-যুক্ত প্রশ্নবোধক বাক্যের উত্তর সাধারণভাবে হ্যাঁ বা না দিয়েও অর্থবহভাবে সম্পন্ন করা যায় না। যেমন:  (১) তাদের কে আসতে বলেছে? এই বাক্যে কে নিজেই একটি স্বাধীন পদ। যা মূল প্রশ্নজ্ঞাপক পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এরকম ‘কে’-প্রাধান্যজ্ঞাপক প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ বা না দিয়ে দেওয়া যায় না। যেমন:  তোমরা কে কে আমার সঙ্গে যেতে চাও?   বাবুল আবার কে? তুমি কে?  আমার সঙ্গে  কে যাবে?

আবার যদি বলা হয়, (২) তাদের(ক)/আমাকে/ বাবুলকে আসতে বলেছ? এটিও প্রশ্নবোধক। এখানে -কে’  সংশ্লিষ্ট পদের সঙ্গে সেঁটে বসেছে। এসব বাক্যে উত্তরের লক্ষ্য কে নয় বরং প্রশ্ন যাকে করা হয়েছে সেই। এমন প্রশ্নের উত্তর সাধারণভাবে হ্যাঁ বা না দিয়ে দেওয়া যায়।   যেমন:  লোকটিকে তুমি দেখেছ? আমাকে যেতে হবে কি? 

আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রশ্নবোধক বাক্য না হলেও কিংবা সরাসরি প্রশ্ন না-বোঝালেও ‘কে’ পদটি পৃথক বসে। তবে এখানে প্রচ্ছন্ন একটি উত্তরের প্রত্যাশা থাকে। এরূপ বাক্যকে ছদ্মপ্রশ্নবোধক বাক্য বলা যায়। যেমন:  কে যেন আমায় ডাকে। তোমরা  কে কে যাবে তাদের নাম জানতে চাই।

যদি কে দিয়ে প্রশ্ন না-বোঝায় তাহলে ‘কে’ পদটি সাধারণত সংশ্লিষ্ট পদের সঙ্গে সেঁটে বসবে। যেমন: বাবুলকে আমি  দেখিনি। তোমাকে আমি আসতে বলিনি। আমি কখনো জাফরকে দেখিনি। তাদেরকে আসতে বলা হয়েছে।

১২. ক্রিয়াপদে ‘না’ অব্যয়

ক্রিয়াপদের পূর্বে ব্যবহৃত হলে ‘না’ অব্যয়ের পর হাইফেন বিধেয়। যেমন: না-দেখা, না-খাওয়া, না-যাওয়া। তবে ক্রিয়াপদ ছাড়া অন্য কোনো শব্দের আদিতে ব্যবহৃত ‘না’ অব্যয়ের পর হাইফেন দেওয়া বিধেয় নয়। যেমন: নাবালক, নাহক, নাজায়েজ, নাপাক।

১৩. বিদেশি শব্দে ঈ ণ ছ ষ

বিদেশি শব্দে দীর্ঘ ঈ-কার, মূর্ধন্য-ণ, ছ, মূর্ধন্য-ষ প্রভৃতি বর্ণচিহ্ন ব্যবহার বিধেয় না। যেমন: ইংরেজি, টেলিভিশন, সরকারি, হর্ন, কর্নার, গভর্নর, স্টার, সালাম, ইনসান, বাসস্ট্যান্ড, মাস্টার। ব্যতিক্রম: খ্রিষ্টাব্দ, খ্রিষ্টান, খ্রিষ্ট, খ্রিষ্টপূর্ব ইত্যাদি।

১৪.  প্রতিবর্ণীকরণে অ্যা-এ

 বিদেশি শব্দের বাংলা বানানে বাঁকা শব্দের উচ্চারণে ‘অ্যা’ ব্যবহার হবে। যেমন: অ্যান্ড (and), অ্যাড (ad/add), অ্যাকাউন্ট (Account), অ্যাম্বুলেন্স (Ambulance), অ্যাসিস্ট্যান্ট (assistant), অ্যাডভোকেট (advocate), অ্যাকাডেমিক (academic), অ্যাডভোকেসি (advocacy) প্রভৃতি। তবে, অবিকৃত বা সরলভাবে উচ্চারণে ‘এ’ হয়। যেমন: এন্টার (enter), এন্ড (end), এডিট (edit), বাংলা একাডেমি (Bangla Academy) প্রভৃতি।

১৫. ইংরেজি বর্ণ S-এর প্রতিবর্ণ

 ইংরেজি বর্ণ S-এর বাংলা প্রতিবর্ণ ‘দন্ত্য-স’। যেমন: সিট (Seat/Sit), রেজিস্ট্রেশন (Registration)। অন্যদিকে ইংরেজি sh, -sion, -tion বর্ণগুচ্ছের জন্য ‘তালব্য-শ’ বসবে। যেমন:  শিট, (sheet), মিশন (mission), স্টেশন (station) প্রভৃতি।

৬. আরবি বর্ণের প্রতিবর্ণিকরণ

আরবি বর্ণ ش (শিন)-এর বাংলা বর্ণরূপ হবে ‘তালব্য-শ’ এবং ث (সা), س (সিন) ও ص (সোয়াদ)-এর বাংলা বর্ণরূপ হবে ‘দন্ত্য-স’। ث (সা), س (সিন) ও ص (সোয়াদ)-এর উচ্চারণ মূলশব্দের মতো হবে এবং বাংলা বানানের ক্ষেত্রে ‘দন্ত্য-স’ ব্যবহার করতে হবে। যেমন:  সালাম, শাহাদাত, শামস্, সূরা, সুন্নাত ইত্যাদি। ফারসি, ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষা থেকে আগত শব্দসমূহে ছ, ণ ও ষ ব্যবহার হবে না। ব্যতিক্রম: খ্রিষ্ট, খ্রিষ্টান, খ্রিষ্টাব্দ, খ্রিষ্টপূর্ব প্রভৃতি।

১৭. ণত্ববিধি

ণত্ব বিধান অনুসারে তৎসম শব্দে মূর্ধন্য-ষ ব্যবহার করতে হবে। কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া ছাড়া খাঁটি বাংলা ও বিদেশি শব্দে ‘মর্ধূন্য-ষ’ ব্যবহার হবে না। বাংলা বানানে কেবল তৎসম শব্দে ‘মূর্ধন্য-ষ’ ব্যবহৃত হবে। যুক্তবর্ণ, ঋ-কার ও র-ফলা যোগে গঠিত যুক্তধ্বনিতে ‘দন্ত্য-স’-এর উচ্চারণ পাওয়া যায়। যেমন: সৃজন, স্মৃতি, স্পর্শ, স্রোত, শ্রী, আশ্রম প্রভৃতি। ব্যতিক্রম: খ্রিষ্ট, খ্রিষ্টাব্দ, খ্রিষ্টীয়, ষোলো, ষণ্ডামর্ক, ষণ্ট, ষাঁড়, ষাট, ষাটগম্বুজ, ষোলোকলা প্রভৃতি।

error: Content is protected !!